৩

آل عمران

সূরা আ লে ‘ইম্‌রান

Aal-e-`Imran

মাদানী ২০১ আয়াত ২০ রুকু পারা ৩–৪

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২০১ আয়াত এবং ২০ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓمَّٓ ۙ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম মীম্‌৩৬২-ক
৩৬২-ক। ১৬ টীকা দেখুন।

اللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۙ الۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ؕ﴿۳﴾

৩
আল্লাহ্‌ (সেই সত্ত্বা), যিনি ব্যাতিরেকে কোন মা’বূদ নাই, তিনি চিরঞ্জীব-জীবনদাতা, চিরস্থায়ী-স্থিতিদাতা৩৬৩
৩৬৩।

এই আয়াতে ঈসা (আঃ)-এর উলূহীয়্যতের (ঈশ্বরত্বের) অলীক মতবাদকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা খণ্ডন করা হইয়াছে।এই মতবাদটি এই সূরার বিষয়াবলীর মধ্যে অন্যতম বিষয়। তাই, সূরার প্রথমেই যুক্তিযুক্তভাবে আল্লাহ্‌তা’লার ঐসব গুণাবলীর উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহা ঐ মতবাদটির মূলে কুঠারাঘাত করে। এই গুণাবলী হইলঃ আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভূ ও স্বনির্ভর। এই গুণগুলি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্‌র কোনও সহযোগী ও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই। অপরদিকে ইহাও প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আঃ ) যিনি জন্ম-মৃত্যুর নিয়মের অধীন ছিলেন; যিনি চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভু ও স্বনির্ভর ছিলেন না, তিনি কখনও ঈশ্বর ছিলেন না। খৃষ্টানদের প্রায়শ্চিত্তবাদ, যাহা যীশুর ইশ্বরত্বের বিশ্বাস হইতে উদ্ভূত, তাহাও ধূলিসাৎ হইয়া যায়। খৃষ্টানগণ বলেন, ঈসা (আঃ) মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য মৃত্যু বরণ করিয়াছিলেন। এই কথা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে তিনি খোদা হইতে পারেন না, কেননা আল্লাহ্তো তিনিই যিনি কখনও মৃত্যুবরণ করেন না, সাময়িক ভাবেও না। খৃষ্টানেরা অনর্থক এই যুক্তির অবতারণা করেন যে, যীশুর মৃত্যুর অর্থ হইল, ঈশ্বর-যীশুর শারীরিক অবস্থান হইতে বিচ্ছেদ। খৃষ্টানদের বিশ্বাস মতে, ঈশ্বর-যীশু ও তাঁহার মানব-দেহ-ধারণ ছিল সাময়িক অবস্থা; অতএব, এই সাময়িক অবস্থা একদিন ভাঙ্গিয়া পড়ারই ছিল, এমন কি ক্রুশে না মরিলেও মৃত্যু হইতই। কাজেই কেবল শারীরিক বিচ্ছেদ কোন কাজেই আসিতে পারে না। অতএব, ইহা অন্য কোন মৃত্যু হইবে, যাহা তাহার পাপী শিষ্যগণকে পরিত্রাণ দিয়াছে। খৃষ্টানদের নিজস্ব মতও তাহাই। তাহারা মনে করেন, ক্রুশীয় মৃত্যুর পরে যীশু যখন দোযখে নিক্ষিপ্ত হইলেন তখন, তাঁহার যে মৃত্যু ঘটিয়াছিল, ঐ মৃত্যুই, সেই পরিত্রাণকারী মৃত্যু(প্রেরিত-২ঃ ৩১)। অতএব, মৃত্যুর ঊর্ধ্বে চিরঞ্জীব থাকা, যাহা আল্লাহ্‌র অন্যতম মর্যাদা, তাহা যীশুর ছিল না, বরং যীশুআক্ষরিক ভাবেও এবংরূপক ভাবেও মৃত্যু বরণ করিয়াছেন। তেমনি ভাবে, স্বয়ম্ভু ও স্বয়ম্ভর হওয়ার দিক হইতে দেখিলেও যীশুর ঈশ্বরত্ব প্রতিপন্ন হয় না। আল্লাহ্ স্বয়ম্ভু ও স্বয়ম্ভর হওয়ার কারণে, কাহারও সাহায্য তাঁহার প্রয়োজন হয় না বরং অন্যান্য সবকিছুই তাঁহার মুখাপেক্ষী ও সাহায্যপ্রার্থী হইয়া থাকে। কিন্তু যীশুর মাঝে এইসব ঐশ্বরিক গুণ ছিল না। অন্যান্য মরণশীলদের মত, তিনি মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়াছিলেন, পানাহারের সাহায্যে বাঁচিয়া ছিলেন, দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন, নিজের দুঃখ-যন্ত্রণা হইতে মুক্তির জন্য অন্যদের প্রার্থনা কামনা করিয়াছিলেন এবং অবশেষে (খৃষ্টানদের মতে) ক্রুশে মৃত্যু বরণ করেন। বাইবেলের নূতন নিয়ম এইসব ঘটনাবলীর তথ্যে পূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ্‌তা’লা, যিনি চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভু ও স্বনির্ভর তিনি এই সব শারীরিক সুখ-দুঃখের বহু ঊর্ধ্বে।

