২

البقرة

সূরা আল-বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

মাদানী সূরা, বিসমিল্লাহসহ ২৮৭ আয়াত ও ৪০ রুকূ

یَکَادُ الۡبَرۡقُ یَخۡطَفُ اَبۡصَارَہُمۡ ؕ کُلَّمَاۤ اَضَآءَ لَہُمۡ مَّشَوۡا فِیۡہِ ٭ۙ وَاِذَاۤ اَظۡلَمَ عَلَیۡہِمۡ قَامُوۡا ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَذَہَبَ بِسَمۡعِہِمۡ وَاَبۡصَارِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿٪۲۱﴾

২১
বিদ্যুৎচমক তাদের দৃষ্টিশক্তি কেড়ে নেবার উপক্রম করে। তা (অর্থাৎ বিদ্যুৎচমক) যখনই তাদের ওপর আলো ছড়ায় তারা তাতে (পথ) চলে। কদেখুন: ২:১৭২; ৬:৪০; ৭:১৮০; ৮:২৩; ১০:৪৩; ১১:২৫; ১৭:৯৮; ২১:৪৬; ২৭:৮১; ৩০:৫৩,৫৪; ৪৩:৪১আর যখন তাদের ওপর অন্ধকার বিস্তৃত করে তখন তারা থমকে দাঁড়ায়। আর আল্লাহ যদি চাইতেন তাহলে তিনি অবশ্যই তাদের শ্রবণশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি৪১ কেড়ে নিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ যা চান এরূপ প্রত্যেক বিষয়ে৪১-ক (তিনি) সর্বশক্তিমান।
সূরা আল-বাকারা - রুকু ২
৪১। দুর্বল বিশ্বাসের অধিকারী মুনাফিকরা তাদের দৃষ্টিশক্তি প্রায় হারিয়ে ফেলেছে, তবে এখনো সম্পূর্ণ দৃষ্টিশক্তি হারায় নি। তারা যদি বার বার এমন অবস্থায় পড়ে, যেখানে সাহস ও আত্মত্যাগ প্রয়োজন, যেমন- বিজলি ও বজ্রপাতের সময় বাইরে যেতে হলে সাহস ও ত্যাগের মনোভাব থাকা দরকার, সেরূপ অবস্থার সম্মুখীন হলে তারা তাদের দৃষ্টিশক্তি অর্থাৎ ঈমানকে হয়ত হারিয়েই ফেলবে, কিন্তু আল্লাহর বিধান হচ্ছে, সকল বিদ্যুৎচমকের সাথেই বজ্রপাত হয় না। প্রায়শই দেখা যায়, বিদ্যুৎচমক অন্ধকারের পর্দা অপসারণ করে পথিককে পথ চলতে সাহায্য করে। ইসলাম যখন বিজয় ও উন্নতির দিকে অগ্রসর হয় তখন এসব মুনাফিক মুসলমানদের দলে ভেড়ে, কিন্তু যখন বিদ্যুৎচমকের সাথে বজ্রপাতও হয় অর্থাৎ যখন ধন, প্রাণ ও সম্পদ উৎসর্গ করার সময় উপস্থিত হয় তখন তারা চোখে অন্ধকার দেখে, তারা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে এবং বিশ্বাসীদের সাথে চলতে অস্বীকৃতি জানায়।
৪১-ক। ‘শাই’ অর্থ কাঙ্ক্ষিত বস্তু বা বিষয়।

یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اعۡبُدُوۡا رَبَّکُمُ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ وَالَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ﴿ۙ۲۲﴾

২২
হে মানবজাতি!৪২ কদেখুন: ৪:২,৩৭; ৫:৭৩,১১৮; ১৬:৩৭; ২২:৭৮; ৫১:৫৭তোমরা তোমাদের সেই প্রতিপালক-প্রভুর ইবাদত করো- যিনি তোমাদের ও তোমাদের পূর্ববর্তীদের সৃষ্টি করেছেন, যেন তোমরা তাকওয়া অবলম্বন করতে পারো;
৪২। এ আয়াতে কুরআনের প্রথম আদেশ বর্ণিত হয়েছে। এ অনুশাসন কেবল আরবদের জন্য নয় বরং সমগ্র মানবজাতির জন্য প্রযোজ্য, কেননা এখানে ‘ইয়া আইয়্যুহান্নাসু’ বলে বিশ্বমানবের প্রতি এ নির্দেশ পালনের আহ্বান জানানো হয়েছে। এ থেকে বুঝা যায়, ইসলাম প্রথম থেকেই বিশ্বধর্ম হবার দাবি করেছে। গোত্রীয় বা ভৌগলিকভাবে ধর্মের আদেশের অবসান ঘটিয়ে ইসলাম প্রথম থেকেই বিশ্বমানবতার গুরুত্ব ও ভ্রাতৃত্বকে সমুন্নত করার ধর্ম হিসাবে আত্মপ্রকাশ করেছে।

