১

الفاتحة

সূরা আল্ ফাতেহা

Al-Fatihah

মক্কী ৭ আয়াত ১ রুকু পারা ১

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৭ আয়াত এবং ১ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র১,২ নামে,৩ যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়৪।
১। ‘আল্লাহ’ সেই পরম অস্তিত্বের বা সত্তার নাম, যিনি পূর্ণতম গুণাবলীর একমাত্র স্বত্বাধিকারী এবং ধারণাতীতভাবে ত্রুটি-মুক্ত। আরবী ভাষায় ‘আল্লাহ্’ শব্দটি অন্য কোন সত্তা বা বস্তুর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয় না। অন্য কোন ভাষাতেই সেই উচ্চতম সত্তার এরূপ স্বতন্ত্র নামবাচক কোনও বিশেষ্য পদ নাই। অন্যান্য ভাষায় তাঁহার যে নামগুলি আছে, সেগুলির সবই গুণবাচক বা বর্ণনাবাচক, সেগুলি বহুবচনেও ব্যবহৃত হয়। কিন্তু ‘আল্লাহ’ শব্দটি কখনও বহুবচনে ব্যবহৃত হয় না। ‘আল্লাহ্’ একটি মৌলিক বিশেষ্য। ইহা কোনও সাধিত শব্দ নহে। ইহা কোন গুণ-প্রকাশক বিশেষণ রূপেও ব্যবহৃত হয় না। বাংলা ভাষায় ইহার কোনও প্রতিশব্দ না থাকাতে, অনুবাদের সবটাতে ‘আল্লাহ্’ শব্দই রাখা হইয়াছে। আরবী ভাষার প্রসিদ্ধ ভাষাবিদ পণ্ডিতেরা এই অভিমতকে সমর্থন করেন। সর্বাপেক্ষা নির্ভুল অভিমত হইল, ‘আল্লাহ্’ নামবাচক বিশেষ্য; ইহা একমাত্র ঐ সত্তারই নাম যিনি স্বয়ম্ভু, অনিবার্যরূপে অস্তিত্ববান, স্বনির্ভর সর্বগুণাধার। ‘আল্লাহ্’ শব্দের ‘আল্’ অবিভাজ্য; ইহা আল্লাহ্ শব্দেরই অবিচ্ছেদ্য অংশ (মুফরাদাত, আকরাব ও লেইন)।
২। ‘ইসম’ অর্থ নাম বা গুণ (আক্‌রাব)। এখানে ইহা উভয় অর্থেই ব্যবহৃত হইয়াছে। একই সাথে ইহা, সৃষ্টিকর্তার মূল নাম ‘আল্লাহ্’-এর সহিত ব্যবহৃত হইয়াছে এবং আল্লাহ্‌র গুণ ‘আর্‌-রাহমান’ (অযাচিত-অসীম দাতা) ও ‘আর্‌-রহীম’ (পরম দয়াময়)-এর সহিতও ব্যবহৃত হইয়াছে।
৩। আরবী ভাষায় ‘বা’ অব্যয়টি নানা অর্থে ব্যবহৃত হইয়া থাকে; এখানে ‘সহিত’ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। ‘বা’ + ‘ইসম’ মিলিয়া, গঠিত যুগ্ম শব্দ ‘বিস্‌মে’, যাহার অর্থ ‘নামের সহিত’। আরবী বাক্‌ধারা অনুযায়ী, ‘বিস্‌মিল্লাহ্’ কথাটির পূর্বে কিছু কথা উহ্য রহিয়াছে- যেমন ‘ইক্‌রা’ (পড়) ‘আক্‌রাউ’ (আমি পড়ি), ‘নাকরাউ’ (আমরা পড়ি); কিংবা ‘ইশ্‌রা’ (শুরু কর); ‘আশ্‌রাউ’ (আমি শুরু করি), ‘নাশরাউ’ (আমরা শুরু করি)। অতএব, উহ্য শব্দগুলিকে লইয়া ‘বিসমিল্লাহ্’র অর্থ ‘আল্লাহ্‌র নামের সহিত বা আল্লাহ্‌র নামে পড় অথবা আল্লাহ্‌র নাম লইয়া পড়’, ‘আমি বা আমরা আল্লাহ্‌র নাম লইয়া পড়ি’, ‘আমি বা আমরা আল্লাহ্‌র নাম লইয়া আরম্ভ করি।’ ‘বিসমিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহীম’ এর নিকটতম অর্থ প্রকাশক বাংলা অনুবাদ হইবে, ‘আল্লাহ্‌র নাম লইয়া (আরম্ভ করিতেছি) যিনি অযাচিত-অসীম দাতা এবং পুনঃ পুনঃ দয়া প্রদর্শনকারী, বার বার রহমকারী, পরম দয়াময়’ (বাহ্‌রে মুহীত, ফাত্‌হুল বায়ান)।
৪। ‘আর্‌ রাহমান (অযাচিত অসীম দাতা) এবং ‘আর্‌ রাহীম’ (পরম দয়াময়) এই উভয় শব্দ একই ‘রাহেমা’ ধাতু হইতে উৎপন্ন। ‘রাহেমা’ অর্থ সে দয়া প্রদর্শন করিল; সে ক্ষমা করিল। ‘রহমত’ শব্দের মধ্যে দুইটি ভাব আছেঃ একটি ভাব হইল ‘রিক্‌কাত’ দয়ার্দ্রতা ও কোমলতার ভাব, আর অপরটি হইল ‘ইহ্‌সান’ বা পরোপকারের ভাব (মুফরাদাত)। ‘আর্‌ রাহমান’ শব্দটি ‘ফা’লান ওজনে এবং ‘আর্‌ রাহীম’ শব্দটি ‘ফায়ীল’ ওজনে আসিয়াছে। আরবী ভাষার নিয়ম ইহাই যে, মূল শব্দের সহিত যতবেশী অক্ষর যুক্ত হইবে, ততই ইহার অর্থের ব্যাপকতা বা গভীরতা বৃদ্ধি পাইবে (কাশ্‌শাফ)। ‘ফা’লান ওজনের শব্দে পূর্ণতা ও ব্যাপকতা থাকে এবং ‘ফায়ীল’ ওজনের শব্দে ক্রিয়ার পৌনঃপুণিকতা ও বদান্যতা প্রকাশ পায় (মুহিত)। অতএব, এই হিসাবে, ‘আর্‌-রাহমান’ দ্বারা সারাবিশ্ব পরিবেষ্টনকারী দয়া বুঝায়; এবং ‘আর্‌ রাহীম’ দ্বারা সেই দয়াকে বুঝায় যা সীমিত হইলেও বার বার প্রদর্শন বুঝায়। উপরোক্ত অর্থের আলোকে ‘আর্ রহমান’ ঐ সত্তাকে বুঝায় যিনি অযাচিত ভাবে ও ব্যাপকভাবে, কাহারও সাধনা বা কর্মের সহিত সম্পর্ক-শূন্য রূপে সকল সৃষ্টির প্রতিই সমভাবে কৃপা বর্ষণ করিয়া থাকেন এবং আর্‌ রাহীম দ্বারা ঐ সত্তাকে বুঝায় যিনি মানুষের কাজের বিনিময়ে, সৎকাজের পুরস্কার স্বরূপ দয়া-দাক্ষিণ্য দেখাইয়া থাকেন এবং ইহা বদান্যতার সহিত বার বার দেখান। ‘আর্‌ রাহমান’ শব্দটি কেবল মাত্র আল্লাহ্‌র জন্য প্রযোজ্য, কিন্তু ‘রাহীম’ শব্দটি দয়ালু মানুষের জন্যও ব্যবহৃত হইতে পারে। পূর্ববর্তী শব্দটি অবিশ্বাসী-বিশ্বাসী নির্বিশেষে সর্ব মানবকেই শুধু নহে, বরং সারা বিশ্বের সব সৃষ্টিকেই স্বীয় আওতার মধ্যে ধারণ করে। কিন্তু পরবর্তী (অর্থাৎ ‘রাহীম’) শব্দটি প্রধানতঃ বিশ্বাসীগণকে আওতাভুক্ত করে। মহানবী (সাঃ)-এর একটি বর্ণনা অনুযায়ী আল্লাহ্‌তা’লার ‘আর্‌ রাহমান’ এর গুণটির প্রকাশ সাধারণভাবে ইহকালের (নেয়ামত সমূহের) সহিত সম্পৃক্ত, এবং ‘আর্‌ রাহীম’-এর গুণটির প্রকাশ পরকালের (নেয়ামত সমূহের) সহিত সম্পৃক্ত (মুহিত)। ইহা দ্বারা বুঝা যায়, যেহেতু এই বিশ্ব (ইহকাল) মানুষের জন্য এক বিরাট কর্মক্ষেত্র এবং পরকাল তাহার কর্মের সবিশেষ ফল প্রাপ্তির স্থান, সেই হেতু ‘আর্‌ রাহমান’ মানুষের কর্তব্য সম্পাদনের উপযোগী সব বস্তু