البقرة
Al-Baqarah
ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।
শিরোনাম, অবতীর্ণ হওয়ার সময় ও প্রসংগ
এই সূরা যাহা ‘আল্ বাকারা’ নামে সমধিক পরিচিত, কুরআন শরীফের সর্ববৃহৎ সূরা। হিজরতের প্রথম চারি বৎসরের মধ্যেই এই সূরা মদীনায় অবতীর্ণ হয়। স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এই সূরার নামকরণ করেন। এই সূরার নামকরণের ব্যাপারে খুব সম্ভব ইহার ৬৮ থেকে ৭২ আয়াতে বর্ণিত বক্তব্যের প্রতি লক্ষ্য রাখা হইয়াছে, যাহাতে ইহুদীদের জাতীয় জীবনের একটি বিশেষ ঘটনা সংক্ষেপে উল্লেখিত হইয়াছে। দীর্ঘ দিন ধরিয়া ইহুদীরা মিশরে ফেরাউনদের ভূমিদাস ও ক্রীতদাস হিসাবে অত্যন্ত প্রতিকুল অবস্থার মধ্যে দিন যাপন করে। ফেরাউনরা ছিল গাভীর পুজারী এবং সাধারণতঃ অধীনস্থ প্রজাদের ক্ষেত্রে প্রভু শ্রেণীর আচার আচরণ অনুকরণের যে অন্ধ মোহ বিরাজ করে উহারই বশবর্তী মিশরীয়দের গাভী পূজার অভ্যাসটি ইহুদীদের মধ্যেও ধীরে ধীরে সংক্রামিত হয়। কালক্রমে, ইহুদীরাও গাভীকে শ্রদ্ধার চোখে দেখিতে থাকে এবং পুজণীয় দেবতা হিসাবে উহাকে অত্যন্ত প্রীতির সহিত গণ্য করে। হযরত মূসা (আঃ) যখন তাহাদেরকে একটি বিশেষ গাভী, যাহা তাহাদের উপাস্যের প্রতীক হিসাবে চিহ্নিত ছিল, যবহ করিতে বলিলেন, তখন তাহারা অযথা হৈ চৈ আরম্ভ করিয়া দিল। এই ঘটনারই উল্লেখ সূরাটির ৬৮ হইতে ৭২ আয়াত সমূহে বর্ণিত হইয়াছে। সূরা বাকারা ছাড়াও এই সূরার আরেকটি নাম হইল ‘আয্ যাহ্রা’ এবং ইহাকে এবং সূরা আলে ইমরানকে সম্মিলিতভাবে ‘আয্ যাহ্রাওয়ান’ বা দুইটি উজ্জ্বল আলোর টুকরা বলা হয় (মুসলিম)। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিয়াছেন, ‘প্রত্যেক জিনিষেরই একটি চূড়া বা অগ্রভাগ রহিয়াছে, আল্ কুরআনের চূড়া হইল আল্ বাকারা’ (তিরমিযি)। সূরা ফাতেহার অব্যবহিত পরে এই সূরাকে সন্নিবেশিত করার কারণ হইল এই যে, পাঠক সূরা ফাতেহা পাঠান্তে যে সব প্রশ্নের সম্মুখীন হয় উহার সঠিক উত্তর ইহাতে অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে। যদিও সার্বিক ভাবে সূরা ফাতেহার সহিত কুরআনের অন্যান্য সূরার সম্পর্ক রহিয়াছে তথাপি সূরা বাকারার সহিত ইহার বিশেষ সম্পর্ক এই কারণে যে,সূরা ফাতেহায় বর্ণিত প্রার্থনা আমাদিগকে সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত কর ……’ ও ইহা কবুলিয়তের উত্তম পন্থা এই সূরায় বর্ণিত হইয়াছে। বস্তুতঃ সূরা বাকারায় উপস্থাপিত দীর্ঘ বক্তব্যের মাধ্যমে আল্লাহ্র আয়াত বর্ণনা, কিতাব ও হিকমত শিক্ষা ও পবিত্রকরণের উপায় সমূহ নিয়া বিস্তারিত আলোচনা করা হইয়াছে (২: ১৩০) এবং ইহাতে অত্যন্ত সঠিক ও বিশদভাবে সূরা ফাতেহার উক্ত মহান প্রার্থনার জবাব প্রদান করা হইয়াছে।
