২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓـمّٓ ۚ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম মীম্১৬
১৬। ১৬। ‘আলিফ লাম মীম্’—প্রত্যেকটি অক্ষর এক একটি শব্দকে বুঝাইয়াছে। স্ব-স্ব উচ্চারণে, পৃথক পৃথকভাবে উচ্চারিত অক্ষরগুলি সংক্ষিপ্ত শব্দ বিশেষ। ইহাদিগকে শব্দ-সংক্ষেপণ বলা যাইতে পারে। আরবীতে এইরূপ পৃথক পৃথকভাবে উচ্চারিত ও ব্যবহৃত অক্ষর-সমষ্টিকে ‘হুরূফে মুকাত্তায়াত’ বলা হয়। কুরআনের ২৮টি সূরার প্রারম্ভে এই ‘মুকাত্তায়াতে’র ব্যবহার আসিয়াছে। একটি হরফ হইতে আরম্ভ করিয়া, বিভিন্ন হরফ একত্রে সন্নিবিষ্ট হইয়া, ‘মুকাত্তায়াত’ রূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। এইরূপে সন্নিবিষ্ট অক্ষরের সর্বোচ্চ সংখ্যা পাঁচ। মোট চৌদ্দটি হুরূফে মুকাত্তায়াত রূপে ব্যবহৃত হইয়াছেঃ আলিফ, লাম, মীম্, সোয়াদ, রা, কাফ, হা, ইয়া, আইন, তা, সিন, হা, কাফ এবং নূন। কাফ ও নূন একা একা যথাক্রমে সূরা কাফ ও সূরা কলমের প্রারম্ভে ব্যবহৃত হইয়াছে। অন্যান্য অক্ষরগুলি দুই বা ততোধিক মিলিয়া সম্মিলিতভাবে, অন্য কতকগুলি সূরার প্রারম্ভে ‘মুকাত্তায়াত’ রূপে স্থান পাইয়াছে। আরবদের মধ্যে এই মুকাত্তায়াতের ব্যবহার পূর্ব হইতেই ছিল। তাহারা তাহাদের কবিতায় ও কথাবার্তায় মুকাত্তায়াত ব্যবহার করিত। একজন আরব কবি বলেন, ‘কুল্‌না কিফি লানা, ফাকালাত্ কাফ্‌’ অর্থাৎ ‘স্ত্রীলোকটিকে বলিলাম, ‘একটু থামুন’, তিনি বলিলেন, ‘আমি থামিতেছি’। এখানে ‘কাফ্’ অক্ষরটি ‘ওয়াকাফ্তু’ (থামিতেছি) শব্দের পরিবর্তে ব্যবহৃত হইয়াছে। আধুনিক কালের পশ্চিমা দেশগুলিতে এবং তাহাদের অনুকরণে প্রাচ্যের দেশগুলিতেও এই শব্দ-সংক্ষেপণ রীতি ব্যাপকভাবে প্রচলিত হইয়াছে। সকল অভিধানেই ইহার একটি লিষ্ট ইদানীং সংযোজিত হইয়া থাকে। মুকাত্তায়াত আল্লাহ্‌র গুণাবলী প্রকাশক শব্দসমূহের অক্ষর সংকেত স্বরূপ। যে সূরার পূর্বে এই অক্ষর-সংকেত ব্যবহৃত হয়, ইহার বিষয়-বস্তুর সাথে আল্লাহ্‌তা’লার কোনও না কোন গুণের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক থাকে। মুকাত্তায়াতের অক্ষরে ঐ গুণটিই নিহিত থাকে। বিভিন্ন সূরার প্রারম্ভে সাংকেতিকভাবে ব্যবহৃত অক্ষরগুলি যেন তেন