ইহজগতে সরবরাহ করেন এবং ‘আর্‌ রাহীম’ রূপে পরকালে ফলপ্রাপ্তির ব্যবস্থা করিয়া থাকেন। যাহা কিছু আমাদের প্রয়োজন এবং যাহা কিছু আমাদের জীবন ধারণের জন্য আবশ্যক, উহার সব কিছুই বিনা পরিশ্রমে, বিনা যোগ্যতায় ও বিনা চাওয়ায় আমাদের জন্মের পূর্ব হইতেই, শুধু ঐশী অনুগ্রহ স্বরূপ, আমাদের জন্য মওজুদ থাকে। তবে, পরকালে যে সকল ঐশী আশীর্বাদ মওজুদ রহিয়াছে, তাহা ইহকালীন কাজের পুরস্কার স্বরূপ আমাদিগকে আপন আপন যোগ্যতানুসারে দেওয়া হইবে। ইহা দ্বারা এই কথাই বুঝা যায় যে, ‘আর্‌ রাহমান’ হইলেন সেই মহান দাতা যিনি আমাদের জন্মের পূর্বেই আমাদের জন্য সব কিছুই দিয়া রাখিয়াছেন, ‘আর্‌-রাহীম’ হইলেন সেই কল্যাণবর্ষণকারী যিনি কাজের বিনিময়ে পুরস্কার দান করেন। ‘বিসমিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহীম’ কুরআনের প্রতিটি সূরার (অধ্যায়ের) প্রথম আয়াত, অবশ্য সূরা তওবা বা বরাআত ছাড়া। তবে, সূরা ‘বরাআত’ সূরা ‘আনফালের’ বর্দ্ধিত অংশবিশেষ, স্বাধীন ও পৃথক সূরা নহে। ইবনে আব্বাস হইতে বর্ণিত হইয়াছে যে, যখনই কোন নূতন সূরা নাযেল হইত, তখনই বিসমিল্লাহ্‌ আয়াতটি প্রথমে আসিত। বিস্‌মিল্লাহ্ না আসা পর্যন্ত রসূলুল্লাহ (সাঃ) জানিতে পারিতেন না যে, নূতন সূরা আরম্ভ হইয়াছে (দাউদ)। ইহাতে বুঝা যায় (১) ‘বিসমিল্লাহির রাহ্‌মানির রাহীম’ আয়াতটি কুরআনেরই অংশ, অতিরিক্ত কোন কিছু নহে, (২)সূরা ‘বরাআত’ স্বাধীন সূরা নহে। হযরত ইবনে আব্বাসের বর্ণনা সেই সকল লোকের ধারণাকে খণ্ডন করে, যাহারা বলেন, ‘বিসমিল্লাহ্’ কেবল মাত্র সূরা ফাতেহার অংশ, অন্যান্য সূরার অংশ নহে। হযরত রসূল করীম (সাঃ) ইহাও বলিয়াছেন যে, ‘বিস্‌মিল্লাহ্’ কুরআনের প্রতিটি সূরারই অংশ (বুখারী এবং কুৎনী)। প্রতিটি সূরার প্রারম্ভে ‘বিস্‌মিল্লাহ্’ ব্যবহারের তাৎপর্য হইতেছেঃ কুরআন ঐশী জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার, আল্লাহ্‌র বিশেষ অনুগ্রহ ছাড়া সেই জ্ঞানের ধারে কাছে পৌঁছানো কাহারও পক্ষে সম্ভব নয়। ‘পবিত্রগণ ছাড়া কেহ ইহাকে স্পর্শ করিবে না’ (৫৬ঃ৮০)। সেই কারণেই, প্রতিটি সূরার প্রারম্ভে ‘বিস্‌মিল্লাহ্’ সংযুক্ত করিয়া মুসলমানদিগকে স্মরণ করানো হইয়াছে যে, কুরআনে বিধৃত ঐশী জ্ঞানভাণ্ডারে প্রবেশলাভ করিতে হইলে এবং ইহা হইতে প্রকৃত উপরকার লাভ করিতে হইলে, তাহাদিগকে কেবল পবিত্র হৃদয় লইয়া অগ্রসর হইলেই চলিবে না, বরং পদে পদে অতিশয় মিনতির সহিত আল্লাহ্‌তা’লার সাহায্যও চাহিতে হইবে। ‘বিসমিল্লাহ’ আয়াতটি আরও একটি প্রয়োজনীয় কার্য সম্পাদন করে—ইহাতে প্রত্যেক সূরার অর্থের ও তাৎপর্যের চাবিকাঠি রহিয়াছে। কেননা, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়াদি, কোনও না কোনও ভাবে, প্রত্যক্ষভাবে বা পরোক্ষভাবে আল্লাহ্‌তা’লার মৌলিক গুণ ‘রাহমানীয়ত’ (অযাচিত-অসীম দান) বা ‘রাহীমিয়ত’ (বার বার দয়া প্রদর্শন)-এর সাথে সম্পর্কিত। এইরূপে, প্রত্যেক সূরাই বস্তুতঃ ‘বিস্‌মিল্লাহ্’ আয়াতে বর্ণিত আল্লাহ্‌তা’লার মূল-গুণাবলীর সবিস্তার ব্যাখ্যা ও বিবরণ মাত্র। অনেক সময় তর্ক উত্থাপন করা হয় যে, ‘বিসমিল্লাহ্’ কথাটি সূত্র হিসাবে পূর্ববতী ধর্মগ্রন্থ হইতে ধার করা হইয়াছে। সেল বলেন, ইহা যেন্দাবেস্তা হইতে অনুকরণ করা হইয়াছে। আর প্রাচ্যবিদ রড্‌ওয়েল বলেন, ইসলাম-পূর্ব আরবগণ ইহা ইহুদীদের নিকট হইতে ধার করিয়াছিল এবং পরে তাহা কুরআনের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছে। এই দুইটি অভিমতই স্পষ্টতঃ ভুল। প্রথম কথা হইল, মুসলমানেরা কখনও দাবী করেন নাই যে, এই সূত্রটি, এই আকারে বা অন্য আকারে, কুরআন অবতরণের পূর্বে মানুষের অজানা ছিল। দ্বিতীয়তঃ এইরূপ তর্ক উঠানোও ঠিক নয় যে, যেহেতু এই সূত্রটি কোনও না কোন আকারে ইসলাম-পূর্ব আরবেরা, কুরআন অবতরণের আগেই কিছুদিন ব্যবহার করিয়াছে, অতএব, ইহা ঐশী-বাণী হইতে পারে না। বস্তুতঃ, কুরআনেই উল্লেখ আছে যে, সুলায়মান (আঃ) সাবার রাণীর কাছে যে পত্র লিখিয়াছিলেন, তাহা এই ‘বিসমিল্লাহ্’ দিয়াই আরম্ভ করিয়াছিলেন (২৭ঃ৩১)। মুসলমানেরা যাহা দাবী করেন এবং যে দাবীকে কেহই অস্বীকার করিতে পারে নাই, তাহা এই যে, কুরআনই একমাত্র ধর্মগ্রন্থ যাহা ‘বিসমিল্লাহ্’ সূত্রটিকে সর্বোত্তমভাবে ব্যবহার করিয়াছে, পূর্ববর্তী কোনও ধর্মগ্রন্থ এইরূপ যথোপযুক্ত ভাবে ইহার ব্যবহার করে নাই। এই কথা বলাও মারাত্মক ভুল যে, ইসলাম-পূর্ব আরবগণ এই সূত্রটির ব্যবহার অহরহ করিত, কেননা ইহা সকলেরই জানা কথা যে, তাহারা আল্লাহ্‌কে ‘আর্‌ রাহমান’ নামে আখ্যায়িত করাকে ঘৃণার কাজ মনে করিত। যাহা হউক, যদি এইরূপ সূত্র পূর্বেও প্রচলিত ছিল বলিয়া মনে করা হয়, তাহাতে কুরআনেরই সত্যতা সাব্যস্ত হয়, যেহেতু কুরআনই বলে, এমন জাতি নাই, যাহাদের মধ্যে ঐশী-শিক্ষাদাতা পাঠানো হয় নাই (৩৫ঃ২৫); আরও বলে, পূর্বেকার অবতীর্ণ গ্রন্থাবলীর সকল চিরস্থায়ী সত্য ও স্থায়ী শিক্ষামালা কুরআনে সঞ্চিত করা হইয়াছে (৯৮ঃ৪)। অবশ্যই কুরআনে আরও বহু কিছু নূতন ভাবে সংযোজিত হইয়াছে। তবে যাহা কিছু অন্যান্য ধর্মগ্রন্থ হইতে প্রাপ্ত হইয়াছে, কুরআন সেইগুলিকে উন্নতরূপ দিয়াছে ও অধিকতর উন্নত পর্যায়ে অভিষিক্ত করিয়া উন্নতভাবে ব্যবহারোপযোগী করিয়াছে।

اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ۙ﴿۲﴾

২
সকল৫ প্রশংসা৫-ক আল্লাহ্‌রই, যিনি জগৎসমূহের৬ প্রতিপালক,৬-ক
৫। কোন কিছুকে ‘নির্দিষ্ট’ করিতে আরবীতে ‘আল্‌’ ব্যবহৃত হয়, যেরূপ ইংরেজীতে ‘দি’ বা বাংলাতে ‘টি, টা, খানি’ খানা’ ইত্যাদি, শব্দের পূর্বে বা পরে যোগ করিয়া, বিষয় বা বস্তুকে নির্দিষ্ট করা হইয়া থাকে। তবে, ‘আল্‌’ দ্বারা বিষয় বা বস্তুর সর্বদিকই নির্দেশ করে অথবা ইহার ব্যাপকতা ও পূর্ণতাকে জ্ঞাপন করে, ইহার সকল স্তর ও পরিমাণকে অন্তর্ভুক্ত করে। যে বস্তুর কথা ইতিপূর্বে বলা হইয়াছে, ইহার পুনরুল্লেখের ক্ষেত্রেও ‘আল্‌’ সূচিত হয় কিংবা মনে ইহার ধারণা উপস্থিত থাকলে, সেক্ষেত্রেও ‘আল্‌’ দ্বারা শব্দটিকে বিশেষিত করা হয়।
৫-ক। আরবীতে দুইটি শব্দ ‘মাদ্‌হ’ ও ‘হাম্‌দ’, প্রশংসা ও ধন্যবাদ জ্ঞাপনার্থে ব্যবহৃত হয়। তবে মাদ্‌হ’ শব্দটি মিথ্যা প্রশংসার ক্ষেত্রেও প্রয়োগ করা হয়; কিন্তু হাম্‌দ শব্দটি একমাত্র সত্য প্রশংসার ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়। তাছাড়া ‘মাদ্‌হ’ সেইরূপ উপকারের ক্ষেত্রেও ব্যবহৃত হইতে পারে, যেখানে কর্তার কোন কর্তৃত্ব বা কৃতিত্ব নাই। কিন্তু ‘হাম্‌দ’ শুধু ঐসব ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয় যেখানে স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হইয়া সৎকাজ বা উপকার করা হয় (মুফরাদাত)। ‘হাম্‌দ’ শব্দের মধ্যে, একদিকে প্রশংসিতের গুণগান, মর্যাদাবৃদ্ধি ও উন্নত মহিমা প্রকাশ পায়, আর অন্যদিকে প্রশংসাকারীর বিনয়, নম্রতা ও অধীনতার মনোভাব নিহিত থাকে। অতএব, ‘হাম্‌দ’ শব্দই এইস্থলে সর্বাধিক উপযুক্ত শব্দ, যেখানে আল্লাহ্‌তা’লার সত্যিকার গুণাবলী, সত্যিকার মহিমা-কীর্তন, যথোচিত প্রশংসা করিতে ইচ্ছা করা হইয়াছে। সাধারণ পরিভাষায়, ‘হাম্‌দ’ শব্দটি এখন শুধু আল্লাহ্‌তা’লার প্রশংসার উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হইতেছে। বর্তমানে পরিভাষাগত ভাবে, ‘হাম্‌দ’ মানেই আল্লাহ্‌র প্রশংসা।
৬। ‘আল্-আলামীন’, ‘আলাম’ শব্দের বহুবচন। ‘আলাম’ শব্দ, ‘ইলম্‌’ ধাতু হইতে উৎপন্ন, আর ‘ইলম’ অর্থ ‘জানা’। ‘আলাম’ শব্দটা ঐ সকল জীব-জন্তু গাছপালা ও বস্তুনিচয়কে বুঝায়, যাহাদের সাহায্যে কেহ সৃষ্টিকর্তাকে জানিতে পারে (আকরাব)। ইহা কেবল সৃষ্ট জীব-জন্তু বা সৃষ্ট বস্তুনিচয়ের সমষ্টিকে বুঝায় না বরং ইহাদের বিভিন্ন শ্রেণী-বিন্যাসকেও বুঝাইতে পারে। যেমন ‘আলামুল্-ইনস’ বলিতে বুঝায় মানব জগত, ‘আলামুল-হায়ওয়ান’ বলিতে বুঝায় পশু-জগৎ, ইত্যাদি। ‘আল্-আলামীন’ বলিতে বুদ্ধিসম্পন্ন মানব ও ফিরিশ্‌তাকেই কেবল বুঝায় না, বরং সমস্ত সৃষ্ট বস্তুকেই বুঝায় (২৬ঃ২৪-২৯ ও ৪১ঃ১০)। সময় সময়, ইহা সীমিত অর্থেও ব্যবহৃত হয় (২ঃ১২৩)। এ স্থলে ইহা সর্বাপেক্ষা ব্যাপক অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে এবং আল্লাহ্ ছাড়া অন্য সব কিছুকেই বুঝাইয়াছে, অর্থাৎ বিশ্ব-চরাচরের সবকিছুসহ চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্র যাহা কিছু বিশ্ব সৃষ্টিতে আছে, তাহারা সবই ‘আলামীন’-এর অন্তর্ভুক্ত।

