৩

آل عمران

সূরা আ লে ‘ইম্‌রান

Aal-e-`Imran

মাদানী ২০১ আয়াত ২০ রুকু পারা ৩–৪

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২০১ আয়াত এবং ২০ রুকু আছে।

فَاِنۡ حَآجُّوۡکَ فَقُلۡ اَسۡلَمۡتُ وَجۡہِیَ لِلّٰہِ وَمَنِ اتَّبَعَنِ ؕ وَقُلۡ لِّلَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡکِتٰبَ وَالۡاُمِّیّٖنَ ءَاَسۡلَمۡتُمۡ ؕ فَاِنۡ اَسۡلَمُوۡا فَقَدِ اہۡتَدَوۡا ۚ وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنَّمَا عَلَیۡکَ الۡبَلٰغُ ؕ وَاللّٰہُ بَصِیۡرٌۢ بِالۡعِبَادِ ﴿٪۲۱﴾

২১
কিন্তু যদি তাহারা তোমার সহিত বিতর্ক করে তাহা হইলে তুমি বল, ‘আমি আল্লাহ্‌র নিকট পূর্ণরূপে আত্মসমর্পণ করিয়াছি এবং যাহারা আমার অনুসরণ করে তাহারাও।’ এবং যাহাদিগকে কিতাব৩৮৪ দেয়া হয়েছিল তাহাদিগকে এবং উম্মী দিগকে৩৮৫ বল, ‘তোমরাও কি আত্মসমর্পণ করিয়াছ?’ অতঃপর, তাহারা যদি আত্মসমর্পণ করে তাহা হইলে নিশ্চয় তাহারা হেদায়াত৩৮৬ পাইয়াছে, এবং যদি তাহারা মুখ ফিরাইয়া লয় তাহা হইলে তোমার কর্তব্য কেবল (পয়গাম) পৌঁছাইয়া দেওয়া। এবং আল্লাহ্ (তাহার) বান্দাগনের সম্বন্ধে সর্বদ্রষ্টা।
সূরা আ লে ‘ইম্‌রান - রুকু ২
৩৮৪। ঐশী ধর্মগ্রন্থের অনুসারীগণ ও ‘উম্মিয়ীন’ (যাহারা ধর্মগ্রন্থের অনুসারী নহে) বলিতে সারা মানব জাতিকেই বুঝায়।
৩৮৫। ১১৩-ক এবং ১০৫৮ টীকা দেখুন।
৩৮৬। ধর্মগ্রন্থের অনুসারীগণ (আহলে কিতাব) এবং যাহারা আহলে কিতাব নহে তাহারা যদি আল্লাহ্‌তা’লার কাছে আত্ম-সমর্পণ করিত, তাহা হইলে নিশ্চয় তাহারা আঁ-হযরত (সাঃ)-কে গ্রহণ না করিয়া থাকিতে পারিত না এবং নিশ্চয় তাহারা সঠিক পথও প্রাপ্ত হইত। কেননা, আলে কিতাবদের নিজ নিজ ধর্ম গ্রন্থে আঁ-হযরত (সাঃ) সম্বন্ধে সুস্পষ্ট ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে। আর যাহারা কিতাবধারী নহে, তাহারাও সাধারণ বিচার-বুদ্ধি, মানব-বিবেক ও প্রকৃতির সাক্ষ্য দ্বারা প্রণোদিত হইয়া মহানবী (সাঃ)-এর সত্যতা মানিয়া লইত।

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡفُرُوۡنَ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَیَقۡتُلُوۡنَ النَّبِیّٖنَ بِغَیۡرِ حَقٍّ ۙ وَّیَقۡتُلُوۡنَ الَّذِیۡنَ یَاۡمُرُوۡنَ بِالۡقِسۡطِ مِنَ النَّاسِ ۙ فَبَشِّرۡہُمۡ بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ﴿۲۲﴾