বা অসাজানোভাবে স্থাপন করা হয় নাই। যেখানে একত্রে একাধিক অক্ষরের সমাবেশ আছে, সেখানেও সুশৃঙ্খলা বিদ্যমান আছে ; আগের অক্ষর পরে কিংবা পরের অক্ষর আগে রাখা হয় নাই। বিভিন্ন সমষ্টি বা সেটের মধ্যে নিগূঢ় সম্পর্ক ও গভীর তাৎপর্য রহিয়াছে এবং যে যে অক্ষর দ্বারা একটি সমষ্টি বা সেট গঠিত হইয়াছে উহারাও একটি নির্দিষ্ট উদ্দেশ্য পালন করিতেছে। যেসব সূরা মুকাত্তায়াত দ্বারা আরম্ভ হয় নাই, তাহারা পূর্ববতী সন্নিহিত মুকাত্তায়াত-সম্বলিত আয়াতের আওতাধীন থাকিয়া, উহারই বিষয়বস্তু, বাক্‌ধারা ও ভাবধারা অনুসরণ করে। মুকাত্তায়াতের তাৎপর্যসমূহের মধ্যে দুইটি অধিকতর নির্ভরযোগ্য বলিয়া মনে হয়ঃ (১) প্রত্যেক অক্ষরের একটি নির্দিষ্ট সংখ্যা-মূল্য আছে (জরীর) আলিফ, লাম, মীম্‌, মিলিয়া সংখ্যা দাঁড়ায় ৭১ (আলিফ-১, লাম-৩০ এবং মীম্‌-৪০)। এমতাবস্থায় সূরার প্রারম্ভে আলিফ লাম মীম্ ব্যবহারের তাৎপর্য ইহা হইতে পারে যে, এই সূরাতে যে বিষয় বিবৃত হইয়াছে (ইসলামের প্রতিষ্ঠার পর প্রাথমিক স্থিতিশীলতা), তাহা সম্পাদিত হইতে ৭১ বৎসর সময় লাগিবে; (২) আল্লাহর নির্দিষ্ট গুণাবলী-জ্ঞাপক শব্দ-সংক্ষেপ (যাহাতে একটি অক্ষর দ্বারা একটি শব্দ নির্দেশ করে) যেমন পূর্বেই বলা হইয়াছে, মুকাত্তায়াত যুক্ত সূরার বিষয়-বস্তু আল্লাহ্‌তা’লার ঐ গুণাবলীর সাথে সম্বন্ধ রাখে, যে গুণগুলি সংশ্লিষ্ট সূরার মুকাত্তায়াতের মধ্যে নিহিত আছে।এখানে মুকাত্তায়াত হিসাবে ‘আলিফ লাম মীম্‌’ ব্যবহৃত হইয়াছে, যাহার অর্থ করা হইয়াছে ‘আমি আল্লাহ সর্বজ্ঞ’। হযরত ইবনে আব্বাস ও হযরত ইবনে মাস্উদ (রাঃ) এই অর্থ করিয়াছেন। এখানে ‘আলিফ মানে ‘আনা’, লাম মানে ‘আল্লাহ’, মীম্ মানে আ’লামু , সব মিলাইয়া হয়, ‘আনাল্লাহু আ’লামু’ (আমি আল্লাহ্ সর্বজ্ঞ)। কাহারও কাহারও মতে, ‘আলিফ’ মানে আল্লাহ্‌, লাম মানে জিব্‌রাঈল, আর ‘মীম্‌’ মানে মুহাম্মদ (সাঃ), যাহার তাৎপর্য হইল—এই সূরার মূল বিষয়-বস্তু সম্পর্কিত ঐশী জ্ঞান আল্লাহ্‌র কাছ হইতে জিব্‌রাঈলের মাধ্যমে মুহাম্মদ (সাঃ)কে দেওয়া হইয়াছে। এই শব্দ-সংক্ষেপ বা মুকাত্তায়াত কুরআনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যাহা ওহীর মাধ্যমে আসিয়াছে (বুখারী)।

ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ﴿۳﴾

৩
ইহা১৭ সেই কামিল (পূর্ণতম)১৭-ক কিতাব, যাহাতে কোন সন্দেহ১৮ নাই; যাহা হেদায়াত (পথ-নির্দেশ) মুত্তাকীগণের১৯ জন্য,
১৭। ‘যালিকা’ মানে ‘উহা বা ঐটা’;সময় সময় ইহা বা এই অর্থেও ব্যবহৃত হয় (আকরাব)। এই শব্দ যে বস্তু বা বিষয়ের পূর্বে ব্যবহৃত হয়, সেই বস্তু বা বিষয়ের উচ্চ মর্যাদা ও সম্মান প্রকাশ পায়। শব্দটি শ্রদ্ধা ও সম্মান নির্দেশক। এখানে শব্দটি ইহাই বুঝাইতেছে যে, কিতাব খানা গুণ, জ্ঞান ও সম্মানের দিক দিয়া এতই উচ্চ পর্যায়ের যে পাঠকের পক্ষে তাহা অনুধাবন করাও কঠিন (ফাতহ্‌)।
১৭-ক। ‘আল্‌’ ইংরেজী ‘দি’ শব্দটির মতই, পাঠকের জানা বস্তুকে নির্দিষ্ট করিবার জন্য ব্যবহৃত হয়। এই হিসাবে, ‘যালিকাল কিতাবু’ মানে ‘ইহাই সেই কিতাব’—প্রতিশ্রুত কিতাব। একজন ব্যক্তির মধ্যে যতগুলি ভাল গুণ থাকিতে পারে, তাহার একত্রিত সমষ্টিকে বুঝাইতেও এই ‘আল্‌’ উপসর্গটি ব্যবহৃত হয়। এই দিক দিয়া দেখিলেও, ‘যালিকাল কিতাবু’-এর অর্থ দাঁড়ায় ইহা এমনই একখানা পুস্তক, যাহার মধ্যে পূর্ণতম পুস্তকের সকল গুণাবলীই বিদ্যমান রহিয়াছে। অন্য কথায় এর অর্থ, ‘ইহাই একমাত্র কামিল বা পূর্ণতম কিতাব’৷
১৮। ‘রাইব’ অর্থ মনের অস্বস্তি, সন্দেহ, যন্ত্রণা, বিপদ ও কুধারণা, মিথ্যা অপবাদ ও দুর্নাম (আকরাব)। এই আয়াতের অর্থ ইহা নয় যে, কেহ কোনদিন কুরআন সম্বন্ধে সন্দেহ পোষণ করিবে না। বরং এই আয়াতে ইহাই বলা হইয়াছে যে, ন্যায়-নিষ্ঠ ব্যক্তি মুক্ত মনে ইহা পাঠ করিলে, ইহার মধ্যে নিরাপদ ও নিশ্চিত পথের সন্ধান পাইবে।
১৯। ‘মুত্তাকী’ শব্দটি ‘ওয়াকা’ হইতে উৎপন্ন, যাহার অর্থ ‘ক্ষতিকর বস্তু হইতে বাঁচিয়া থাকা’। ‘ভিকায়া’ অর্থ ‘বর্ম’; ‘ইত্তাকা বিহি’ — (মুত্তাকী হইল ইত্তাকার কর্তা) — অর্থ সে ইহাকে বা তাহাকে বর্মরূপে গ্রহণ করিল (লেইন)। হযরত রসূল করীম (সাঃ)-এর একজন প্রসিদ্ধ সাহাবী উবাই-বিন-কাব ‘তাক্‌ওয়া’র ব্যাখ্যা দিতে গিয়া সুন্দরভাবে বলিয়াছেন, ‘মুত্তাকী সেই ব্যক্তি যে কন্টকাকীর্ণ জঙ্গলের ভিতর দিয়া এমনি সাবধানে চলে যাহাতে তাহার কাপড়-চোপড় কাঁটায় জড়াইয়া না যায় বা গুল্মের শাখা-প্রশাখায় লাগিয়া না ছিঁড়ে (কাসীর)। অতএব, মুত্তাকী হইলেন এমনই ব্যক্তি যিনি আল্লাহ্‌কে ঢাল, বর্ম বা আশ্রয় রূপে গ্রহণ করিয়া, অতি সাবধানতার সহিত সর্বদা পাপকর্ম হইতে আত্মরক্ষা করেন এবং নিজের কর্তব্য সযত্নে পালন করিয়া থাকেন। ‘ধর্মপরায়ণদের জন্য পথ-নির্দেশ’ শব্দগুলি দ্বারা ইহাই বুঝায় যে, কুরআনে যে পথ দেখানো হইয়াছে, তাহা অনন্ত-অসীম। ইহা মানুষকে সীমাহীন আধ্যাত্মিক উন্নতি লাভে সাহায্য করে এবং আল্লাহ্‌তা’লার ক্রমবর্ধমান অনুগ্রহ প্রাপ্তির জন্য মানুষকে ক্রমাগতভাবে যোগ্য হইতে যোগ্যতর করিয়া তুলে।

الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَیۡبِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۙ﴿۴﴾