الَّذِیۡ جَعَلَ لَکُمُ الۡاَرۡضَ فِرَاشًا وَّالسَّمَآءَ بِنَآءً ۪ وَّاَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَخۡرَجَ بِہٖ مِنَ الثَّمَرٰتِ رِزۡقًا لَّکُمۡ ۚ فَلَا تَجۡعَلُوۡا لِلّٰہِ اَنۡدَادًا وَّاَنۡتُمۡ تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
খদেখুন: ২০:৫৪; ২৭:৬২; ৪৩:১১; ৫১:৪৯; ৭১:২০; ৭৮:৭যিনি ভূমিকে তোমাদের জন্য বিছানা ও গদেখুন: ৫১:৪৮; ৭৮:১৩আকাশকে ছাদস্বরূপ বানিয়েছেন। আর মেঘ থেকে পানি বর্ষণ করেছেন, এরপর এর মাধ্যমে তিনি তোমাদের জন্য রিযকরূপে নানাবিধ ফলফলাদি উৎপন্ন করেছেন। অতএব তোমরা জেনেশুনে (কাউকে) আল্লাহর সমকক্ষ দাঁড় কোরো না।৪৩
৪৩। এ বক্তব্যটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়, একটি ছাদ বা দালান যেমন তার নীচে বসবাসকারীর নিরাপত্তা বিধান করে, তেমনই মহাবিশ্বের বিভিন্ন দূরবর্তী অংশগুলোও আমাদের পৃথিবীর নিরাপত্তা বিধান করে থাকে। যারা জ্যোতির্বিদ্যা নিয়ে গবেষণা করে তারা জানে, পৃথিবীর চেয়ে অনেকগুণ বড়ো বস্তু পৃথিবীর সবদিকে নিজ নিজ ৪৪ টীকা পরবর্তী পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য কক্ষপথে মহাশূন্যে ভাসমান আর এরা পৃথিবীর স্থিতি ও নিরাপত্তাকে নিশ্চিত করছে। এখানে ইঙ্গিত দেওয়া হয়েছে, এ বস্তুজগতের পূর্ণতা ও সার্থকতা পার্থিব ও স্বর্গীয় উভয় ধরনের শক্তির সমন্বয় সাধনের ওপর নির্ভর করে।