২২
নিশ্চয় যাহারা আল্লাহ্‌র নির্দেশনাবলীকে অস্বীকার করে এবং অন্যায়ভাবে নবীগণকে হত্যা করিতে চাহে এবং লোকদের মধ্য হইতে যাহারা ন্যায় বিচারের আদেশ দেয় তাহাদিগকেও হত্যা করিতে চাহে, তাহা হইলে তুমি তাহাদিগকে যন্ত্রণাদায়ক আযাবের৩৮৭ সংবাদ দাও।
৩৮৭। আল্লাহ্‌র নবীগণ, যে কোনও অবস্থায়ই নিপতিত হইয়া থাকুন না কেন, কোনও দিনই স্বীয় মিশনের পূর্ণতা সাধনে ব্যর্থ হন নাই। সীমাহীন অত্যাচার, এমনকি প্রাণ-সংহারের প্রচেষ্টাও নবীগণের বিশ্বাসের অগ্রগতি ও উন্নতিকে দমাইতে পারে নাই। ধর্মের ইতিহাস এই চির সত্যের উজ্জ্বল সাক্ষী হইয়া রহিয়াছে।

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ حَبِطَتۡ اَعۡمَالُہُمۡ فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ۫ وَمَا لَہُمۡ مِّنۡ نّٰصِرِیۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
তাহারাই সেই সকল লোক যাহাদের কর্ম সমূহ ইহকালে ও পরকালে ব্যর্থ হয় হইবে এবং তাহাদের কোন সাহায্যকারী৩৮৮ হইবে না।
৩৮৮। কাফেরগণ এই কথায় বিশ্বাস করে না যে, পরলোকে ইহকালীন কর্মের ফল ভোগ করিতে হইবে। তাই বিচার ও পুনরুত্থানের দিনে যে তাহারা সবদিকে ব্যর্থ-মনোরথ হইবে, ইহার প্রমাণ স্বরূপ তাহাদিগকে বলা হইতেছে যে, ইহলোকে তাহাদের সকল ইসলাম-বিধ্বংসী কার্যকলাপ ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে। আর এই ব্যর্থতা ইহলোকেই তাহাদিগকে বলিয়া দিবে যে, তাহাদের কর্মকাণ্ড পরলোকে তাহাদের কোনই কাজে আসিবে না।

اَلَمۡ تَرَ اِلَی الَّذِیۡنَ اُوۡتُوۡا نَصِیۡبًا مِّنَ الۡکِتٰبِ یُدۡعَوۡنَ اِلٰی کِتٰبِ اللّٰہِ لِیَحۡکُمَ بَیۡنَہُمۡ ثُمَّ یَتَوَلّٰی فَرِیۡقٌ مِّنۡہُمۡ وَہُمۡ مُّعۡرِضُوۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
যাহাদিগকে কিতাবের৩৮৯ একাংশ দেওয়া হইয়াছিল, তুমি কি তাহাদিগকে লক্ষ্য কর নাই? (যখন) তাহাদিগকে আল্লাহ্‌র কিতাবের দিকে আহ্বান করা হয় যেন ইহা তাহাদের মধ্যে ফয়সালা করিয়া দেয়, তখন তাহাদের মধ্য হইতে এক দল উপেক্ষা করিয়া মুখ ফিরাইয়া লয়।
৩৮৯। গ্রন্থের একাংশ বলিতে বুঝাইতে পারে - (১) আঁ-হযরত (সাঃ) সম্বন্ধে বাইবেলে যে সব ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে, সেই অংশ, (২) বাইবেলের সেই পবিত্র অংশ, যাহা মানুষের হস্তক্ষেপে কুলষিত হয় নাই বা পরিবর্তিত-পরিবর্ধিত হয় নাই। আদতে বাইবেলের অল্প অংশই অপরিবর্তিত ও হস্তক্ষেপ-মুক্ত আছে; (৩) পরিপূর্ণ ও সর্বশেষ্ঠ গ্রন্থ কুরআনের তুলনায় বাইবেল একটি অংশ মাত্র।

ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَالُوۡا لَنۡ تَمَسَّنَا النَّارُ اِلَّاۤ اَیَّامًا مَّعۡدُوۡدٰتٍ ۪ وَغَرَّہُمۡ فِیۡ دِیۡنِہِمۡ مَّا کَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
ইহা এই জন্য যে, তাহারা বলে, ‘নির্দিষ্ট কতক৩৯০ দিন ব্যতীত অগ্নি আমাদিগকে আদৌ স্পর্শ করিবে না।’ এবং তাহারা যাহা মিথ্যা রচনা করিয়া আসিতেছিল তাহাই তাহাদিগকে তাহাদের ধর্ম সম্বন্ধে প্রতারিত করিয়াছে।
৩৯০।