বিষয়বস্তু
অনেক সময় বলা হয় যে,এই সূরাটি দিয়াই কুরআন মজীদ শুরু হইয়াছে, কেননা, এই সূরার শুরুতেই, ইহা একটি (সম্পূর্ণ) কিতাব, যাহাতে কোন সন্দেহ নাই বলিয়া উল্লেখ করা হইয়াছে। অন্য দিকে ইহার পূর্ববতী সূরা ফাতেহা সার্বিক বিবেচনায় সংক্ষিপ্ত কুরআন এবং কুরআনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে সর্বজন স্বীকৃত। অতএব, শিক্ষার পথনির্দেশিকা হিসাবে উভয় সূরার মধ্যেই যে সন্দেহাতীত জ্ঞান-ভাণ্ডার বিদ্যমান, এই বিষয়ে মতভেদের কোন অবকাশ নাই। অবশ্য সূরা ফাতেহার অনন্য বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে কুরআন নিজেই সাক্ষ্য প্রদান করিয়াছে (১৫ঃ৮৮)। এই বৃহৎ সূরাটির বিষয়বস্তু সংক্ষিপ্তাকারে ইহার ১৩০ আয়াতে প্রদত্ত হইয়াছে। উক্ত আয়াতে হযরত ইব্রাহীম (আঃ) মক্কাবাসীদের মধ্য হইতে একজন নবীর আবির্ভাবের জন্য আল্লাহ্র দরবারে বিনীত প্রার্থনা জানান, যিনি (আবির্ভূত হইয়া) উহাদের মধ্যে (১) আল্লাহ্র নিদর্শন বর্ণনা করিবেন, (২) পরিপূর্ণ শরীয়াত গ্রন্থের মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে চিরন্তন হেদায়াত প্রদান করিবেন, (৩) ইহাতে অন্তর্ভুক্ত জ্ঞান ও হিকমত শিক্ষাদান করিবেন, এবং (৪) জীবনের বিভিন্ন কর্মকাণ্ড পরিচালনায় এমন একটি সুষ্ঠু নীতি ও আদর্শের বাস্তবায়ন ঘটাইবেন যাহা তাহাদের জীবনে এক আধ্যাত্মিক পরিবর্তন আনয়ন করিবে এবং যাহার ফলে তাহারা এক মহৎ ও শক্তিধর জাতি হিসাবে সারা পৃথিবীর নেতৃত্ব প্রদানে সক্ষম হইবে। হযরত ইব্রাহীমের (আঃ) এই মহান প্রার্থনা যে চারিটি বিষয়কে কেন্দ্র করিয়া সংযুক্ত ছিল, সেই চারিটি বিষয়ই ক্রমানুসারে এই সূরায় বর্ণনা করা হইয়াছে। প্রথম ১৬৮টি আয়াতে আল্লাহ্র নিদর্শন বর্ণনা, ১৬৯ হইতে ২৪৩ আয়াত পর্যন্ত ধর্মপুস্তক ও হিকমত শিক্ষার প্রসঙ্গ এবং পরিশেষে ২৪৪ হইতে ২৮৭ আয়াত পর্যন্ত জাতীয় জীবনে সফলতার উপকরণ সম্পর্কিত নীতিমালা আলোচনা করা হইয়াছে। আল্লাহ্র নিদর্শন বর্ণনা সংক্রান্ত আয়াত সমুহ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সত্যতার যুক্তি হিসাবেও দেখানো হইয়াছে, এবং অনুরূপ ভাবে জ্ঞান ও হিকমত শিক্ষাকে শরীয়তের বিধিবিধান ও উহাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্যের আকারে এবং সর্বোপরি আধ্যাত্মিক পরিবর্তনের বিষয়টি জাতীয় উন্নতি ও সংহতির কাঠামোরুপে বর্ণনা করা হইয়াছে।
