آل عمران
Aal-e-`Imran
ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ২০১ আয়াত এবং ২০ রুকু আছে।
পূর্ববর্তী সূরার সহিত সম্পর্ক
পূর্ববর্তী সূরা আল্ বাকারার সহিত এই সূরার এক গভীর ও সুদূরপ্রসারী সম্পর্ক রহিয়াছে, যেজন্য এই দুই সূরাকে একত্রে “আয়ূ যাহ্রাওয়ান” (দুইটি উজ্জ্বল আলো) বলা হয়। পূর্ববতী সূরাতে ইহুদীদের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও দুষ্কর্ম নিয়াই বেশীর ভাগ আলোচনা করা হইয়াছে, যাহাদের মধ্যে মূসায়ী শরীয়াত প্রবর্তিত হয়। বর্তমান সূরাতে খৃষ্টধর্মের ভ্রান্ত বিশ্বাস ও মতবাদ নিয়াই প্রধানতঃ মূল আলোচনা কেন্দ্রীভূত হইয়াছে। সূরাটির নামকরণ করা হইয়াছে ‘আ ল ইমরান’ (ইমরানের পরবিার-পরিজন)। ‘ইমরান’ বা ‘আমরান’ ছিলেন হযরত মূসা (আঃ) এবং হযরত হারূন (আঃ)-এর পিতা এবং হযরত ঈসা (আঃ)-এর মাতা বিবি মরিয়মের পরিবারের পূর্ব পুরুষ। হযরত ঈসা (আঃ)-এর জীবন বৃত্তান্ত ও তাঁহার কর্মধারা সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোচনা এই সূরাতে বর্ণিত হইয়াছে। সূরা বাকারার সহিত ইহার গভীর সম্পর্ক বিদ্যমান থাকায় স্বাভাবিক ভাবেই ইহা সূরা বাকারার অব্যবহিত পরে অবতীর্ণ হইয়াছে বলিয়া ধরিয়া নেওয়া চলে। তদুপরি ইহাতে ওহুদ যুদ্ধ সম্পর্কে বিস্তারিত উল্লেখ থাকায় সূরাটি হিজরী ৩য় বৎসরেই অবতীর্ণ হইয়াছে বলিয়া অনেকের বিশ্বাস।
সূরা বাকারার সহিত সূরা আলে ইমরানের দ্বিবিধ সম্পর্ক রহিয়াছে। প্রথমতঃ উভয় সূরার বিষয়-বস্তুর সম্পর্ক ও দ্বিতীয়তঃ আল্ বাকারার শেষাংশ ও অত্র সূরার প্রারম্ভের সহিত সাদৃশ্য। বস্তুতঃ সমস্ত কুরআন শরীফের (সূরা সমূহের) বিন্যাস প্রধানতঃ দুই প্রকারের বলিয়া লক্ষ্য করা যায়। যেমন, কোন সূরার শেষাংশে যেই বিষয়ের আলোচনা করা হয়, উহার ধারাবাহিকতা পরবর্তী সূরার শুরুতেও রক্ষিত হইয়াছে। অথবা, পূর্ববর্তী সূরার বিষয়বস্তু সার্বিকভাবে পরবর্তী সূরাতেও উল্লেখিত হইয়াছে। সূরা বাকারা ও সূরা আ লে ইমরানের মধ্যে এই উভয়বিধ সম্পর্কই বিদ্যমান। সার্বিকভাবে উভয় সূরার মধ্যে বিষয়বস্তুগত বক্তব্যের যে সম্পর্ক রহিয়াছে উহার আলোচনা মূলতঃ মূসায়ী শরীয়াত হইতে কিভাবে ইসলামী শরীয়াতে নবুওয়াতের ধারা স্থানান্তরিত করা হইল উহাকে কেন্দ্র করিয়া করা হইয়াছে। সূরা বাকারার প্রধান বক্তব্য ছিল ইহাই এবং ইহার কারণ বিশ্লেষণে ইহুদীদের নৈতিক অধঃপতনের উপর আলোকপাত করিয়া কিছু আলোচনাও উক্ত সূরাতে করা হইয়াছিল। কিন্তু সূরা বাকারাতে খৃষ্টান ধর্মমত (যাহা মূসায়ী শরীয়াতেরই চরম পরিণতি) সম্পর্কে তেমন কোন উল্লেখযোগ্য আলোচনা করা হয় নাই। ইহাতে