২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

یَکَادُ الۡبَرۡقُ یَخۡطَفُ اَبۡصَارَہُمۡ ؕ کُلَّمَاۤ اَضَآءَ لَہُمۡ مَّشَوۡا فِیۡہِ ٭ۙ وَاِذَاۤ اَظۡلَمَ عَلَیۡہِمۡ قَامُوۡا ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَذَہَبَ بِسَمۡعِہِمۡ وَاَبۡصَارِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿٪۲۱﴾

২১
বিদ্যুৎ-চমক তাহাদের দৃষ্টি শক্তিকে কাড়িয়া লইয়া যাওয়ার উপক্রম হয়; যখনই উহা তাহাদের উপর চমকায়, তখন তাহারা উহার আলোকে চলিতে থাকে, এবং যখন অন্ধকার তাহাদিগকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলে তখন তাহারা দাঁড়াইয়া পড়ে, এবং যদি আল্লাহ্‌ চাহিতেন তাহা হইলে তিনি তাহাদের শ্রবণ শক্তি এবং দৃষ্টি শক্তিকে৪১ বিনষ্ট করিয়া দিতেন, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ প্রত্যেক বিষয়ে৪১-ক (যাহা তিনি চাহেন) সর্বশক্তিমান।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ২
৪১। দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী মোনাফেকরা তাহাদের দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারাইয়া ফেলিয়াছে। তাহারা এখনও সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারায় নাই। তবে যদি তাহারা বার বার এমন অবস্থায় পতিত হয়, যেখানে সাহস ও আত্মত্যাগ প্রয়োজন, যেমন বিজলী ও বজ্রপাতের সময়ে বাহিরে যাইতে হইলে সাহস ও ত্যাগের মনোভাব থাকা দরকার, সেইরূপ অবস্থার সম্মুখীন হইলে, ইহারা নিজেদের দৃষ্টিশক্তি (ঈমান) কে সম্ভবতঃ হারাইয়াই ফেলিবে। কিন্তু আল্লাহ্‌র বিধান এমনই যে, সকল বিজলী-চম্‌কানীর সাথেই বজ্রপাত হয় না। প্রায় সময়েই দেখা যায়, বিজলীর আলোর চমক অন্ধকারের পর্দা সরাইয়া দিয়া, পথিককে পথ চলিতে সাহায্য করে। যখন ইসলাম বিজয় ও উন্নতির দিকে যায়, তখন এই মোনাফেকরা মুসলমানদের দলে ভীড়ে। কিন্তু যখন বিজলীর আলোর সাথে বজ্রপাতও নামে অর্থাৎ যখন অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, ধন, প্রাণ ও সম্পদ বিলাইবার সময় উপস্থিত হয়, তখন তাহারা চোখে সবই অন্ধকার দেখে, তাহারা হতভম্ব হইয়া দাঁড়াইয়া যায় এবং বিশ্বাসীদের সাথে চলিতে অস্বীকৃতি জানায়।
৪১-ক। ‘শাঈ’ অর্থ ঈপ্সিত বস্তু বা বিষয়।

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اعۡبُدُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ وَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ﴿ۙ۲۲﴾

২২
হে মানব মণ্ডলী!৪২ তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালকের ইবাদত কর, যিনি তোমাদিগকে এবং তোমাদের পূর্ববর্তীগণকে সৃষ্টি করিয়াছেন, যেন তোমরা তাক্‌ওয়া অবলম্বন করিতে পার;
৪২। এই আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশই কুরআনে প্রদত্ত অনুশাসনগুলির মধ্যে প্রথম। এই অনুশাসন কেবল আরবদের জন্য নহে। বরং সারা মানবজাতির উপর ইহা প্রযোজ্য। কেননা, ‘ইয়া আইয়ুহান্নাসু’ বলিয়া বিশ্ব-মানবের প্রতি এই নির্দেশ পালনের আহবান জানানো হইয়াছে। ইহা দ্বারা বুঝা যায় ইসলাম প্রথম হইতেই বিশ্বধর্ম হইবার দাবী করিয়াছে। গোত্রীয় বা ভৌগলিকগত ধর্মের আদেশকে উচ্ছেদ করিয়া ইসলাম প্রারম্ভিক পর্যায়ই বিশ্বমানবতার একত্ব ও ভ্রাতৃত্বকে সমুন্নত করার ধর্ম হিসাবে আত্মপ্রকাশ করে।

الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ فِرَاشًا وَّالسَّمَآءَ بِنَآءً ۪ وَّاَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخۡرَجَ بِہٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزۡقًا لَّکُمۡ ۚ فَلَا تَجۡعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا وَّاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
যিনি পৃথিবীকে তোমাদের জন্য শয্যা এবং আকাশকে ছাদ৪৩ স্বরূপ করিয়াছেন, এবং মেঘমালা হইতে পানি বর্ষণ করিয়াছেন এবং তদ্বারা তিনি তোমাদের জন্য রিয্‌ক স্বরূপ নানাবিধ ফল-ফলাদি উৎপন্ন করিয়াছেন, অতএব তোমরা আল্লাহ্‌র সমকক্ষ দাঁড় করিও না, এমতাবস্থায় যে তোমরা জ্ঞাত আছ।
৪৩। এই বক্তব্যটি আমাদিগকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে, একটি ছাদ বা দালান যেমন ইহার নীচে বা ইহার ছায়াতলে বসবাসকারীর নিরাপত্তা বিধান করে, তেমনি নিখিল বিশ্বের বিভিন্ন দূরবর্তী অংশগুলিও আমাদের পৃথিবী নামীয় গ্রহটির নিরাপত্তা বিধান করিয়া থাকে। যাহারা আকাশমালা, তারকারাজি, মেঘ-বৃষ্টি ইত্যাদি অন্যান্য আকাশমণ্ডলের দৃশ্য ও ঘটনাবলীর বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ করেন, তাহারা জানেন যে, পৃথিবী হইতে অনেক বড় বড় বস্তু পৃথিবীর উপরে সবদিকে থাকিয়া, নিজ নিজ কক্ষপথে নিঃসীম শূন্যে ভাসমান অবস্থায় রহিয়া, পৃথিবীর স্থিতি ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করিতেছে। এখানে ইশারা দেওয়া হইয়াছে যে, এই বস্তুজগতের পূর্ণতা ও সার্থকতা নির্ভর করে, পার্থিব ও স্বর্গীয় উভয় ধরণের শক্তির সমন্বয় সাধনের উপর।

وَاِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ۪ وَادۡعُوۡا شُہَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
এবং যদি তোমরা উহার সম্বন্ধে সন্দেহে থাক যাহা আমরা আমাদের বান্দার উপর নাযেল করিয়াছি তাহা হইলে তোমরা ইহার অনুরূপ একটি সুরা উপস্থাপন কর এবং আল্লাহ্ ব্যতীত তোমাদের অন্যান্য সাহায্যকারীকে আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।৪৪
৪৪। কুরআনের অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যের কথা, কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি স্থানে বর্ণিত হইয়াছে, যথাঃ ২ঃ২৪ ; ১০ঃ৩৯; ১১ঃ১৪ ; ১৭ঃ৪৯; ৫২ঃ৩৪-৩৫। এই পাঁচটির মধ্যে দুইটি স্থানে (২ঃ২৪ এবং ১০ঃ৩৯) একই ধরণের চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে। অন্য তিনটি স্থানে তিনটি ভিন্ন প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ দিয়া, অবিশ্বাসীগণকে মোকাবেলার আহবান জানানো হইয়াছে। চ্যালেঞ্জের ধরণের মধ্যে এই যে বিভিন্নতা, তাহা আপাতদৃষ্টিতে সামঞ্জস্যহীন মনে হইতে পারে; কিন্তু তাহা নহে। প্রকৃত পক্ষে, চ্যালেঞ্জের আয়াতগুলিতে এমন কতকগুলি দাবী আছে, যেগুলি চিরস্থায়ী। তাই হযরত রসূলে পাক (সাঃ)-এর সময়ে যেমন বিভিন্ন আকারে এই চ্যালেঞ্জগুলি বলবৎ ছিল, তেমনি আজও সেইগুলি সমভাবেই বলবৎ রহিয়াছে। চ্যালেঞ্জগুলির বিভিন্ন ধরণকে ব্যাখ্যা করার পূর্বে, ইহা জানাইয়া দেওয়া প্রয়োজন যে, কুরআনের যে সব স্থলে এই মোকাবেলার আহবান (চ্যালেঞ্জ) জানানো হইয়াছে, সেই সেই স্থলে সঙ্গে সঙ্গে ধন-দৌলত ও শক্তি মত্তার উল্লেখ রহিয়াছে। তবে, এই আয়াতটিতে এর ব্যতিক্রম রহিয়াছে, কেননা এই আয়াতটি ১০ঃ৩৯ আয়াতের পুনরুল্লেখ মাত্র। ইহা হইতে একটি সিদ্ধান্তে সহজেই উপনীত হওয়া যায় যে, ধন-দৌলত ও ক্ষমতার সাথে, কুরআনের অনুরূপ কিংবা ইহার অংশ বিশেষের অনুরূপ আয়াতাদি রচনার চ্যালেঞ্জের মধ্যে, কোন না কোনভাবে, একটা যোগসূত্র রহিয়াছে। যোগসূত্রটি এই কথার মধ্যে রহিয়াছে যে, কুরআনকে অমুসলমানদের কাছে অমূল্য ধন রূপে তুলিয়া ধরা হইয়াছে। অবিশ্বাসীরা মহানবী (সাঃ)-এর কাছে ধন-দৌলত ও অর্থ সম্পদাদি দাবী করিত (১১ঃ১৩), ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে যে, তিনি (সাঃ) কুরআনের আকারে যে মহাসম্পদ লাভ করিয়াছেন তাহা তুলনা বিহীন। তাহারা এই প্রশ্নও উত্থাপন করিত যে, রসূলে পাক (সাঃ)-এর কাছে কোনও ফিরিশ্‌তা আসে না কেন (১১ঃ১৩)? ইহার উত্তরে বলা হইয়াছে যে ফিরিশ্‌তা নিশ্চয় রসূলেপাক (সাঃ)-এর কাছে আসিয়াছেন এবং তাহারা তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য স্বরূপ তাঁহার (সাঃ) কাছে আল্লাহ্‌র বাণীও পৌঁছাইয়া দিতেছেন। এইভাবে, অবিশ্বাসীদের দাবী ‘ধন-সম্পদ আন ও ফিরিশ্‌তা দেখাও’—এই দুইটি দাবীরই উত্তর কুরআনে একসাথে দেওয়া হইয়াছে যে, কুরআনই ফিরিশ্‌তার মাধ্যমে আনীত অতুলনীয় ধন, যাহার অনতিক্রমনীয় শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবেলা করা কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়। এখন চ্যালেঞ্জ-সম্বলিত বিভিন্ন আয়াতগুলি পৃথক পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা যাউক। সবচেয়ে বড় দাবী করা হইয়াছে ১৭ঃ৮৯ আয়াতে, যেখানে অবিশ্বাসীগণকে সারা কুরআনের অনুরূপ সর্বগুণসম্পন্ন একখানা কিতাব রচনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে। এই চ্যালেঞ্জে তাহাদিগকে বলা হয় নাই যে, তাহাদের কিতাবকে আল্লাহ্‌র বাণী রূপে উপস্থাপন করিতে হইবে। তাহাদের নিজের লিখা কিতাব হিসাবে ইহা উপস্থাপন করিয়া ঘোষণা করিতে হইবে যে, ইহা কুরআনের সমকক্ষ বা কুরআন হইতে উত্তম। কিন্তু যেহেতু, সম্পূর্ণ কুরআন তখনও অবতীর্ণ হয় নাই, অতএব, সমস্ত কুরআনের মোকাবিলা করার প্রশ্ন তাৎক্ষণিক ছিল না, বরং এই চ্যালেঞ্জের মধ্যে একটি ভবিষ্যদ্বাণী এইভাবে অন্তর্নিহিত রহিয়াছে যে, অবিশ্বাসীরা কস্মিন কালেও কুরআনের সমকক্ষ কোন কিতাব রচনা করিতে সক্ষম হইবে না। অসম্পূর্ণ অবস্থায় কুরআন উক্ত চ্যালেঞ্জের