২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

وَلَمَّا بَرَزُوۡا لِجَالُوۡتَ وَجُنُوۡدِہٖ قَالُوۡا رَبَّنَاۤ اَفۡرِغۡ عَلَیۡنَا صَبۡرًا وَّثَبِّتۡ اَقۡدَامَنَا وَانۡصُرۡنَا عَلَی الۡقَوۡمِ الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۵۱﴾ؕ

২৫১
অতঃপর, যখন তাহারা জালুত৩১১ ও তাহার সেনাবাহিনীর সহিত যুদ্ধ করিবার জন্য বাহির হইল, তখন তাহারা বলিল, ‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উপর ধৈর্যশক্তি বর্ষণ কর এবং (যুদ্ধক্ষেত্রে) আমাদের কদমকে দৃঢ় প্রতিষ্ঠিত কর এবং কাফের জাতির বিরুদ্ধে আমাদিগকে সাহায্য কর।’
৩১১। ‘জালুত’ এখানে কোন ব্যক্তিকে বুঝায় নাই, বরং একটি জাতিকে বুঝাইয়াছে। সৈন্য বাহিনী শব্দ দ্বারা তাহাদের সহায়তাকারী ও সহযোগীদিগকে বুঝাইয়াছে। বাইবেল, মিদিয়ানী শিরোনামের নিম্নে জালুতের উল্লেখ করিয়াছে। এই মিদিয়ানীরা বনী ইসরাঈলকে কষ্ট দিয়াছে, লুণ্ঠন করিয়াছে এবং বহু বৎসর যাবত তাহাদের জায়গা-জমি ও বাড়ী-ঘর ধ্বংস করিয়াছে (বিচারক ৬ঃ১-৬)। আমালেকীরা এবং অন্যান্য প্রাচ্য গোত্রগুলি মিদিয়ানীদিগকে এই লুণ্ঠনকার্যে সাহায্য করিত (বিচারক ৬ঃ৩) এবং ইহাদিগকে এই আয়াতে সৈন্য বাহিনী বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে।

فَہَزَمُوۡہُمۡ بِاِذۡنِ اللّٰہِ ۟ۙ وَقَتَلَ دَاوٗدُ جَالُوۡتَ وَاٰتٰٮہُ اللّٰہُ الۡمُلۡکَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَعَلَّمَہٗ مِمَّا یَشَآءُ ؕ وَلَوۡلَا دَفۡعُ اللّٰہِ النَّاسَ بَعۡضَہُمۡ بِبَعۡضٍ ۙ لَّفَسَدَتِ الۡاَرۡضُ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ ذُوۡ فَضۡلٍ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۲۵۲﴾

২৫২
অতএব, আল্লাহ্‌র হুকুমে তাহারা উহাদিগকে পরাস্ত৩১২ করিল, এবং দাউদ জালুতকে হত্যা করিল, এবং আল্লাহ্ তাহাকে হুকূমত ও হিক্‌মত দান করিলেন এবং তিনি যাহা চাহিয়াছিলেন তাহা তাহাকে শিক্ষা দিলেন এবং আল্লাহ্‌ যদি মানব জাতিকে তাহাদের এক দলকে অপর দল দ্বারা প্রতিহত না করিতেন তাহা হইলে অবশ্যই পৃথিবী ফাসাদপূর্ণ৩১৩ হইয়া যাইত। কিন্তু আল্লাহ্‌ সকল জগদ্বাসীর উপর অতীব অনুগ্রহশীল।
৩১২। তালুত (গিদিওন) জালুতকে (গলিয়াথ বা মিদিয়ান জাতিকে) পরাভূত করিয়াছিলেন বটে, কিন্তু জালুতকে (মিদিয়ান জাতিকে) সমূলে উৎখাত করিতে সময় লাগিয়াছিল প্রায় ২০০ বৎসর। তালুতের হাতে পরাজয়ের সূচনা হইয়াছিল। আর ইহার দুইশত বৎসর পর দাউদ (আঃ) এর হাতে মিদিয়ান জাতি এমন চূড়ান্ত পরাজয় বরণ করে যে, এর পর তারা আর মাথা তুলে নাই। দাউদ (আঃ) যে শক্তিধর ব্যক্তিকে পরাজিত করিয়াছিলেন, তাহার নাম গোলিয়াথ বলিয়া বাইবেলে উল্লেখ আছে (১ শমূয়েল ১৭ঃ৪), যাহা কুরআনের জালুত নামের অনুরূপ। সম্ভবতঃ কুরআনে যে গুণবাচক নামটি ঐ জাতির জন্য ব্যবহৃত হইয়াছে, দাউদ (আঃ)-এর সময়ে সেই জাতির নেতার নামও তাহাই ছিল।
৩১৩। সত্য ও ন্যায়ের যুদ্ধ করার সার্বিক দর্শন ও যুক্তি এই কয়েকটি মাত্র শব্দেই বিধৃত হইয়াছে। অন্যায় ও উচ্ছঙ্খলাকে দমন করা এবং শান্তিকে সমুন্নত রাখার জন্যই যুদ্ধ। বিশৃংখলা সৃষ্টি, শান্তি-ভঙ্গ ও দুর্বল জাতির স্বাধীনতা হরণের জন্য যুদ্ধ নয়।