কাহারো কাহারো মনে হয়তো সঙ্গত কারণেই এই সন্দেহের উদ্রেক হইতে পারে যে, ইহুদী ধর্ম,যাহার মাধ্যমে মূসায়ী শরীয়াত প্রবর্তিত হইয়াছিল, তাহা ক্রুটিপূর্ণ হইয়া গেলেও ইহার পরিণত শাখা খৃষ্টান ধর্ম বুঝি এখনো পবিত্র আছে। এমতাবস্থায় ইসলামের নূতন বিধান বা ধর্ম-ব্যবস্থা প্রচলনের কোন প্রয়োজন ছিল না। এই সন্দেহ নিরসন কল্পে খৃষ্টান ধর্মের অন্তঃসারশূন্যতা সম্পর্কে বর্তমান সূরাতে বিশদভাবে আলোচনা করা হইয়াছে।
শিরোনাম
হাদীস পাঠ করিলে দেখা যায় যে, এই সূরার অনেকগুলি নাম রহিয়াছে। যেমন, আয্ যাহ্রা (একটি উজ্জ্বল আলো) আল্ আমান (শান্তি), আল্ কান্য (সম্পদ), আল্ মুয়িনাহ্ (সাহায্যকারী), আল মুজাদালাহ্ (পরস্পর বিতর্ক), আল্ এসতেগফার (ক্ষমা প্রার্থনা), এবং তৈয়্যেবা (পবিত্র)। যেহেতু বর্তমান খৃষ্টধর্মের অসারতা প্রমাণ করাই বর্তমান সূরার প্রধান উদ্দেশ্য, তাই, এই ইঙ্গিত সূরার প্রারম্ভেই রহিয়াছে যে, খৃষ্ট ধর্মের শিক্ষা অপবিত্র ও অধঃপতিত হওয়ায় ইহা নূতন ও উন্নততর কোন বিধান বা ধর্ম ব্যবস্থা প্রবর্তনের পথে অন্তরায় হইতে পারে না। পরন্তু, খৃষ্ট ধর্মের অসারতাই প্রকারান্তরে একটি নূতন বিধান বা ধর্মব্যবস্থার প্রয়োজনীয়তাকে স্বীকার করে। তাই সূরার প্রারম্ভেই খৃষ্টধর্মের মূল মতবাদকে খণ্ডন করিবার জন্য আল্লাহ্তা’লার ঐশী গুণাবলীর অন্যতম ‘আল্ হাইয়ুল কাইয়ুম’ বা চিরজীবিত-স্বয়ম্ভর ও চিরন্তন গুণের অবতারণা করা হইয়াছে। সূরা বাকারার শেষাংশ ও বর্তমান সূরার শুরুতে যে সম্পর্ক বিদ্যমান তাহা হইল এই যে, সূরা বাকারার শেষাংশে মুসলমানদের জাতীয় উন্নতি তথা অবিশ্বাসীদের উপর ইসলামের সাফল্য ও বিজয় কামনা করা হইয়াছিল, আর তাই এই সূরার প্রারম্ভে বলা হইয়াছে যে, আল্ হাইয়ুল কাইয়ুম আল্লাহ্তা’লা অবশ্যই মুসলমানদের সাফল্য ও বিজয় প্রদান করিবেন, কেননা তিনি চিরঞ্জীব ও চিরশাশ্বত হওয়ায় সকল প্রকার দুর্বলতার ঊর্ধ্বে। যিনি চিরঞ্জীব ও চিরশাশ্বত তাঁহার শক্তিতে কোন দুর্বলতা পরিলক্ষিত হয় না, তাই সত্যিকারের সফলতা একমাত্র তাঁহার সাহায্য বলেই সম্ভব।
বিষয়বস্ত
এই সূরা পূর্ববর্তী সূরার মতই হুরূফে মুকাত্তয়াত দিয়া শুরু হইয়াছে । তিনটি শব্দ ‘আলিফ’ ‘লাম’ ‘মীম্’ (আমি আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ) দ্বারা আল্লাহ্র জ্ঞান প্রকাশক বৈশিষ্ট্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে। সাথে সাথে আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভর ও চিরন্তন এই পরিচয় পেশ করিয়া আল্লাহ্ যে সর্বজ্ঞ সেই বৈশিষ্ট্যেকে জোরদার সমর্থন দেওয়া