نَزَّلَ عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَاَنۡزَلَ التَّوۡرٰٮۃَ وَالۡاِنۡجِیۡلَ ۙ﴿۴﴾

৪
তিনি সত্যসহ৩৬৪ তোমার উপর এই কিতাব নাযেল করিয়াছেন, উহার সত্যতা প্রতিপন্ন করিয়া যাহা ইহার পূর্বে (আসিয়া) ছিল; এবং তিনি ইহার পূর্বে মানবজাতির হেদায়াতের জন্য তওরাত৩৬৫ ও ইঞ্জিল৩৬৬ নাযেল করিয়াছিলেন; এবং তিনি ফুরকান৩৬৭ নাযেল করিয়াছেন।
৩৬৪। ‘হাক্কা’ অর্থ ইহা যথার্থ ছিল বা হইল, উপযোগী, সঠিক, সত্য, অকৃত্রিম, মূলতঃ অথবা প্রকৃত, অথবা ইহা প্রতিষ্ঠিত বা সত্যায়িত সত্য ছিল বা হইল, অথবা ইহা বিধিবদ্ধ ছিল বা হইল, বাধ্যতামূলক বা যোগ্য (লেইন)। ‘বিল হাক্‌ক’ প্রকাশভঙ্গি ইহাই নির্দেশ করে যে, ( ১) কুরআন ঐ সকল শিক্ষা সম্বলিত যাহার ভিত্তি চিরন্তন-শাশ্বত সত্য সমূহ এবং প্রবল আক্রমণের সম্মুখে অপরাজিত- অপরাভূত; (২) ইহার উৎকৃষ্ট গ্রহণকারী তাহারাই ছিল যাহাদের নিকট ইহা প্রাথমিক ভাবে অবতীর্ণ; ( ৩) ইহা চরম প্রয়োজনের সময়ে অবতীর্ণ এবং মানবের সঠিক প্রয়োজন নির্বাহ করেঃ ( ৪) ইহা স্থায়ী হইবার জন্য আসিয়াছে এবং বিরুদ্ধবাদীদের কোন চেষ্টা ইহাকে ধ্বংস বা অন্যায় হস্তক্ষেপ করিতে পারিবে না।
৩৬৫। ‘তাওরাত’ শব্দটি ‘ওয়ারা’ ধাতু হইতে উৎপন্ন, যাহার অর্থ হইল সে পুড়িয়াছিল, লুকাইয়াছিল (আকরাব)। ‘তাওরাত’ কে এই নামে অভিহিত করার মধ্যে হয়ত এই উদ্দেশ্য থাকিতে পারে যে, সত্যিকার আকারে যখন এই গ্রন্থ বিদ্যমান ছিল, তখন ইহার পঠন ও ইহার উপদেশানুযায়ী জীবন-যাপন দ্বারা মানুষের হৃদয়ে আল্লাহ্‌র ভালবাসার শিখা প্রজ্বলিত হইয়া উঠিত। ’তাওরাত’ নামটির মধ্যে এই কথারও ইঙ্গিত থাকিতে পারে যে, এই গ্রন্থে ভবিষ্যতে আগমনকারী শেষ শরীয়াত-বাহী এক মহানবীর আগমনের দীপ্ত ভবিষ্যদ্বানী সমূহ লুকানো রহিয়াছে। হযরত মূসা (আঃ )-এর পাঁচটি গ্রন্থের একত্রিত নাম ‘তাওরাত’। গ্রন্থগুলি হইল, আদিপুস্তক, যাত্রা পুস্তক, লেবীয় পুস্তক, গণনা পুস্তক ও দ্বিতীয় বিবরণ। ‘দশ-নির্দ্দেশ’-কেও কখন কখন ‘তাওরাত’ বলা হইয়া থাকে।
৩৬৬। ইন্‌জীল অর্থ সু-সংবাদ ৷ আকরাবের মতে ইহা একটি গ্রীক শব্দ, আরবী ধাতু-উদ্ভূত শব্দ নহে। ইহা হইতে ইংরেজী ইভাঞ্জেল শব্দ উদ্ভূত হইয়াছে। ‘সুসমাচার গুলিক’ এইজন্যই ইন্‌জীল বলা হইয়াছে, যেহেতু ইহার মধ্যে, যীশু-ভক্তদের জন্য বহু শুভ সংবাদ থাকা ছাড়াও এমন এক মহানবীর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী সমূহ রহিয়াছে, যাঁহার আগমনকে যীশু স্বয়ং ‘প্রভুর আগমন’ বলিয়া আখ্যায়িত করিয়াছেন (মথি- ২১ ঃ ৪০)। ইন্‌জীল বলিতে বর্তমানের চারিটি সুসমাচারকে বুঝায় না। এই গুলি যীশুর ক্রুশবিদ্ধ হওয়ার দীর্ঘকাল পরে তাঁহার শিষ্যমণ্ডলী দ্বারা রচিত হইয়াছে, যাহাতে কেবল যীশুর জীবন ও শিক্ষার অপূর্ণ খতিয়ান মাত্র প্রাপ্ত হওয়া যায়। কুরআনে ইন্‌জীল বলিতে ঈসা ( আঃ)-এর উপর অবতীর্ণ আল্লাহ্‌র শরীয়াত-বিহীন বাণী সমূহের সমষ্টিকে বুঝাইতেছে।
৩৬৭। আল্-ফুরকান, কুরআনকে বুঝাইতে পারে অথবা রসূলে আকরাম (সাঃ)-এর স্বপক্ষে যে সকল ঐশী-নিদর্শন প্রদর্শিত হইয়া তাঁহার সত্যতাকে প্রমাণিত ও সুস্পষ্ট করিয়া দিয়াছিল, সেইগুলির সমষ্টিকেও বুঝাইয়া থাকিতে পারে।

مِنۡ قَبۡلُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَاَنۡزَلَ الۡفُرۡقَانَ ۬ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿۵﴾

৫
যাহারা আল্লাহ্‌র নিদর্শনাবলীকে অস্বীকার করে, নিশ্চয় তাহাদের জন্য কঠোর আযাব (অবধারিত) আছে। এবং আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী, প্রতিশোধ গ্রহণকারী।

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَخۡفٰی عَلَیۡہِ شَیۡءٌ فِی الۡاَرۡضِ وَلَا فِی السَّمَآءِ ؕ﴿۶﴾

৬
নিশ্চয় আল্লাহ্‌ (সেই সত্ত্বা), যাহার নিকট হইতে কোন বস্তুই গোপন নহে, না পৃথিবীতে এবং না আকাশে।

ہُوَ الَّذِیۡ یُصَوِّرُکُمۡ فِی الۡاَرۡحَامِ کَیۡفَ یَشَآءُ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۷﴾