সময় যতটুকু ছিল, ততটুকুরও না এবং সম্পূর্ণ হইবার পর যতটুকু হইল, ততটুকুরও না। এই চ্যালেঞ্জ শুধু রসূলে পাক (সাঃ) এর জীবদ্দশায় যেসব অবিশ্বাসী ছিল, তাহাদের জন্যই সীমাবদ্ধ নহে বরং অনাগত ভবিষ্যতের অবিশ্বাসী, সংশয়বাদী ও সমালোচকদের সকলের জন্যই ইহা প্রকাশ্য চ্যালঞ্জ হিসাবে বিদ্যমান রহিয়াছে। ১১নং সূরার ১৪ আয়াতে দশটি সূরার সমকক্ষতা করার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে, ইহার কারণ এই যে, অবিশ্বাসীরা তখন সমস্ত কুরআনের উপর আপত্তি উত্থাপন না করিয়া, কয়েকটি অংশ বিশেষের সমালোচনা করিয়া আপত্তি জানাইয়াছিল। তাই এই ক্ষেত্রে তাহাদিগকে সমস্ত কুরআন মোকাবিলার আহ্বান না জানাইয়া, দশটি সূরা রচনা করিবার আহ্বান করা হইল যাহা তাহাদের অনুমিত দোষ-যুক্ত কুরআনী অংশগুলির সমকক্ষতায় টিকিতে পারিবে। এখানে উল্লেখ করা প্রয়োজন, ১৭ঃ৮৯ তে সমস্ত কুরআনকে একটি পরিপূর্ণ ত্রুটি বিচ্যুতিহীন কিতাব বলিয়া দাবী করা হইয়াছে, অতএব, সেখানে সমস্ত কুরআনের মোকাবিলায় উহারই মত সর্বাংশে সমকক্ষ কিতাব আনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে। কিন্তু ১১ঃ১৪ তে যে চ্যালেঞ্জ আছে, তাহার মূল কারণ ছিল অবিশ্বাসীদের এই দাবী যে, কুরআনের স্থানে স্থানে ভুল-ভ্রান্তি ও দোষ-ত্রুটি বিদ্যমান; সমস্ত কুরআনেই দোষ-ত্রুটি রহিয়াছে বলিয়া তাহারা এই ক্ষেত্রে দাবী করে নাই। অতএব, তাহাদিগকে চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইল, তাহারা যে কোন দশটি সূরা যাহা ত্রুটিপূর্ণ বলিয়া তাহারা মনে করে, তাহারই সমকক্ষতা করিয়া যেন দেখাইয়া দেয়। দশম সূরার ৩৯ আয়াতে অবিশ্বাসীদিগকে কুরআনের যে কোন একটি মাত্র সূরার মোকাবিলা করিতে বলা হইয়াছে। ইহার কারণ এই যে, উপরে উল্লেখিত সূরার দুই আয়াতের মত, এখানে অবিশ্বাসীদের কোন অনুযোগের প্রেক্ষিত অনুপস্থিত ; এখানে কুরআন নিজের পরিপূর্ণতার দাবী নিজের তরফ হইতেই উত্থাপন করিতেছে, অবিশ্বাসীদের অনুযোগে বা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। দশম সূরার ৩৮ আয়াতে কুরআন দাবী করিয়াছে যে, ইহার (কুরআনের) পাঁচটি অতিশয় উচ্চ স্তরের গুণ রহিয়াছে। এই দাবীর সমর্থনে পরবর্তী; (৩৯ আয়াতে), অস্বীকারকারী সংশয়বাদীগণকে চ্যালেঞ্জ করা হইয়াছে তাহারা যেন ঐ পাঁচটি গুণ-সম্বলিত (দশম সূরার মত) একটি সূরাই রচনা করিয়া জন-সমক্ষে হাযির করে। আলোচ্য আয়াতে (২ঃ২৪) পঞ্চম বারের মত চ্যালেঞ্জ দেওয়া হইয়াছে। এখানেও দশম সূরার ৩৯ আয়াতের মতই, অবিশ্বাসীগণকে চ্যালেঞ্জ করা হইয়াছে কোনও সূরার মত একটি সূরা তৈরী করিয়া আনিতে। এই চ্যালেঞ্জের পূর্বের আয়াতে এই দাবী করা হইয়াছে যে, ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিগণকে কুরআন পথ দেখাইয়া ও পথে চালাইয়া নিয়া আধ্যাত্মিকতার উচ্চমার্গে পৌঁছাইয়া দেয়। অবিশ্বাসীগণকে বলা হইতেছে যে, তাহারা যদি কুরআনকে ঐশী বাণী বলিয়া বিশ্বাস না করে, তাহা হইলে যে কোন একটি সূরার সমকক্ষ সূরা তাহারা রচনা করিয়া দেখাইয়া দেউক যাহা পাঠক বা অনুসারীর মনকে সমভাবে আধ্যাত্মিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত করিতে পারে। উপরোক্ত ব্যাখ্যা হইতে বুঝা যায়, এই চ্যালেঞ্জগুলির একটি অপরটি হইতে পৃথক ; কোনটিই পরস্পরবিরোধী নহে। প্রত্যেকটি চ্যালেঞ্জ স্বকীয় স্থানে বলবৎ রহিয়াছে এবং চিরকালের জন্য বলবৎ থাকিবে। যেহেতু কুরআন পবিত্রতম ও উচ্চাঙ্গীন ভাবধারার বাহক, সেই কারণে ইহার রচনাশৈলী ও সাহিত্যিক গুণাবলী সর্বোচ্চ স্তরের হওয়া অপরিহার্য ছিল, যাহাতে বিষয়-বস্তু ও ভাবধারার স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা কোনদিক দিয়া ম্লান না হয় এবং কুরআনের বিমল ও পরিপূর্ণ সৌন্দর্য ব্যাহত ও ক্ষুন্ন না হয়। তাই অবিশ্বাসীগণকে কুরআনের মত বা কুরআনের সমকক্ষ কিতাব রচনার চ্যালেঞ্জ যে আকারেই দেওয়া হউক না কেন, বিষয়-বস্তু, আদর্শ ও ভাবধারা এবং রচনা-শৈলী ও প্রকাশ-ভঙ্গি ইত্যাদি সব কিছুই এই চ্যালেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হইয়া রহিয়াছে।

فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا وَلَنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیۡ وَقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتۡ لِلۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
কিন্তু যদি তোমরা এইরূপ করিতে না পার— এবং তোমরা কখনও এইরূপ করিতে পারিবে না— তাহা হইলে সেই অগ্নি হইতে আত্মরক্ষা কর, যাহার ইন্ধন৪৫ মানুষ৪৬ এবং প্রস্তরসমূহ, যাহা কাফেরদের জন্য প্রস্তুত করা হইয়াছে।
৪৫। ‘ইন্ধন’ শব্দটি এখানে রূপকভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে, পৌত্তলিকতাকে এখানে দোযখের শাস্তির মূল কারণ বলা হইয়াছে। মূর্তিকে ও মূর্তিপূজাকে দোযখের আগুনের ইন্ধন বলা হইয়াছে। প্রস্তর মূর্তিগুলি যাহাকে পৌত্তলিকরা উপাস্য রূপে পূজা করে, ইহারাও দোযখের ইন্ধন। এদের উপাসকগণ ঘৃণা ও লাঞ্ছনার আগুনে পুড়িবে, যখন তাহারা দেখিবে যে, তাহাদের উপাস্য মূর্তিগুলিও দোযখের ইন্ধন রূপে জ্বলিতেছে।
৪৬। ‘আন্নাসু’ (মানুষ) ও ‘আল্‌-হিজরাতু’ (প্রস্তরগুলি) বলিতে দুই ধরণের দোযখবাসীকে বুঝাইতে পারে। “আন্নাসু’ বলিতে ঐ সকল অবিশ্বাসীদিগকে বুঝাইতে পারে যাহাদের মনে আল্লাহ্‌র প্রতি কিছু ভালবাসা আছে এবং ‘আল্-হিজরাতু’ বলিতে ঐসকল অবিশ্বাসীদিগকে বুঝাইতে পারে, যাহাদের মনে আল্লাহ্‌র প্রতি ভালবাসা মোটেই অবশিষ্ট নাই। তাহারা পাথর হইতে কোনও অংশে উৎকৃষ্ট নহে। শব্দটি ‘হাজর’-এর বহুবচন যাহার অর্থ প্রস্তর, পাথরের টিলা, সোনা, বড়লোক ও নেতা (লেইন)।