হইয়াছে। বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভর ও চিরন্তন হওয়ায় তাঁহার পক্ষেই সর্বজ্ঞ হওয়া সম্ভব। আর যিনি সর্বজ্ঞ, তিনিই চিরঞ্জীব ও চীরশাশ্বত হইতে পারেন, কেননা, মৃত্যু ও লয় জ্ঞানহীনতারই ফল। এই সূরাতে অতঃপর বর্ণিত হইয়াছে যে, ইহুদী ও খৃষ্টানগণ সঠিক পথ হইতে বহুদূরে সরিয়া যাওয়ার ফলে ঐশী-আযাবে নিপতিত হইবে। তাহারা যে তওরাত বা ইন্জীলের অনুসারী এই কথা তাহাদিগকে ঐশী-শাস্তি হইতে রক্ষা করিতে পারিবে না, কেননা, এই উভয় গ্রন্থই এখন বাতিল হইয়া যাওয়ায় উহাদের শিক্ষা মানুষের প্রয়োজন বা চাহিদা মিটাইতে অক্ষম। অতঃপর, মুসলমানদের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে যে, তাহারা যেন তাহাদের মন হইতে সমস্ত প্রকার সন্দেহ ও সংশয় দূর করিয়া এই বিশ্বাসে কায়েম থাকে যে, ইহুদী ও খৃষ্টানই তাহাদের সংখ্যাধিক্য ও পার্থিব উপকরণের প্রাচুর্য সত্বেও মুসলমানদের বিরুদ্ধে জয়ী হইতে পারিবে না। যেই ভাবে আল্লাহ্তা’লা ইহার পূর্বেও মুসলামনদেরকে তাহাদের শত্রুপক্ষ কুরাইশ ও আরবের অন্যান্য গোত্রের জনবল ও পার্থিব পরাক্রমের বিরুদ্ধে জয়যুক্ত করিয়াছিলেন, অনুরূপ ভাবে, এখনও মুসলমানদের বিজয় সংঘটিত হইবে। তদুপরি, জাতীয় পর্যায়ে কোন বিজয় শুধুমাত্র উহার পার্থিব উপকরণের প্রাচুর্যের উপরই নির্ভর করে না, বরং বিশেষভাবে উহার নৈতিক গুণাগুণ ও উৎকর্ষতার জন্যই সম্ভবপর হয়। সেইজন্য চূড়ান্ত বিজয় মুসলমানদের অনুকূলেই আসিবে, কেননা, যদিও তাহাদের পার্থিব উপকরণের স্বল্পতা রহিয়াছে কিন্তু নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতায় তাহারা সমৃদ্ধ এবং সর্বোপরি তাহারা একটি সঠিক ও সত্য ধর্মের অনুসারী।
সূরাটিতে অতঃপর, এই বিভ্রান্তি নিরসনকল্পে আলোচনা করা হইয়াছে যে, প্রায়শঃই ইসলামের শত্রুগণ ভ্রমবশতঃ, তাহাদের জাতীয় কৃষ্টি ও আচার-অনুষ্ঠানকে মুসলমানদের চাইতে শ্রেয়ঃ বলিয়া মনে করে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছে যে, ভুল বিশ্বাস পোষণ করা এবং অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকার ফলে তাহারা বাহ্যতঃ কার্যকারণ নিয়মকে উপেক্ষা করিতেছে, কিন্তু পরিণামে ইহার ক্ষতি হইতে তাহারা অব্যাহতি পাইবে না। ইহার পর সূরাটিতে মুসলমানদের সফলতার সম্ভাব্য উপায় সম্পর্কে আলোকপাত করিয়া বলা হইয়াছে যে, অন্য জাতির অন্ধ অনুকরণ নয়, বরং ইসলাম ও হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর শিক্ষাকে সঠিক ভাবে অনুসরণের ফলেই মুসলমানদের জাতীয় উন্নতি ও সফলতা অর্জিত হইতে পারে। অতঃপর, মূল বিষয়ের ব্যাখ্যা প্রসঙ্গে খৃষ্টান ধর্মমতের শুরু