ইহুদী ও খৃষ্টান, এই উভয় সম্প্রদায়ই নিজদিগকে এই বিশ্বাসে উপনীত করিয়াছে যে, পরলোকে তাহাদের কোনও শাস্তি হইবে না, তাহারা নিরাপদ থাকিবে। ইহুদীরা শাস্তি হইতে এই কারণে মুক্ত থাকিবে, যেহেতু তাহারা আত্ম-প্রবঞ্চণায় মগ্ন থাকিয়া মনে করে তাহারা আল্লাহ্‌র একান্ত অনুগৃহীত। খৃষ্টানেরা এই অন্ধ-বিশ্বাসে নিপতিত যে, তথা-কথিত ঈশ্বর-পুত্র যীশু ক্রুশে মৃত্যুবরণ করিয়া তাহাদের পাপ-রাশিকে ধুইয়া ফেলিয়াছেন।

فَکَیۡفَ اِذَا جَمَعۡنٰہُمۡ لِیَوۡمٍ لَّا رَیۡبَ فِیۡہِ ۟ وَوُفِّیَتۡ کُلُّ نَفۡسٍ مَّا کَسَبَتۡ وَہُمۡ لَا یُظۡلَمُوۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
অতএব, যখন আমরা তাহাদিগকে সেইদিন একত্রিত করিব যাহার সম্বন্ধে কোন সন্দেহ নাই তখন অবস্থা কেমন হইবে, এবং প্রত্যেক ব্যাক্তিকে যাহা সে অর্জন করিবে উহার পূর্ন প্রতিফল দেয়া হইবে এবং তাহাদের উপর কিছু মাত্র যুলুম৩৯১ করা হইবে না?
৩৯১। এই আয়াত অতি দৃঢ়তার সহিত এই কথার খণ্ডন করিতেছে যে, কাহারও নিজের কর্মফলে নহে, বরং অন্যের রক্ত দ্বারা নাজাত বা পরিত্রাণ অর্জিত হয়।

قُلِ اللّٰہُمَّ مٰلِکَ الۡمُلۡکِ تُؤۡتِی الۡمُلۡکَ مَنۡ تَشَآءُ وَتَنۡزِعُ الۡمُلۡکَ مِمَّنۡ تَشَآءُ ۫ وَتُعِزُّ مَنۡ تَشَآءُ وَتُذِلُّ مَنۡ تَشَآءُ ؕ بِیَدِکَ الۡخَیۡرُ ؕ اِنَّکَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲۷﴾

২৭
তুমি বল, ‘হে রাজ্যাধিপতি আল্লাহ্! তুমি যাহাকে চাহ রাজত্ব দান কর এবং যাহার নিকট হইতে চাহ রাজত্ব কাড়িয়া লও; এবং যাহাকে চাহ ইজ্জত দান কর এবং যাহাকে চাহ লাঞ্ছিত কর। সকল কল্যাণ তোমারই হস্তে। নিশ্চয় তুমি প্রত্যেক বিষয়ের৩৯২ ওপর সর্বশক্তিমান।
৩৯২। এই আয়াতের ব্যাখ্যার জন্য পরবর্তী আয়াতটি দেখুন।

تُوۡلِجُ الَّیۡلَ فِی النَّہَارِ وَتُوۡلِجُ النَّہَارَ فِی الَّیۡلِ ۫ وَتُخۡرِجُ الۡحَیَّ مِنَ الۡمَیِّتِ وَتُخۡرِجُ الۡمَیِّتَ مِنَ الۡحَیِّ ۫ وَتَرۡزُقُ مَنۡ تَشَآءُ بِغَیۡرِ حِسَابٍ ﴿۲۸﴾