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ کُلَّمَا رُزِقُوۡا مِنۡہَا مِنۡ ثَمَرَۃٍ رِّزۡقًا ۙ قَالُوۡا ہٰذَا الَّذِیۡ رُزِقۡنَا مِنۡ قَبۡلُ ۙ وَاُتُوۡا بِہٖ مُتَشَابِہًا ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ٭ۙ وَّہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
এবং তুমি সুসংবাদ দাও তাহাদিগকে যাহারা ঈমান আনে এবং নেক আমল (সৎকর্ম) করে যে, নিশ্চয় তাহাদের জন্য এমন বাগানসমূহ আছে যাহার তলদেশ দিয়া নহর (স্রোতস্বিনী) সমূহ প্রবাহিত থাকিবে, যখনই উহা হইতে তাহাদিগকে রিয্‌কস্বরূপ ফল-ফলাদির কিছু দেওয়া হইবে, তাহারা বলিবে, ‘ইহাতো সেই রিয্‌ক যাহা আমাদিগকে ইহার পূর্বে দেওয়া হইয়াছিল,’ এবং তাহাদিগকে উহার অনুরূপও দেওয়া হইবে, এবং তাহাদের জন্য সেখানে পবিত্র জোড়া সমূহ৪৬-ক থাকিবে এবং তথায় তাহারা চিরকাল৪৭ বাস করিবে।
৪৬-ক। কুরআন এইকথা শিক্ষা দেয় যে, প্রত্যেক সৃষ্ট বস্তুর স্বীয় পূর্ণতা ও উন্নতির জন্য জীবন-সঙ্গী বা জোড়া-সাথীর প্রয়োজন। বেহেশ্‌তে ধর্মপরায়ণ পুরুষ ও স্ত্রীলোক আপন আপন আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন ও সুখানুভূতির পূর্ণতার জন্য পবিত্র সঙ্গী লাভ করিবে। এই সঙ্গী বা সঙ্গিণী কি ধরণের হইবে, তাহা পরলোকে ছাড়া, ইহলোকে জানা বা বুঝা সম্ভব নহে।
৪৭। এই আয়াতে বিশ্বাসীদের পারলৌকিক পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হইয়াছে। ইসলামের সমালোচকেরা এই বিবরণের প্রতি আপত্তির ঝড় তুলিয়াছেন। বেহেশ্‌ত সম্বন্ধে ইসলামের ধারণা ও শিক্ষা কি তাহা না জানা ও সঠিকভাবে না বুঝার কারণেই এইসব অসমীচীন সমালোচনার উদ্ভব হইয়াছে। কুরআন অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করিতেছে যে, ঐগুলির (বেহেশ্‌তী পুরস্কারসমূহের) প্রকৃতি জানা বা কল্পনা করা মানব-মনের পক্ষে সম্ভব নহে (৩২ঃ১৮)। রসূলে পাক (সাঃ) বলিয়াছেন, ‘কোনও চক্ষু ইহাদিগকে (বেহেশতী পুরস্কারসমূহকে) দেখে নাই, কোনও কর্ণ ইহাদের সঠিক বর্ণনা শুনে নাই, কোন মনও ইহাদের ধারণা করিতে পারে নাই’ (বুখারী)। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহা হইলে, ইহজগতের বস্তুর নামে বেহেশ্‌তের আশিসসমূহকে অভিহিত করার সার্থকতা কি? ইহার জবাব এই যে, কুরআন কেবলমাত্র উচ্চস্তরের বুদ্ধিদীপ্তদের জন্যই নহে বরং সর্বসাধারণের জন্যও। তাই এমন সরল-সহজ ভাষা ব্যবহার করা হইয়াছে, যাহা সকলেই বুঝে। বেহেশ্‌তের আশিসসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে, কুরআন ঐসকল পার্থিব জিনিষগুলিরই নাম ব্যবহার করিয়াছে যেগুলিকে মানুষ সাধারণতঃ ভাল বলিয়া জানে ও পসন্দ করে এবং বিশ্বাসীগণকে বলা হইয়াছে যে, এই সব ভাল জিনিষগুলি তাহারা আরও উৎকৃষ্টতর আকারে বেহেশ্‌তে প্রাপ্ত হইবে। এই আবশ্যকীয় তুলনামূলক চিত্র দিবার জন্যই, ভাল-ভাল জানা জিনিষের নাম ও সুপরিচিত শব্দ ব্যবহার করা হইয়াছে। নতুবা ইহজগতের সুখ ও আনন্দ এবং পরজগতের আশিসসমূহের মধ্যে কোন মিল নাই, ইহাদের উভয়ে মোটেই একজাতীয় বা এক ধরণের নহে। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী পরকাল কেবলমাত্র একটা মানসিক বা আধ্যাত্মিক অবস্থার নাম নহে। পরকালেও মানবাত্মা এক প্রকারের দেহ প্রাপ্ত হইবে, তবে ঐ দেহ স্থূল বস্তু হইবে না। স্বপ্নে দৃষ্ট দৃশ্যাবলীর উদাহরণ হইতে বিষয়টা কতক পরিমাণে আঁচ করা যাইতে পারে। স্বপ্নে মানুষ যাহা দেখে, তাহা যে কেবলমাত্র মানসিক বা আধ্যাত্মিক, এ কথা বলা যায় না। কেননা, স্বপ্নাবস্থায়ও তাহার দেহ থাকে, সে নিজেকে স্রোতস্বিনী-বিধৌত মনোরম বাগানে ভ্রমণরত অবস্থায় দেখে এবং সেখানে ফলমূল ও দুগ্ধ পান করিতে দেখে। একথা বলা কঠিন যে, স্বপ্নের বিষয়বস্তু শুধু মানসিক অবস্থা বিশেষ। স্বপ্নে দুগ্ধ পানের তৃপ্তি নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা, তাহা সত্বেও কেহই বলিবে না যে, ইহা এই জগতে প্রাপ্ত দুধ যাহা সে পান করিয়াছে। আল্লাহ্‌তা’লার যে