ও উহার ভ্রান্ত বিশ্বাসের খণ্ডন ইত্যাকার বিষয় নিয়া বিস্তারিত আলোচনা হইয়াছে। তারপর আহলে কিতাবদের দৃষ্টি এই বিষয়ের দিকে আকর্ষণ করা হইয়াছে যে, যখন মুসলমানরাও তাহাদের ধর্মের ঐশী-উৎস সম্পর্কে বিশ্বাসী, তখন মুসলমানদের সহিত সংগ্রামে রথা শক্তি ও সম্পদ নষ্ট করা তাহাদের উচিত নয়। বরং উভয়ের উচিত সম্মিলিত ভাবে অবিশ্বাসীদের নিকট উভয়ের সম্মত বিষয় যেমন, আল্লাহ্তা’লার তওহীদ বা একত্ব সম্পর্কে প্রচার করা এবং তাহাদের নিজস্ব ধর্মীয় মতভেদকে একটি আলোচিত সীমার মধ্যে আবদ্ধ রাখা। অতঃপর, খৃষ্টানদের উদ্দেশ্যে বিশেষভাবে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হইয়াছে যে, নূতন ধর্ম গ্রহণ না করিয়া তাহারা আল্লাহ্র মনোনীত হওয়ার দাবী করিতে বা আল্লাহ্র দয়া ও প্রেম লাভের আশা পোষন করিতে পারে না। আর তাহা কিরূপেই বা সম্ভব, যেখানে এই শাশ্বত ঐশী-নীতি রহিয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা যুগের প্রয়োজনে সব সময়ই সত্য প্রকাশ করিয়া থাকেন এবং এই চিরন্তন নীতিকে অস্বীকার করিবার তো তাহাদের কোন বৈধ কারণও নাই। পুনরায়, মুসলমানদের সহিত মতভেদের বিষয়টিকে উল্লেখ পূর্বক বলা হইয়াছে যে, আহলে কিতাবগণ যে সমস্ত বিষয় নিয়া মুসলমানদের সহিত বিবাদ করিতেছে, প্রকৃত প্রস্তাবে সেইগুলি খুব গুরুত্বপূর্ণ নয় এবং কোন কোন বিষয়কে তাহাদের নিজেদের পূর্ব পুরুষগণই বৈধ বলিয়া স্বীকার করিয়াছেন। অতঃপর, বিষয়টিকে সুস্পষ্ট ঐতিহাসিক পটভূমি হইতে বিশ্লেষণ করিবার জন্য বলা হইয়াছে যে, ইহুদী ও মুসলমান উভয়ের মিলিত হইবার একটি সংযোগস্থল হইতেছেন হযরত ইবরাহীম (আঃ) এবং হযরত ইবরাহীমই (আঃ) যেহেতু কা’বা শরীফের ভিত্তি স্থাপন করিয়াছিলেন, তাই, কোন প্রকার কাল্পনিক ও অনুল্লেখযোগ্য বিষয়াদিকে কেন্দ্র করিয়া মুসলমানদের সহিত বনী ইসরাঈলীদের ঝগড়া বিবাদে লিপ্ত হওয়া উচিত নয়। অতঃপর, মুসলমানদের উদ্দেশ্যে এই সতর্কবাণী উচ্চারণ করা হইয়াছে যে, আহলে কিতাবগণ মুসলমানদের সহিত শত্রুতায় এতদূর অগ্রসর হইয়াছে যে, সুযোগ পাইলেই তাহারা তাহাদিগকে বিভ্রান্ত করিতে প্রচেষ্টা চালাইবে। কিন্তু মুসলমানগণ যেহেতু আল্লাহ্তা’লার দয়া ও অনুগ্রহপুষ্ট, তাই তাহারা তাহাদিগকে বিভ্রান্ত করিতে পারিবে না। অবশ্য তাহাদের তরফ হইতে যখন মুসলমানগণ তীব্র বিরোধিতা ও শত্রুতার সম্মুখীন হইবে, তখন তাহারা ধৈর্যের সহিত উহার মোকাবিলা করিবে এবং আল্লাহ্তা’লার সহিত তাহাদের সম্পর্ককে আরো জোরদার করিবে। শুধু তাহাই নহে তাহাদের পারস্পরিক সম্পর্ককে আরো মযবুত ভিত্তির উপর কায়েম করিবে, কেননা, শীঘ্রই খৃষ্টানদের (তরফ হইতে) এক প্রচণ্ড আক্রমণকে প্রতিহত করিবার জন্য তাহাদের ঐক্যবদ্ধ মোকাবিলার প্রয়োজন হইবে। সেই সময় আসিবার পূর্বে যতদূর সম্ভব ইসলামের বাণী অন্যের নিকট পৌঁছাইয়া মুসলমানদেরকে সংখ্যা বৃদ্ধির জন্য তাহাদের তৎপর থাকিতে হইবে। মুসলমানদেরকে আরো সাবধান করা হইয়াছে যে, তাহারা যেন এই ভ্রান্ত ধারণা পোষণ না করে যে খৃষ্টানদের সহিত মোকাবিলায় ইহুদীরা মুসলমানদেরকে সহায়তা করিবে। পরন্তু, ইহুদীরা মুসলমানদেরকে অপমান করিতে বা বিভিন্ন প্রকার কষ্ট দিতে চেষ্টার কোন ক্রুটি করিবে না। ইহুদীদের বিরুদ্ধে এই সতর্ক বাণী উচ্চারণ সত্বেও সূরাটিতে ইহুদীদের ভাল দিকের স্বীকৃতি দানে কার্পণ্য করা হয় নাই এবং বলা হইয়াছে যে, আহলে কিতাবদের সকলেই খারাপ নয়। তাহাদিগের মধ্যে কিছু ভাল লোকও রহিয়াছে, কিন্তু যাহারা ইসলামের ক্ষতি সাধনের জন্য চক্রান্ত করিতেছে, পরিণামে তাহারা বিফল মনোরথ ও দুঃখভারাক্রান্ত হইবে। এই ধরণের ইহুদীদের সহিত মুসলমানদের সমস্ত প্রকার বন্ধুত্বের সম্পর্ক এড়াইয়া চলিতে হইবে যাহাতে তাহাদের অবাঞ্ছিত নৈতিকতা ও কুপ্রভাব দ্বারা তাহারা আবার প্রভাবান্বিত না হইয়া পড়ে।
অতঃপর, বদরের যুদ্ধ সম্পর্কে সংক্ষিপ্ত আলোকপাত করিয়া মুসলমানদেরকে বলা হইয়াছে যে, উক্ত যুদ্ধে যেরূপ প্রতিকূল অবস্থা সত্বেও আল্লাহ্তা’লা তাহাদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন এবং আরবের পৌত্তলিকদের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য বিজয় দান করিয়াছিলেন, আহলে কিতাবের সাথেও তদ্রুপ হইবে এবং তাহাদের বিরুদ্ধেও (সংগ্রাম কালে) আল্লাহ্তা’লার অনুগ্রহ এবং সাহায্য মুসলমানদের সাথে থাকিবে। আহলে কিতাবগণ তাহাদের জনবল এবং সুদের কাজ কারবার জনিত পার্থিব শক্তি সামর্থ্যের উপর ভরসা করে। এই ধরণের সুদের আদান-প্রদান প্রকৃত নৈতিকতার একান্ত পরিপন্থী। সুদ গ্রহণের ফলে তাহারা আল্লাহ্র বান্দাগণকে কষ্ট দিতেছে এবং প্রায়শ্চিত্তবাদের সমর্থনের অনুশোচনা বা তওবা গ্রহণের সুযোগ না রাখিয়া তাহারা নিজেদের মতই আল্লাহ্কে নিষ্ঠুর বলিয়া অভিহিত করিতেছে। এই পরিপ্রেক্ষিতে মুসলমানেরা যদি তাহাদের জীবনে সফলতা লাভ করিতে চায়, তাহা হইলে তাহারা যেন সঠিক সময়ে তাহাদের নির্ধারিত কর্ম সম্পাদন করে, সম্ভাব্য কুরবানী করে এবং তাহাদের সম্পদ নিজেদের ভরণ-পোষণ ব্যতিরেকে আল্লাহ্র রাস্তায় ব্যয় করিবার জন্য প্রস্তুত থাকে। অতঃপর, সূরাটিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতির ঘোষণা করিয়া বলা হইয়াছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একজন (আল্লাহ্র) রসূল, যদি তিনি মারা যান