এই সূরাতে ৪০ টি রুকূ ও ২৮৭ টি আয়াত আছে। আল্লাহ্, ওহী ও পরকাল এই তিনটি মৌলিক বিষয়ে ঈমান রাখা এবং নামায এবং যাকাতরূপী দুইটি ব্যবহারিক বিধির বর্ণনার মাধ্যমে সুরাটি শুরু হইয়াছে—বাকী মূলতঃ এই নীতিমালা ও বিধি বিধানের ব্যাখ্যা হিসাবেই উপস্থাপিত হইয়াছে। হেদায়াত সংক্রান্ত প্রার্থনার জবাবে পবিত্র কুরআনের দাবী হইতেছে এই যে, ইহা (মানুষের জন্য) পরিপূর্ণ জীবন-বিধান, পূর্ববর্তী গ্রন্থগুলিতেযে সত্য অবতীর্ণ হইয়াছিল তাহা আরো সুস্পষ্ট ও অকৃত্রিম ভাবে ইহাতে সন্নিবেশিত হইয়াছে এবং ইহার সঠিক উপলব্ধির ভিত্তিতে মানুষ আধ্যাত্মিক সোপানের উচ্চতম শৃঙ্গে উন্নীত হইতে পারে। দ্বিতীয় রুকূতে এই ধরণের মৌখিক বিশ্বাস যাহা হদয়ের গভীরে প্রোথিত নয়, অত্যন্ত নিন্দনীয় এবং গ্রহণযোগ্য নয় বলিয়া বর্ণিত হইয়াছে। পবিত্র কুরআনের সত্যতা যাচাইয়ের মান ও নীতি নির্ধারণী বক্তব্য রাখা হইয়াছে তৃতীয় রুকূতে। এই লক্ষ্যে বস্তু জগতে ক্রিয়াশীল বিবর্তন প্রক্রিয়ার প্রতি বিশেষ ভাবে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে যাহা আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রেও সমভাবে দৃশ্যমান। অতঃপর,আধ্যাত্মিক সিলসিলার প্রথম সংযোগ স্থাপনকারী মানব হযরত আদম (আঃ)-এর প্রসঙ্গ বর্ণনা করা হইয়াছে, যাহার মাধ্যমে আল্লাহ্ তাঁহার ইচ্ছাকে প্রথম ধরাধামে অবতীর্ণ করেন। চতুর্থ রুকূতে (বিরুদ্ধবাদী কর্তৃক হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর বিরোধিতার প্রসঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে যে, যেইভাবে হযরত আদম (আঃ)-এর বিরোধিতা তাঁহার সত্যতার খ্যাতি বা মূল্যকে খাটো করিতে পারে নাই, তদ্রুপ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি আরোপিত অপবাদও তাঁহার সত্যতায় কোন কলঙ্ক লেপন করিতে পারিবে না। ৫ম রুকূ, হইতে ১৬শ রুকূ পর্যন্ত অর্থাৎ, পরবর্তী ১২ রুকূতে নূতন ওহী অবতরণের যৌক্তিকতা বর্ণিত হইয়াছে এবং হযরত আদম (আঃ)-এর মাধ্যমে আল্লাহ্ নিজেকে প্রকাশ সত্বেও বিশেষ করিয়া নূতন ওহী-ইল্হামের কি প্রয়োজন তাহা বর্ণনা পূর্বক এতদসংক্রান্ত আপত্তির খণ্ডন করা হইয়াছে। বর্ণিত হইয়াছে যে,আধ্যাত্মিক জগতে ক্রম বর্ধমান উৎকর্ষতা ও বিবর্তনের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়া আল্লাহ্তা’লা প্রতি যুগেই তাহার বাণীপ্রেরণ করেন এবং প্রত্যেকবাণী ইহার পূর্ববতী বাণী হইতে উন্নততর হইয়া থাকে। ঐশীবাণীর এই ধারায় একটি নূতন বিধান দিয়া আল্লাহ্তা’লা হযরত মূসা (আঃ)-কে প্রেরণ করেন। হযরত মূসা (আঃ)-এর পরে বনী ইসরাঈলীদের জন্য বহু নবী প্রেরিত হন এবংবনী ইসরাঈলীগণ তাহাদের অনেককেই অস্বীকার ও উৎপীড়ণ করে। ঐশী আদেশ নির্দেশের ক্রমাগত