সকল দান আমরা ইহকালে উপভোগ করিয়া থাকি, পরকালের আশীর্বাদসমূহ সেইগুলিরই মনস্তাত্বিক রূপায়ণ বলা ঠিক হইবে না। বরং এই জগতে যাহা আমরা পাই তাহা আল্লাহ্‌তা’লার সত্যিকার খাঁটি দান ও আশীর্বাদসমূহের নমুনা স্বরূপ, আসলে সত্য-সত্য দান সমূহের প্রাপ্তিস্থান হইল পরকাল। অধিকন্তু বাগান সমূহ বলিতে বুঝায় বিশ্বাস এবং ‘স্রোতস্বিনী’ বলিতে বুঝায় কর্ম সমূহ। বাগান টিকিতে পারে না ও ফলফুল সুশোভিত হইতে পারে না যদি সেখানে স্রোতস্বিনী তথা পানির ব্যবস্থা না থাকে। তেমনি বিশ্বাস ফলপ্রসূ হইতে পারে না যদি সৎ কর্মের দ্বারা ইহাকে সুদৃঢ় করা না হয়। অতএব, বিশ্বাস ও সৎ কর্ম অঙ্গাঙ্গীভাবে জড়িত। পরিত্রাণের জন্য উভয়ের একত্রে সমাবেশ অত্যাবশ্যক। পরকালে, বাগানগুলি বিশ্বাসীদিগকে তাহাদের ইহলৌকিক বিশ্বাসের কথা স্মরণ করাইয়া দিবে এবং স্রোতস্বিনী গুলি তাহাদের ইহকালীন সৎকর্মসমূহকে স্মরণ করাইয়া দিবে। তাহারা তখন সুস্পষ্ট ভাবে বুঝিতে পারিবে, তাহাদের বিশ্বাস ও সৎকর্ম বৃথা যায় নাই। ইহা আমাদিগকে পূর্বেও দেওয়া হইয়াছিল মো’মেনের এই উক্তি হইতে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ঠিক হইবে না যে, বেহেশ্‌তে তাহাদিগকে এইসব ফলই দেওয়া হইবে, যাহা তাহারা ইহকালে উপভোগ করিয়াছিল। কেননা, পূর্বেই ব্যাখ্যা করা হইয়াছে যে, এই দুই বস্তু এক নয়। প্রকৃত পক্ষে পরকালের ফলগুলি হইবে তাহাদের ইহকালীন বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি যখন তাহারা সেইগুলি খাইবে, তখন তাহারা সাথে সাথেই উপলব্ধি করিবে যে, এইগুলি তাহাদের ইহকালীন জীবনের বিশ্বাসের ফল মাত্র। তাই, তাহারা কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আনন্দাতিশয্যে বলিয়া উঠিবে ‘ইহা আমাদিগকে পূর্বেও দেওয়া হইয়াছিল।’ এই শব্দগুলির অর্থ ইহা হইতে পারে, ইহা দেওয়া হইবে বলিয়া আমাদের কাছে প্রতিশ্রুতি করা হইয়াছিল। পারস্পরিক সাদৃশ্যপূর্ণ বলিতে বুঝাইতেছে যে, ইহকালে অনুসৃত নীতি ও ধর্ম কর্ম এবং পরকালে প্রাপ্ত উহার প্রতিফল ও পুরস্কার, এই দুইয়ের মাঝে ঘনিষ্ঠ মিল থাকিবে। ইহকালের ইবাদত বা আরাধনা-উপাসনা পরকালে মো’মেনদের কাছে ফল-স্বরূপ উপস্থিত হইবে। একজন লোকের ইবাদতের মধ্যে যত বেশী সরলতা ও যথাযথ ভাব-গাম্ভীর্য থাকিবে, সেই অনুপাতে বেহেশ্‌তে তাহার ফলভোগের আনন্দও তত বেশী হইবে। এমনকি ফলের গুণাগুণের মধ্যেও আনুপাতিক হারে তারতম্য হইবে। তাই পরলোকে অধিক হইতে অধিক গুণসম্পন্ন ফল প্রাপ্তির জন্য ইহলোকে অধিক হইতে অধিক ধর্ম-কর্ম করিতে হইবে, ইহা করা মানুষের ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। এই আয়াতের আরেকটি তাৎপর্য এই যে, বেহেশ্‌তে যে আধ্যাত্মিক খাদ্য মানুষকে দেওয়া হইবে, তাহা প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী, তাহার আত্মিক স্তর ও অবস্থানুযায়ী হইবে, যাহাতে তাহার আত্মা উন্নতির এক স্তর হইতে অন্য স্তরে ক্রমাগত উন্নতি লাভ করিতে পারে। ‘তাহারা চিরকাল সেখানে থাকিবে’ বাক্য দ্বারা বুঝা যায়, বেহেশ্‌তে প্রবেশকারীরা ক্ষয়প্রাপ্ত বা লয়প্রাপ্ত হইবে না। মানুষ যখন খাদ্য-গ্রহণ বা খাদ্য হজম করিতে পারে না, কিংবা যখন কেহ তাহাকে হত্যা করে, তখনই সে মৃত্যু বরণ করে। কিন্তু বেহেশ্‌তী ব্যক্তি যেহেতু নিজের জন্য ঠিক ঠিক ও উপযোগী খাদ্য লাভ করিবে এবং যেহেতু পবিত্র ও শান্তিপ্রিয় বহু সঙ্গী সাথী লাভ করিবে, সেইজন্য ক্ষয় বা বিনাশ তাহার নাগাল পাইবে না। মো’মেনগণ বেহেশ্‌তে নিজের নিজের জোড়া স্বরূপ স্ত্রী বা স্বামী লাভ করিবে। একজন ভাল জীবন-সঙ্গী বা জীবন-সঙ্গিনী কতইনা শান্তি ও আনন্দের হইয়া থাকে! বিশ্বাসীরা ইহকালেও ভাল,পবিত্র স্বামী বা স্ত্রী পাইবার চেষ্টা করে। তাহারা পরলোকে তাহা পাইবেই। তথাপি এই কথা না বলিয়া উপায় নাই যে, এই আশীর্বাদ সমূহ শারীরিক ও বস্তুগত নহে। বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যার জন্য সূরা তূর, সূরা রাহমান ও সূরা ওয়াক্বিয়া দেখুন।

