১৪

إبراهيم

সূরা ইব্‌রাহীম

Ibrahim

মক্কী ৫৩ আয়াত ৭ রুকু পারা ১৩

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৫৩ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓرٰ ۟ کِتٰبٌ اَنۡزَلۡنٰہُ اِلَیۡکَ لِتُخۡرِجَ النَّاسَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ۙ بِاِذۡنِ رَبِّہِمۡ اِلٰی صِرَاطِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ ۙ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম রা।১৪৫২ (ইহা) কামিল কিতাব, যাহা আমরা তোমার উপর এই জন্য নাযেল করিয়াছি যেন তুমি মানব জাতিকে তাহাদের প্রভুর আদেশক্রমে অন্ধকাররাশি হইতে বাহির করিয়া আলোর দিকে আন, (অর্থাৎ) মহা পরাক্রমশালী ও প্রশংসনীয় সত্তার পথে—
১৪৫২। ১৬ টিকা দ্রষ্টব্য।

اللّٰہِ الَّذِیۡ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَوَیۡلٌ لِّلۡکٰفِرِیۡنَ مِنۡ عَذَابٍ شَدِیۡدِ ۙ﴿۳﴾

৩
সেই আল্লাহ্‌র (পথে) যাঁহার অধিকার আছে আকাশ সমূহে যাহা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সবই। এবং কাফেরদের জন্য কঠোর শাস্তির কারণে—দুর্ভোগ —

ۣالَّذِیۡنَ یَسۡتَحِبُّوۡنَ الۡحَیٰوۃَ الدُّنۡیَا عَلَی الۡاٰخِرَۃِ وَیَصُدُّوۡنَ عَنۡ سَبِیۡلِ اللّٰہِ وَیَبۡغُوۡنَہَا عِوَجًا ؕ اُولٰٓئِکَ فِیۡ ضَلٰلٍۭ بَعِیۡدٍ ﴿۴﴾

৪
যাহারা পার্থিব জীবনকে পরকালের মোকাবেলায় প্রিয়তর জ্ঞান করে এবং (লোকদিগকে) আল্লাহ্‌র পথ হইতে নিবৃত্ত রাখে এবং উহাকে বক্র করিতে চাহে। ইহারাই ঘোরতর ভ্রান্তিতে পড়িয়া রহিয়াছে।

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا مِنۡ رَّسُوۡلٍ اِلَّا بِلِسَانِ قَوۡمِہٖ لِیُبَیِّنَ لَہُمۡ ؕ فَیُضِلُّ اللّٰہُ مَنۡ یَّشَآءُ وَیَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۵﴾