‘সকল প্রশংসাই একমাত্র আল্লাহ্‌র’ এই বাক্যটি, ‘আমি আল্লাহ্‌র প্রশংসা করি’ বাক্য হইতে অনেকগুণ বেশী ব্যাপক ও গভীর। কারণ, মানুষ তাহার সীমিত জ্ঞানানুযায়ী আল্লাহ্‌কে প্রশংসা করিতে পারে। কিন্তু ‘সমস্ত প্রশংসাই আল্লাহ্‌র’ বলাতে, এই বাক্যের মধ্যে, মানুষের জ্ঞাত প্রশংসা ত থাকেই, তাহার অজ্ঞাত অজানা প্রশংসাও অন্তর্ভুক্ত হইয়া যায়। আল্লাহ্ সব সময় ও সর্বাবস্থায় প্রশংসার যোগ্য, মানুষের অপূর্ণ জ্ঞান বা চেতনায় তাহা বুঝা যাউক বা না যাউক, মানুষের উপলব্ধিতে তাহা ধরা পড়ুক বা না পড়ুক। সর্বোপরি ব্যাকরণগতভাবে, হাম্‌দ শব্দটি অসমাপিকা ক্রিয়া বিশেষ। অতএব, আল্লাহ্‌ সেই ক্রিয়ার কর্তা বা কর্ম উভয়ই হইতে পারেন। কর্তা হইলে, অর্থ হইবে আল্লাহ্‌ই সত্যিকার প্রশংসা করিবার একমাত্র অধিকারী। আর কর্মকারক হইলে, অর্থ দাঁড়াইবে, সকল প্রকারের সত্য ও পরিপূর্ণতাপ্রাপ্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহ্‌তা’লারই প্রাপ্য। ‘আল্‌’ অর্থ ৫ টীকায় দেখুন।

এই আয়াতে বিশ্বের ক্রমোন্নয়ন বা বিবর্তন ধারার কথা বলা হইয়াছে অর্থাৎ প্রত্যেক বস্তুই ক্রমোন্নয়নের ধারায় পর্যায়ক্রমে স্তর হইতে স্তরান্তরে উন্নতি লাভ করে, রাব্ব্‌ হইলেন তিনিই যিনি সৃষ্টি করেন, বর্দ্ধিত করেন ও পর্যায়ক্রমে উন্নতি দান করেন। ইহাতে এই কথাও বুঝা যায় যে, বিবর্তন ও ক্রমোন্নয়ন আল্লাহ্‌র প্রতি বিশ্বাসের পরিপন্থী নয়। কিন্তু এখানে যে বিবর্তনের কথা বলা হইয়াছে তাহা, সাধারণভাবে প্রচলিত বিবর্তনবাদ (যাহাকে ইংরেজীতে বলা হয় থিওরী অব ইভলিউশন) নহে। এই আয়াত হইতে বুঝা যায়, সীমাহীন উন্নতির জন্যই মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে, কারণ ‘রাব্বুল আলামীন’ শব্দগুলিতে এই কথা নিহিত রহিয়াছে যে, আল্লাহ্‌তা’লা প্রত্যেক বস্তুকে নিম্ন পর্যায় হইতে উচ্চ পর্যায়ে উন্নীত করেন। আর এইরূপ করা তখনই সম্ভব যখন এক উন্নত স্তরের পরে আরো উন্নত স্তর থাকে এবং এইভাবে অশেষ স্তর থাকে।
৬-ক। ‘রাব্বা’ অর্থ সে কর্মসম্পাদন করিল; সে বিষয়টি বা বস্তুটিকে বৃদ্ধি করিল, ইহার উন্নতি সাধন করিয়া উচ্চ পর্যায়ে পৌঁছাইল ও পূর্ণ করিল, সে প্রতিপালন ও রক্ষণাবেক্ষণ করিল। এইভাবে ‘রাব্ব্‌’ অর্থ দাঁড়ায়, (ক) প্রভু, মনিব, সৃষ্টি-কর্তা; (খ) যে প্রতিপালন করে ও বৃদ্ধি সাধন করে; (গ) যে ক্রমানুয়ে পূর্ণতা দান করে ( মুফ্‌রাদাত ও লেইন)। রাব্ব্‌ শব্দ যখন অন্য একটি শব্দের সহিত যুগ্ম ভাবে ব্যবহৃত হয়, তখন আল্লাহ্ ছাড়াও মানুষ কিংবা অন্য কিছুর জন্যও ব্যবহৃত হইতে পারে।

الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ۙ﴿۳﴾

৩
অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়৭
৭। ‘বিসমিল্লাহ্’ আয়াতে, ‘আর্‌-রাহমান’ ও ‘আর্-রাহীম’ গুণ দুইটি, সূরা ‘ফাতেহা’র অর্থ বুঝিতে চাবিকাঠির মত কাজ করিয়া থাকে। এইখানে এইগুলি পুনরুল্লেখের একটি অতিরিক্ত উদ্দেশ্য আছে। মধ্যবর্তী পর্যায়ে ব্যবহৃত হইয়া ইহারা ‘রাব্বু ল আলামীন’ ও ‘মালিকে ইয়াওমিদ্দীন’ গুণদ্বয়ের মধ্যে সংযোগ সাধন করিয়াছে।