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَسۡتَحۡیٖۤ اَنۡ یَّضۡرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوۡضَۃً فَمَا فَوۡقَہَا ؕ فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فَیَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہُ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ۚ وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَیَقُوۡلُوۡنَ مَاذَاۤ اَرَادَ اللّٰہُ بِہٰذَا مَثَلًا ۘ یُضِلُّ بِہٖ کَثِیۡرًا ۙ وَّیَہۡدِیۡ بِہٖ کَثِیۡرًا ؕ وَمَا یُضِلُّ بِہٖۤ اِلَّا الۡفٰسِقِیۡنَ ﴿ۙ۲۷﴾

২৭
আল্লাহ্ কখনও মশা৪৮ অথবা উহা অপেক্ষা ক্ষুদ্রতর৪৮-ক (বস্তুরও) উপমা৪৮-খ দিতে কুণ্ঠা বোধ করেন না, অতএব যাহারা ঈমান আনিয়াছে তাহারা জানে যে, ইহা তাহাদের প্রভুর নিকট হইতে সত্য, কিন্তু যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা বলে, ‘এইরূপ উপমা দিয়া আল্লাহ্ কি বুঝাইতে চাহেন?’ ইহার দ্বারা তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট৪৯ সাব্যস্ত করেন এবং অনেককে তিনি ইহার দ্বারা হেদায়াত দান করেন, বস্তুতঃ তিনি ইহার দ্বারা দুষ্কৃতিপরায়ণদের ব্যতিরেকে অন্য কাহাকেও পথভ্রষ্ট করেন না;
৪৮। আল্লাহ্‌তা’লা কুরআনে বেহেশ্‌ত ও দোযখের রূপক ও আলঙ্কারিক উপমাসূচক বর্ণনা দিয়াছেন। রূপক বর্ণনা ও আলঙ্কারিক উপমা গভীর অর্থ-বোধক হইয়া থাকে। বিশেষতঃ আধ্যাত্মিক বিষয়াবলীতে শাব্দিক ও আক্ষরিক ভাবে যে সব গভীর তত্ত্ব প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকে, সেই সব ক্ষেত্রে ভাব প্রকাশের জন্য রূপক, উপমা ও আলঙ্কারিক ভাষা ব্যবহারই বোধ হয় একমাত্র পন্থা। শব্দের মাধ্যমে বেহেশ্‌তের বর্ণনা দেওয়া আর একটি মশা-মাছি দ্বারা হাতীর বর্ণনা দেওয়া সমান কথা। তবুও তুচ্ছপ্রাণীটির তুলনা দ্বারা মনের মধ্যে আমরা একটি চিত্র লাভ করিয়া থাকি। মো’মেনগণ ভালভাবেই জানেন যে, এই শব্দগুলি আলঙ্কারিক ও রূপক এবং ইহাদের মাধ্যমে তাহারা অর্থের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করেন। কিন্তু অবিশ্বাসীরা ইহাদের (শব্দগুলির) মধ্যে কেবল দোষ-ত্রুটির সন্ধান করে,আর এই ছিদ্রান্বেষণের নেশায় তাহারা হেদায়াত প্রাপ্তি হইতে দূরে সরিয়া যায়।
৪৮-ক। ‘ফাউক’ অর্থ ‘উপরে’ ; ‘বড়’ এর সহিত ব্যবহারে অধিকতর বড় এবং ‘ছোট’ এর সহিত ব্যবহারে অধিকতর ছোট বুঝায়; অর্থটি প্রসঙ্গের উপরে নির্ভর করে (মুফ্‌রাদাত)।
৪৮-খ। ‘যারাবাল মাসালা’ অর্থ সে একটি উদাহরণ দিল, সে একটি বক্তব্য পেশ করিল, সে একটি উপদেশপূর্ণ রূপক গল্প বলিল (লেইন; তাজ; এবং ১৪ঃ৪৬)।
৪৯। আযাল্লাহু আল্লাহ্ অর্থ (১) আল্লাহ্ তাহাকে স্বীয় বিচারে ভ্রান্ত সাব্যস্ত করেন; (২) আল্লাহ্ তাহাকে পরিত্যাগ করেন, যার ফলে সে বিভ্রান্তিতে পতিত হয় (কাশ্‌শাফ); (৩) আল্লাহ্ তাহাকে ভ্রান্তিতে নিপতিত পাইলেন, ভ্রান্তিতে ছাড়িয়া দিলেন, ভ্রান্ত পথে যাইতে দিলেন (লেইন)।