২৮
তুমি রাত্রিকে দিবসের মধ্যে প্রবিষ্ট কর এবং দিবসকে রাত্রির৩৯৩ মধ্যে প্রবিষ্ট কর; এবং তুমি জীবিতকে মৃত হইতে বাহির কর এবং মৃতকে জীবিত হইতে বাহির কর। এবং যাহাকে চাহ তুমি বেহিসাব৩৯৪ রিয্‌ক দান কর।’
৩৯৩। স্পষ্ট আক্ষরিক অর্থ ছাড়াও, ইহার রূপক অর্থও থাকিতে পারে যথা, ‘দিবস’ বলিতে একটি জাতির উন্নতি ও ক্ষমতার আলোময় যুগ বুঝাইতে পারে এবং ‘রজনী’ বলিতে জাতির অধঃপতন ও অপমানের অন্ধকারময় যুগকে বুঝাইতে পারে।
৩৯৪। পূর্ববর্তী আয়াত এবং এই আয়াত মিলিত ভাবে আল্লাহ্‌তা’লার একটি অমোঘ নিয়মের প্রতি ইঙ্গিত করিতেছে। তাহা এই - যে জাতি আল্লাহ্‌র ইচ্ছার সহিত নিজের আশা-আকাঙ্খা ও কামনা-বাসনাকে মিলাইয়া জীবন- পথে অগ্রসর হয়, সেই জাতি উন্নতি করে এবং যে জাতি আল্লাহ্‌র ইচ্ছার বিপরীতমূখী পথ অবলম্বন করে, সেই জাতির পতন ঘটে। কেননা ক্ষমতা ও মহিমার একমাত্র উৎস হইলেন আল্লাহ্।

لَا یَتَّخِذِ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ الۡکٰفِرِیۡنَ اَوۡلِیَآءَ مِنۡ دُوۡنِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ۚ وَمَنۡ یَّفۡعَلۡ ذٰلِکَ فَلَیۡسَ مِنَ اللّٰہِ فِیۡ شَیۡءٍ اِلَّاۤ اَنۡ تَتَّقُوۡا مِنۡہُمۡ تُقٰٮۃً ؕ وَیُحَذِّرُکُمُ اللّٰہُ نَفۡسَہٗ ؕ وَاِلَی اللّٰہِ الۡمَصِیۡرُ ﴿۲۹﴾

২৯
মো’মেনগনণ যেন মো’মেনগণকে ছাড়িয়া কাফেরদিগকে বন্ধু৩৯৫ হিসেবে গ্রহণ না করে, এবং (তোমাদের মধ্যে) যে কেহ ইহা করিবে, আল্লাহ্‌র সহিত কোন বিষয়ে তাহার কোন সম্পর্ক থাকিবে না; হাঁ, কেবল তোমরা তাহাদের নিকট হইতে সম্পূর্ণরূপে আত্মরক্ষা৩৯৬ করিয়া চলিবে। এবং আল্লাহ্ তোমাদিগকে তাহার সত্তা৩৯৭ (তাহার শাস্তি) সম্বন্ধে সতর্ক করিতেছেন এবং আল্লাহ্‌রই দিকে (সকলকে) প্রত্যাবর্তন করিতে হইবে।
৩৯৫। এই আয়াতে উপদেশ দেওয়া হইতেছে যে, নীতিগত ভাবে কোন ইসলামী রাষ্ট্র অনৈসলামী রাষ্ট্রের সাথে এমন কোনও জোট বা মৈত্রী গঠন করিবে না যাহা অন্য কোনও ইসলামী রাষ্ট্রের সামান্য স্বার্থহানিও ঘটাইতে পারে। ইসলামের তথা মুসলমানের স্বার্থকে সবকিছুর উপরে স্থান দিতে হইবে।
৩৯৬। কাফেরদের ষড়যন্ত্র ও অপকৌশল হইতে বাঁচিয়া থাকার জন্য মুসলমানকে বিশেষ ভাবে সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। এখানে শত্রুর ক্ষমতার প্রতি ইঙ্গিত করা হয় নাই। বরং তাহাদের কূটিল কৌশল ও চালাকির প্রতি দৃষ্টি রাখার কথা বলা হইয়াছে।
৩৯৭। ‘নাফস্’ অর্থ ব্যক্তিত্ব, উদ্দেশ্য, কামনা-বাসনা, শাস্তি ইত্যাদি (আকরাব)।

قُلۡ اِنۡ تُخۡفُوۡا مَا فِیۡ صُدُوۡرِکُمۡ اَوۡ تُبۡدُوۡہُ یَعۡلَمۡہُ اللّٰہُ ؕ وَیَعۡلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَاللّٰہُ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۳۰﴾

৩০
তুমি বল, ‘তোমাদের বক্ষদেশে যাহা কিছু আছে উহা তোমরা প্রকাশ কর অথবা উহা গোপন কর, আল্লাহ্ উহা জানেন; এবং তিনি জানেন যাহা কিছু আকাশসমূহে আছে এবং যাহা কিছু পৃথিবীতে আছে। এবং আল্লাহ্ প্রত্যেক বিষয়ের ওপর সর্বশক্তিমান।’