مٰلِکِ یَوۡمِ الدِّیۡنِ ؕ﴿۴﴾

৪
বিচার৮ দিবসের৯ মালিক।১০
৮। ‘দীন’ মানে প্রতিদান বা পুরস্কার; বিচার বা হিসাব-নিকাশ; রাজত্ব বা শাসনকর্তৃত্ব; অনুবর্তিতা, ধর্ম ইত্যাদি (আকরাব, লেইন)। আল্লাহ্‌তা’লার চারিটি গুণ, যথা সমগ্র বিশ্বের প্রভু’, ‘অযাচিত-অসীম দাতা’, ‘পরম দয়াময়’ এবং ‘বিচার দিনের মালিক’—এই চারিটিই আল্লাহ্‌তা’লার মূল বা আদি গুণ। আল্লাহ্‌তা’লার অন্যান্য গুণাবলী, এই চারিটি মূল গুণের ব্যাখ্যা বা শাখা-প্রশাখা মাত্র। অন্য গুণগুলি এই চারিটি গুণের বিশ্লেষণকারী। এই চারিটি মৌলিক গুণ, চারিটি স্তম্ভ স্বরূপ, যাহার উপর আল্লাহ্‌র আরশ বা আসন স্থাপিত। যে ধারাবাহিকতায় এই চারিটি গুণের উল্লেখ করা হইয়াছে তাহা, মানুষের কাছে আল্লাহ্‌তা’লা যে পর্যায়ক্রমে স্বীয় গুণাবলী প্রকাশ করেন, সেই পর্যায়ক্রমের উপর আলোকপাত করে। ‘রাব্বুল আলামীন’ (বিশ্বসমূহের প্রতিপালক, প্রভু) গুণের তাৎপর্য এই যে, মানব সৃষ্টির সাথে সাথে, তিনি প্রয়োজনীয় পরিস্থিতি ও পারিপার্শ্বিকতাও সৃষ্টি করিয়াছেন, যাহাতে মানুষ আধ্যাত্মিক উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করিতে পারে। ইহার পরে পরেই ‘আর-রাহমান’ গুণের ক্রিয়া আরম্ভ হয় যাহার মাধ্যমে, প্রকৃত পক্ষে, আল্লাহ্‌তা’লা মানুষকে তাহার নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির উপায় ও উপকরণসমূহ দান করেন। আর যখন মানুষ ঐসব উপায় উপকরণের সদ্ব্যবহার করে তখন ‘আর্‌-রাহীম’ গুণটি কার্যকরী হয় এবং তাহাকে কাজের জন্য পুরস্কৃত করা হয়। সর্বশেষে, ‘মালিকে ইয়াউমিদ্দীন’ (বিচার দিবসের মালিক বা সর্বাধিপতি) নামক গুণটি মানুষের পরিশ্রমের শেষ ও সার্বিক ফলাফল ঘোষণা করে এবং এইভাবে প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণতা লাভ করে। যদিও চরম ও পূর্ণ হিসাব-নিকাশ পরকালের বিচারের দিনেই সম্পন্ন হইবে, তথাপি ইহকালেও প্রতিফলন প্রাপ্তির প্রক্রিয়া চলিতেছে। তবে, তফাৎ এই যে, ইহকালে মানুষের কাজকর্মে বিচার ও পুরস্কার দান অন্য মানুষের দ্বারা, রাজা-বাদশা দ্বারা অথবা শাসকদের দ্বারা সম্পন্ন হয় এবং সেজন্য তাহাতে ভুল-ভ্রান্তির আশংকা থাকে। শেষ বিচারের দিনে, আল্লাহ্‌তা’লার একক কর্তৃত্ব ও প্রভুত্ব পূর্ণমাত্রায় প্রকাশ পাইবে এবং প্রতিদান ও পুরস্কার প্রদান একমাত্র তাঁহারই হাতে ন্যস্ত থাকিবে। কাজেই সেখানে ভুল-ভ্রান্তি থাকবে না, অযথা শাস্তি বা অযথা পুরস্কারও থাকবে না। ‘মালিক’ শব্দটি স্পষ্ট বলিয়া দিতেছে যে, তিনি সাধারণ বিচারকের মত নহেন, যিনি সংশ্লিষ্ট আইনের গণ্ডীর ভিতরে থাকিয়া, নির্দিষ্ট ও সীমাবদ্ধ আইন-কানুন মোতাবেক বিচার করেন এবং এইরূপ করিতে বাধ্য। মালিকের সর্বময় কর্তৃত্ব খাটাইয়া আল্লাহ্ যাহাকে ইচ্ছা যেকোনও ভাবে, যে কোন স্থানে, যে কোনও সময়, ক্ষমা করিতে পারেন, দয়া দেখাইতে পারেন। এখানে ‘দীন’ শব্দটির অর্থ যদি ‘ধর্ম’ গ্রহণ করা হয়, তাহা হইলে, অর্থ দাঁড়াইবে ‘ধর্মের সময়ের প্রভু’ যাহার তাৎপর্য হইবে যখন ধর্ম অবতীর্ণ হইবার সময় আসে, তখন মানুষ ঐশী শক্তি নিচয়ের ও ঐশী সিদ্ধান্ত সমূহের অপূর্ব ঘটনাবলী দেখিতে পায় এবং ঐশী নিদর্শনসমূহ চুর্তদ্দিকে ছড়াইয়া পড়ে। আবার ধর্মের স্রোতে যখন ভাঁটা আসে, তখন মনে হয়, এই বিশ্ব লাগামহীন, কর্তৃত্বহীন অবস্থায় আপনাআপনি যন্ত্রের মত চলিতেছে; সৃষ্টিকর্তা বা মালিকের ভূমিকা তখন ততটা দৃষ্টিগোচর হয় না।
৯। ‘ইয়াওম’ অর্থ অখণ্ড-অসীম সময়, সূর্য্যোদয় হইতে সূর্য্যাস্ত পর্যন্ত সময়, বর্তমান সময় (আকরাব)।
১০। ‘মালিক’ অর্থ সর্বময় কর্তা, যাহার কোনও কিছুর উপর সত্বাধিকার রহিয়াছে এবং উহাকে বা ইহার সহিত যদৃচ্ছা ব্যবহার করিতে পারে (আক্‌রাব)।

اِیَّاکَ نَعۡبُدُ وَاِیَّاکَ نَسۡتَعِیۡنُ ؕ﴿۵﴾

৫
আমরা তোমারই ইবাদত১১ করি এবং তোমারই নিকট সাহায্য১২ প্রার্থনা করি।
১১। ‘ইবাদাহ্‌’ অর্থ চূড়ান্ত বিনয়, পূরাপুরি বশ্যতা, আজ্ঞানুবর্তিতা ও সেবা। আল্লাহ্‌র একত্বে বিশ্বাস ও তাহা প্রকাশ করাও ‘ইবাদাহ্’ শব্দেরই অন্তর্ভুক্ত। এই শব্দটির অন্য একটি তাৎপর্য হইল, কোন বস্তুর ‘মোহর’ বা ছাপ গ্রহণ করা। এই তাৎপর্য মূলে, ‘ইবাদাহ’র অর্থ দাঁড়ায়, আল্লাহ্‌তা’লার গুণাবলীর ছাপ নিজের মাঝে গ্রহণ করিয়া তাহা ধারণ ও বর্দ্ধন করতঃ নিজের জীবনে প্রতিফলন করা।
১২। ‘আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত বা উপাসনা করি’ কথাটি, ‘একমাত্র তোমারই সাহায্য প্রার্থনা করি’ বাক্যটির পূর্বে স্থান পাইয়াছে। কেননা, আল্লাহ্‌তা’লার মহান গুণাবলী অবগত হইবার সাথে সাথে মানুষের মধ্যে প্রথম যে আবেগটি জাগিয়া উঠে, তাহা হইল, আরাধনার আবেগ, এই প্রথম আবেগের পরে পরেই, সাহায্য প্রার্থনার আবেগ জাগে মনে। মানুষ আল্লাহ্‌র উপাসনা করিতে চায়, কিন্তু তাহা করিতে গেলে, নানাভাবেই আল্লাহ্‌র সাহায্যের প্রয়োজন। এই আয়াতে ‘আমরা’ (বহুবচন) ব্যবহৃত হইয়াছে। ‘ইহা দুইটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের প্রতি ইঙ্গিত করে ; (ক) মানুষ পৃথিবীতে একাকী বাস করে না বরং সে সমাজের অংশ হিসাবেই পরিস্থিতি ও পরিবেশের সহিত মিলিয়া মিশিয়া বাস করে ; অতএব তাহার একা একা আল্লাহ্‌র পথে চলিলেই হইবে না, বরং অন্যদেরকে সঙ্গে লইয়া চলিতে হইবে ; (খ) যে পর্যন্ত মানুষের পারিপার্শ্বিকতা শুধরানো না হয়, সে পর্যন্ত মানুষ নিরাপদ থাকিতে পারে না। এইখানে একটি বিশেষ লক্ষ্যণীয় বিষয় রহিয়াছে। প্রথম চারটি আয়াতে ‘আল্লাহ্‌কে প্রথম পুরুষ (ব্যাকরণগতভাবে) দেখানো হইয়াছে। কিন্তু পঞ্চম আয়াতে আসিয়া হঠাৎ তাঁহাকে মধ্যম পুরুষে আহ্বান করা হইয়াছে। তাহার কারণ এই যে, প্রথম চারটি আয়াতে যে চারটি মহান ঐশী গুণের উল্লেখ হইয়াছে, সেগুলির ধ্যান-ধারণা ও প্রভাব মনে প্রবেশ করা মাত্র, মানুষের হৃদয় সেই মহামহিম স্রষ্টার দর্শন লাভের জন্য এত তীব্রভাবে ব্যাকুল ও উদ্বেলিত হইয়া উঠে এবং তাঁহার উপাসনার বাসনা এতই অপ্রতিরোধ্য হইয়া পড়ে যে, তাহার হৃদয়ের সেই আকুতিকে চরিতার্থ করার উচ্ছাসে ও ব্যগ্রতায় এখানে এই পঞ্চম আয়াতে আসিয়া, মনের অগোচরেই, প্রথম পুরুষ (Third Person) মধ্যম পুরুষে রূপান্তরিত হইয়া যায়।