تِلۡکَ اٰیٰتُ اللّٰہِ نَتۡلُوۡہَا عَلَیۡکَ بِالۡحَقِّ ؕ وَاِنَّکَ لَمِنَ الۡمُرۡسَلِیۡنَ ﴿۲۵۳﴾

২৫৩
এইগুলি আল্লাহ্‌র আয়াত, যাহা আমরা সত্যসহ তোমার নিকট আবৃত্তি করিয়া শুনাইতেছি, এবং নিশ্চয় তুমি রসূলগণের অন্যতম।

تِلۡکَ الرُّسُلُ فَضَّلۡنَا بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ۘ مِنۡہُمۡ مَّنۡ کَلَّمَ اللّٰہُ وَرَفَعَ بَعۡضَہُمۡ دَرَجٰتٍ ؕ وَاٰتَیۡنَا عِیۡسَی ابۡنَ مَرۡیَمَ الۡبَیِّنٰتِ وَاَیَّدۡنٰہُ بِرُوۡحِ الۡقُدُسِ ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ مَا اقۡتَتَلَ الَّذِیۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِہِمۡ مِّنۡۢ بَعۡدِ مَا جَآءَتۡہُمُ الۡبَیِّنٰتُ وَلٰکِنِ اخۡتَلَفُوۡا فَمِنۡہُمۡ مَّنۡ اٰمَنَ وَمِنۡہُمۡ مَّنۡ کَفَرَ ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ مَا اقۡتَتَلُوۡا ۟ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ یَفۡعَلُ مَا یُرِیۡدُ ﴿۲۵۴﴾٪

২৫৪
এই রসূলগণ— যাহাদের মধ্য হইতে আমরা কতককে কতকের উপর শ্রেষ্ঠত্ব প্রদান করিয়াছি—তাহাদের মধ্যে কতক এমন আছে যাহাদের সহিত আল্লাহ্ বাক্যালাপ করিয়াছেন, এবং তাহাদের মধ্যে কতককে মর্যাদায়৩১৪ উন্নীত করিয়াছেন। এবং আমরা ঈসা ইবনে মরিয়মকে স্পষ্ট প্রমাণসমূহ দিয়াছিলাম এবং রূহুল কুদুস (পবিত্র আত্মা) দ্বারা তাহাকে শক্তি দান করিয়াছিলাম। এবং যদি আল্লাহ্ চাহিতেন তাহা হইলে যাহারা তাহাদের পরে হইয়াছে তাহাদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসমূহ সমাগত হওয়ার পর তাহারা পরস্পর ঝগড়া বিবাদ করিত না, কিন্তু তাহারা মতভেদ করিল। ফলে তাহাদের মধ্যে কতক লোক ঈমান আনিল এবং তাহাদের মধ্যে কতক লোক অস্বীকার করিল। এবং আল্লাহ্ যদি চাহিতেন তাহা হইলে তাহারা পরস্পরের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ করিত না, কিন্তু আল্লাহ্ যাহা চাহেন তাহাই তিনি করেন।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ৩৩
৩১৪। এই বাক্যদ্বারা একথা বুঝায় না যে, নবীগণের মধ্যে এমন কেহ কেহ আছেন, যাহাদের সাথে আল্লাহ্‌ কথা বলেন না, কিংবা যাহারা আধ্যাত্মিকতার উচ্চ মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত নহেন। এই বাক্যটির আসল অর্থ হইল, নবী দুই প্রকারের হইয়া থাকেনঃ (ক) যাহারা নূতন শরীয়াত আনয়ন করেন— তাহাদিগকে মুকাল্লাম নবী বলা হয়, (খ) অন্যেরা আধ্যাত্মিক মর্যাদায় অত্যুচ্চ স্তরে থাকা সত্বেও গয়ের মুকাল্লাম নবী। রেওয়ায়াত আছে, হযরত রসূলে করীম (সাঃ) বলিয়াছেন, হযরত আদম (আঃ) মুকাল্লাম নবী ছিলেন (মুসনাদ)।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنۡفِقُوۡا مِمَّا رَزَقۡنٰکُمۡ مِّنۡ قَبۡلِ اَنۡ یَّاۡتِیَ یَوۡمٌ لَّا بَیۡعٌ فِیۡہِ وَلَا خُلَّۃٌ وَّلَا شَفَاعَۃٌ ؕ وَالۡکٰفِرُوۡنَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ﴿۲۵۵﴾