অস্বীকৃতি, পাপ ও অবিচারের ফলে ইসরাঈল জাতি ঐশী অনুগ্রহ হইতে বঞ্চিত হইয়া পড়ে। পরিণামে, নবুওয়াতের ধারা, বাইবেলের ভবিষ্যদ্বাণী অনুযায়ী বনী ইসরাঈল হইতে বনী ইসমাঈলের প্রতি স্থানান্তরিত হইয়া যায় এবং পরিপূর্ণ ও নির্ভুল শরীয়ত সহকারে মক্কার অনুর্বর ও মরুপ্রান্তরে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাব ঘটে। ইহাতে বনী ইসরাঈলগণ অত্যন্ত ক্রোধান্বিত হইয়া উঠে, যদিও নবুওয়াত হইতে বিচ্যুত হইবার জন্য তাহাদের নিজেদের অপকর্মই দায়ী ছিল এবং এইজন্য অন্যের প্রতি ক্রোধান্বিত হইবার তাহাদের কোন যুক্তি সঙ্গত কারণ ছিল না। তাহারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)- এর সাথে সর্বাত্মক বিরোধিতায় লিপ্ত হয় এবং তাঁহার উদ্দেশ্যকে বানচাল করিবার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে। কিন্তু পরিণামে তাহারা ব্যর্থ হয়, যেহেতু ঐশী পরিকল্পনার বিরোধিতা কোন যুগেই সাফল্যমণ্ডিত হয় নাই।
পরবর্তী দুই রুকূতে পূর্ববর্তী সকল নবীদের কিবলা পরিবর্তন করিয়া কেন তাহা কা’বায় স্থিরীকৃত হইল - সেই সম্পর্কে ইসরাঈলীদের বিভিন্ন আপত্তির জবাব প্রদান করা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে বলা হইয়াছে যে, প্রথমতঃ প্রার্থনার সময় কোন বিশেষ দিকে মুখ ফিরাইয়া দাঁড়ানো বা কোন স্থানকে কিবলা হিসাবে ঠিক করার মধ্যে কোন পুণ্য নাই, কিবলা সাধারণতঃ কোন সম্প্রদায়ের মধ্যে ঐক্যের প্রতীক হিসাবে কাজ করে। দ্বিতীয়তঃ হযরত ইসমাঈল (আঃ)-এর ভবিষ্যত বংশধরদের জন্য হযরত ইব্রাহীম (আঃ) যে সকাতর প্রার্থনা করিয়াছিলেন তাহাতে এই ভবিষ্যদ্বাণী ছিল যে, মক্কা একদিন তাহাদের জন্য একটি তীর্থস্থান ও কা’বা কিবলাহ হিসাবে প্রতিষ্ঠিত হইবে। ১৯ রুকূতে বলা হইয়াছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তাঁহার সত্য প্রচারে মোশরেকদের তরফ হইতে ঘোরতর বিরোধিতার সম্মুখীন হইবেন এবং মক্কা বিজয়ের পূর্ব পর্যন্ত এই বিরোধিতা চলিতে থাকিবে। ২০ রুকূতে এই অমোঘ সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে যে, পূর্বে বর্ণিত বিষয়াবলী কোন নিছক কল্পনা বা স্বপ্ন বিলাস নয়, ইহা চিরন্তন সত্য এবং আকাশ মণ্ডলী ও পৃথিবীর সৃষ্টি, দিবা রাত্রির পরিবর্তন ও অন্যান্য প্রাকৃতিক ঘটনাবলী ইহার সত্যতা প্রতিপন্ন করে। শুধু তাই নয়, প্রাকৃতিক নিয়মাবলীও আধ্যাত্মিক আইন-কানুনের মতই পরিচালিত হয় এবং ইহাতে ক্রমঃবিবর্তন প্রক্রিয়া ক্রিয়াশীল। একদিকে ইহা যেমন সত্য, ঠিক অনুরূপভাবে ইহাও সত্য যে, সমস্ত বিশ্বজগৎ সন্দেহাতীত ভাবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) এর