اِہۡدِنَا الصِّرَاطَ الۡمُسۡتَقِیۡمَ ۙ﴿۶﴾

৬
তুমি আমাদিগকে সরল-সুদৃঢ় পথে১৩ পরিচালিত কর,
১৩। এই আয়াতের প্রার্থনাটি অপূর্ব! ইহা এত পূর্ণ ও সার্বিক যে, মানুষের সকল প্রকার প্রয়োজনের প্রতি লক্ষ্য রাখিয়া, প্রার্থনাটি শিখানো হইয়াছে। জাগতিক ও আধ্যাত্মিক, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক কল্যাণ-প্রাপ্তির চির-আকুতিকে এই প্রার্থনাটির প্রতি শব্দেই রূপায়িত করা হইয়াছে। ইহার চাইতে পূর্ণতর, উচ্চতর ও গভীরতর প্রার্থনা কল্পনায় আসিতে পারে না। বিশ্বাসীর মন আকুতি জানায় সরল-সুদৃঢ় পথ পাওয়ার জন্য, যে পথ সর্বাপেক্ষা স্বল্প সময়ে গন্তব্যে পৌঁছাইয়া দিবে। কখনও কখনও এমন হয়, যে মানুষকে সোজা সঠিক পথটিকে কিছু দূরত্ব হইতে দেখাইয়া দেওয়া হয়, কিন্তু তাহাকে আগাইয়া নিয়া ঐ পথে চালাইয়া দেওয়া হয় না। আর অগত্যা যদি চালাইয়া দেওয়াও হয় তথাপি সে শেষ পর্যন্ত ইহাতে স্থির থাকিতে পারে না বরং অন্য পথ ধরিয়া ফেলে। তাই মো’মেন বা বিশ্বাসী ব্যক্তি প্রার্থনা করে, আমাকে সরল-সুদৃঢ় পথ দেখাও এবং আমাকে ঐ পথে লইয়া গিয়া উহাতে চালাইতে থাক, যে পর্যন্ত না আমি সঠিক গন্তব্যে পৌঁছিয়া যাই—হেদায়াত শব্দের মধ্যেই এই তাৎপর্য রহিয়াছে। ‘হেদায়াত’ শব্দের অর্থ হইল সঠিক সোজা রাস্তা দেখানো (৭০ঃ১১), সেই রাস্তায় পৌঁছাইয়া দেওয়া (২৯ঃ৭০) এবং শেষাবধি সেই রাস্তায় চালাইয়া নেওয়া (৭ঃ৪৪), (মুফ্‌রাদাত এবং বাকা)। বস্তুতঃ মানুষ প্রতিটি পদক্ষেপেই আল্লাহ্‌র সাহায্যের মুখাপেক্ষী। তাই এই প্রার্থনাটি আল্লাহ্‌র কাছে প্রতিনিয়ত নিবেদন করা তাহার জন্য একান্ত জরুরী। যে পর্যন্ত আমাদের অভাব থাকিবে, প্রয়োজন ও চাহিদা অপূর্ণ থাকিবে এবং যে পর্যন্ত আমরা গন্তব্যস্থলে পৌঁছতে না পারি, সে পর্যন্তই আমরা প্রার্থনার মুখাপেক্ষী।

صِرَاطَ الَّذِیۡنَ اَنۡعَمۡتَ عَلَیۡہِمۡ ۬ۙ غَیۡرِ الۡمَغۡضُوۡبِ عَلَیۡہِمۡ وَلَا الضَّآلِّیۡنَ ﴿٪۷﴾