৫
এবং আমরা প্রত্যেক রসূলকেই তাহার জাতির১৪৫৩ ভাষায় ওহী (করিয়া) পাঠাইয়াছি, এইজন্য যেন সে তাহাদের নিকট (বিষয়াবলী) স্পষ্ট করিয়া বর্ণনা করিতে পারে। অতঃপর আল্লাহ্ যাহাকে চাহেন পথ-ভ্রষ্ট হইতে দেন এবং যাহাকে চাহেন হেদায়াত দান করেন। বস্তুতঃ তিনি মহা পরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।
১৪৫৩। এই আয়াতের অর্থ ইহা নহে যে, আঁ-হযরত (সাঃ)-এর পয়গাম কেবল আরববাসীগণের জন্যই সীমাবদ্ধ। এইরূপ ধারণা কুরআন করীমের অন্যান্য আয়াত দ্বারা ভ্রান্ত প্রতিপন্ন হয়। কুরআন করীমের মধ্যে সুস্পষ্টভাবে এবং দ্ব্যর্থহীনরূপে তাঁহাকে সারা বিশ্বের সকল মানব জাতির জন্য প্রেরিত আল্লাহ্‌র রসূল বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে (৭ঃ১৫৯; ৩৪ঃ২৯)। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মিশনের সার্বজনীনতা একমাত্র কুরআনেরই দাবী নহে, হাদীসেও বর্ণিত হইয়াছে যে, রসূল করীম (সাঃ) স্বয়ং বলিয়াছেনঃ- “আমি লাল কাল অর্থাৎ সকল জাতীয় মানুষের জন্য প্রেরিত হইয়াছি” (মজমাউল বিহার)। অন্য এক হাদীসে তিনি বলিয়াছেনঃ “আমি বিশ্বমানবের জন্য আবির্ভূত হইয়াছি” (বুখারী)। কুরআন নাযেল হইয়াছিল আরবী ভাষাতে, কারণ (তাঁহার) সম্মুখস্থ আরবী ভাষাভাষী আরবজাতিকেই সর্বপ্রথম সম্বোধন করা হইয়াছিল, এবং তাহাদের মাধ্যমেই বিশ্বব্যাপী ইহার বাণী (ইসলাম) প্রচার হওয়া নির্ধারিত ছিল কিন্তু এইজন্য নহে যে, কুরআনের বাণী শুধু আরববাসীদের জন্য নাযেল হইয়াছিল। কুরআন আরবী ভাষায় নাযেল হওয়ার আরো কারণ হইল যে, সকল ভাষার মোকাবিলায় ইহা অধিক ভাব প্রকাশে সক্ষম। ইহা প্রাঞ্জল এবং ব্যাপক ভাষা। ইহার উপযোগিতা কুরআনের বাণী প্রচারের জন্য সর্বোৎকৃষ্ট মাধ্যম।

وَلَقَدۡ اَرۡسَلۡنَا مُوۡسٰی بِاٰیٰتِنَاۤ اَنۡ اَخۡرِجۡ قَوۡمَکَ مِنَ الظُّلُمٰتِ اِلَی النُّوۡرِ ۬ۙ وَذَکِّرۡہُمۡ بِاَیّٰٮمِ اللّٰہِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّکُلِّ صَبَّارٍ شَکُوۡرٍ ﴿۶﴾

৬
এবং আমরা মূসাকেও আমাদের নিদর্শনাবলীসহ পাঠাইয়াছিলাম (এই বলিয়া যে), ‘তুমি তোমার জাতিকে অন্ধকাররাশি হইতে বাহির করিয়া আলোর দিকে আন এবং তাহাদিগকে আল্লাহ্‌র দিনগুলি১৪৫৪ স্মরণ করাও।’ নিশ্চয় ইহাতে প্রত্যেক পরম ধৈর্যশীল, সকৃতজ্ঞ লোকের জন্য অনেক নিদর্শন আছে।
১৪৫৪। ‘আইয়ামুল্লাহ্‌’ আল্লাহ্‌র দিনসমূহ অর্থাৎ আল্লাহ্‌তা’লার শাস্তি এবং পুরস্কার (তাজ)। যেমন বিখ্যাত আরবী প্রবাদ ‘আইয়ামুল আরব’ অর্থাৎ আরবদের লড়াই ও দ্বন্দ্ব বা যুদ্ধ-বিগ্রহ।

وَاِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہِ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَۃَ اللّٰہِ عَلَیۡکُمۡ اِذۡ اَنۡجٰکُمۡ مِّنۡ اٰلِ فِرۡعَوۡنَ یَسُوۡمُوۡنَکُمۡ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ وَیُذَبِّحُوۡنَ اَبۡنَآءَکُمۡ وَیَسۡتَحۡیُوۡنَ نِسَآءَکُمۡ ؕ وَفِیۡ ذٰلِکُمۡ بَلَآءٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ عَظِیۡمٌ ﴿٪۷﴾