অনুকূলে তাহাদের কাজকর্ম করিয়া যাইতেছে। ২১ রুকুর মাধ্যমে শরীয়তের বিধি-বিধানের বর্ণনা ও উহাদের অন্তর্নিহিত তাৎপর্য ব্যক্ত করা হইয়াছে এবং প্রথমেই বৈধ ও পবিত্র খাদ্য গ্রহণ সম্পর্কিত আদেশ প্রদান করা হইয়াছে। এই প্রসঙ্গে উল্লেখ্য যে, মানুষের বাহ্যিক কাজকর্ম তাহার মানসিক অবস্থার উপর নির্ভরশীল এবং এই মানসিক অবস্থা, সে যে খাদ্য গ্রহণ করে তাহা দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবান্বিত হয়। ২২ রুকুতে ইসলামী শিক্ষার সার সংক্ষেপ বর্ণনা করা হইয়াছে, যাহাতে আল্লাহ, পরকাল, ঐশী কিতাবসমূহ ও নবী-রসূলদের প্রতি বিশ্বাসস্থাপনের প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হইয়াছে। অন্যের প্রতি মঙ্গল সাধন করা, সালাত (নামায)কায়েম করা ও যাকাত প্রদান করা ইত্যাদিকেও সৎকর্মের অন্তর্ভুক্ত বিষয় হিসাবে বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহার সহিত দুঃখে দারিদ্রে ও বিপদে আপদে ধৈর্য ধারণ করা ও প্রতিশ্রুতি দিয়া তাহা পূর্ণ করার বিষয়ও বর্ণিত হইয়াছে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, আত্মীয় স্বজনকে বৈধ সাহায্য প্রদান এবং সামাজিক আইন-কানুন মানিয়া চলার প্রসঙ্গ এবং বিশেষ করিয়া উত্তরাধিকারীর সম্পত্তি বন্টন বা ওসীয়্যত করার বিষয়েও আলোচনা হইয়াছে। পরবর্তী রুকূতে ধর্ম সম্বন্ধীয় সাধনা বা আল্লাহ্প্রেমের অনুশীলন হিসাবে রোযার প্রসঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে। ২৪ ও ২৫ রুকূতে হজ্জের অনুষ্ঠান সম্পর্কিত বিভিন্ন নিয়ম-কানুনের বিষয় আলোচিত হইয়াছে যাহা মুসলমানদের জাতীয় ঐক্য ও সংহতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। ২৬ রুকূর মধ্যে রহিয়াছে শরীয়তের কতিপয় বিধি বিধানের দর্শনগত আলোচনা। আল্লাহ্র আদেশের মধ্যে যে কল্যাণ নিহিত থাকে উহার প্রতি বাহ্যিক ও অভ্যন্তরীণ উভয়বিধ আনুগত্যের প্রয়োজন, কেননা বাহ্যিক আচরণ অভ্যন্তরীণ পবিত্রতাকে প্রভাবিত করে। ইহার পর বলা হইয়াছে যে, মানুষ সাধারণতঃ এই কারণে শরীয়তের বিধি-বিধানকে অস্বীকার করিয়া থাকে যেহেতু তাহারা আল্লাহ্র রাস্তায় তাহাদের সময় ও সম্পদকে ব্যয় করিতে অনিচ্ছুক এবং এই ব্যাপারে অনর্থক ওযর-আপত্তি পেশ করাতে তাহারা অধিক আগ্রহী। বস্তুতঃ, কুরবানী ছাড়া কোন সফলতা অর্জনই সম্ভব নয় এবং বিশ্বাসীরা তাহাদের কষ্টার্জিত ধনসম্পদ হইতে আল্লাহ্র রাস্তায় কুরবানী করে যাহাতে পূর্ণ ধর্মীয় স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠিত হয়। ২৭ রুকুতে বলা হইয়াছে যে, যখন ধর্মীয় স্বাধীনতাকে