৪
যাহারা গায়েবের২০ (অদৃশ্যের) উপর ঈমান আনে এবং নামায২১ কায়েম করে এবং আমরা তাহাদিগকে যে রিয্‌ক২২ দিয়াছি উহা হইতে খরচ করে;
২০। ‘আল গায়েব’ অর্থ অদৃশ্য বা গোপন বস্তু; অনুপস্থিত, অদেখা, বহুদূরের বস্তু (আকরাব)। আল্লাহ, ফিরিশ্‌তা, কেয়ামতের দিন ইত্যাদি আল গায়েব। অধিকন্তু, কুরআনে ব্যবহৃত এই শব্দটি অবাস্তব বা কল্পিত কোন বস্তুর জন্য ব্যবহৃত হয় নাই। অদৃশ্য অথচ নিশ্চিত ও সত্য বস্তুর জন্যই ব্যবহৃত হইয়াছে (৩২ঃ৭, ৪৯ঃ১৯)। অতএব, পাশ্চাত্যের ভ্রান্ত সমালোচকদের মত, অন্য কাহারও এইরূপ ধারণা করা অন্যায় যে, ইসলাম ইহার অনুসারীদের উপর রহস্যময় বিশ্বাস চাপাইয়া দেয় এবং তাহাতে আস্থা স্থাপনের আহ্বান জানায়। ‘গাইব’ শব্দটির তাৎপর্য এতটুকুই যে, মানবের পঞ্চেন্দ্রিয় দ্বারা সকল বস্তুকে জানা যায় না; তথাপি যুক্তি, জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা দ্বারা ঐসব বস্তুর অস্তিত্বের ভূরি ভূরি প্রমাণ পাওয়া যায়। ইন্দ্রিয়-গ্রাহ্যতার বাহিরে থাকিলেই, বস্তুটিকে অযৌক্তিক মনে করা ভুল। যেসব ‘অদেখা’ জিনিষে বিশ্বাস আনয়নের জন্য ইসলাম আহ্বান জানায়, তাহাদের কোনটিই যুক্তির আওতার বাহিরে নহে। পৃথিবীতে এমন অনেক অদৃশ্য বস্তু আছে, যাহা দেখা যায় না বটে, কিন্তু অকাট্য যুক্তি দ্বারা তাহাদের অস্তিত্বের প্রমাণ সংশয়াতীতভাবে লাভ করা যায়।
২১। ‘তাহারা নামায কায়েম করে’ অর্থাৎ তাহারা নামাযের বিধিবদ্ধ সকল শর্ত পূর্ণভাবে পালন করিয়া নামায আদায় করে। ‘আকামা’ শব্দের অর্থ হইল, সে বিষয়টাকে বা বস্তুটাকে সঠিকভাবে, সঠিক স্থানে, রাখিল (লেইন)। আল্লাহ্‌তা’লার সাথে মানুষের অভ্যন্তরীণ সম্পর্কের বহিঃপ্রকাশের নাম ইবাদত। আল্লাহ্‌র অনুগ্রহরাজি মানুষের দেহ-মন ও আত্মাকে ঘিরিয়া রাখিয়াছে। অতএব, পরিপূর্ণ ইবাদত উহাই, যাহার মধ্যে দেহ ও আত্মা সমভাবে অংশ গ্রহণ করে। উভয়ের অংশ গ্রহণ ব্যতীত ইবাদতের চেতনা ও সারবস্তু সুরক্ষিত থাকিতে পারে না। কেননা যদিও হৃদয়ের নিবেদনই মূলবস্তু এবং শারীরিক ইবাদত বা উপাসনা খোলস মাত্র, তথাপি খোলস বা আবরণ ব্যতীত সারবস্তু রক্ষিত হইতে পারে না। খোলস নষ্ট হইয়া গেলে, সারবস্তুও নষ্ট হইয়া যায়।
২২। ‘রিয্‌ক’— আল্লাহ্‌তা’লা মানুষকে যাহা কিছু দান করিয়াছেন বা দান করেন, তাহা বস্তুই হউক বা অন্য কিছুই হউক, তাহাই ‘রিয্‌ক’ (মুফরাদাত)। মানুষের আধ্যাত্মিক কল্যাণের তিনটি দিক-নির্দেশনা ও তিনটি অবস্থা এই আয়াতে ব্যক্ত হইয়াছে। যথাঃ (১) তাহাকে ঐ সকল সত্য তত্ত্বের উপর বিশ্বাস স্থাপন করিতে হইবে, যাহা সে চোখে দেখিতে পায় না এবং তাহার ইন্দ্রিয়সমূহেও ধরা পড়ে না। কারণ, এইরূপ বিশ্বাস প্রমাণ করে যে, তাহার মধ্যে তাক্‌ওয়া বা ধর্মপরায়ণতা রহিয়াছে, (২) যখন সে এই মহাবিশ্বের দিকে তাকাইয়া চিন্তা করে এবং দেখিতে পায় যে, ইহাতে এক আশ্চর্যজনক সুপরিকল্পিত শৃঙ্খলা বিরাজমান আছে, তখন সে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয় যে, ইহার একজন স্রষ্টা আছে, তখন সেই স্রষ্টার সহিত সত্যিকার সম্বন্ধ স্থাপনের প্রবল ও অপ্রতিরোধ্য বাসনা তাহার মনকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে। এই বাসনাই তাহাকে ইবাদতে বা উপাসনায় প্রণত করিয়া দেয়, (৩) অবশেষে, যখন বিশ্বাসী ব্যক্তি তাহার সৃষ্টিকর্তার সাথে জীবন্ত সম্পর্ক স্থাপনে কৃতকার্য হয়, তখন সে নিজের মধ্যে মানব-সেবার এক বিশেষ অনুপ্রেরণা অনুভব করে।

وَالَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَمَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ وَبِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ ؕ﴿۵﴾

৫
এবং যাহারা ঈমান আনে উহার উপর যাহা তোমার২৩ প্রতি নাযেল (অবতীর্ণ) করা হইয়াছে এবং যাহা তোমার২৪ পূর্বে নাযেল করা হইয়াছিল, এবং তাহারা পরকালের২৫ উপর দৃঢ় বিশ্বাস রাখে।
২৩। আল্লাহ্‌তা’লা কর্তৃক প্রেরিত সকল নবীর প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের কেন্দ্রস্থল রূপে মহানবী হযরত মুহাম্মদ মুস্তাফা (সাঃ)-এর উপর বিশ্বাস স্থাপন প্রয়োজন (২ঃ২৮৬, ৪ঃ৬৬, ৪ঃ১৩৭)।
২৪। ইসলাম ইহার অনুসারীদের উপর এই বিশ্বাসও অপরিহার্য রাখিয়াছে যে, পূর্বেও আল্লাহ্‌র নবীগণ ঐশী শিক্ষা আনিয়াছিলেন, কেননা আল্লাহ্‌তা’লা সকল জাতির মধ্যেই তাঁহার রসূল প্রেরণ করিয়াছেন (১৩ঃ৮; ৩৫ঃ২৫)।
২৫। : ‘আল্ আখেরাত’ অর্থ (ক) শেষ আবাস অর্থাৎ পরকাল, (খ) ইহা দ্বারা রসূল পাক (সাঃ)-এর পরবর্তী সময়ে যেসব ওহী-ইলহাম বা ঐশী বাণী অবতীর্ণ হইবে সেইগুলিকেও বুঝায়। এই দ্বিতীয় অর্থটি কুরআনের ৬২ঃ৩,৪ আয়াতে আরও ব্যাখ্যা করা হইয়াছে, যেখানে কুরআন রসূলে পাক (সাঃ)-এর দ্বিতীয় বিকাশের সংবাদ দান করিয়াছে। তাঁহার প্রথম বিকাশ ঘটিয়াছিল খৃষ্টীয় সপ্তম শতাব্দীতে যখন তাঁহার কাছে কুরআন নাযিল হইয়াছিল। তাঁহার দ্বিতীয় বিকাশের কথা ছিল আখেরী যমানাতে তাঁহার একজন বিশিষ্ট অনুসারী প্রতিভূর মাধ্যমে। এই দ্বিতীয় বিকাশের ভষ্যিদ্বাণী পূর্ণ হইয়াছে প্রতিশ্রুত মসীহ্-মাহদীর মাধ্যমে।

اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۶﴾

৬
ইহারাই তাহাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে হেদায়াতের উপর প্রতিষ্ঠিত এবং ইহারাই সফলকাম হইবে।

اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۷﴾

৭
নিশ্চয় যাহারা অস্বীকার করিয়াছে — তাহাদিগকে তুমি সর্তক কর বা সতর্ক না কর, ইহা তাহাদের জন্য সমান— তাহারা ঈমান২৬  আনিবে না।
২৬। এই আয়াতে ঐসব অবিশ্বাসীদের কথা বলা হইয়াছে, যাহারা সত্যের প্রতি সম্পূর্ণ উদাসীন; এমনকি এই ব্যাপারে তাহারা সম্পূর্ণ বেপরওয়া। তাহাদিগকে সাবধান করা আর না করা সমান কথা। ইহাদের সম্বন্ধে ইহাই বলা হইতেছে যে, যতদিন পর্যন্ত তাহারা এই বর্তমান অবস্থায় থাকিবে, তাহারা বিশ্বাস আনয়ন করিবে না।

خَتَمَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ وَعَلٰی سَمۡعِہِمۡ ؕ وَعَلٰۤی اَبۡصَارِہِمۡ غِشَاوَۃٌ ۫ وَّلَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ﴿٪۸﴾