وَاِنۡ کُنۡتُمۡ فِیۡ رَیۡبٍ مِّمَّا نَزَّلۡنَا عَلٰی عَبۡدِنَا فَاۡتُوۡا بِسُوۡرَۃٍ مِّنۡ مِّثۡلِہٖ ۪ وَادۡعُوۡا شُہَدَآءَکُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
আর আমরা আমাদের বান্দার প্রতি যা অবতীর্ণ করেছি তোমরা সে বিষয়ে কোনো সন্দেহে থাকলে এর মতো একটি সূরা নিয়ে আসো এবং তোমরা সত্যবাদী হয়ে থাকলে আল্লাহকে বাদ দিয়ে তোমাদের (কল্পিত) সাহায্যকারীদের ডেকে নাও।৪৪
৪৪। কুরআনের অতুলনীয় শ্রেষ্ঠত্ব ও মাহাত্ম্যের কথা কুরআনের ভিন্ন ভিন্ন পাঁচটি স্থানে বর্ণিত হয়েছে, যথা- ২:২৪; ১০:৩৯; ১১:১৪; ১৭:৮৯; ৫২:৩৪-৩৫। এ পাঁচটির মধ্যে দুটি স্থানে (২:২৪ এবং ১০:৩৯) একই ধরনের চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। অন্য তিনটি স্থানে তিনটি ভিন্ন প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ দিয়ে অবিশ্বাসীদেরকে মোকাবিলার আহ্বান জানানো হয়েছে। চ্যালেঞ্জের ধরনের মধ্যে এই যে বিভিন্নতা তা আপাতদৃষ্টিতে সামঞ্জস্যহীন মনে হতে পারে, কিন্তু তা নয়। প্রকৃতপক্ষে চ্যালেঞ্জের আয়াতগুলোতে এমন কতগুলো দাবি আছে, যেগুলো চিরস্থায়ী। তাই হযরত রসূল করীম (সা.)- এর সময়ে যেমন বিভিন্ন আকারে এ চ্যালেঞ্জগুলো বলবৎ ছিল, তেমনই আজও সেগুলো সমভাবেই বলবৎ আছে। চ্যালেঞ্জগুলোর বিভিন্ন ধরনকে ব্যাখ্যা করার পূর্বে জানা প্রয়োজন, কুরআনের যে-সব স্থলে এ মোকাবিলার আহ্বান (চ্যালেঞ্জ) জানানো হয়েছে সেসব স্থলে ধনসম্পদ ও শক্তিমত্তারও উল্লেখ রয়েছে। তবে এ আয়াতটিতে এর ব্যতিক্রম রয়েছে, কেননা এ আয়াতটি ১০:৩৯ আয়াতেও বর্ণিত হয়েছে। এ থেকে এ সিদ্ধান্তে সহজে উপনীত হওয়া যায়, ধনসম্পদ ও ক্ষমতার সাথে কুরআনের অনুরূপ কিংবা এর অংশবিশেষের অনুরূপ আয়াতসমূহ রচনার চ্যালেঞ্জের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে একটা যোগসূত্র রয়েছে। যোগসূত্রটি একথার মাঝে রয়েছে যে, কুরআনকে অমুসলমানদের কাছে এক অমূল্য সম্পদরূপে তুলে ধরা হয়েছে। অবিশ্বাসীরা মহানবী (সা.)-এর কাছে ধনদৌলত ও অর্থসম্পদ দাবি করত (১১:১৩)। এর উত্তরে বলা হয়েছে, তিনি (সা.) কুরআন আকারে যে মহাসম্পদ লাভ করেছেন তা অতুলনীয়। ফেরেশতারা রসূল করীম (সা.)-এর কাছে আসেন এবং তারা তাদের দায়িত্ব ও কর্তব্যস্বরূপ তাঁর (সা.) কাছে আল্লাহর বাণীও পৌঁছে দিচ্ছেন। এভাবে অবিশ্বাসীদের দাবি ‘ধনসম্পদ আনো ও ফেরেশতা দেখাও’- এ দুটি দাবিরই খণ্ডনে কুরআনে একসাথে একথা বলে দেওয়া হয়েছে, কুরআনই ফেরেশতার মাধ্যমে আনীত অতুলনীয় সম্পদ, যার অনন্য শ্রেষ্ঠত্বের মোকাবিলা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়। এখন চ্যালেঞ্জসংবলিত বিভিন্ন আয়াত পৃথক পৃথকভাবে পর্যালোচনা করা যাক। সবচেয়ে বড়ো দাবি করা হয়েছে ১৭:৮৯ আয়াতে, যেখানে অবিশ্বাসীদেরকে সম্পূর্ণ কুরআনের মতো সর্বগুণসম্পন্ন এক কিতাব রচনার চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জে তাদের কিতাবকে আল্লাহর বাণীরূপে উপস্থাপন করতে তাদের বলা হয় নি বরং তাদের নিজেদের লিখিত কিতাব হিসাবে তা উপস্থাপন করে ঘোষণা করতে হবে, এটি কুরআনের সমকক্ষ বা কুরআনের চেয়ে উত্তম, কিন্তু যেহেতু সম্পূর্ণ কুরআন তখনো অবতীর্ণ হয় নি, সেহেতু সমস্ত কুরআনের মোকাবিলা করার প্রশ্ন তখন ছিল না বরং এ চ্যালেঞ্জে একটি ভবিষ্যদ্বাণী এভাবে অন্তর্নিহিত রয়েছে যে, অবিশ্বাসীরা কখনো কুরআনের সমকক্ষ কোনো কিতাব রচনা করতে পারবে না। অসম্পূর্ণ অবস্থায় কুরআন উক্ত চ্যালেঞ্জের সময় যতটুকু ছিল ততটুকুরও না এবং সম্পূর্ণ হবার পর যতটুকু হলো ততটুকুরও না। এ চ্যালেঞ্জ শুধু রসূল করীম (সা.)