প্রতিহত করা হয় তখন (শত্রুদের বিরুদ্ধে) যুদ্ধ করা অপরিহার্য হইয়া পড়ে এবং এমতাবস্থায় জান ও মালের কুরবানীর প্রয়োজন হয়। অতঃপর, ইহা বর্ণিত হইয়াছে যে, অযথা সময় কাটানো বা মানসিক আরামের প্রত্যাশায় লোকে মদ্যপান করে এবং যুদ্ধের খরচ বহনার্থে টাকা সংগ্রহের জন্য তাহারা জুয়া খেলে। কিন্তু ইসলাম এই উভয় বিষয়কেই ঘৃণ্য ও অপকারী বলিয়া বর্জন করিয়াছে। পুনরায় বলা হইয়াছে যে, যুদ্ধের ফলে যাহারা পিতৃহীন হইয়া পড়ে তাহাদের সুষ্ঠু ভরন-পোষণ করিতে হইবে। এই ব্যাপারে মুসলমানগণ যেন অংশীবাদী নারীদিগের সহিত বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখিতে হইবে, কেননা উহাতে তাহাদের পারিবারিক জীবনের সুখ-শান্তি বিঘ্নিত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে। ২৮, ২৯, ৩০ এবং ৩১ রুকূতে বলা হইয়াছে যে,আমরা যেন ঋতুস্রাব কালে স্ত্রী সংগ বর্জন করি, কেননা উহা এক ধরণের সাময়িক বর্জন পদ্ধতি; এই নির্দেশের পরে তালাক সম্পর্কিত বিধি-বিধানের বিষয় (স্বামী স্ত্রীর সম্পর্কের মধ্যে) এক ধরণের স্থায়ী বিচ্ছেদ ব্যবস্থা, উপস্থাপিত হইয়াছে; অতঃপর, স্তন্যপান কাল ও বিধবাদের সাথে আচরণ সম্পর্কিত উপবিধি লইয়াও আলোচনা হইয়াছে। ৩২ ও ৩৩ রুকূতে জাতীয় অগ্রগতির নীতি-পদ্ধতি সংক্রান্ত বক্তব্য রাখা হইয়াছে যাহার ভিত্তিমূলে একটি জাতি সত্যিকার ভাবে সফলকাম জাতি হিসাবে পরিগণিত হইতে পারে। মুসলমানদেরকে বলা হইয়াছে যে, যদি কোন জাতি পৃথিবীতে শক্তিশালী জাতি হিসাবে নিজেদেরকে চিহ্নিত করিতে চায়, তাহা হইলে তাহাদেরকে সত্য ও ন্যায় প্রতিষ্ঠা কল্পে মৃত্যুর মোকাবিলা করিবার জন্য অবশ্যই প্রস্তুত থাকিতে হইবে। ৩৪ রুকূতে বর্ণিত হইয়াছে যে, পৃথিবীতে মানুষের জীবনকাল নিতান্তই সাময়িক এবং এই সময়ে তাহাকে স্রষ্টার সহিত সত্যিকার সম্পর্ক স্থাপনের জন্য আপ্রাণ চেষ্টা চালাইয়া যাইতে হইবে। আল্লাহ্তা’লার ঐশী সত্তা ও গুণাবলীর প্রতি গভীর ধ্যান ও অনুশীলন ছাড়া এই সম্পর্ক স্থাপন করা সম্ভব নয়। অতঃপর, ‘আয়াতুল কুরসীর’ অনুপম আয়াত বর্ণিত হইয়াছে, যাহাকে স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কুরআনের অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও মহিমান্বিত আয়াত বলিয়া বর্ণনা করিয়াছেন। উক্ত আয়াতগুলিতে মহান আল্লাহ্তা’লার গুণাবলীর সংক্ষিপ্ত ও সুন্দর বর্ণনা প্রদান করা হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে যে, এই সমস্ত অনুপম গুণাবলীর অধিকারী মহান আল্লাহ্তা’লার সাথে সম্পর্ক স্থাপনের জন্য কাহারো প্রতি জোর জবরদস্তির প্রয়োজন