৭
তিনিই মাতৃগর্ভে৩৬৮ যেভাবে চাহেন তোমাদিগকে আকৃতি দান করেন; তিনি ব্যতিরেকে কোন মা’বূদ নাই, তিনি মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।
৩৬৮। যেহেতু সন্তান মায়ের গর্ভে থাকিবার সময়ও বৃদ্ধি প্রাপ্ত হয়, সেই হেতু শিশু মায়ের শারীরিক ও নৈতিক অবস্থা দ্বারা প্রভাবান্বিত হইয়া থাকে। অতএব, ঈসা (আঃ) ও যখন অন্যান্য মানুষেরই মতই মাতৃগর্ভে শারীরিক পুষ্টিলাভ করিয়াছিলেন, তখন স্বাভাবিক ভাবেই মাতার দৈহিক-মানসিক গুণাবলী ও সীমাবদ্ধতা দ্বারা প্রভাবান্বিত না হইয়া জন্ম গ্রহণ করেন নাই। এই কারণেই, মহানবী (সাঃ) যখন নাজরান হইতে আগত খৃষ্টানদের সঙ্গে ধর্মালোচনায় রত হইলেন, তখন তিনি ঈসা (আঃ)-এর মাতৃজঠর হইতে জন্মলাভের যুক্তি দিয়া বুঝাইয়া ছিলেন যে, ঈসা (আঃ ) খোদা হইতে পারেন না। জানা যায়, তিনি তাহাদিগকে বলিয়াছিলেনঃ “আপনারা কি জানেন না, একজন স্ত্রীলোক ঈসা (আঃ)-কে গর্ভে ধারণ করিয়াছিলেন এবং সাধারণভাবে একজন স্ত্রীলোক যেরূপে সন্তান প্রসব করেন, তিনি ঠিক সেইভাবে ঈসা (আঃ)-কে প্রসব করিয়াছিলেন?” (জরীর, ৩য় খণ্ড, ১০১পৃঃ)।

ہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ مِنۡہُ اٰیٰتٌ مُّحۡکَمٰتٌ ہُنَّ اُمُّ الۡکِتٰبِ وَاُخَرُ مُتَشٰبِہٰتٌ ؕ فَاَمَّا الَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ زَیۡغٌ فَیَتَّبِعُوۡنَ مَا تَشَابَہَ مِنۡہُ ابۡتِغَآءَ الۡفِتۡنَۃِ وَابۡتِغَآءَ تَاۡوِیۡلِہٖ ۚ؃ وَمَا یَعۡلَمُ تَاۡوِیۡلَہٗۤ اِلَّا اللّٰہُ ۘؔ وَالرّٰسِخُوۡنَ فِی الۡعِلۡمِ یَقُوۡلُوۡنَ اٰمَنَّا بِہٖ ۙ کُلٌّ مِّنۡ عِنۡدِ رَبِّنَا ۚ وَمَا یَذَّکَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ ﴿۸﴾