৭
এবং (স্মরণ কর) যখন মূসা তাহার জাতিকে বলিয়াছিল, ‘তোমরা তোমাদের উপর আল্লাহ্‌র সেই নেয়ামতকে স্মরণ কর, যখন তিনি তোমাদিগকে ফেরাউনের জাতি হইতে উদ্ধার করিয়াছিলেন যাহারা তোমাদিগকে ভীষণ কষ্ট দিত এবং তোমাদের পুত্রদিগকে নৃশংসভাবে হত্যা করিত এবং তোমাদের নারীদিগকে জীবিত রাখিত। বস্তুতঃ ইহাতে তোমাদের জন্য তোমাদের প্রভুর পক্ষ হইতে এক মহা পরীক্ষা ছিল।
সূরা ইব্‌রাহীম - রুকু ১

وَاِذۡ تَاَذَّنَ رَبُّکُمۡ لَئِنۡ شَکَرۡتُمۡ لَاَزِیۡدَنَّکُمۡ وَلَئِنۡ کَفَرۡتُمۡ اِنَّ عَذَابِیۡ لَشَدِیۡدٌ ﴿۸﴾

৮
এবং যখন তোমাদের প্রভু ঘোষণা করিয়াছিলেন, ‘যদি তোমরা কৃতজ্ঞ১৪৫৫ হইয়া চল তাহা হইলে নিশ্চয় আমি তোমাদিগকে আরও অধিক দান করিব, কিন্তু যদি তোমরা অকৃতজ্ঞ হও তাহা হইলে (জানিয়া রাখ) আমার আযাব বড়ই কঠোর।’
১৪৫৫। শোকর অর্থ কৃতজ্ঞতা। ইহা তিন প্রকারঃ (১) মন-প্রাণ দ্বারা উপকার বা এহসান প্রাপ্তির পূর্ণ উপলদ্ধির স্বীকৃতি; (২) জিহ্বা দ্বারা অর্থাৎ প্রকাশ্য কথায় উপকারীর উচ্চ প্রশংসা করা; (৩) অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দ্বারা অর্থাৎ উপকার সাধনকারীর যোগ্যতা অনুসারে পরিশোধ করা অর্থাৎ বিনিময়ে উপকার করা। ইহা পাঁচটি ভিত্তির উপর স্থাপিতঃ (ক) উপকারী ব্যক্তির প্রতি উপকৃত ব্যক্তির বিনয়; (খ) তাহার প্রতি তাহার প্রীতি ও ভালবাসা; (গ) উপকৃত ব্যক্তি কর্তৃক উপকারীর এহসান স্বরণ রাখা ও স্বীকৃতি দেওয়া; (ঘ) ইহার জন্য প্রকাশ্যে তাহার প্রশংসা করা; এবং (ঙ) হিতসাধনকারীর পসন্দনীয় নয় এমনভাবে তাহার এহসানের ব্যবহার না করা। ইহাকেই মানুষের প্রতি মানুষের কৃতজ্ঞতা বা শোকর বলা হয়। আর আল্লাহ্‌তা’লার প্রতি ‘শোকর’ প্রকাশের অর্থ তাঁহার বান্দাকে ক্ষমা করা, প্রশংসা করা, ভাল আদেশ দেওয়া, সন্তোষজনক শ্রদ্ধা দেখানো, তাহার মঙ্গলাকাঙ্খা করা, শুভেচ্ছা-সহানুভূতি প্রকাশ করা এবং অনিবার্যরূপে বিনিময় ও প্রতিদান দেওয়ার মধ্যে নিহিত (লেইন)। সে-ই প্রকৃত কৃতজ্ঞতাপরায়ণ ব্যক্তি যে আল্লাহ্‌তা’লার দেওয়া সকল নেয়ামতের সঠিক ব্যবহার করিয়া থাকে।

وَقَالَ مُوۡسٰۤی اِنۡ تَکۡفُرُوۡۤا اَنۡتُمۡ وَمَنۡ فِی الۡاَرۡضِ جَمِیۡعًا ۙ فَاِنَّ اللّٰہَ لَغَنِیٌّ حَمِیۡدٌ ﴿۹﴾