নাই। অতঃপর, ৩৫ রুকূতে বলা হইয়াছে যে, যদিও ব্যক্তি পর্যায়ে নৈতিক গুণাবলী আল্লাহ্তা’লার সরাসরি অনুগ্রহে সংঘটিত হয়, কিন্তু জাতীয় পর্যায়ে নৈতিকতার রূপান্তর আল্লাহ্তা’লার নবী-রসূলদের অনুসরণের মাধ্যমেই লাভ হইয়া থাকে এবং এই উভয়বিধ পরিবর্তন হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর বংশধরদের মধ্যে ৪ বার অনুষ্ঠিত হইবে বলিয়া নির্ধারিত রহিয়াছে। পুনরায় বলা হইয়াছে যে, জাতীয় পর্যায়ে নৈতিক পরিবর্তনের জন্য সম্মিলিত প্রচেষ্টা ও সহযোগিতা একান্তই অপরিহার্য এবং এই দিক হইতে মো’মেনদের সম্মিলিত ও পরিকল্পিত প্রচেষ্টা এবং পারস্পরিক সহযোগিতা তাহাদের কুরবানী হইতে অধিক হইতে হইবে। অতঃপর সুদের উপর ভিত্তি করিয়া সমস্ত প্রকার লেনদেনকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হইয়াছে এবং সুদ দেওয়া বা নেওয়া উভয়কেই আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার সমার্থক বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। ইহা এইজন্য যে, সুদের লেন-দেন পারস্পরিক সাহায্য ও সহযোগিতা এবং অপর ভাইয়ের মঙ্গল সাধন করার মনোভাবের একান্ত পরিপন্থী। মুসলমানদেরকে আরো বলা হইয়াছে যে, তাহারা যেন এইরূপ মনে না করে যে, সুদের কারবার ছাড়া কোনপ্রকার (বৈষয়িক) উন্নতি সম্ভব নয়, কেননা আল্লাহ্র বিধান এই যে, সুদের লেন-দেনকারী জাতিসমূহ পরিণামে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। পরবর্তীতে বলা হইয়াছে যে, প্রয়োজনে ধার-কর্জ দেওয়ার মাধ্যমেও পারস্পরিক সহযোগিতা ও সম্প্রীতি বৃদ্ধিপ্রাপ্ত হয়, কিন্তু এই ধরণের সমস্ত লেন-দেন যথাযথভাবে লিখিত হওয়া উচিত। পরিশেষে সূরা এই মর্মে বক্তব্য রাখিয়াছে যে, যদিও কোন জাতির মধ্যে নৈতিক অবস্থার সার্বিক পরিবর্তনের জন্য উল্লেখিত নির্দেশাবলী মানিয়া চলা অপরিহার্য, কিন্তু সর্বোৎকৃষ্ট নিরাপদ ও নিশ্চিত উপায়, যাহার ফলে সত্যিকার ভাবে তাহাদের মধ্যে নৈতিক উন্নতি, পুণ্যবোধ ও সচ্চরিত্রের উন্মেষ ঘটিবে, তাহা হইল আল্লাহ্র বাণীর প্রতি তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করা, আল্লাহ্র গুণাবলী সর্বদা স্বরণ করতঃ নিজেদের জীবনে সেইগুলি অনুশীলনের প্রচেষ্টা জারী রাখা এবং ঐকান্তিক প্রার্থনার মাধ্যমে আল্লাহ্র ঐশী সাহায্য ও অনুকম্পা ভিক্ষা করা।