২৫৫
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! আমরা তোমাদিগকে যে রিয্‌ক দান করিয়াছি উহা হইতে খরচ কর সেই দিন আসিবার পূর্বে যেদিন কোন ক্রয়-বিক্রয়৩১৫ এবং বন্ধুত্ব৩১৬ এবং শাফায়াত৩১৭ (সুপারিশ) চলিবে না, বস্তুতঃ কাফেরগণই যালেম।
৩১৫। ঐ দিন, পরিত্রাণ খরিদ করা যাইবে না। মানুষের সৎকর্ম ও আল্লাহ্‌র অনুগ্রহের উপর পরিত্রাণ ও মুক্তি নির্ভর করিবে।
৩১৬। সেখানে সেদিন নূতন বন্ধুত্ব স্থাপনের সুযোগ থাকবে না, ইহকালের বন্ধুরাও কাজে আসবে না।
৩১৭। ৮৫ টীকা দেখুন।

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ھُوَ ۚ اَلۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ۬ۚ لَا تَاۡخُذُہٗ سِنَۃٌ وَّلَا نَوۡمٌ ؕ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ مَنۡ ذَا الَّذِیۡ یَشۡفَعُ عِنۡدَہٗۤ اِلَّا بِاِذۡنِہٖ ؕ یَعۡلَمُ مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمَا خَلۡفَہُمۡ ۚ وَلَا یُحِیۡطُوۡنَ بِشَیۡءٍ مِّنۡ عِلۡمِہٖۤ اِلَّا بِمَا شَآءَ ۚ وَسِعَ کُرۡسِیُّہُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ ۚ وَلَا یَـُٔوۡدُہٗ حِفۡظُہُمَا ۚ وَہُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ﴿۲۵۶﴾

২৫৬
আল্লাহ্ - তিনি ব্যতীত কোন মা’বূদ নাই, তিনি চিরঞ্জীব-জীবনদাতা, চিরস্থায়ী- স্থিতিদাতা, না তন্দ্রা তাঁহাকে স্পর্শ করিতে পারে এবং না নিন্দ্রা। যাহা কিছু আকাশসমূহে আছে এবং যাহাকিছু পৃথিবীতে আছে, সবই তাঁহার। কে আছে যে তাঁহার অনুমতি ব্যতিরেকে তাঁহার নিকট শাফায়াত (সুপারিশ) করিতে পারে? তাহাদের সম্মুখে যাহা কিছু আছে এবং তাহাদের পশ্চাতে যাহা কিছু আছে সবই তিনি জানেন, তাঁহার জ্ঞানের কিছুই তাহারা আয়ত্ত করিতে পারে না, কেবল তাহা ব্যতীত যাহা তিনি চাহেন। তাহার জ্ঞান ও শাসনক্ষমতা৩১৮ আকাশ সমূহকে ও পৃথিবীকে পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছে, উহাদের রক্ষণাবেক্ষণ তাঁহাকে ক্লান্ত করে না, বস্তুতঃ তিনি অতি উচ্চ, মহিমান্বিত।
৩১৮। ‘কুরসী’ অর্থ আসন, দেয়ালের নীচের দিকের পুরু অংশ, জ্ঞান, কর্তৃত্ব ও শক্তি (আকরাব), বহুবচন ‘কারাসী’ অর্থ জ্ঞানী লোক। আয়াতটি আল্লাহ্‌তা’লার তৌহীদকে (একত্বকে) ও তাঁহার বড় বড় গুণাবলীকে, অতি মাধুর্যের সাথে ও সুন্দরতর ভাষায় প্রকাশ করিয়াছে। মহানবী (সাঃ) বলিয়াছেন, “আয়াতুল কুরসী কুরআন শরীফের মধ্যে মহোত্তম আয়াত” (মুসলিম)।