-এর জীবদ্দশায় যে-সব অবিশ্বাসী ছিল তাদের জন্যই সীমাবদ্ধ নয়, বরং অনাগত ভবিষ্যতের সব সংশয়বাদী ও সমালোচকদের সকলের জন্যই তা প্রকাশ্য চ্যালেঞ্জ হিসাবে উন্মুক্ত। ১১:১৪ আয়াতে দশটি সূরার সমকক্ষতা দাঁড় করানোর চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। এর কারণ হলো, অবিশ্বাসীরা তখন সমস্ত কুরআনের ওপর আপত্তি উত্থাপন না করে কয়েকটি অংশবিশেষের সমালোচনা করে আপত্তি জানিয়েছিল। তাই এক্ষেত্রে তাদেরকে সমস্ত কুরআনের মোকাবিলার আহ্বান না জানিয়ে দশটি সূরা রচনা করার আহ্বান করা হয়েছে, যা তাদের ধারণামতে দোষযুক্ত বিধায় তারা এ অংশগুলোর সমকক্ষতায় টিকতে পারবে। এখানে উল্লেখ্য, ১৭:৮৯ আয়াতে সমস্ত কুরআনকে একটি পরিপূর্ণ ও ত্রুটিবিচ্যুতিহীন কিতাব বলে দাবি করা হয়েছে। অতএব সেখানে সমস্ত কুরআনের মোকাবিলায় এরই মতো সর্বাংশে সমকক্ষ কিতাব আনার চ্যালেঞ্জ ৩২:১৮; ৪৭:১৬; ৫৮:২৩; ৬১:১৩; ৬৪:১০; খ. ৩:১৬; ৪:৫৮। দেওয়া হয়েছে, কিন্তু ১১:১৪ আয়াতে যে চ্যালেঞ্জ আছে, এর মূল কারণ ছিল অবিশ্বাসীদের এ দাবি যে, কুরআনের স্থানে স্থানে ভুলভ্রান্তি ও দোষত্রুটি বিদ্যমান, সমস্ত কুরআনেই দোষত্রুটি রয়েছে বলে তারা এক্ষেত্রে দাবি করে নি। অতএব তাদের চ্যালেঞ্জ দেওয়া হলো, তারা যে-কোনো দশটি সূরা যা ত্রুটিপূর্ণ বলে তারা মনে করে, এরই সমকক্ষ যেন এনে দেখায়। দশম সূরার ৩৯ নম্বর আয়াতে অবিশ্বাসীদেরকে কুরআনের যে-কোনো একটি মাত্র সূরার মোকাবিলা করতে বলা হয়েছে। এর কারণ উপরুল্লিখিত সূরার দুই আয়াতের মতো এখানে অবিশ্বাসীদের অনুযোগের প্রেক্ষিত অনুপস্থিত। এখানে কুরআন নিজের পরিপূর্ণতার দাবি নিজের পক্ষ থেকেই উত্থাপন করছে, অবিশ্বাসীদের অনুযোগ বা অভিযোগের পরিপ্রেক্ষিতে নয়। ১০:৩৮ আয়াতে কুরআন দাবি করেছে যে, কুরআনের পাঁচটি অতি উচ্চস্তরের গুণ রয়েছে। এ দাবির সমর্থনে পরবর্তী আয়াতে অস্বীকারকারী ও সংশয়বাদীদেরকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, তারা যেন সেই পাঁচটি গুণসংবলিত (দশম সূরার মতো) একটি সূরাই রচনা করে জনগণের সামনে উপস্থাপন করে। আলোচ্য আয়াতে (২:২৪) পঞ্চম বারের মতো চ্যালেঞ্জ দেওয়া হয়েছে। এখানেও দশম সূরার ৩৯ নম্বর আয়াতের মতোই অবিশ্বাসীদেরকে কোনো কুরআনী সূরার মতো একটি সূরা তৈরি করে আনতে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে। এ চ্যালেঞ্জের পূর্বের আয়াতে এ দাবি করা হয়েছে যে, ধর্মপরায়ণ ব্যক্তিদেরকে কুরআন পথ দেখায় ও সঠিক পথে পরিচালিত করে আধ্যাত্মিকতার উচ্চমার্গে পৌঁছে দেয়। অবিশ্বাসীদেরকে বলা হচ্ছে, তারা যদি কুরআনকে ঐশীবাণী বলে বিশ্বাস না করে তাহলে যে-কোনো একটি সূরার সমকক্ষ সূরা তারা রচনা করে দেখিয়ে দিক যা পাঠক বা অনুসারীর মনকে সমভাবে আধ্যাত্মিক প্রভাবে প্রভাবান্বিত করতে পারে। উপরোক্ত ব্যাখ্যা থেকে বুঝা যায়, এ চ্যালেঞ্জগুলোর প্রত্যেকটি স্বতন্ত্র এবং একটি অপরটির বিরোধী নয়। প্রত্যেকটি চ্যালেঞ্জ নিজ জায়গায় বলবৎ রয়েছে এবং চিরকালের জন্যই বলবৎ থাকবে। কুরআন যেহেতু পবিত্রতম ও উচ্চাঙ্গীন ভাবধারার বাহক, সে কারণে এর রচনাশৈলী ও সাহিত্যিক গুণাবলি সর্বোচ্চ স্তরের হওয়া অপরিহার্য ছিল, যেন বিষয়বস্তু ও ভাবধারার স্বচ্ছতা ও স্পষ্টতা কোনো দিক দিয়ে ম্লান না হয় এবং কুরআনের বিমল ও পরিপূর্ণ সৌন্দর্য ব্যাহত ও ক্ষুণ্ণ না হয়। তাই অবিশ্বাসীদেরকে কুরআনের মতো বা সমকক্ষ কিতাব রচনার চ্যালেঞ্জ যে আকারেই দেওয়া হোক না কেন, এর বিষয়বস্তু, আদর্শ, ভাবধারা এবং রচনাশৈলী ও প্রকাশভঙ্গি ইত্যাদি সবকিছুই এই চ্যালেঞ্জের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আছে।