বা কোন যুদ্ধে নিহত হন (যদিও ঐশী-প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী কোন যুদ্ধে তিনি মারা যাইবেন না), তাহা হইলেও মুসলমানদের নিরাশ হওয়ার বা ইসলামের সত্যতা সম্পর্কে সন্দিহান হওয়ার কোন কারণ নাই, কেননা, ইসলামের বিজয় বা সফলতা কোন ব্যক্তি (তিনি যত বড়ই হউন না কেন) বিশেষের উপর নির্ভর করে না। আরেকটি প্রয়োজনীয় বিষয় যাহা যুদ্ধের সময়ে বিশেষ করিয়া লক্ষ্য রাখিতে হইবে তাহা হইল এই যে, অন্য সময় অপেক্ষা তখন মুসলমান নেতৃবর্গের অন্যান্য মুসলমানদের প্রতি অধিকতর সহিষ্ণুতা প্রদর্শন করিতে হইবে এবং সহজেই অভিভূত হয় এমন সংবেদনশীল বিষয়ের প্রতিও সতর্ক থাকিতে হইবে যাহাতে শত্রুগণ কোন ভাবেই তাহাদের মধ্যে মতভেদের সৃষ্টি করিতে না পারে। তাহা ছাড়া, উক্ত সময়ে প্রত্যেক বিষয়েই যাহাতে পারস্পরিক আলাপ-আলোচনার মধ্যে আল্লাহ্তা’লা যে এক মহান রসূলকে (মুহাম্মদ সাঃ-কে) আবির্ভূত করিয়া অতি ব্যাপক ও সুদূরপ্রসারী মঙ্গল সাধন করিয়াছেন সেই বিষয়কে স্বরণ করানো হইয়াছে। মুসলমানদের উচিত সর্বক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর অনুসরণ করা এবং শান্তি বিঘ্নিতকারী সমস্ত পথ ও পদ্ধতি হইতে নিজেদেরকে বাঁচাইয়া চলা। অতঃপর, সূরাটিতে এই নীতির উল্লেখ করা হইয়াছে যে, যাহারা সত্য প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে মারা যায়, তাহারা বিশেষ সম্মানের অধিকারী। তাহাদের মৃত্যুর মাধ্যমে তাহারা আসলে অনন্ত জীবন প্রাপ্ত হয় এবং তাহাদের সম্প্রদায়কে নূতন জীবনের প্রেরণায় অনুপ্রাণিত করে। পুনর্বার, আহলে কিতাবদের উল্লেখ করিয়া সূরাটিতে বলা হইয়াছে যে, নীতিগত ভাবে তাহারা এমন অধঃপতিত হইয়াছে যে, একদিকে যদিও আল্লাহ্তা’লার “মনোনীত জাতি” বলিয়া তাহাদের দাবী, অথচ আল্লাহ্র রাস্তায় খরচ করিবার সময় তাহারাই অধিক ব্যয়কুণ্ঠ। মুসলমানরা যেন ইহা হইতে শিক্ষালাভ করে। আহলে কিতাবদের নৈতিক অধঃপতনের আরেকটি দৃষ্টান্ত হইতেও প্রতীয়মান হয় যে, তাহাদের দাবী অনুযায়ী শুধু মাত্র সেই রসূলের নিকটই তাহারা আনুগত্য দেখাইবে (বলিয়া বলে) যিনি তাহাদের নিকট সর্বাধিক কুরবানী পেশ করিবার আহবান জানাইবেন। অথচ, এই ধরণের অনেক রসূল তাহাদের মধ্যে আবির্ভূত হইলেও তাহাদেরকে তাহারা স্বীকার করে নাই। অতঃপর, কুরবানীর অন্তর্নিহিত তাৎপর্যকে তুলিয়া ধরিয়া বিশ্বাসীদেরকে বলা হইয়াছে যে, জাতীয় স্বার্থে কুরবানী করিতে ভয় পাওয়া বোকামীরই শামিল। তাহাদেরকে অতঃপর,সতর্ক করা হইয়াছে যে, তাহাদের বিশ্বাসের এক কঠোর পরীক্ষা দিতে হইবে। তাহারা যেন মনে না করে যে, অগ্নি ও রক্তপাতের মত