لَاۤ اِکۡرَاہَ فِی الدِّیۡنِ ۟ۙ قَدۡ تَّبَیَّنَ الرُّشۡدُ مِنَ الۡغَیِّ ۚ فَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِالطَّاغُوۡتِ وَیُؤۡمِنۡۢ بِاللّٰہِ فَقَدِ اسۡتَمۡسَکَ بِالۡعُرۡوَۃِ الۡوُثۡقٰی ٭ لَا انۡفِصَامَ لَہَا ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۵۷﴾

২৫৭
ধর্মের ব্যাপারে কোন বল প্রয়োগ৩১৯ নাই। (কারণ) সৎপথ ও ভ্রান্তি উভয়ের মধ্যে পার্থক্য সুস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে; সুতরাং যে ব্যক্তি তাগুতকে৩২০ (পুণ্যের পথে বাধাদানকারী বিদ্রোহী শক্তিকে) অস্বীকার করে এবং আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনে সে নিশ্চয় এমন এক সুদৃঢ় হাতলকে মযবুত করিয়া ধরিয়াছে যাহা কখনও ভাঙ্গিবার নহে। এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
৩১৯। পূর্ববর্তী আয়াতগুলিতে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে যে, ধর্মের প্রয়োজনে আত্মোৎসর্গ করা এবং ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা উচিত। ইহাতে কেহ ভুল বুঝিতে পারে যে, ইসলাম প্রচারের জন্য আল্লাহ্‌তা’লা বুঝি মুসলমানগণকে শক্তি প্রয়োগের অনুমতি দিয়াছেন। এই আয়াত এইরূপ ভুল বুঝা-বুঝির মূলোৎপাটন করিয়া, অতি পরিষ্কার ও জোরালো ভাষায় ঘোষণা করিতেছে যে, মুসলমানেরা যেন অমুসলমানদিগকে ইসলাম গ্রহণের জন্য কোন যবরদস্তি বা বল প্রয়োগ না করে। সাথে সাথে, এই নিষেধাজ্ঞার পক্ষে যুক্তিও দেওয়া হইয়াছে যে, সত্য বিভ্রান্তি হইতে সুস্পষ্টরূপে পৃথকভাবে বিরাজমান। অতএব, বল-প্রয়োগের প্রয়োজনই বা কি? ইসলাম দেদীপ্যমান সত্য।
৩২০। ‘তাগুৎ’ অর্থ সীমা লঙ্ঘনকারী, দানব, যাহারা অন্যকে সত্য ও নেকী হইতে ফিরাইয়া রাখে, সকল দেব-মূর্তি। শব্দটি একবচন ও বহুবচন উভয় বচনেই ব্যবহৃত হয় (২ঃ২৫৮; ৪ঃ৬১)।

اَللّٰہُ وَلِیُّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۙ یُخۡرِجُہُمۡ مِّنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَوۡلِیٰٓـُٔہُمُ الطَّاغُوۡتُ ۙ یُخۡرِجُوۡنَہُمۡ مِّنَ النُّوۡرِ اِلَی الظُّلُمٰتِ ؕ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۵۸﴾٪

২৫৮
আল্লাহ্ ঐ সকল লোকের অভিভাবক যাহারা ঈমান আনে; তিনি তাহাদিগকে অন্ধরকাররাশি হইতে বাহির করিয়া আলোকের দিকে আনেন, এবং যাহারা অস্বীকার করিয়াছে ‘তাগুত’ তাহাদের অভিভাবক, তাহারা তাহাদিগকে আলোক হইতে বাহির করিয়া অন্ধকাররাশির দিকে লইয়া যায়। এই সকল লোকই অগ্নির অধিবাসী, তাহারা উহাতে দীর্ঘকাল বাস করিবে।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ৩৪

اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡ حَآجَّ اِبۡرٰہٖمَ فِیۡ رَبِّہٖۤ اَنۡ اٰتٰٮہُ اللّٰہُ الۡمُلۡکَ ۘ اِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّیَ الَّذِیۡ یُحۡیٖ وَیُمِیۡتُ ۙ قَالَ اَنَا اُحۡیٖ وَاُمِیۡتُ ؕ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ فَاِنَّ اللّٰہَ یَاۡتِیۡ بِالشَّمۡسِ مِنَ الۡمَشۡرِقِ فَاۡتِ بِہَا مِنَ الۡمَغۡرِبِ فَبُہِتَ الَّذِیۡ کَفَرَ ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۲۵۹﴾ۚ

২৫৯
তুমি কি ঐ ব্যক্তির প্রতি লক্ষ্য কর নাই যে ইব্‌রাহীমের সহিত তাহার প্রভু সম্বন্ধে এই কারণে বিতর্কে লিপ্ত হইয়াছিল যে, আল্লাহ্ তাহাকে শাসনক্ষমতা দিয়াছিলেন? যখন ইব্‌রাহীম বলিল, ‘তিনি আমার প্রভু, যিনি জীবিত করেন এবং মৃত্যু দেন’। সে বলিল, ‘আমিও জীবিত করি এবং মৃত্যু দিই।’ ইব্‌রাহীম বলিল, ‘বেশ কথা আল্লাহ্‌তো সূর্যকে পূর্বদিক হইতে লইয়া আসেন, এখন তুমি উহাকে পশ্চিম দিক হইতে লইয়া আস দেখি।’ ইহাতে যে অবিশ্বাস করিয়াছিল সে হতভম্ব৩২১ হইয়া গেল। বস্তুতঃ আল্লাহ্ যালেম জাতিকে হেদায়াত দেন না।
৩২১। হযরত ইব্‌রাহীম (আঃ) প্রতিমা ভঙ্গকারী ছিলেন। তাঁহার জাতি সূর্য ও তারকার পূজা করিত, তাহাদের প্রধান দেবতা ছিল মেরোডাক (মাদরুক), যাহাকে আদতে মনে করা হইত প্রভাতের ও বসন্তের সূর্য (এনসাই, বিব এবংএনসাই রিল এথ ২য়, ২৯৬)। তাহারা বিশ্বাস করিত যে, সকল প্রকারের জীবনই সূর্য-নির্ভর। ইব্‌রাহীম (আঃ) কট্টর অবিশ্বাসীকে বলিলেন, ‘বেশ কথা, আল্লাহ্ সূর্যকে পূর্বদিক হইতে লইয়া আসেন, এখন তুমি উহাকে পশ্চিম দিক হইতে লইয়া আস দেখি।’ ইহাতে সে হতভম্ব হইয়া গেল। সে একথা বলিতে পারে না যে সূর্যকে পশ্চিম দিকে উদিত করার ক্ষমতা তাহার নাই, কারণ এইরূপ উত্তর দিলে, জীবন-মৃত্যুর উপরে তাহার ক্ষমতা রহিয়াছে এই দাবী চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া যায়। আবার এই উত্তরও দিতে পারেনা যে, সে সূর্যকে পশ্চিম দিক হইতে উদিত করিয়া পূর্বদিকে অস্তমিত করিতে সক্ষম। কেননা এইরূপ উত্তর দিলে, তাহার জাতির উপাস্য দেবতাকে অবমাননা করার জন্য সে জাতির কাছে দণ্ডনীয় হইবে। তাই সে বিস্ময়-বিমূঢ় অবস্থায় বোবার মত চুপ করিয়া থাকিল।