৮
তিনিই, তোমার উপর এই কিতাব নাযেল করিয়াছেন, যাহার কতক আয়াত সুস্পষ্ট-দ্ব্যর্থহীন৩৬৯, যেগুলি এই কিতাবের মুল;৩৭০ এবং অন্যগুলি পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ,৩৭১ রূপক (এবং বিভিন্ন ব্যাখ্যাবাহী); কিন্তু যাহাদের অন্তরে বক্রতা আছে তাহারা ফিৎনা সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে এবং ইহার (অপ)ব্যাখ্যার৩৭২ উদ্দেশ্যে ঐ অংশের অনুসরণ করে যাহা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ, রূপক; অথচ ইহার প্রকৃত ব্যাখ্যা জানেন কেবল আল্লাহ্‌, এবং জ্ঞানে পরিপক্ক লোকগণ; তাহারা বলে ‘আমরা ইহার উপর ঈমান রাখি, সবাই আমাদের প্রভুর তরফ হইতে সমাগত। বস্তুতঃ ধীমান ব্যক্তিগন ব্যতীত অন্য কেহই উপদেশ গ্রহন করে না।৩৭৩
৩৬৯। ‘মুহকাম’ অর্থ (১) যাহা অপরিবর্তনীয়, রদ বা বদল যোগ্য নহে, (২) যাহা অর্থের দিক দিয়া সুস্পষ্ট এবং প্রকাশের দিক দিয়াও পরিস্কার, (৩) যাহা দ্ব্যর্থবোধক বা সন্দেহাত্মক নহে এবং (৪) এরূপ আয়াত যাহা বিশিষ্ট কুরআনী শিক্ষা বহন করে (মুফরাদাত ও লেইন)।
৩৭০। ‘উম্ম্‌’ অর্থ (১) মাতা, (২) কোন বস্তুর উৎস, উৎপত্তিস্থল বা ভিত্তি, (৩) এমন বস্তু, যাহা অন্য বস্তুর লালন-পালন, সাহায্য-সহায়তা, সংস্কার ও সংশোধনের কাজ করে, (৪) এমন এক বস্তু যাহার সহিত পারিপার্শ্বিক বস্তুসমূহ শৃঙ্খলিত (আকবার ও মুফরাদাত)।
৩৭১। ‘মুতাশাবিহ্‌’ বলিতে বুঝায় (১) যে বাক্যাংশ, বাক্য বা আয়াত বিভিন্ন ভাবে অর্থ বা ব্যাখ্যা করা যায় অথচ ঐ বিভিন্নতার মাঝেও একটি ঐক্য বিরাজ করে, (২) যাহার বিভিন্ন অংশ পরস্পরের অনুরূপ, (৩) যে সঠিক তাৎপর্য অন্য একটি অর্থের সহিত মিলে বটে, কিন্তু শেষোক্ত অর্থটি উদ্দিষ্ট নহে, (৪) যাহার অর্থ কেবল মাত্র ‘মুহ্‌কামের’ সহিত মিলাইয়া করিলেই সঠিক হয়, (৫) এরূপ কথা, যাহার প্রকৃত অর্থ বহু সুবিবেচনা ছাড়া সঠিক হয় না, (৬) এইরূপ আয়াত যাহাতে পূর্ববর্তী গ্রন্থাবলীর আয়াতের শিক্ষার অনুরূপ শিক্ষা স্থান পাইয়াছে (মুফরাদাত)।
৩৭২। তা’বিল অর্থ (১) বিশ্লেষণ বা ব্যাখ্যা, (২) বক্তৃতা বা রচনার অর্থ সম্বন্ধে অনুমান, (৩) একটি রচনা বা বক্তৃতার অর্থ ঘুরাইয়া ফেলা বা অপব্যাখ্যা করা, (8) স্বপ্নের ব্যাখ্যা, (৫) পরিণতি, প্রতিফল, পরবর্তী ফলাফল (লেইন)। এইআয়াতে শব্দটা দুইবার ব্যবহৃত হইয়াছে। প্রথমবার দ্বিতীয় বা তৃতীয় অর্থে এবং দ্বিতীয়বার প্রথম বা পঞ্চম অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে।