কঠোর পরীক্ষা না দিয়া তাহারা এমনিতেই সফলকাম হইতে পারিবে। পরবর্তী কিছু আয়াতে সত্যিকার বিশ্বাসীদের বৈশিষ্ট্য ও চারিত্রিক গুণাবলীর বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে এবং জাতীয় উন্নতি ও সংহতির জন্য অপরিহার্য কিছু প্রার্থনা শিক্ষা দেওয়া হইয়াছে। পরিশেষে সূরাটিতে কতিপয় নীতি ও কর্মধারা পেশ করা হইয়াছে যেইগুলি অনুসরণের মাধ্যমে মুসলমানরা এই পৃথিবীতে সাফল্য ও শ্রেষ্ঠত্ব এবং পরকালে আল্লাহ্র সন্তষ্টি অর্জনে সক্ষম হইতে পারে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
اللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ۙ الۡحَیُّ الۡقَیُّوۡمُ ؕ﴿۳﴾
এই আয়াতে ঈসা (আঃ)-এর উলূহীয়্যতের (ঈশ্বরত্বের) অলীক মতবাদকে শক্তিশালী যুক্তি দ্বারা খণ্ডন করা হইয়াছে।এই মতবাদটি এই সূরার বিষয়াবলীর মধ্যে অন্যতম বিষয়। তাই, সূরার প্রথমেই যুক্তিযুক্তভাবে আল্লাহ্তা’লার ঐসব গুণাবলীর উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহা ঐ মতবাদটির মূলে কুঠারাঘাত করে। এই গুণাবলী হইলঃ আল্লাহ্ চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভূ ও স্বনির্ভর। এই গুণগুলি প্রমাণ করে যে, আল্লাহ্র কোনও সহযোগী ও সাহায্যকারীর প্রয়োজন নাই। অপরদিকে ইহাও প্রমাণিত হয় যে, ঈসা (আঃ ) যিনি জন্ম-মৃত্যুর নিয়মের অধীন ছিলেন; যিনি চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভু ও স্বনির্ভর ছিলেন না, তিনি কখনও ঈশ্বর ছিলেন না। খৃষ্টানদের প্রায়শ্চিত্তবাদ, যাহা যীশুর ইশ্বরত্বের বিশ্বাস হইতে উদ্ভূত, তাহাও ধূলিসাৎ হইয়া যায়। খৃষ্টানগণ বলেন, ঈসা (আঃ) মানুষের পাপের প্রায়শ্চিত্তের জন্য মৃত্যু বরণ করিয়াছিলেন। এই কথা যদি সত্য হয়, তাহা হইলে তিনি খোদা হইতে পারেন না, কেননা আল্লাহ্তো তিনিই যিনি কখনও মৃত্যুবরণ করেন না, সাময়িক ভাবেও না। খৃষ্টানেরা অনর্থক এই যুক্তির অবতারণা করেন যে, যীশুর মৃত্যুর অর্থ হইল, ঈশ্বর-যীশুর শারীরিক অবস্থান হইতে বিচ্ছেদ। খৃষ্টানদের বিশ্বাস মতে, ঈশ্বর-যীশু ও তাঁহার মানব-দেহ-ধারণ ছিল সাময়িক অবস্থা; অতএব, এই সাময়িক অবস্থা একদিন ভাঙ্গিয়া পড়ারই ছিল, এমন কি ক্রুশে না মরিলেও মৃত্যু হইতই। কাজেই কেবল শারীরিক বিচ্ছেদ কোন কাজেই আসিতে পারে না। অতএব, ইহা অন্য কোন মৃত্যু হইবে, যাহা তাহার পাপী শিষ্যগণকে পরিত্রাণ দিয়াছে। খৃষ্টানদের নিজস্ব মতও তাহাই। তাহারা মনে করেন, ক্রুশীয় মৃত্যুর পরে যীশু যখন দোযখে নিক্ষিপ্ত হইলেন তখন, তাঁহার যে মৃত্যু ঘটিয়াছিল, ঐ মৃত্যুই, সেই পরিত্রাণকারী মৃত্যু(প্রেরিত-২ঃ ৩১)। অতএব, মৃত্যুর