اَوۡ کَالَّذِیۡ مَرَّ عَلٰی قَرۡیَۃٍ وَّہِیَ خَاوِیَۃٌ عَلٰی عُرُوۡشِہَا ۚ قَالَ اَنّٰی یُحۡیٖ ہٰذِہِ اللّٰہُ بَعۡدَ مَوۡتِہَا ۚ فَاَمَاتَہُ اللّٰہُ مِائَۃَ عَامٍ ثُمَّ بَعَثَہٗ ؕ قَالَ کَمۡ لَبِثۡتَ ؕ قَالَ لَبِثۡتُ یَوۡمًا اَوۡ بَعۡضَ یَوۡمٍ ؕ قَالَ بَلۡ لَّبِثۡتَ مِائَۃَ عَامٍ فَانۡظُرۡ اِلٰی طَعَامِکَ وَشَرَابِکَ لَمۡ یَتَسَنَّہۡ ۚ وَانۡظُرۡ اِلٰی حِمَارِکَ وَلِنَجۡعَلَکَ اٰیَۃً لِّلنَّاسِ وَانۡظُرۡ اِلَی الۡعِظَامِ کَیۡفَ نُنۡشِزُہَا ثُمَّ نَکۡسُوۡہَا لَحۡمًا ؕ فَلَمَّا تَبَیَّنَ لَہٗ ۙ قَالَ اَعۡلَمُ اَنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۶۰﴾

