১৫

الحجر

সূরা আল্ হিজ্‌র

Al-Hijr

মক্কী ১০০ আয়াত ৬ রুকু পারা ১৩–১৪

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১০০ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।

وَجَعَلۡنَا لَکُمۡ فِیۡہَا مَعَایِشَ وَمَنۡ لَّسۡتُمۡ لَہٗ بِرٰزِقِیۡنَ ﴿۲۱﴾

২১
এবং উহাতে আমরা নানা প্রকার উপজীবিকা সৃষ্টি করিয়াছি তোমাদের জন্য এবং তোমরা যাহাদের রিয্‌ক-দাতা নহ তাহাদের জন্যও।

وَاِنۡ مِّنۡ شَیۡءٍ اِلَّا عِنۡدَنَا خَزَآئِنُہٗ ۫ وَمَا نُنَزِّلُہٗۤ اِلَّا بِقَدَرٍ مَّعۡلُوۡمٍ ﴿۲۲﴾

২২
এবং এমন কোন বস্তু নাই যাহার (অফুরন্ত) ভাণ্ডার সমূহ আমাদের নিকট নাই এবং আমরা কেবল নিরূপিত পরিমাণ১৪৯০ ব্যতিরেকে উহা অবতীর্ণ করি না।
১৪৯০। আল্লাহ্‌তা’লা প্রত্যেক বস্তুর অফুরন্ত ভাণ্ডারের মালিক। কিন্তু তাঁহার অসীম করুণায় তিনি মানুষের মন নির্দিষ্ট জিনিসের দিকে পরিচালিত করেন, যখনই খাঁটি এবং প্রকৃত প্রয়োজন দেখা দেয়। জড় জগতের ন্যায় পবিত্র কুরআন এক বিশাল আধ্যাত্মিক জগৎ, যাহার অভান্তরে লুক্কায়িত রহিয়াছে আধ্যাত্মিক জ্ঞানের ভাণ্ডার, সেখান হইতেই আল্লাহ্‌র ইচ্ছায় চাহিদা অনুযায়ী মানবের নিকট জ্ঞান প্রকাশিত হইয়া থাকে।

وَاَرۡسَلۡنَا الرِّیٰحَ لَوَاقِحَ فَاَنۡزَلۡنَا مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَاَسۡقَیۡنٰکُمُوۡہُ ۚ وَمَاۤ اَنۡتُمۡ لَہٗ بِخٰزِنِیۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
এবং আমরা বোঝা বহনকারী-সংযোজনকারী১৪৯১ বায়ুরাশি প্রেরণ করি, অতঃপর মেঘমালা হইতে বারিধারা বর্ষণ করি, তৎপর আমরাই তোমাদিগকে উহা পান করাই; বস্তুতঃ তোমরা উহার সঞ্চয়কারী নহ!
১৪৯১। ‘লাওয়াকিহা’ অর্থ ‘বোঝাবহনকারী- সংযোজনকারী।’ ‘লাওয়াকিহা’ এমন এক বাতাস যাহা পুরুষ-বৃক্ষ হইতে পুষ্পরেণু বা পরাগ বহন করিয়া স্ত্রী-বৃক্ষে নিয়া যায় যাহাতে উহা ফলোৎপাদনকারী বৃক্ষে পরিণত হয়। এই শব্দ দ্বারা এইরূপ বাতাসও বুঝায় যাহা ভূপৃষ্ঠ হইতে উত্থিত বাষ্পকে বহন করিয়া উপরে বায়ুমণ্ডলে নিয়া যায় যেখানে উহা মেঘমালার আকার ধারণ করে।

وَاِنَّا لَنَحۡنُ نُحۡیٖ وَنُمِیۡتُ وَنَحۡنُ الۡوٰرِثُوۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
এবং নিশ্চয় আমরাই জীবন দান করি এবং আমরাই মৃত্যু দিই এবং আমরাই একমাত্র উত্তরাধিকারী।১৪৯২
১৪৯২। কুরআনের শিক্ষা দ্বারা এক মহান বিপ্লব সংঘটিত হইবে, যদ্বারা পুরাতন ব্যবস্থা মিটাইয়া দেওয়া হইবে এবং অকৃত্রিম বিশ্বাসীরা ভূপৃষ্ঠের উত্তরাধিকারী হইয়া বসবাস করিবে।

وَلَقَدۡ عَلِمۡنَا الۡمُسۡتَقۡدِمِیۡنَ مِنۡکُمۡ وَلَقَدۡ عَلِمۡنَا الۡمُسۡتَاۡخِرِیۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
এবং তোমাদের মধ্যে যাহারা অগ্রে গমন করিয়াছে আমরা তাহাদিগকে জানি, এবং তাহাদিগকেও আমরা জানি যাহারা পশ্চাতে রহিয়াছে।

وَاِنَّ رَبَّکَ ہُوَ یَحۡشُرُہُمۡ ؕ اِنَّہٗ حَکِیۡمٌ عَلِیۡمٌ ﴿٪۲۶﴾

২৬
এবং নিশ্চয় তোমার প্রতিপালকই তাহাদিগকে সমবেত করিবেন। নিশ্চয় তিনিই পরম প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞানী।
সূরা আল্ হিজ্‌র - রুকু ২