ঊর্ধ্বে চিরঞ্জীব থাকা, যাহা আল্লাহ্র অন্যতম মর্যাদা, তাহা যীশুর ছিল না, বরং যীশুআক্ষরিক ভাবেও এবংরূপক ভাবেও মৃত্যু বরণ করিয়াছেন। তেমনি ভাবে, স্বয়ম্ভু ও স্বয়ম্ভর হওয়ার দিক হইতে দেখিলেও যীশুর ঈশ্বরত্ব প্রতিপন্ন হয় না। আল্লাহ্ স্বয়ম্ভু ও স্বয়ম্ভর হওয়ার কারণে, কাহারও সাহায্য তাঁহার প্রয়োজন হয় না বরং অন্যান্য সবকিছুই তাঁহার মুখাপেক্ষী ও সাহায্যপ্রার্থী হইয়া থাকে। কিন্তু যীশুর মাঝে এইসব ঐশ্বরিক গুণ ছিল না। অন্যান্য মরণশীলদের মত, তিনি মাতৃগর্ভে জন্ম নিয়াছিলেন, পানাহারের সাহায্যে বাঁচিয়া ছিলেন, দুঃখ-যন্ত্রণা ভোগ করিয়াছিলেন, নিজের দুঃখ-যন্ত্রণা হইতে মুক্তির জন্য অন্যদের প্রার্থনা কামনা করিয়াছিলেন এবং অবশেষে (খৃষ্টানদের মতে) ক্রুশে মৃত্যু বরণ করেন। বাইবেলের নূতন নিয়ম এইসব ঘটনাবলীর তথ্যে পূর্ণ। কিন্তু আল্লাহ্তা’লা, যিনি চিরঞ্জীব, স্বয়ম্ভু ও স্বনির্ভর তিনি এই সব শারীরিক সুখ-দুঃখের বহু ঊর্ধ্বে।
نَزَّلَ عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ مُصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیۡہِ وَاَنۡزَلَ التَّوۡرٰٮۃَ وَالۡاِنۡجِیۡلَ ۙ﴿۴﴾
مِنۡ قَبۡلُ ہُدًی لِّلنَّاسِ وَاَنۡزَلَ الۡفُرۡقَانَ ۬ؕ اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ لَہُمۡ عَذَابٌ شَدِیۡدٌ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ ذُو انۡتِقَامٍ ﴿۵﴾
اِنَّ اللّٰہَ لَا یَخۡفٰی عَلَیۡہِ شَیۡءٌ فِی الۡاَرۡضِ وَلَا فِی السَّمَآءِ ؕ﴿۶﴾
ہُوَ الَّذِیۡ یُصَوِّرُکُمۡ فِی الۡاَرۡحَامِ کَیۡفَ یَشَآءُ ؕ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۷﴾
ہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ عَلَیۡکَ الۡکِتٰبَ مِنۡہُ اٰیٰتٌ مُّحۡکَمٰتٌ ہُنَّ اُمُّ الۡکِتٰبِ وَاُخَرُ مُتَشٰبِہٰتٌ ؕ فَاَمَّا الَّذِیۡنَ فِیۡ قُلُوۡبِہِمۡ زَیۡغٌ فَیَتَّبِعُوۡنَ مَا تَشَابَہَ مِنۡہُ ابۡتِغَآءَ الۡفِتۡنَۃِ وَابۡتِغَآءَ تَاۡوِیۡلِہٖ ۚ وَمَا یَعۡلَمُ تَاۡوِیۡلَہٗۤ اِلَّا اللّٰہُ ۘؔ وَالرّٰسِخُوۡنَ فِی الۡعِلۡمِ یَقُوۡلُوۡنَ اٰمَنَّا بِہٖ ۙ کُلٌّ مِّنۡ عِنۡدِ رَبِّنَا ۚ وَمَا یَذَّکَّرُ اِلَّاۤ اُولُوا الۡاَلۡبَابِ ﴿۸﴾
رَبَّنَا لَا تُزِغۡ قُلُوۡبَنَا بَعۡدَ اِذۡ ہَدَیۡتَنَا وَہَبۡ لَنَا مِنۡ لَّدُنۡکَ رَحۡمَۃً ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡوَہَّابُ ﴿۹﴾
رَبَّنَاۤ اِنَّکَ جَامِعُ النَّاسِ لِیَوۡمٍ لَّا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُخۡلِفُ الۡمِیۡعَادَ ﴿۱۰﴾٪