الَّذِیۡنَ یَنۡقُضُوۡنَ عَہۡدَ اللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ مِیۡثَاقِہٖ ۪ وَیَقۡطَعُوۡنَ مَاۤ اَمَرَ اللّٰہُ بِہٖۤ اَنۡ یُّوۡصَلَ وَیُفۡسِدُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ﴿۲۸﴾

২৮
যাহারা আল্লাহ্‌র অঙ্গীকারকে উহা সুদৃঢ় করিবার পর ভঙ্গ করে এবং যেই সম্পর্ককে অটুট রাখিতে আল্লাহ্‌ আদেশ দিয়াছেন উহাকে ছিন্ন করে এবং পৃথিবীতে বিশৃংখলা সৃষ্টি করিয়া বেড়ায়, ইহারাই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।

کَیۡفَ تَکۡفُرُوۡنَ بِاللّٰہِ وَکُنۡتُمۡ اَمۡوَاتًا فَاَحۡیَاکُمۡ ۚ ثُمَّ یُمِیۡتُکُمۡ ثُمَّ یُحۡیِیۡکُمۡ ثُمَّ اِلَیۡہِ تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
তোমরা কিরূপে আল্লাহ্‌কে অস্বীকার করিতে পার? অথচ তোমরা প্রাণহীন৫০ ছিলে, অতঃপর তিনি তোমাদিগকে প্রাণ৫১ দান করিলেন, আবার তিনি তোমাদিগকে মৃত্যু দান করিবেন, অতঃপর তিনি তোমাদিগকে জীবিত৫২ করিবেন, অতঃপর তাহারই দিকে তোমাদিগকে ফিরাইয়া৫৩ লইয়া যাওয়া হইবে।
৫০। ‘আমওয়াত’ শব্দটি ‘মাইয়েত’ শব্দের বহুবচন যাহার অর্থ মৃত বা জীবনহীন। সেই হিসাবে, যে বস্তুর এখনও জীবনের স্ফুরণ ঘটে নাই এবং যে বস্তুর জীবন ছিল তবে এখন নাই, এই উভয় প্রকারের বস্তুকে মৃত বা জীবনহীন বলা হইয়া থাকে। মৃত নয় অথচ মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীতকেও মাইয়েত বলা হয় (লেইন)।
৫১। হায়াত অর্থ (১) বৃদ্ধিপ্রাপ্তি বা বর্ধন লাভের গুণ; (২) স্পর্শানুভূতি শক্তি; (৩) বোধ ও জ্ঞান শক্তি; (৪) দুঃখ-কষ্ট হইতে মুক্তি; (৫) পরকালের অনন্ত জীবন; (৬) সুযোগ পাওয়া অথবা লাভবান হওয়া অথবা ইহাদের উপায়; (৭) কর্ম সম্পাদন বা শক্তি প্রকাশের সামর্থ্য।
৫২। এই আয়াতটি একটা চরম সত্যের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তাহা এই যে, মানুষের জীবন, তাহার শরীরের ধ্বংস ও বিনাশের সাথে সাথে শেষ হইয়া যায় না। মানব-জীবন এত সম্ভাবনাময় এবং এত দায়িত্ব-কর্তব্য দ্বারা ভারাক্রান্ত যে, শরীরের ক্ষয় ও মৃত্যুর সাথে সাথে ইহা শেষ হইবার নয়। যদি জীবনের বড় ও মহান উদ্দেশ্য না-ই থাকিত, তাহা হইলে আল্লাহ্ তাহা সৃষ্টিই করিতেন না। আর যখন সৃষ্টি করিয়াছেন, তখন ইহার মৃত্যু ঘটাইতেন না, যদি পারলৌকিক জীবন না থাকিত। মৃত্যুই যদি সকল জীবনের অবসান হইত, তাহা হইলে, মানব সৃষ্টি প্রহসনে পরিণত হইত। মানব-সৃষ্টি হাসি তামাসা ও খেলার বস্তু হইলে, আল্লাহ্‌র প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার প্রতি কটাক্ষ করার অবকাশ থাকিয়া যাইত। আল্লাহ্‌ তা’লা যিনি সকল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার উৎস, তিনি এই বিশ্বের সব কিছু সৃষ্টি করিয়াছেন মানব-জীবনকে কেন্দ্র করিয়া। তাহা কি ষাট-সত্তর বৎসর জীবন ধারণের পর, পুনরায় মাটিতে বিলীন হইয়া যাইবার জন্যই ? নিশ্চয় নয়। তিনি তাহাকে উচ্চতর, পূর্ণতর, চিরস্থায়ী ও অমর জীবনের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন। ইহজীবনের শরীর-রূপী তাঁবুর মধ্যে থাকিয়া দায়-দায়িত্ব সম্পাদন করার পর যখন সে এই অস্থায়ী তাঁবুটি পরিত্যাগ করিবে, তখন সে স্থায়ী বসবাসের জন্য নিজের আসল ও চিরস্থায়ী আবাসে চলিয়া যাইবে।
৫৩। মৃত্যুর সাথে সাথেই মানুষের আত্মা বেহেশ্‌তে বা দোযখে চলিয়া যায় না। মধ্যবর্তী পর্যায়ে তাহার আত্মা ‘বরযখ’ নামক একটি অবস্থায় থাকে। এখানেও আত্মা ইহার ভাল-মন্দ কর্মের শুভাশুভ ফল সামান্য সামান্য ভোগ করিয়া থাকে। অতঃপর, পূণরুত্থান দিবস আসার পর পরই চুলচেরা বিচারের মাধ্যমে পূর্ণতম পুরস্কার ও শাস্তির চূড়ান্ত ফয়সলা ঘোষণা করা হইবে।

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ لَکُمۡ مَّا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ٭ ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ فَسَوّٰٮہُنَّ سَبۡعَ سَمٰوٰتٍ ؕ وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ﴿٪۳۰﴾

৩০
তিনিই তো পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করিয়াছেন; অতঃপর, তিনি আকাশের দিকে মনোনিবেশ৫৪ করিলেন এবং উহাকে সাত৫৫ আসমানে সুবিন্যস্ত৫৬ করিলেন, এবং তিনি সর্ব বিষয়ে৫৬-ক সর্বজ্ঞাত।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ৩
৫৪। ‘ইস্‌তাওয়া’ অর্থ সে দৃঢ় হইল বা দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হইল। ‘ইস্‌তাওয়া ইলাশ্ শাইয়ে’ অর্থ সে একটি বস্তুর প্রতি মনোযোগ দিল অথবা বস্তুটির দিকে ফিরিল (লেইন)।
৫৫। আরবীতে ‘সাত’ সংখ্যাটি ত্রুটিহীনতা ও সম্পূর্ণতার প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হইয়া থাকে। এই ‘সাত’ সংখ্যাটি, ‘সত্তর’ ও ‘সাতশত’ সংখ্যাগুলিরই মত, বহুসংখ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এই তিনটি শব্দই (সাত, সত্তর, সাতশত) কুরআনে ‘বহুসংখ্যক’ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে (৯ঃ৮০, ১৫ঃ৪৫)। অন্যস্থানে ‘সপ্তাকাশ’ এর স্থলে ব্যবহৃত হইয়াছে ‘সাত পর্যায়’ ১৯৮৮ টীকা দ্রষ্টব্য।
৫৬। ‘সাওয়াহু’ অর্থ সে ইহাকে মসৃন ও সুসামঞ্জস্য করিল; সকল অংশের সংযোজনকে সামঞ্জস্য পূর্ণভাবে মিলাইল যে, তাহা সুন্দর ও একাকার হইয়া গেল। সে দক্ষতার সহিত, উপযুক্তভাবে ইহা গঠন করিল। সে ইহাকে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযোগ্য করিয়া নিল। সে ইহাকে পূর্ণতা দান করিল। সে ইহাকে ভাল ও সঠিক অবস্থায় স্থাপন করিল (লেইন)।
৫৬-ক। সূর্য, চন্দ্র এবং আসমানের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ ইত্যাদি মানুষের জন্য পরম উপকারী। আধুনিক বিজ্ঞান এই ব্যাপারে বহু কিছু আবিস্কার করিয়াছে এবং করিতে থাকিবে, যাহা দ্বারা কুরআনের ‘সর্বময় জ্ঞানের’ সত্যতা উপলব্ধি করা যাইবে। এই জগতের বস্তুগুলির বহু গুনাগুণ, যাহা পূর্বে অজানা ছিল, তাহা দিন দিন বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা জানিতে পারিতেছি। যে সকল বস্তুকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বলিয়া মনে করিয়াছিলাম, আজ তাহা মানুষের জন্য অতিশয় কল্যাণকর বলিয়া সাব্যস্ত হইয়া চলিয়াছে।