وَلَقَدۡ خَلَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنۡ صَلۡصَالٍ مِّنۡ حَمَاٍ مَّسۡنُوۡنٍ ﴿ۚ۲۷﴾

২৭
এবং নিশ্চয় আমরা ইনসানকে সৃষ্টি করিয়াছি (খন্‌খনে) শুষ্ক কাদা অর্থাৎ এমন কাল পচা কাদা হইতে, বহুকাল অতীত হওয়ার ফলে যাহার আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল।১৪৯৩
১৪৯৩। ‘সালসাল’ অর্থাৎ ‘খন্‌খনে শুষ্ক কাদা’ এই কথা ইঙ্গিত করে যে, তাহাকে এমন এক জড়বস্তু হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে যাহার মধ্যে বাক্‌শক্তির গুণাবলী গুপ্ত ও সুপ্ত রহিয়াছে। ইহাতেই প্রমাণিত হয় যে, ঐশী আওয়াজে সাড়া দেওয়া বা প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার ক্ষমতাসম্পন্ন গুণাবলী দ্বারা মানুষকে বিভূষিত করা হইয়াছে। কিন্তু ‘সালসাল’কে বাহিরের কোন বস্তু দ্বারা কেবল আঘাত করিলেই যেমন শব্দ নির্গত হয়, সেইরূপ এখানে ‘সালসাল’ শব্দ দ্বারা ইহাই ইঙ্গিত করিতেছে যে, মানুষের প্রতিধ্বনি করার শক্তি ঐশী ডাক বা বাণীর অধীন বা উহার উপর নির্ভরশীল। এই গুণ বা ধীশক্তিই সমস্ত সৃষ্ট জগতের উপর মানবের প্রাধান্য বা শ্রেষ্ঠত্ব প্রতিষ্ঠিত করিয়াছে। ‘হামা’ (কালো পচা কাদা) শব্দটি ইহাই ব্যক্ত করিতেছে যে, মানুষকে সৃষ্টি করা হইয়াছে কালো কাদা মাটি হইতে; মাটি দেহের অধিকরণ এবং পানি আত্মার উৎস। অন্যত্র কুরআন করীম স্বতন্ত্রভাবে ‘মাটি’ এবং ‘পানি’ হইতে মানুষ সৃষ্টি হইয়াছে বলিয়া বর্ণনা করিয়াছে (৩ঃ৬০; ২১ঃ৩১)। “সালসাল” শব্দ “হামা” শব্দের সংগে যুক্ত করিয়া কুরআন করীম এই মর্মের প্রতি ইঙ্গিত করিতেছে যে, যে স্থলে অন্যান্য সজীব প্রাণীর সৃষ্টি শুধু হামা অর্থাৎ মাটি ও পানি হইতে, কারণ ইহাদের ও (প্রাণীকুল) এক প্রকার অপরিণত আত্মা রহিয়াছে, সেখানে হামা এবং সালসাল সংযুক্ত হইয়া বাক্‌শক্তি গুণসম্পন্ন মানুষের সৃষ্টি হইয়াছে। তাহাকে ‘মাসনূন’ও (যাহার উপর বহুকাল অতীত হওয়ার ফলে আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তীত হইয়াছে) বলা হইয়াছে (৯৫ঃ৫)। এই আয়াত দ্বারা ইহা বুঝায় না যে, পচা কাদা-মাটির বস্তুতে আল্লাহ্‌তা’লা জীবন ফুঁকিয়া দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উহা ছাঁচে ঢালা জীবন্ত মানুষে পরিণত হইয়াছে। কুরআন বার বার ঘোষণা করিয়াছে যে, ক্রম-বির্বতনের মধ্য দিয়া এই বিশ্বজগতের সৃষ্টি। বর্তমান আয়াত মানব সৃষ্টির কেবল প্রাথমিক স্তর সম্বন্ধে ব্যক্ত করিয়াছে। অন্যান্য স্তর সম্পর্ক ৩০ঃ২১; ৩৫ঃ১২; ২২ঃ৬; ২৩ঃ১৫ এবং ৪০ঃ৬৮ আয়াতসমূহে উল্লেখ রহিয়াছে। কুরআনের বর্ণনানুযায়ী মানুষকে “মাটি” হইতে সৃষ্টি করা হইয়াছে ইহার মর্ম দাঁড়ায় যে, মানব সৃষ্টির দীর্ঘ প্রক্রিয়া আরম্ভ হইয়াছিল ‘মাটি’ হইতে। ইহার সমর্থন বাস্তব ঘটনা হইতে পাওয়া যায়, যথাঃ আজও মানুষের খাদ্য মাটি হইতে পাওয়া যায়, ইহার কতক প্রত্যক্ষভাবে এবং কতক পরোক্ষভাবে মাটি হইতেই প্রাপ্ত। ইহাতে প্রমাণিত হয় যে, মাটিতে ধারণ-করা জড় পদার্থই হইল মানব-জন্মের উপকরণ; উহা যদি না হইত তবে সে ইহা (মৃত্তিকা) হইতে পুষ্টি আহরণ করিতে পারিত না। কারণ একমাত্র সেই বস্তুই যাহা হইতে কোন সত্তা বা জীবের উৎপত্তি, তাহা সেই উৎপন্ন সত্তার পুষ্টি সরবরাহ করিতে পারে—ভিন্ন বা অপরিচিত উপাদান উহার ক্ষয় পূরণ করিতে অক্ষম। (এই আয়াতের আরও ব্যাখ্যার জন্য ‘দি লারজার এডিশন অব দি কমেন্টারী’ দ্রষ্টব্য)