৩৭৩। এই আয়াত দ্ব্যর্থ-বোধক কিংবা বিতর্ক-মূলক বিষয়ের মীমাংসার জন্য সুবর্ণ-নীতি বর্ণনা করিতেছে। এইরূপ ক্ষেত্রে উপদেশ হইল এই যে, বিষয়টিকে বা ব্যাখ্যাটিকে, কুরআনের পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন আয়াত সমূহের আলোকে, পরীক্ষা ও বিবেচনা করিতে হইবে। যদি দেখা যায়, বিতর্কমূলক অর্থ বা ব্যাখ্যা, দ্ব্যর্থহীন আয়াতের বিপরীত বা বিরোধী হয়, তাহা হইলে বিতর্কমূলক বাক্যের বা বাক্যগুলির গঠন-পদ্ধতি সবদিক হইতে বিবেচনা করিয়া এমন অর্থ বা ব্যাখ্যায় পৌঁছাইতে হইবে, যাহা দ্ব্যর্থহীন আয়াতের সাথে খাপ খায়। এই আয়াত বলিতেছে, কুরআনে দুই ধরণের আয়াত রহিয়াছে। কতকগুলি রহিয়াছে ‘মুহকাম’ (দৃঢ় ও সুস্পষ্ট অর্থ-বিশিষ্ট) এবং অন্যগুলি রহিয়াছে মুতাশাবিহ্ (যার বিভিন্ন অর্থ করা সম্ভব)। ‘মুতাশাবিহ্’ আয়াতের অর্থ সঠিক ভাবে পাওয়ার একটি সুন্দর পথ ইহাই রহিয়াছে যে, যতগুলি অর্থ হয়, উহার মধ্যে যেসব অর্থ ‘মুহকাম’ আয়াতের সাথে খাপ খায়, সেই অর্থই গ্রহণযোগ্য। ৩৯ঃ২৪ আয়াতে সমগ্র কুরআনকেই ‘মুতাশাবিহ্’ বলা হইয়াছে। আবার ১১ঃ২ আয়াতে সমগ্র কুরআনের আয়াতগুলিকেই ‘মুহ্‌কাম’ বলা হইয়াছে। ইহা দ্বারা এই বুঝায় না যে, আলোচ্য আয়াতটি উহার বিপরীত, কেননা আলোচ্য আয়াতে বলা হইয়াছে কতক আয়াত ‘মুহ্‌কাম’ ও কতক ‘মুতাশাবিহ্’। কুরআনের আয়াতগুলি, তাৎপর্যের দিক দিয়া দেখিলে সবই ‘মুহ্‌কাম’, কেননা সবগুলিতেই অপরিবর্তনীয় চিরসত্য রহিয়াছে। আবার অন্যদিক হইতে কুরআনের আয়াত সমূহ সবই মুতাশাবিহ্, কেননা কুরআনে এমনই ব্যাপক অর্থবোধক শব্দাবলী ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা একই সময়ে অনেক অর্থ প্রকাশ করে, যাহা সমভাবে সত্য ও সুন্দর। কুরআন এই অর্থেও ‘মুতাশাবিহ্‌’ (পরস্পরের অনুরূপ) যে, ইহাতে কোন বৈপরীত্য বা অনৈক্য নাই, বরং ইহার আয়াতগুলি একে অপরের সহিত সামঞ্জস্যপূর্ণ, সহায়তাকারী। তবে, হ্যাঁ, ইহার অংশ বিশেষ ‘মুহ্‌কাম’ ও অংশবিশেষ ‘মুতাশাবিহ্’, এই কথাও এইভাবে সত্য যে, বিভিন্ন পাঠকের জ্ঞান, বুদ্ধি, প্রজ্ঞা, মানসিকতা, প্রকৃতি-দত্ত