৮
আল্লাহ্ তাহাদের হৃদয় সমূহের উপর এবং কর্ণ সমূহের উপর মোহর২৭ মারিয়া দিয়াছেন এবং তাহাদের চক্ষুর উপর রহিয়াছে পর্দা এবং তাহাদের জন্য রহিয়াছে এক মহা আযাব।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ১
২৭। যে সকল অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ বহুদিন অব্যবহৃত অবস্থায় থাকে, সেগুলি শুকাইয়া ক্ষীণ ও অকর্মণ্য হইয়া যায়। এই স্থলে উল্লেখকৃত অবিশ্বাসীদের অবস্থা এমনই যে, তাহারা সত্যকে উপলব্ধির জন্য তাহাদের হৃদয় কিংবা কর্ণকে ব্যবহার করে না। কাজেই তাহাদের বুঝিবার ও শুনিবার শক্তি তাহারা হারাইয়া ফেলে। ‘আল্লাহ্ তাহাদের হৃদয়ে ও কর্ণে মোহর মরিয়া দিয়াছেন’ বাক্যটি ঐ সকল ব্যক্তির প্রতি আরোপ করা হইয়াছে যাহারা ইচ্ছা করিয়াই উদাসীনতা দেখাইতে তৎপর রহিয়াছে, তাহাদের উদাসীনতার ফলে তাহাদের ইন্দ্রিয়সমূহে বৈকল্য ও শিথিলতা ঘটিয়াছে। এই বিকলতা ও শিথিলতা ঘটাইবার কার্যটি আল্লাহ্‌র উপর আরোপ করা হইয়াছে। এখানে আল্লাহ্‌কে ‘কর্তৃকারকে’ দেখানো হইয়াছে, কারণ প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুন আল্লাহ্‌র কাছ হইতেই আগত এবং তাঁহারই ইচ্ছায় প্রতিটি কার্যকারণ প্রাকৃতিক প্রক্রিয়ানুযায়ী সম্পাদিত হয়।

وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَمَا ہُمۡ بِمُؤۡمِنِیۡنَ ۘ﴿۹﴾

৯
এবং মানুষের মধ্যে কতক এমনও আছে, যাহারা বলে, ‘আমরা আল্লাহ্‌ এবং পরকালের উপর ঈমান রাখি’, অথচ তাহারা আদৌ মো’মেন২৮ নহে।
২৮। এখানে আল্লাহ্‌র প্রতি ও কিয়ামতের দিনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের উল্লেখ করা হইয়াছে। ইসলামের অন্যান্য মৌলিক বিশ্বাস্য বিষয়গুলির উল্লেখ করা হয় নাই। ইহার কারণ এই যে, আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাস ও শেষ দিনের প্রতি বিশ্বাস যথাক্রমে ইসলামী বিশ্বাসের প্রথম ও শেষ ধাপ এবং এই দুইটি বিষয়ে বিশ্বাস স্থাপন দ্বারা প্রকৃতপক্ষে অন্যান্য বিশ্বাসগুলিও অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়। কেননা কুরআনেরই অন্যত্র বলা হইয়াছে, কিয়ামতের দিনের প্রতি বিশ্বাস স্থাপনের মাঝেই পরোক্ষভাবে ফিরিশ্‌তাগণের প্রতি ও ঐশী পুস্তকাদির প্রতি বিশ্বাস প্রকাশ পায় (৬ঃ ৯৩)।

یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۚ وَمَا یَخۡدَعُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡفُسَہُمۡ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ ؕ﴿۱۰﴾

১০
তাহারা আল্লাহ্‌কে এবং যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহাদিগকে ধোকা২৯ দিতে চাহে, কিন্তু তাহারা নিজেদেরকে ছাড়া অন্য কাহাকেও ধোকা দেয় না, বস্তুতঃ তাহারা ইহা বুঝে না।
২৯। ‘খা-দায়াহু’ মানে, সে তাহাকে প্রতারণা করিতে চাহিল, কিন্তু পারিল না। ‘খাদায়াহু’ মানে সে চেষ্টা দ্বারা তাহাকে ঠকাইয়া ফেলিল, সে তাহাকে পরিত্যাগ করিল (বাকা)। প্রথম শব্দটি প্রতারকের অকৃতকার্যতা এবং দ্বিতীয় শব্দটি প্রতারকের কৃতকার্যতার ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় (লেইন)।