وَالۡجَآنَّ خَلَقۡنٰہُ مِنۡ قَبۡلُ مِنۡ نَّارِ السَّمُوۡمِ ﴿۲۸﴾

২৮
এবং ইতিপূর্বে আমরা জিন্ন্‌কে অত্যন্ত উত্তপ্ত বায়ুর আগুন হইতে সৃষ্টি করিয়াছি।১৪৯৪
১৪৯৪। কুরআনের রূপক উক্তি ‘মানুষকে সত্বরতার স্বভাব দিয়া সৃষ্টি করা হইয়াছে (২১ঃ৩৮) হইতে বুঝা যায় যে, তফ্‌সীরাধীন আয়াতের অর্থ ‘জিন্ন্‌’ অগ্নিময় বা উত্তেজনা-প্রবণ স্বভাবের ধারক। ইহার অর্থ এমন নহে যে, জিন্ন্‌ প্রকৃত পক্ষে আগুনের তৈরী। এই জন্য কাদা মাটি দ্বারা বা অগ্নি দ্বারা সৃষ্ট রূপক বা আলংকারিক অর্থে প্রযোজ্য, যাহার অর্থ হইতেছে বিনয়ী এবং নমনীয় স্বভাব অথবা অগ্নিময় (দাহ্য) এবং প্রজ্জ্বলনীয় প্রকৃতির অধিকারী।

وَاِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ خَالِقٌۢ بَشَرًا مِّنۡ صَلۡصَالٍ مِّنۡ حَمَاٍ مَّسۡنُوۡنٍ ﴿۲۹﴾

২৯
এবং (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রতিপালক ফিরিশ্‌তাদিগকে বলিলেন, ‘আমি নিশ্চয় মানুষ সৃষ্টি করিতে চলিয়াছি খনেখনে শুষ্ক কাদা হইতে অর্থাৎ এমন কাল পচা কাদা হইতে, বহুকাল অতীত হওয়ার ফলে যাহার আকৃতি-প্রকৃতি পরিবর্তিত হইয়া গিয়াছিল,

فَاِذَا سَوَّیۡتُہٗ وَنَفَخۡتُ فِیۡہِ مِنۡ رُّوۡحِیۡ فَقَعُوۡا لَہٗ سٰجِدِیۡنَ ﴿۳۰﴾

৩০
অতঃপর, যখন আমি তাহার গঠনকার্য সুসম্পন্ন করি এবং তাহার মধ্যে আমার বাণী হইতে কিছু বাণী ফুৎকার করি, তখন তোমরা তাহার (আনুগত্যের) জন্য সেজদায় পড়িয়া যাও।’১৪৯৫
১৪৯৫। ‘ফিরিশ্‌তাগণ’ শব্দ দ্বারা সমস্ত সৃষ্টিকেও বুঝায়; কারণ ফিরিশ্‌তাগণ সকল সৃষ্টির মধ্যে প্রাথমিক সংযোজক এবং সে কারণেই তাহাদের প্রতি আদেশ বা নির্দেশ বিশ্বের সকল সৃষ্ট বস্তুর প্রতিও প্রযোজ্য। ইহা বড়ই তাৎপর্যপূর্ণ যে, অন্যত্র কুরআন যেখানে আদমের অনুগত হওয়ার জন্য ফিরিশ্‌তাকুলের প্রতি আল্লাহ্‌তা’লার আদেশের কথা বলে, সেখানে বর্তমান ও পরবর্তী আয়াতসমূহে ‘মানুষ’ শব্দটি ব্যবহার হইয়াছে। এই প্রকারে কুরআনে উভয় শব্দ (আদম এবং মানুষ) সমার্থক রূপে ব্যবহার করা হইয়াছে। আদম সম্পর্কে ফিরিশ্‌তাদিগকে প্রদত্ত সকল আদেশ প্রত্যেক মানুষের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। প্রত্যেক মানুষের মধ্যেই আল্লাহ্‌তা’লা রূহ ফুঁকিয়া দেন এবং ফিরিশ্‌তাকে তাহাদের পরিচর্যার জন্য নির্দেশ দান করেন। মানুষ পৃথিবীতে আল্লাহ্‌র প্রতিনিধি এবং সে তাহার নিজ ব্যক্তি-সত্তায় ‘ইলাহী সিফ্‌ত’ (গুণাবলী) প্রতিফলিত করিয়া থাকে।