২৬০
অথবা সেই ব্যক্তির ন্যায় (তুমি কাহাকেও কি লক্ষ্য করিয়াছ?) যে এমন এক শহরের৩২২ পার্শ্ব দিয়া অতিক্রম করিয়াছিল যাহার ছাদসমূহ ধ্বসিয়া ভূপতিত হইয়াছিল (এই দৃশ্য দেখিয়া) সে বলিল, ‘ইহার ধ্বংসের পর আল্লাহ্ কখন ইহাকে পুনরুজ্জীবন দান করিবেন?’ ইহাতে আল্লাহ্ তাহাকে একশত৩২৩ বৎসরের জন্য মৃত্যু দিলেন, অতঃপর তিনি তাহাকে পুনরুত্থিত করিলেন এবং জিজ্ঞাসা করিলেন, ‘তুমি (এই অবস্থায়) কত কাল ছিলে? সে বলিল, ‘একদিন বা এক দিনের৩২৩-ক কিয়দংশ অবস্থান করিয়াছি।’ তিনি বলিলেন, ‘(ইহাও ঠিক) বরং৩২৩-খ তুমি এই অবস্থায় একশত৩২৪ বৎসর ছিলে (ইহাও ঠিক), তুমি তোমার খাদ্য দ্রব্যের এবং পানীয় বস্তুর প্রতি লক্ষ্য কর, ঐগুলি পচে নাই, এবং তুমি তোমার গর্দভের৩২৫ প্রতিও লক্ষ্য কর।’ এবং আমরা (এইরূপ এই জন্য করিয়াছি) যেন তোমাকে মানব জাতির জন্য এক নিদর্শন করিতে পারি। এবং তুমি অস্থিগুলির প্রতিও লক্ষ্য কর, কিরূপে আমরা উহাদিগকে সংযোজিত করি, অতঃপর, আমরা উহাদিগকে মাংসের আবরণ পরিধান করাই।’ অতঃপর, যখন প্রকৃত তত্ত্ব তাহার নিকট প্রকাশ হইয়া গেল, তখন সে বলিল, ‘আমি জানি যে নিশ্চয় আল্লাহ্ প্রত্যেক বিষয়ের৩২৬ উপর পূর্ণ ক্ষমতাবান।’
৩২২। এই আয়াতে ধ্বংসপ্রাপ্ত যে নগরীর উল্লেখ আছে, তাহা হইল জেরুযালেম। ব্যাবিলনের রাজা নবুখদ নিৎসর (বুখ্‌তানাসার) ৫৯৯ খৃষ্টপূর্বে এই নগরটি দখল করিয়া ইহার সবকিছু ধ্বস করিয়া প্রেতপুরীতে পরিণত করে। ইহার অধিবাসী ইহুদীদিগকে বন্দী করিয়া ব্যাবিলনে লইয়া যায়। এই বন্দীদের মধ্যে যিহিষ্কেল নবীও ছিলেন। বিজয়ীরা যিহিষ্কেলকে বীভৎসভাবে বিধ্বস্ত নগরীর করুণ দৃশ্য দেখাইয়া লইয়া যাইতে থাকে।
৩২৩। যিহিষ্কেল স্বভাবতঃই এই বীভৎস দৃশ্যাবলী দেখিয়া মর্মাহত হইলেন। তিনি কাতর হৃদয়ে আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করিলেন- হে প্রভু, এই নগরী না জানি কতদিনে জীবন ফিরিয়া পাইবে, ধ্বংসের পরেও আবার কখন ইহাতে প্রাণের স্পন্দন জাগিবে। তাহার প্রাণের দরদভরা দোয়া আল্লাহ্‌ শ্রবণ করিলেন। তাহাকে স্বপ্নে বা কাশ্‌ফে (দিব্যদৃষ্টিতে) দেখানো হইল, তাহার প্রার্থিত নগরীর পুনর্জীবন লাভ একশত বৎসরের মাথায় সম্পন্ন হইবে। আয়াতটিতে একথা বুঝায় না যে, যিহিষ্কেল একশত বৎসর পর্যন্ত মৃত অবস্থায় ছিলেন এবং তৎপর জীবিত হইয়া উঠিলেন। কুরআন, কাশ্‌ফে বা স্বপ্নে দৃষ্ট বস্তু বা বিষয়কে এমনভাবেই উল্লেখ করে, যেন সেই বস্তু, বিষয় বা ঘটনা প্রকৃত পক্ষেই ছিল বা ঘটিয়াছিল, স্বপ্ন বা কাশফের কথা উল্লেখই করা হয় না (১২ঃ৫)। যিহিষ্কেল তাহার কাশফের অর্থ বুঝিয়াছিলেন। ইহার অর্থ এই যে, বনী ইসরাঈল জাতি একশত বৎসর পর্যন্ত অসহায়, নির্যাতিত ও অপদস্থ অবস্থায় বন্দী হিসাবে থাকিবে। তারপর তাহারা নব চেতনায় জাগ্রত হইয়া, নূতন জীবন লাভ করিবে এবং তাহাদের পবিত্রভূমি জেরুযালেমে ফিরিয়া আসিবে। যিহিষ্কেলের কাশফ বা স্বপ্ন অক্ষরে অক্ষরে পূর্ণ হইয়াছিল। নবুখদ নিৎসর খৃঃপূঃ ৫৯৯ অব্দে জেরুযালেম দখল করিয়াছিল (২য় রাজাবলি-২৪ঃ১০)। যিহিষ্কেল কাশ্‌ফ দেখেন সম্ভবতঃ খৃঃপূঃ ৫৮৬ অব্দে। আর ইহা পূনঃনির্মিত হয়, ধ্বংসপ্রাপ্তির পূর্ণ এক শতাব্দী পরে। পূনঃনির্মাণের কাজ আরম্ভ হয় খৃঃপূঃ ৫৩৭ অব্দে মিদিয়ার সম্রাট সাইরাসের অনুমতি ও সাহায্য নিয়া পুনঃনির্মানের কাজ সমাপ্ত