فَاِنۡ لَّمۡ تَفۡعَلُوۡا وَلَنۡ تَفۡعَلُوۡا فَاتَّقُوا النَّارَ الَّتِیۡ وَقُوۡدُہَا النَّاسُ وَالۡحِجَارَۃُ ۚۖ اُعِدَّتۡ لِلۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
কিন্তু তোমরা যদি এমনটি না করো, আর তোমরা কখনো (এমনটি) করতে পারবে না, তাহলে সেই আগুনকে ভয় করো ক্যার জ্বালানি৪৫ হলো মানুষ ও পাথর; তা প্রস্তুত করা হয়েছে অস্বীকারকারীদের জন্য।৪৬কদেখুন: ৩:১১; ৬৬:৭
৪৫। ‘জ্বালানি’ শব্দটি এখানে রূপকভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। পৌত্তলিকতাকে এখানে দোযখের শাস্তির মূল কারণ বলা হয়েছে। মূর্তিকে ও মূর্তিপূজারিকে দোযখের আগুনের জ্বালানি বলা হয়েছে। পাথরের যে মূর্তিগুলোকে পৌত্তলিকরা উপাস্যরূপে পূজা করে সেগুলোও দোযখের জ্বালানি। তারা যখন দেখবে তাদের উপাস্য মূর্তিগুলোও দোযখের জ্বালানিরূপে জ্বলছে তখন তারা ঘৃণা ও লাঞ্ছনার আগুনে পুড়বে।
৪৬। ‘আন-নাস’ (মানুষ) ও ‘আল-হিজারাত’ (পাথর) বলতে দুই ধরনের দোযখবাসীকে বুঝানো হতে পারে। ‘আন- ৪৬-ক ও ৪৭ টীকা পরবর্তী পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য নাস’ বলতে সেসব অবিশ্বাসীকে বুঝাতে পারে যাদের মনে আল্লাহর প্রতি কিছু ভালোবাসা আছে এবং ‘আল- হিজারাত’ বলতে সেসব অবিশ্বাসীকে বুঝাতে পারে, যাদের মনে আল্লাহর প্রতি মোটেই ভালোবাসা নাই। তারা পাথরতুল্য। শব্দটি ‘হাজর’-এর বহুবচন যার অর্থ পাথর, পাথরের টিলা, সোনা, বড়োলোক ও নেতা (লেইন)।

وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ اَنَّ لَہُمۡ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ؕ کُلَّمَا رُزِقُوۡا مِنۡہَا مِنۡ ثَمَرَۃٍ رِّزۡقًا ۙ قَالُوۡا ہٰذَا الَّذِیۡ رُزِقۡنَا مِنۡ قَبۡلُ ۙ وَاُتُوۡا بِہٖ مُتَشَابِہًا ؕ وَلَہُمۡ فِیۡہَاۤ اَزۡوَاجٌ مُّطَہَّرَۃٌ ٭ۙ وَّہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
আর যারা ঈমান এনেছে এবং সৎকাজ করেছে তুমি কদেখুন: ৩:১৬; ৪:১৪,৫৮,১২৩; ৫:১৩,৮৬; ৭:৪৪; ৯:৭২,৮৯,১০০; ১০:১০; ১৩:৩৬; ২২:১৫,২৪; ২৫:১১তাদেরকে (এমনসব) বাগানের সুসংবাদ দাও যার পাদদেশ দিয়ে নদনদী বয়ে যায়। তাদেরকে যখনই তা থেকে রিযকস্বরূপ ফলফলাদি দেওয়া হবে তখন তারা বলবে, ‘এটি তো তা-ই যা পূর্বেও আমাদের দেওয়া হয়েছিল; অথচ তাদেরকে অনুরূপ (রিযকই) দেওয়া হয়েছিল। আর তাদের জন্য সেখানে থাকবে খদেখুন: ৩৩:৫৪পবিত্র সঙ্গীসাথি৪৬-ক এবং সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে।৪৭
৪৬-ক। কুরআন শিক্ষা দেয়, প্রত্যেক সৃষ্ট জীবের পক্ষে নিজ পূর্ণতা ও উন্নতির জন্য সঙ্গী প্রয়োজন। বেহেশতে ধর্মপরায়ণ পুরুষ ও নারী স্বীয় আধ্যাত্মিক উন্নতি সাধন ও সুখানুভূতির পূর্ণতার জন্য পবিত্র সঙ্গী লাভ করবে। এ সঙ্গী কী ধরনের হবে তা কেবল পরলোকেই জানা বা বুঝা সম্ভব।
৪৭। এ আয়াতে বিশ্বাসীদের পারলৌকিক পুরস্কারের সংক্ষিপ্ত বিবরণ দেওয়া হয়েছে। ইসলামের সমালোচকরা এ বিবরণের প্রতি আপত্তির ঝড় তুলেছেন। বেহেশত সম্বন্ধে ইসলামের ধারণা ও শিক্ষা কী- তা না জানা ও সঠিকভাবে না বুঝার কারণেই এসব অসমীচীন সমালোচনার উদ্ভব হয়েছে। কুরআন অত্যন্ত জোরালো ভাষায় ঘোষণা করেছে, পরকালের নিয়ামতসমূহের স্বরূপ ও তত্ত্ব অনুধাবন করা মানবীয় জ্ঞানবুদ্ধির অতীত (৩২:১৮)। নবী করীম (সা.) বর্ণনা করেছেন, ‘কোনো চোখ এগুলোকে (বেহেশতী পুরস্কারসমূহকে) দেখে নি, কোনো কান এদের সঠিক বর্ণনা শোনে নি, কোনো মনও এদের ধারণা করতে পারে নি’ (বুখারী)। তাই স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন দাঁড়ায়, তাহলে ইহজগতের বস্তুর নামে বেহেশতের আশিসসমূহকে অভিহিত করার সার্থকতা কী? এর উত্তর হচ্ছে, কুরআন কেবল বিজ্ঞ পণ্ডিতদের জন্যই নয় বরং সর্বসাধারণের জন্যও। তাই এমন সহজসরল ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা সকলেই বুঝে। বেহেশতের আশিসসমূহ বর্ণনার ক্ষেত্রে কুরআন সেই সকল পার্থিব জিনিসগুলোরই নাম ব্যবহার করেছে যেগুলোকে মানুষ সাধরণত ভালো বলে জানে ও পছন্দ করে এবং বিশ্বাসীদেরকে বলা হয়েছে, এসব ভালো জিনিস তারা আরো উৎকৃষ্টতর আকারে বেহেশতে পাবে। এ আবশ্যকীয় তুলনামূলক চিত্র দেবার জন্যই ভালো ভালো জানা জিনিসের নাম ও সুপরিচিত শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। নতুবা ইহজগতের সুখ ও আনন্দ এবং পরজগতের আশিসসমূহের মধ্যে কোনো মিল নাই। এদের উভয়ে মোটেই একজাতীয় বা এক ধরনের নয়। ইসলাম ধর্ম অনুযায়ী পরকাল কেবল একটা মানসিক বা আধ্যাত্মিক অবস্থার নাম নয়। পরকালেও মানবাত্মা একপ্রকারের দেহ পাবে, তবে তা রক্তমাংসের হবে না। স্বপ্নে দেখা দৃশ্যাবলির উদাহরণ থেকে বিষয়টি কিছুটা আঁচ করা যেতে পারে। স্বপ্নের বিষয়বস্তু শুধু মানসিক অবস্থা বিশেষ- একথা বলা কঠিন। স্বপ্নে দুধপানের তৃপ্তি নিঃসন্দেহে একটি বাস্তব অভিজ্ঞতা। তা সত্ত্বেও কেউই বলবে না, এটা এই জগতে প্রাপ্ত দুধ, যা সে পান করেছে। আল্লাহ তা’লার যে-সকল দান আমরা ইহকালে উপভোগ করে থাকি পরকালের আশীর্বাদসমূহকে সেগুলোরই মনস্তাত্ত্বিক রূপায়ণ বলা ঠিক হবে না। বরং এ জগতে যা আমরা পাই তা আল্লাহ তা’লার সত্যিকার, খাঁটি দান ও আশীর্বাদসমূহের নমুনাস্বরূপ। প্রকৃত ঐশী দানসমূহের প্রাপ্তিস্থান হলো পরকাল। অধিকন্তু ‘বাগানসমূহ’ বলতে বুঝায় বিশ্বাস এবং ‘নদনদী’ বলতে বুঝায় কর্মসমূহ। বাগান টিকতে পারে না এবং ফুলেফলে সুশোভিত হতে পারে না যদি সেখানে নদনদী তথা পানির ব্যবস্থা না থাকে। তেমনই বিশ্বাস ফলপ্রসূ হতে পারে না যদি সৎকর্মের দ্বারা তা সুদৃঢ় করা না হয়। অতএব বিশ্বাস ও সৎকর্ম অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত। পরিত্রাণের জন্য উভয়ের একত্রে সমাবেশ অত্যাবশ্যক। পরকালে বাগানগুলো বিশ্বাসীদেরকে তাদের ইহলৌকিক বিশ্বাসের কথা স্মরণ করিয়ে দেবে এবং নদনদী তাদের ইহকালীন সৎকর্মসমূহকে স্মরণ করিয়ে দেবে। তারা তখন সুস্পষ্টভাবে বুঝতে পারবে তাদের বিশ্বাস ও সৎকর্ম বৃথা যায় নি। ‘যা পূর্বেও আমাদের দেওয়া হয়েছিল’- মুমিনের এ উক্তি থেকে বেহেশতে তাদেরকে এসব ফলই দেওয়া হবে, যা তারা ইহকালে উপভোগ করেছিল- এ সিদ্ধান্তে পৌছানো ঠিক হবে না, কেননা পূর্বেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে, এ দুই জগৎ এক নয়। প্রকৃতপক্ষে পরকালের ফল হবে তাদের ইহকালীন বিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। তারা যখন সেগুলো খাবে তখন তারা সাথে সাথেই উপলব্ধি করবে এগুলো তাদের ইহকালীন জীবনের বিশ্বাসের ফলমাত্র। তাই তারা ৪৮, ৪৮-ক, ৪৮-খ ও * চিহ্নিত টীকা পরবর্তী পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশের জন্য আনন্দের আতিশয্যে বলে উঠবে, ‘যা পূর্বেও আমাদের দেওয়া হয়েছিল।’ সেখানে পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ বলতে বুঝাচ্ছে, ইহকালে অনুসৃত নীতি ও ধর্মকর্ম এবং পরকালে প্রাপ্ত এর প্রতিফল ও প্রতিদান, এ দুয়ের মাঝে যথেষ্ট মিল থাকবে। ইহকালের ইবাদত বা উপাসনা পরকালে মুমিনদের কাছে ফলরূপে উপস্থিত হবে। একজন লোকের ইবাদতে যত বেশি সরলতা ও যথাযথ ভাবগাম্ভীর্য থাকবে সেই অনুপাতে বেহেশতে তার ফলভোগের আনন্দও তত বেশি হবে। এমনকি ফলের গুণাগুণে ও আনুপাতিক হারে তারতম্য হবে। তাই পরলোকে বেশি বেশি ভালো কাজের ফলপ্রাপ্তির জন্য ইহলোকে বেশি বেশি ধর্মকর্ম করতে হবে। এটা করা মানুষের ইচ্ছা ও ক্ষমতার অধীন। এ আয়াতের আরেকটি তাৎপর্য হলো, বেহেশতে যে আধ্যাত্মিক খাদ্য মানুষকে দেওয়া হবে তা প্রত্যেক ব্যক্তির নিজ নিজ রুচি অনুযায়ী, তার আত্মিক স্তর ও অবস্থানুযায়ী হবে, যেন তার আত্মা উন্নতির এক স্তর হতে অন্য স্তরে ক্রমাগত উন্নতি লাভ করতে পারে। ‘সেখানে তারা চিরকাল বসবাস করবে’ বাক্য দ্বারা বুঝা যায়, বেহেশতে প্রবেশকারীরা ক্ষয়প্রাপ্ত বা লয়প্রাপ্ত হবে না। মানুষ যখন খাদ্য গ্রহণ ও পরিপাকে অপারগ হয়, কিংবা যখন কেউ তাকে হত্যা করে তখনই সে মৃত্যুবরণ করে, কিন্তু বেহেশতী ব্যক্তি যেহেতু নিজের জন্য সঠিক ও উপযোগী খাদ্য লাভ করবে এবং যেহেতু পবিত্র ও শান্তিপ্রিয় বহু সঙ্গীসাথি লাভ করবে, সেজন্য ক্ষয় বা বিনাশ তার নাগাল পাবে না। মুমিনরা বেহেশতে পবিত্র সঙ্গী লাভ করবেন। পার্থিব জীবনে একজন ভালো জীবনসঙ্গী কত-না শান্তি ও আনন্দের হয়ে থাকে! বিশ্বাসীরা ইহকালেও ভালো স্বামী বা স্ত্রী পাবার চেষ্টা করে। তারা পরলোকে উত্তম সঙ্গী পাবেই। তথাপি একথা না বলে উপায় নাই এ আশীর্বাদসমূহ শারীরিক ও বস্তুগত নয়। বিশদ বিবরণ ও ব্যাখ্যার জন্য সূরা আত-তূর, সূরা আর-রাহমান ও সূরা আল-ওয়াকিআ দেখুন।