৯
এবং মূসা বলিয়াছিল, ‘যদি তোমরা এবং ভূপৃষ্ঠস্থ সকল লোক অকৃতজ্ঞতা কর, তথাপি (আল্লাহ্‌র কোন ক্ষতি করিতে পারিবে না, কেননা) আল্লাহ্ নিশ্চয়ই স্বনির্ভর, প্রশংসাভাজন।’

اَلَمۡ یَاۡتِکُمۡ نَبَؤُا الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکُمۡ قَوۡمِ نُوۡحٍ وَّعَادٍ وَّثَمُوۡدَ ۬ؕۛ وَالَّذِیۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِہِمۡ ؕۛ لَا یَعۡلَمُہُمۡ اِلَّا اللّٰہُ ؕ جَآءَتۡہُمۡ رُسُلُہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ فَرَدُّوۡۤا اَیۡدِیَہُمۡ فِیۡۤ اَفۡوَاہِہِمۡ وَقَالُوۡۤا اِنَّا کَفَرۡنَا بِمَاۤ اُرۡسِلۡتُمۡ بِہٖ وَاِنَّا لَفِیۡ شَکٍّ مِّمَّا تَدۡعُوۡنَنَاۤ اِلَیۡہِ مُرِیۡبٍ ﴿۱۰﴾

১০
তোমাদের নিকট কি তাহাদের সংবাদ পৌঁছে নাই, যাহারা তোমাদের পূর্বে ছিল (যেমন) নূহ, আদ এবং সামূদের জাতি এবং যাহারা তাহাদের পরে হইয়াছিল যাহাদিগকে আল্লাহ্১৪৫৬ ব্যতীত কেহই অবগত নহে? যখন তাহাদের নিকট তাহাদের রসূলগণ উজ্জল নিদর্শনাবলী লইয়া আসিয়াছিল তখন তাহারা তাহাদের হস্ত দ্বারা তাহাদের মুখ১৪৫৭ চাপিয়া ধরিয়াছিল এবং বলিয়াছিল, ‘যে বিষয়সহ তোমরা প্রেরিত হইয়াছ আমরা অবশ্যই উহাকে অস্বীকার করিলাম, কারণ যে বিষয়ের প্রতি তোমরা আমাদিগকে আহ্বান করিতেছ উহার সম্বন্ধে আমরা নিশ্চয় অস্বস্তিকর সন্দেহের মধ্যে নিপতিত আছি।’
১৪৫৬। এই বাক্যাংশ স্পষ্ট ব্যক্ত করিতেছে যে, হযরত ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর বংশ ছাড়াও অন্যান্য জাতিতে আল্লাহ্‌তা’লা নবী প্রেরণ করিয়াছেন, যেমন হযরত ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর পূর্বে ‘আদ’ ও ‘সামুদ’ জাতি এবং অন্যান্য জাতির অস্তিত্ব ছিল, যাহাদের কথা আল্লাহ্ ছাড়া এখন আর কেহ জানে না। পক্ষান্তরে ইব্‌রাহীমি বংশধরগণের মধ্যে প্রেরিত নবীগণের কথা কুরআন এবং বাইবেল উভয়ের মধ্যে উল্লেখ রহিয়াছে।
১৪৫৭। “তাহারা তাহাদের হস্তদ্বারা তাহাদের মুখ চাপিয়া ধরিয়াছিল”-এই বাক্যাংশ দ্বারা বুঝা যায় যে, অবিশ্বাসীরা নবীদের উচ্চাঙ্গের দাবীকে নিস্তব্ধ করার জন্য তাহাদের হাত তাহাদের মুখে চাপিয়া ধরিল অথবা তাহারা নবীদের কথায় ক্রুদ্ধ হইয়া হাত দ্বারা তুচ্ছভাব প্রকাশ করিল অথবা তাহারা নবীদের কথায় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করিল যাহাতে তাঁহাদের দাবী বা প্রচার স্তব্ধ করিয়া দিতে পারে। এই বাক্য দ্বারা ঘৃণা, তাচ্ছিল্য বা বিদ্রুপাত্মক ব্যবহারও প্রকাশ পায়।