ইহাই হইল সংক্ষেপে সূরা বাকারার (যাহা কুরআনের সর্ববৃহৎ সূরা) বিষয়বস্তুর সারমর্ম। ইহাতে সাধারণভাবে অবিশ্বাসী এবং বিশেষভাবে আহলে কিতাবদেরকে উদ্দেশ্য করিয়া অত্যন্ত বলিষ্ঠভাবে বলা হইয়াছে যে হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-এর আবির্ভাবের মাধ্যমেই হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-এর প্রার্থনা পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছে। এখন যদি হযরত মুহাম্মদ (সঃ)-কে অস্বীকার করা হয়, তাহা হইলে হযরত ইব্রাহীম (আঃ)-কে একজন মিথ্যাবাদী ও প্রতারক হিসাবে গণ্য করিতে হইবে এবং ইহার ফলশ্রুতিতে সমস্ত মূসায়ী শরীয়ত ও খৃষ্টান ধর্মমত মিথ্যা ও বাতিলযোগ্য বলিয়া প্রতিপন্ন হইবে। পরোক্ষভাবে, এই সূরার মাধ্যমে ইসলামের বাণীর সত্যতাকে সুস্পষ্টভাবে তুলিয়া ধরিয়া ইহাকে গ্রহণ করিবার জন্য সারা বিশ্ববাসীকে আহবান জানানো হইয়াছে। বস্তুত: মানুষ সৃষ্টির পশ্চাতে যে মহান উদ্দেশ্য নিহিত রহিয়াছে তাহা কেবলমাত্র কুরআন শরীফে বর্ণিত মহান শিক্ষার অনুসরণের মাধ্যমেই পরিপূর্ণতা লাভ করিতে পারে। কেননা, জগতে কুরআন শরীফই এখন একমাত্র সঠিক শরীয়ত গ্রন্থ যাহাতে উপস্থাপিত বিভিন্ন বিধি-বিধান যথার্থ প্রজ্ঞা ও হিকমত সহকারে উহাদের স্বরূপ ও তাৎপর্য বর্ণনা করা হইয়াছে এবং যাহার প্রতি পরিপূর্ণ বিশ্বাস ও আমল দ্বারাই হৃদয়ের পবিত্রতা ও ঐশীজ্ঞান অর্জন করা সম্ভব।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
الٓـمّٓ ۚ﴿۲﴾
ذٰلِکَ الۡکِتٰبُ لَا رَیۡبَ ۚۖۛ فِیۡہِ ۚۛ ہُدًی لِّلۡمُتَّقِیۡنَ ۙ﴿۳﴾
الَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡغَیۡبِ وَیُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ۙ﴿۴﴾
وَالَّذِیۡنَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِمَاۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ وَمَاۤ اُنۡزِلَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۚ وَبِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ ؕ﴿۵﴾
اُولٰٓئِکَ عَلٰی ہُدًی مِّنۡ رَّبِّہِمۡ ٭ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُفۡلِحُوۡنَ ﴿۶﴾
اِنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا سَوَآءٌ عَلَیۡہِمۡ ءَاَنۡذَرۡتَہُمۡ اَمۡ لَمۡ تُنۡذِرۡہُمۡ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۷﴾
خَتَمَ اللّٰہُ عَلٰی قُلُوۡبِہِمۡ وَعَلٰی سَمۡعِہِمۡ ؕ وَعَلٰۤی اَبۡصَارِہِمۡ غِشَاوَۃٌ ۫ وَّلَہُمۡ عَذَابٌ عَظِیۡمٌ ﴿٪۸﴾
وَمِنَ النَّاسِ مَنۡ یَّقُوۡلُ اٰمَنَّا بِاللّٰہِ وَبِالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَمَا ہُمۡ بِمُؤۡمِنِیۡنَ ۘ﴿۹﴾
یُخٰدِعُوۡنَ اللّٰہَ وَالَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ۚ وَمَا یَخۡدَعُوۡنَ اِلَّاۤ اَنۡفُسَہُمۡ وَمَا یَشۡعُرُوۡنَ ؕ﴿۱۰﴾