اِنَّ اللّٰہَ لَا یَسۡتَحۡیٖۤ اَنۡ یَّضۡرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوۡضَۃً فَمَا فَوۡقَہَا ؕ فَاَمَّا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا فَیَعۡلَمُوۡنَ اَنَّہُ الۡحَقُّ مِنۡ رَّبِّہِمۡ ۚ وَاَمَّا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا فَیَقُوۡلُوۡنَ مَاذَاۤ اَرَادَ اللّٰہُ بِہٰذَا مَثَلًا ۘ یُضِلُّ بِہٖ کَثِیۡرًا ۙ وَّیَہۡدِیۡ بِہٖ کَثِیۡرًا ؕ وَمَا یُضِلُّ بِہٖۤ اِلَّا الۡفٰسِقِیۡنَ ﴿ۙ۲۷﴾

২৭
নিশ্চয় আল্লাহ কখনো মশা কিংবা এর চেয়েও ক্ষুদ্র৪৮ কোনো (বস্তুর) উপমা৪৮-ক দিতে কুণ্ঠাবোধ করেন না।* যারা ঈমান এনেছে তারা জানে, নিশ্চয় এ হলো তাদের প্রতিপালক-প্রভুর পক্ষ থেকে ধ্রুবসত্য; কিন্তু যারা অস্বীকার করেছে তারা বলে, ‘এ উপমা দিয়ে আল্লাহ কী বুঝাতে চান?’ এর মাধ্যমে তিনি অনেককে পথভ্রষ্ট৪৯ সাব্যস্ত করেন এবং এর মাধ্যমে তিনি অনেককে সঠিক পথের দিশা দেন। আর তিনি এর মাধ্যমে দুষ্কৃতকারীদের ছাড়া অন্য কাউকে পথভ্রষ্ট সাব্যস্ত করেন না।*,৪৮-খকদেখুন: ১৪:২৫; ১৬:৭৬,১১৩; ৪৭:৪; ৬৬:১২কদেখুন: ৬:১১৮; ৭:১৮৭; ১৩:২৮; ১৬:৯৪; ৪০:৩৫
৪৮। আল্লাহ তা’লা কুরআনে বেহেশত ও দোযখের রূপক ও আলংকারিক দৃষ্টান্তসূচক বর্ণনা দিয়েছেন। রূপক বর্ণনা ও আলংকারিক দৃষ্টান্ত গভীর অর্থবোধক হয়ে থাকে। বিশেষত আধ্যাত্মিক বিষয়াবলিতে শাব্দিক ও আক্ষরিকভাবে যে-সব গভীর তত্ত্ব প্রকাশে সীমাবদ্ধতা থাকে, সেসব ক্ষেত্রে ভাব প্রকাশের জন্য রূপক দৃষ্টান্ত ও আলংকারিক ভাষা ব্যবহারই মনে হয় একমাত্র পন্থা। নিছক ভাষায় বেহেশতের বর্ণনা দেওয়া সিন্ধুকে বিন্দুতে আবদ্ধ করারই নামান্তর। তবুও তুচ্ছ প্রাণিটির তুলনা দ্বারা আমরা মনে একটি চিত্র লাভ করে থাকি। মুমিনরা ভালোভাবেই জানে, এসব কথা আলংকারিক ও রূপক এবং এদের মাধ্যমে তারা অর্থের গভীরে প্রবেশের চেষ্টা করে, কিন্তু অবিশ্বাসীরা এর মাঝে কেবল দোষত্রুটির সন্ধান করে। আর এই ছিদ্রান্বেষণের নেশায় তারা হিদায়াত পাওয়া থেকে দূরে সরে যায়।
৪৮-ক। ‘ফাওক’ অর্থ ‘ওপর’। এ শব্দটি ‘বড়ো’-এর সাথে ব্যবহারে অধিকতর বড়ো এবং ‘ছোটো’-এর সাথে ব্যবহারে অধিক ক্ষুদ্র বুঝায়। অর্থটি প্রসঙ্গের ওপর নির্ভর করে (মুফরাদাত)।
৪৮-খ। ‘যারাবাল মাসালা’ অর্থ সে একটি উদাহরণ দিল, সে একটি বক্তব্য পেশ করল, সে এক উপদেশপূর্ণ রূপক গল্প বলল (লেইন, তাজ এবং ১৪:৪৬)।
৪৯। ‘আযাল্লাহুল্লাহ’ অর্থ: (১) আল্লাহ তাকে নিজ বিচারে পথভ্রষ্ট সাব্যস্ত করেন, (২) আল্লাহ তাকে পরিত্যাগ করেন, যার ফলে সে পথভ্রষ্টতায় পতিত হয় (কাশশাফ), (৩) আল্লাহ তাকে পথভ্রষ্টতায় নিপতিত পেলেন, পথভ্রষ্টতায় ছেড়ে দিলেন, ভ্রান্ত পথে যেতে দিলেন (লেইন)।
* ফামা ফাওকাহা-এর একটি অনুবাদ হলো, মশা যা বহন করে। এ আয়াতে মশার মতো এক ক্ষুদ্র পতঙ্গের মাধ্যমে আল্লাহ তা’লা মানবজাতির মাঝে ম্যালেরিয়ারূপে প্রলয়ংকরী যে ধ্বংস এনে থাকেন তার স্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে। [হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত কুরআন করীমে প্রদত্ত টীকা দ্রষ্টব্য।

الَّذِیۡنَ یَنۡقُضُوۡنَ عَہۡدَ اللّٰہِ مِنۡۢ بَعۡدِ مِیۡثَاقِہٖ ۪ وَیَقۡطَعُوۡنَ مَاۤ اَمَرَ اللّٰہُ بِہٖۤ اَنۡ یُّوۡصَلَ وَیُفۡسِدُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ﴿۲۸﴾

২৮
(অর্থাৎ তারা-) কদেখুন: ২:১০১; ৪:১৫৬; ৫:১৪; ১৩:২৬্যারা আল্লাহর অঙ্গীকারকে সুদৃঢ় করার পর তা ভঙ্গ করে এবং আল্লাহ যা অটুট রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তা ছিন্ন করে আর পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করে, তারাই ক্ষতিগ্রস্ত।