শক্তির বিভিন্নতার কারণে, কুরআনকে বুঝিতেও বিভিন্নতা দেখা দেয়। এই আলোচ্য আয়াতে, এই দিকেই ইঙ্গিত করা হইয়াছে। কুরআনে যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে, উহার মধ্যে যেগুলি সাদা-সিধা ও সরাসরি ব্যক্ত হইয়াছে, এবং যাহার একটি ভিন্ন দ্বিতীয় কোন অর্থ হইতে পারে না, সেইগুলিকে ‘মুহ্‌কাম’ বলা যাইতে পারে। অপর দিকে যে সকল ভবিষ্যদ্বাণী আলঙ্কারিক ও রূপক ভাষায় বর্ণিত হইয়াছে, এবং যে গুলির ব্যাখ্যা একাধিক হইতে পারে, সেইগুলিকে বলা যাইতে পারে ‘মুতাশাবিহ্’। রূপক ভাষায় বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীগুলি সুস্পষ্টভাবে পূর্ণতাপ্রাপ্ত ভবিষ্যদ্বাণীগুলির আলোকে ব্যাখ্যা করিতে হইবে এবং এই ব্যাখ্যাকে ইসলামের মৌলিক নীতিমালার সহিত মিলাইয়া দেখিতে হইবে। ‘মুহুকাম’ ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য দেখুন ৫৮ঃ২২ এবং ‘মুতাশাবিহ্’ ভবিষ্যদ্বাণীর জন্য দেখুন ২৮ঃ৮৬। যেসব আয়াতে আল্লাহ্‌তা’লার আদেশ-নিষেধ ও আইন পূর্ণ আকারে জারি করা হয়, সেগুলিকেও ‘মুহ্‌কাম’ আয়াত বলা যাইতে পারে। আর, যেগুলিতে আদেশ-নিষেধ বা আইন-বিধি আংশিক ভাবে দেওয়া হয় এবং অন্য আয়াতাদির সাথে না মিলাইয়া ঐ আদেশ-নিষেধের পরিপূর্ণতা প্রাপ্ত হওয়া যায় না, সেইগুলিকে বলা যায় ‘মুতাশাবিহ্‌’। ‘মুহ্‌কামাত’ সাধারণতঃ আইনের ও বিশ্বাসের বিধিমালা দান করে। ‘মুতাশাবিহাত’ সাধারণতঃ দ্বিতীয় পর্যায়ের বিষয়াদি যথাঃ নবীগণের জীবন-কাহিনী, জাতিগণের জীবন-কথা ইত্যাদি বর্ণনা করে এবং ঐসব বর্ণনায় এমন বাগধারা ও প্রকাশ ভঙ্গী ব্যবহৃত হয় যাহার বিভিন্ন অর্থ হইতে পারে। এইরূপ আয়াতগুলির অর্থ করিতে সাবধানতা অবলম্বন করা প্রয়োজন যে, এমন কোনও অর্থ যেন করা না হয়, যাহা সর্বজন-বিদিত পরিষ্কার অর্থের কিংবা মূলবিশ্বাসের পরিপন্থী। ‘মুতাশাবিহ্’ আয়াতগুলিতে যে আলঙ্কারিক ও রূপক ভাষা ব্যবহার করা হয়, তাহা অর্থের ব্যাপকতা ও গভীরতার জন্য এবং অল্প কথায় বহুকিছু প্রকাশের জন্য ধর্মগ্রন্থ সমূহে ব্যবহৃত হইয়া আসিয়াছে। এরূপ করার প্রয়োজনও আছে। ইহাতে ধর্ম শাস্ত্রের সৌন্দর্য ও লালিত্য বৃদ্ধি পায় এবং মানুষের পরীক্ষা উপস্থিত হয়, যাহার মাধ্যমে তাহার আধ্যাত্মিক উন্নতি ও পরিপক্কতা আসে।

رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوۡبَنَا بَعۡدَ اِذۡ ہَدَیۡتَنَا وَہَبۡ لَنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ رَحۡمَۃً ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡوَہَّابُ ﴿۹﴾

৯
‘হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদিগকে হেদায়াত৩৭৪ দেওয়ার পর আমাদের হৃদয়কে বক্র হইতে দিও না এবং তোমার নিকট হইতে আমাদিগকে রহমত দান কর; নিশ্চয় তুমি মহান দাতা।
৩৭৪। কুরআনের সঠিক তত্ব ও জ্ঞান তাঁহারাই প্রাপ্ত হইয়া থাকেন, যাহাদের হৃদয় পবিত্র (৫৬ঃ৮০)।

رَبَّنَاۤ اِنَّکَ جَامِعُ النَّاسِ لِیَوۡمٍ لَّا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُخۡلِفُ الۡمِیۡعَادَ ﴿۱۰﴾٪

১০
হে আমাদের প্রভু! নিশ্চয় তুমি মানব জাতিকে সেইদিন একত্রিত করিবে, যাহাতে কোন সন্দেহ নাই; আল্লাহ্ (নিজ) প্রতিশ্রুতিকে আদৌ ভঙ্গ করেন না।’
সূরা আ লে ‘ইম্‌রান - রুকু ১