হয় খৃঃপৃঃ ৫১৫ অব্দে। ইসরাঈলীরা পুনর্বাসনের জন্য ব্যাবিলন রাজ্য ত্যাগ করিয়া ক্রমে ক্রমে আসিতে আসিতে আরও ১৫ বৎসর লাগিয়া যায় এবং খৃঃপৃঃ ৫০০ সনে জেরুযালেম নগরীতে আবার প্রাণ চাঞ্চল্য দেখা দেয়। বনী ইসরাঈল জাতি মৃতপ্রায় অবস্থা হইতে পুনরায় এক নব জীবন লাভ করিল। একথা শিশুসুলভ বলিয়া মনে হয় যে, আল্লাহ্‌তা’লা যিহিষ্কেলের মৃত্যু দিয়া ঠিকই একশত বৎসর পর্যন্ত মৃত রাখিয়া, তৎপর তাঁহাকে পুনর্জীবিত করিয়াছিলেন। এইরূপ করাতো যিহিষ্কেলের প্রার্থনার সাথে সঙ্গতিহীন। যিহিষ্কেল তাঁহাকে বা কোন ব্যক্তিকে, মৃত্যুদানের পর পুনরুত্থানের জন্য প্রার্থনা করেন নাই। তিনি প্রার্থনা করিয়াছিলেন, মৃতনগরী যেন জীবন পায়, বিধ্বস্ত জেরুযালেম যেন পুনরায় উহার অধিবাসীকে ফিরিয়া পায় ও প্রাণ চাঞ্চল্যে ভরিয়া উঠে।
৩২৩-ক। এই কথাটি অনির্দিষ্ট সময় বুঝাইয়া থাকে (১৮ঃ২০, ২০ঃ১৪) এবং কুরআনের বাগ্‌ধারা অনুযায়ী এই বুঝায় যে, যিহিষ্কেল ঐ অবস্থায় কতক্ষণ ছিলেন নিজে জানিতে পারেন নাই। ‘ইয়াউম’ এখানে ২৪ ঘন্টার দিনকে বুঝায় নাই, বরং অবাধ ও অনপেক্ষিক সময়কেও বুঝাইতেছে (১ঃ৪ দেখুন)। আমি একদিন বা দিনাংশ (এই অবস্থায়) ছিলাম- এই বাক্যটির দ্বারা যিহিষ্কেলের নিদ্রাবস্থায় ব্যয়িত সময়টিকে, কিংবা স্বপ্ন দেখার সময়টিকেও বুঝাইতে পারে।
৩২৩-খ। ‘বাল’ আরবীতে এমন একটি বিয়োজন অব্যয় যাহা (ক) পূর্বে বিব্রত বিষয়টিকে খণ্ডন করে, যেমন ২১ঃ২৭, অথবা (খ) একটি আলোচ্য বিষয় হইতে অন্য বিষয়ের আলোচনায় যাওয়া, যেমন ৮৭ঃ১৭। এখানে ‘বাল’ শব্দটি শেষোক্ত অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
৩২৪। “ইহাও ঠিক, তবে তুমি এই অবস্থায় একশত বৎসর ছিলে ইহাও ঠিক” এই বাক্যটির তাৎপর্য হইল, এক হিসাবে যদি যিহিষ্কেল ঐ অবস্থায় ১০০ বৎসর ছিলেন (কেননা কাশ্‌ফে বা জাগ্রত স্বপ্নে নিজেকে ১০০ বৎসর মৃত অবস্থায় দেখিতে পাইয়াছিলেন), তথাপি তাহার এই কথাও সত্য যে, তিনি ঐ স্বপ্ন দর্শনাবস্থায় একদিন বা দিনাংশ কাটাইয়াছিলেন, কেননা স্বপ্নে বা কাশ্‌ফে বিষয়াদি দেখিতে দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হয় না।
৩২৫। এই সত্যকে যিহিষ্কেলের মনে গভীরভাবে আঁকিয়া দিবার জন্যে আল্লাহ্ তাহাকে তাহার খাদ্য, পানীয় ও গাধার দিকে তাকাইতে বলিলেন। ঐ খাদ্য ও পানীয় বাসি হয় নাই, তাহার গাধাও স্বস্থানেই জীবিতাবস্থায় আছে। “তোমার গর্দভের প্রতিও লক্ষ্য কর” বাক্যটা, এই কথা প্রকাশ করে যে, যিহিষ্কেল মাঠে কাজের ফাঁকে গাধাকে পাশে রাখিয়া ঘুমাইয়াছিলেন, তখন স্বপ্ন দেখিয়াছিলেন কিংবা জাগ্রত অবস্থায় কাশ্‌ফী অবস্থায় নিজের মৃত্যু ও পুনর্জাগণের শত বর্ষের ব্যবধান দেখিয়াছিলেন। বন্দী অবস্থায় ইসরাঈলীদিগকে ব্যাবিলনের ক্ষেতে খামারে কৃষি কার্য করিতে হইত।
৩২৬। যিহিষ্কেল সমগ্র ইহুদী জাতির প্রতিনিধিত্ব করিতেছিলেন। তাঁহার, একশত বৎসর মৃত অবস্থায় থাকার রূপক অর্থ হইল, তাহার জাতির বন্দী অবস্থায় শত বর্ষব্যাপী অসহায়, অপমানজনক, পদানত, দীনহীন, পরাধীন জীবন ধারণ। এই শতবর্ষের লাঞ্ছনার জীবন যাপনের পরেই, ইসরাঈলী জাতি স্বকীয় সত্তায় নিজেকে আপন ভূমিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল। এইভাবেই যিহিষ্কেল আল্লাহ্‌র নিদর্শনে পরিণত হইলেন। (যিহিষ্কেল ৩৭ অধ্যায় দেখুন)।