کَیۡفَ تَکۡفُرُوۡنَ بِاللّٰہِ وَکُنۡتُمۡ اَمۡوَاتًا فَاَحۡیَاکُمۡ ۚ ثُمَّ یُمِیۡتُکُمۡ ثُمَّ یُحۡیِیۡکُمۡ ثُمَّ اِلَیۡہِ تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
তোমরা কীভাবে আল্লাহকে অস্বীকার করতে পারো, অথচ তোমরা প্রাণহীন ছিলে? খদেখুন: ১৯:৩৪; ২২:৬৭; ৩০:৪১; ৪০:১২; ৪৫:২৭অতঃপর তিনি তোমাদের জীবন৫১ দান করেছেন। এরপর তিনি তোমাদের মৃত্যু দেবেন। পুনরায় তিনি তোমাদের জীবিত করবেন।৫২ অতঃপর তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।৫০,৫৩
৫০। ‘আমওয়াত’ শব্দটি ‘মাইয়্যিত’ শব্দের বহুবচন। অর্থ: মৃত বা প্রাণহীন। সে হিসাবে যে বস্তুর এখনো জীবনের স্ফূরণ ঘটে নি এবং যে বস্তুর জীবন ছিল তবে এখন নাই, এ উভয় প্রকারের বস্তুকে মৃত বা প্রাণহীন বলা হয়। মৃত নয় অথচ মুমূর্ষু অবস্থায় উপনীত হওয়াকেও ‘মাইয়্যিত’ বলা হয় (লেইন)।
৫১। ‘হায়াত’ অর্থ: (১) বৃদ্ধিপ্রাপ্তি বা বর্ধন লাভের গুণ, (২) স্পর্শানুভূতি শক্তি, (৩) বোধ ও জ্ঞান শক্তি, (৪) দুঃখকষ্ট থেকে মুক্তি, (৫) পরকালের অনন্ত জীবন, (৬) সুযোগ পাওয়া অথবা লাভবান হওয়া অথবা এর উপায়, (৭) কর্ম সম্পাদন বা শক্তি প্রকাশের সামর্থ্য।
৫২। এ আয়াতটি মানবজীবনের এক পরম সত্যের দিকে আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। তা হলো, মানবজীবন এত সম্ভাবনাময় ও এত গুরুদায়িত্বসম্পন্ন যে, তার দেহের ধ্বংস ও বিনাশের সাথে সাথে তা শেষ হয়ে যায় না। যদি জীবনের মহান এক উদ্দেশ্য না-ই থাকত, আল্লাহ তা সৃষ্টি করতেন না। আর মৃত্যুর পর পারলৌকিক জীবন যদি না-ই থাকত তাহলে মানুষ মৃত্যুর অধীন হতো না। মৃত্যুতেই যদি জীবন শেষ হয়ে যেত তাহলে মানব সৃষ্টিই একটি প্রহসনে পরিণত হতো আর তা আল্লাহর প্রজ্ঞার প্রতি আপত্তি ও কটাক্ষের সুযোগ বয়ে আনত। সকল প্রজ্ঞা ও বুদ্ধিমত্তার উৎস মহান আল্লাহর মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য মাত্র ষাট-সত্তর বছর পরেই দৈহিক মৃত্যুর সাথে সাথে ধুলোয় মিশে যাবে- একথা ভাবাই যায় না। প্রকৃতপক্ষে তিনি মানুষকে উন্নত, পূর্ণতম ও চিরস্থায়ী জীবন দেবার জন্যই সৃষ্টি করেছেন। মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষ তার ক্ষণস্থায়ী ইহলৌকিক জীবনের খোলস ছেড়ে এক অনন্ত জীবনের পথে যাত্রা আরম্ভ করবে।
৫৩। মৃত্যুর সাথে সাথেই মানুষের আত্মা বেহেশত বা দোযখে চলে যায় না। মধ্যবর্তী পর্যায়ে তার আত্মা ‘বরযখ’ নামক একটি অবস্থায় থাকে। এখানেও আত্মা ভালোমন্দ কর্মের শুভাশুভ ফল অল্প কিছুটা ভোগ করে থাকে। তারপর পুনরুত্থান দিবস আসার পরই চুলচেরা বিচারের মাধ্যমে পূর্ণতম পুরস্কার ও শাস্তির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হবে (৪০:৪৬-৪৭)।

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ لَکُمۡ مَّا فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ٭ ثُمَّ اسۡتَوٰۤی اِلَی السَّمَآءِ فَسَوّٰٮہُنَّ سَبۡعَ سَمٰوٰتٍ ؕ وَہُوَ بِکُلِّ شَیۡءٍ عَلِیۡمٌ ﴿٪۳۰﴾

৩০
গদেখুন: ২২:৬৬; ৩১:২১; ৪৫:১৪তিনিই সেই মহান অস্তিত্ব- যিনি পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই তোমাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন। অতঃপর তিনি আকাশের প্রতি মনোনিবেশ৫৪ করলেন এবং সেগুলোকে সাত৫৫ আকাশে সুবিন্যস্ত করলেন। আর তিনি সকল বিষয়ে৫৬ সর্বজ্ঞ।৫৬-কঘদেখুন: ৭:৫৫; ১০:৪; ৪১:১০-১৩
সূরা আল-বাকারা - রুকু ৩
৫৪। ‘ইসতাওয়া’ অর্থ সে দৃঢ় হলো বা দৃঢ়ভাবে স্থাপিত হলো। ‘ইসতাওয়া ইলাশ শাইয়্যি’ অর্থ ‘সে একটি বস্তুর প্রতি মনোযোগ দিল অথবা বস্তুটির দিকে ফিরল’ (লেইন)।
৫৫। আরবীতে ‘সাত’ সংখ্যাটি ত্রুটিহীনতা ও পরিপূর্ণতার প্রতীক হিসাবে ব্যবহৃত হয়ে থাকে। এ ‘সাত’ সংখ্যাটি, ‘সত্তর’ ও ‘সাতশ’ সংখ্যাগুলোরই মতো বহুসংখ্যক অর্থে ব্যবহৃত হয়। এ তিনটি শব্দই (সাত, সত্তর, সাতশ) কুরআনে ‘বহুসংখ্যক’ অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে (৯:৮০, ১৫:৪৫)। অন্যস্থানে ‘সাত আকাশ’-এর স্থলে ব্যবহৃত হয়েছে ‘সাত পর্যায়’। ১৯৮৮ টীকা দ্রষ্টব্য।
৫৬। ‘সাউওয়াহু’ অর্থ, সে একে মসৃণ ও সুসামঞ্জস্য করল, সকল অংশের সংযোজনকে এমন সামঞ্জস্যপূর্ণভাবে মেলালো যে, তা সুন্দর ও সুবিন্যস্ত হয়ে গেল। সে দক্ষতার সঙ্গে উপযুক্তভাবে একে গড়ল। সে একে প্রয়োজন অনুযায়ী যথাযোগ্য করে নিল। সে একে পূর্ণতা দান করল। সে একে ভালো ও সঠিক অবস্থায় স্থাপন করল (লেইন)।
৫৬-ক। সূর্য, চন্দ্র এবং আকাশের অন্যান্য গ্রহ-উপগ্রহ ইত্যাদি মানুষের জন্য পরম উপকারী। আধুনিক বিজ্ঞান এ ব্যাপারে বহু কিছু আবিষ্কার করেছে এবং করতে থাকবে, যা দিয়ে কুরআনের ‘সর্বময় জ্ঞানের’ সত্যতা উপলব্ধি করা যাবে। এ জগতের বস্তুনিচয়ের বহু গুণাগুণ যা পূর্বে অজানা ছিল তা দিন দিন বিজ্ঞানের কল্যাণে আমরা জানতে পারছি। যে-সব বস্তুকে আমরা অপ্রয়োজনীয় বলে মনে করতাম আজ তা মানুষের জন্য অতি কল্যাণকর বলে সাব্যস্ত হচ্ছে।