৭
তাহাদের পথে, যাহাদিগকে তুমি পুরস্কৃত১৪ করিয়াছ, কোপগ্রস্তদের (পথে) নহে, এবং পথভ্রষ্টদেরও১৫ (পথে) নহে।
সূরা আল্ ফাতেহা - রুকু ১
১৪। একজন সত্যিকারের মো’মেন বা বিশ্বাসী সত্য ও সোজা পথ পাইয়াই সন্তুষ্ট থাকিতে পারে না, কিংবা ধর্মপরায়ণতার কিছু কিছু কাজকর্ম করিয়াই ক্ষান্ত হইতে পারে না। সে বহু উচ্চস্তরে তাহার গন্তব্য নির্ধারণ করে এবং এমন উর্ধস্তরে গিয়া পৌছিতে চায়, যেখানে পৌছিলে আল্লাহ্ তাঁহার বান্দার উপরে আর্শীবাদ ও অনুগ্রহরাজি বর্ষণ করিতে আরম্ভ করেন। আল্লাহ্‌তা’লার মনোনীতগণের উপর বর্ষিত ঐশী অনুগ্রহ সমূহের দৃষ্টান্ত তাহার চোখের সম্মুখে ভাসিতে থাকে এবং তাহাকে প্রেরণা যোগায়। ইহাতেও সে পরিতৃপ্ত হয় না। সে অবিরাম চেষ্টা করে এবং প্রার্থনাও করিতে থাকে, যাহাতে সে নিজেও পুরস্কারপ্রাপ্ত ও মনোনীতগণের অন্তর্ভুক্ত হইয়া তাহাদেরই একজন বলিয়া গণ্য হইতে পারে। এই পুরস্কারপ্রাপ্তগণের উল্লেখ ৪ঃ৭০ আয়াতে রহিয়াছে। প্রার্থনাটি কোন বিশিষ্ট অনুগ্রহের জন্য নহে, সাধারণভাবে সকল অনুগ্রহের জন্যই। তবে, প্রার্থনাকারী আল্লাহ্‌তা’লাকে যখন সকাতরে ডাকে, তখন তাঁহার কাছে উচ্চতম আধ্যাত্মিক অনুগ্রহ লাভের প্রত্যাশায়ই প্রাণভরা মিনতি ও প্রার্থনা জানায়। ইহা একমাত্র আল্লাহ্‌তা’লার উপর নির্ভর করে, তিনি প্রার্থনাকারীকে কি ধরণের অনুগ্রহ দ্বারা ভূষিত ও পুরস্কৃত করিবেন এবং কে কোন্ ধরণের পুরস্কারের যোগ্য বলিয়া বিবেচিত হইবে।
১৫। সূরা ফাতেহার মাঝে শব্দ ও বাক্য বিন্যাসের এক অনাবিল সৌন্দর্য ও অনুপম সাদৃশ্য দেখিতে পাওয়া যায়। সূরাটি দুইভাগে বিভক্ত। প্রথমার্ধ আল্লাহ্ সম্পর্কিত এবং দ্বিতীয়ার্ধ মানুষ (বান্দা) সম্পর্কিত। প্রথমার্ধের অংশগুলি দ্বিতীয়ার্ধের অংশগুলির সাথে এক চমৎকার, নিগূঢ় যোগ সূত্রে বাঁধা। প্রথমার্ধের সর্বগুণাধার ‘আল্লাহ্‌’ নামটির সাথে, দ্বিতীয়ার্ধের মানবাকুতি ‘আমরা তোমারই ইবাদত করি’ বাক্যটির অপূর্ব সম্পর্ক সংযোগ রহিয়াছে। যখনই বিশ্বাসী ভক্ত ভাবে যে, কত মহামহিম, কত পূত-পবিত্র ত্রুটি-বিচুতি-বিবর্জিত, সর্বগুণের পরিপূর্ণ আধার সেই সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্, তখনই তাহার হৃদয়ের অন্তঃস্থল হইতে আপনা-আপনি ধ্বনিত হইয়া উঠে এই আওয়াজ, প্রভু! আমরা একমাত্র তোমারই ইবাদত করি। প্রথমার্ধের আল্লাহ্‌র গুণ ‘বিশ্ব সমূহের প্রতিপালক প্রভু’ এর সাথে যোগাযোগ রহিয়াছে দ্বিতীয়ার্ধের আমরা একমাত্র তোমরাই সাহায্য প্রার্থনা করি’ বাক্যটির। যখন মানুষ বুঝিতে পারে যে, আল্লাহ্‌তা’লাই তাহার ও বিশ্বসমূহের পালনকর্তা, বদ্ধনকর্তা ও উন্নতিদাতা, তখন সে কালবিলম্ব না করিয়া তাঁহার সাহায্যের আশ্রয় নিতে ধাবিত হয় এবং স্বতঃস্ফূর্ত বলিয়া উঠে ‘আমরা একমাত্র তোমরাই সাহায্য চাই। আল্লাহ্‌র ‘আর্‌-রাহমান’ গুণের সাথে সংযোগ আছে দ্বিতীয়ার্ধে এই মানব প্রার্থনার ‘আমাদিগকে সরল-সুদৃঢ় পথে চালিত কর’। ‘আর্‌-রাহমান’ এর সংক্ষিপ্ত অর্থ হইল, ‘অসীম অনুগ্রহ বর্ষণকারী, যিনি অযাচিত ভাবে আমাদের প্রয়োজন মিটান।’ আল্লাহ্‌র এই গুণ স্মরণ হওয়ার সাথে সাথে, মানব মনে স্বাভাবিক ভাবেই সাধ জাগে, সে যেন অনিশ্চিত ও অন্ধকারময় জীবন পাড়ি দিবার জন্য সঠিক ও আলোক-দীপ্ত পথ প্রাপ্ত হয়, যাহা একমাত্র ‘আর্‌-রাহমানই’ নবী পাঠাইয়া তাহার মাধ্যমে ওহী দ্বারা প্রবর্তিত করিয়া থাকেন। প্রথমার্ধের ‘আর্‌-রাহীম’ গুণের সাথে (আর-রাহীম মানে, মানুষের কাজ কর্মের উত্তম পুরস্কারদাতা) দ্বিতীয়ার্ধের ‘ঐ সকল পুরস্কারপ্রাপ্তদের পথে চালাও’ বাক্যটির সম্বন্ধ রহিয়াছে। কেননা, ‘আর্‌-রাহীম’ই তাঁহার যোগ্য ও উপযুক্ত বান্দাগণের উপর পুরস্কার ও অনুগ্রহ বর্ষণ করিয়া থাকেন। একই ভাবে আমরা প্রথমার্ধের আল্লাহ্‌র একটি গুণ জানিতে পারি যে, তিনি ‘বিচার দিনের মালিক’। আর দ্বিতীয়ার্ধে পাই এই ‘বিচারদিনের মালিকের’ প্রতি তাঁহার মানব-বান্দার মিনতি, ‘যাহারা তোমার কোপগ্রস্ত ও পথভ্রষ্ট হইয়াছে, আমাদিগকে তাহাদের পথে নিও না।’ মালিকের কাছে বান্দাকে কাজের হিসাব দিতে হইবে, এই কথা ভাবিলেই বান্দার মনে স্বভাবতঃ ভয়ের উদ্রেক হয়, কোথায় কি ভুল ধরা পড়ে। তাই সে মালিকের কাছে প্রথম হইতে প্রার্থনা করিতে থাকে যাহাতে তাহাকে ভ্রান্তির পথ হইতে এবং কোপগ্রস্ত হওয়ার পথ হইতে রক্ষা করেন। এই সূরার প্রার্থনাটির আরেকটি বৈশিষ্ট্য হইল এই যে, ইহা অতি স্বাভাবিক ভাবে মানুষের হৃদয়-তন্ত্রীতে ঝংকার তুলে। মানুষের প্রকৃতিতে আনুগত্য স্বীকারের প্রেরণা সৃষ্টির জন্য দুইটি মৌলিক চালিকাশক্তি নিহিত আছে। তার একটি হইল ভালবাসা এবং অপরটি হইল ভয়। কেহ আছে, ভালবাসায় অভিভূত হয়। আর কেহ কেহ আছে, যাহারা ভয় ও ভীতির মাধ্যমে বশে আসে। ভালবাসা নিশ্চয় মহত্তর গুণ। কিন্তু এমন লোকও থাকিতে পারে এবং নিশ্চয় আছে যাহারা ভালবাসা দ্বারা প্রভাবিত হয় না, তাহাদিগকে বশে আনার একমাত্র অস্ত্র ভয়। সূরা ফাতেহাতে মানব-প্রকৃতির এই উভয় চালিকা শক্তি ব্যবহার করা হইয়াছে। তাই, প্রথমে আল্লাহ্‌তা’লার ঐ গুণবাচক নামগুলির উল্লেখ রহিয়াছে যাহা ভালবাসাকে জাগাইয়া তুলে, যেমন ‘বিশ্বের সৃষ্টিকারী ও প্রতিপালন কারী, অযাচিত-অসীম দাতা এবং পরম দয়াময়।’ অতঃপর, ভালবাসা উদ্দীপক গুণাবলীর সীমাতে যাইয়া ‘বিচার দিনের মালিক’ নামটি উচ্চারিত হইয়াছে। ইহা মানুষকে স্বরণ করাইয়া দিতেছে যে, সে যদি ভালবাসা দ্বারা প্রণোদিত হইয়া আত্মশুদ্ধির পথে না চলে, তাহা হইলে তাহাকে আল্লাহ্‌তা’লার কাছে জবাবদিহির জন্য প্রস্তুত থাকিতে হইবে। এমনিভাবে ভয়কেও ভালবাসার পাশাপাশি একটি চালিকা-শক্তিরূপে ব্যবহারে লাগানো হইয়াছে। কিন্তু যেহেতু আল্লাহ্‌তা’লার রহমত—দয়ার গুণ তাহার অন্যান্য সকল গুণের উর্ধ্বে এবং অন্যান্য সকল গুণকে বেষ্টন করিয়া রহিয়াছে, তাই তাঁহারই এই ভীতি উৎপাদক মৌলিক গুণটিও তাঁহার দয়া-দাক্ষিণ্যের গুণে রঞ্জিত। বস্তুতঃ আল্লাহ্‌র করুণারাশি, তাহার ক্রোধকে ডিঙ্গাইয়া যায়। ‘মালিক’ শব্দটির মধ্যে ইহার আভাষ পাওয়া যায় এবং আমরা স্বস্তি বোধ করি যে, আমরা আইন-কানুনের অন্ধ অনুসারী একজন বিচারকের সম্মুখে হাযির হইতেছি না, বরং সর্বময় ক্ষমতার একচ্ছত্র অধিকারী এক শাহানশাহের সম্মুখে হাযির হইতেছি, যাহার ক্ষমা করার ক্ষমতা রহিয়াছে এবং যেখানে শাস্তিদান করা সম্পূর্ণরূপে অপরিহার্য সেখানে তিনি শাস্তি প্রদান করিবেন। মোট কথা, সূরা ফাতেহা আধ্যাত্মিক জ্ঞানের এক অফুরন্ত ভাণ্ডার। মাত্র সাতটি আয়াতের একটি সূরা, কিন্তু ইহা জ্ঞান ও প্রজ্ঞার একটি সত্যিকার খনি। ইহা উম্মুল কিতাব বা গ্রন্থ-জননী বলিয়া আখ্যায়িত হইয়াছে। জননী যেমন আপন জঠরে সন্তানকে তাহার সকল অবয়বসহ ধারণ করেন, তেমনি সূরা ফাতেহার মধ্যে, বিস্তীর্ণ কুরআনের সারাংশ বিধৃত রহিয়াছে। সর্বপ্রকার মঙ্গল ও কল্যাণের উৎস আল্লাহ্‌র নাম নিয়া আরম্ভ করিয়া, এই সূরাটি প্রথমেই সেই আল্লাহ্‌তা’লার মৌলিক গুণাবলীর উল্লেখ করিয়াছে, যথাঃ (১) তিনি বিশ্বসমূহের সৃষ্টিকর্তা ও পালনকর্তা, (২) তিনি অযাচিত অসীম দাতা যিনি মানুষের জন্মের পূর্বেই, মানুষের চেষ্টা প্রচেষ্টা ব্যতিরেকে, তাহার জীবন ধারণের উপযোগী প্রয়োজনীয় উপায়-উপকরণাদির সরবরাহ নিশ্চিত করিয়াছেন; (৩) তিনি পরম দয়াময় যিনি মানুষের শ্রমের উৎকৃষ্টতম ফলোদয় ঘটান এবং তাহার শ্রমের তুলনায় বহুগুণ পুরস্কার ও বেশী বেশী ও বার বার প্রতিদান দিয়া থাকেন ও (৪) তিনি বিচার-দিনের একচ্ছত্র মালিক ও অধিপতি, যাঁহার কাছে প্রত্যেক মানুষকেই ইহকালীন কার্যাবলীর জন্য হিসাব দিতে হইবে, তিনি দুষ্কৃতকারীকে শাস্তি দিবেন বটে, কিন্তু বিচারকের আসনে বসিয়া নয় বরং সম্রাটের উচ্চাসনে বসিয়া। মালিকের শাস্তির মাঝে, বান্দার প্রতি তাহার যে স্বাভাবিক করুণা থাকে তাহাও একত্রিত হইয়া যায়। ক্ষমার মাধ্যমে সংশোধন ও সুফল লাভের সম্ভাবনা থাকিলে, মালিক বান্দাকে হয়ত ক্ষমাই করিবেন। ইসলাম ধর্মমতে, ইহাই আল্লাহ্‌র পরিচিতি, যাহা কুরআনের প্রারম্ভেই পেশ করা হইয়াছে। সেই আল্লাহ্‌তা’লার মহিমা, ক্ষমতা ও প্রভুত্বের যেমন কোনও সীমা পরিসীমা নাই, তেমনি তাঁহার করুণা, দয়া-দাক্ষিণ্য ও হিতৈষণারও কোন সীমা-পরিসীমা নাই। তাই মানুষের হৃদয় হইতে স্বতঃই উচ্চারিত হইয়া উঠে এই অপ্রতিরোধ্য ঘোষণা, ‘আমার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্ যেহেতু উচ্চ মৌলিক গুণের একক অধিকারী, অতএব, আমি একমাত্র তাঁহারই সেবায় নিজেকে সমর্পণ করিতে প্রস্তুত, কেবল প্রস্তুতই নহি বরং তাঁহার সেবার জন্য অধীরভাবে আগ্রহী। কিন্তু আল্লাহ্‌তা’লা জানেন যে মানুষ দুর্বল। সে ভুল করিতে পারে। তাই তিনি নিজেই দয়া পরবশ হইয়া তাঁহার বান্দাকে শিখাইয়া দিয়াছেন যে, সে যেন তাহার অগ্রযাত্রার পথে সকল উপায় উপকরণ লাভের জন্য এবং সকল বাধাবিপত্তি অপসারণের জন্য পদে পদে অবিরাম আল্লাহ্‌র সাহায্য যাচনা করে। সূরাটির শেষে আছে মানুষের সুদূর প্রসারী ও সর্বকল্যাণকর, পূর্ণতম প্রার্থনাটি, যে প্রার্থনাতে মানুষ তাহার সৃষ্টিকর্তার কাছে ইহাই চাহে যে, ইহলৌকিক ও পারলৌকিক, বর্তমান ও ভবিষ্যতের বস্তুগত ও অধ্যাত্মগত সার্বিক মঙ্গল প্রাপ্তির সরল-সুদৃঢ় পথটিতে যেন তাহাকে চালিত করা হয়। সে আল্লাহ্‌র কাছে কাতর স্বরে মিনতি করে, সে যেন বাধা-বিপত্তি অতিক্রম করিয়াই ক্লান্ত হইয়া না পড়ে বরং কৃতিত্বের সহিত আরও অগ্রসর হইয়া তাঁহার মনোনীতগণের অন্তর্ভুক্ত হয় এবং তাহাদের মতই অশেষ পুরস্কার ও অনুগ্রহরাজিতে ভূষিত হয়। সে আরো অনুনয় করে, সে যেন সরল-সুদৃঢ় এই পথটিতে অবিচল ভাবে চলিতেই থাকে যাহাতে সে তাহার প্রতিপালক প্রভু ও মালিকের নিকট হইতে নিকটতর হইয়া যাইতে পারে। যেরূপে পূর্ববর্তীগণের অনেকেই প্রভুর নৈকট্য লাভ করিয়াছিলেন, সেইরূপ সে-ও যেন নৈকট্য লাভ করিতে পারে। ইহাই কুরআনের উদ্বোধনী সূরার বিষয় বস্তু। ইহাই নানা ভাবে ও নানা আকারে পবিত্র গ্রন্থের সর্বত্র বারে বারে বিবৃত হইয়াছে।