১৫

الحجر

সূরা আল্ হিজ্‌র

Al-Hijr

মক্কী ১০০ আয়াত ৬ রুকু পারা ১৩–১৪

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১০০ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓرٰ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ وَقُرۡاٰنٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম রা। এইগুলি এক কামিল (পূর্ণ) কিতাব এবং সুস্পষ্ট বর্ণনাকারী কুরআনের আয়াত।১৪৭৬
১৪৭৬। কেবল মাত্র সূরা নমলের ২য় আয়াতে এবং এই তফসীরাধীন আয়াতে ‘কিতাব’ এবং ‘কুরআন’ শব্দদ্বয় একসঙ্গে ব্যবহৃত হইয়াছে; কিন্তু বর্তমান আয়াতে ‘কিতাব’ শব্দ প্রথমে এবং ‘কুরআন’ শব্দ পরে আসিয়াছে এবং সূরা নমলে শব্দদ্বয় উলটাভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে, অর্থাৎ ‘কুরআন’ প্রথমে এবং ‘কিতাব’ পরে ব্যবহৃত হইয়াছে। কিতাব শব্দ এই ভবিষ্যদ্বাণীর দিকে ইঙ্গিত করিতেছে যে, ইসলামের এই পবিত্র গ্রন্থ, লিখিত আকারে প্রকাশ হইতে থাকিবে; আর কুরআন শব্দ দ্বারা এই ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতি নির্দেশ করিতেছে যে, ইহা ক্রমবর্দ্ধিতভাবে পঠিত ও পুনরাবৃত্ত হইতে থাকিবে। ইহা ব্যতীত কুরআনে ‘স্পষ্ট বর্ণনাকারী’ ‘কুরআন’ শব্দদ্বয় মাত্র দুইবার ব্যবহৃত হইয়াছে, আর ‘স্পষ্ট বর্ণনাকারী’ ‘কিতাব’ শব্দ দুইটি কমপক্ষে ১২ বার ব্যবহৃত হইয়াছে। এতদ্বারা ইহাই ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, লিখিত বিবরণী বা প্রমাণ মৌখিক কথাবার্তার আদান-প্রদান হইতে অধিকতর কার্যকর। অতএব, মুসলমানদের শিক্ষার্জনের প্রতি এবং লিখিত জ্ঞান অন্বেষার প্রতি অধিক মনোনিবেশ করা উচিৎ।

رُبَمَا یَوَدُّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَوۡ کَانُوۡا مُسۡلِمِیۡنَ ﴿۳﴾

৩
যাহারা অবিশ্বাস করিয়াছে তাহারা প্রায়ই কামনা করেঃ হায়! তাহারাও যদি মুসলমান হইত।১৪৭৭
১৪৭৭। ইহা লিপিবদ্ধ রহিয়াছে যে, নবী করীম (সাঃ)-এর সময়ে অবিশ্বাসীদের মধ্যে কেহ কেহ এই অভিলাষ প্রকাশ করিয়াছিল।

ذَرۡہُمۡ یَاۡکُلُوۡا وَیَتَمَتَّعُوۡا وَیُلۡہِہِمُ الۡاَمَلُ فَسَوۡفَ یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۴﴾

৪
তুমি তাহাদিগকে ছাড়িয়া দাও যেন তাহারা আহার-বিহার এবং সুখ-ভোগ করিয়া বেড়ায় এবং বৃথা আশা-আকাংখা১৪৭৮ তাহাদিগকে গাফেল করিতে থাকে, অতএব অচিরেই তাহারা (ইহার পরিণাম) জানিতে পারিবে।
১৪৭৮। এই আয়াতের অর্থ ইহাও হইতে পারে যে, পূর্ববর্তী আয়াতে উল্লেখিত অবিশ্বাসীদের যে ধারণা—তাহারা মুসলমান হইয়া গিয়াছে — তাহা এক বৃথা আশা অর্থাৎ বিক্ষিপ্ত ইচ্ছার প্রকাশ মাত্র; তাহাদের আসল উদ্দেশ্য হইতেছে পার্থিব উপভোগ এবং বৈষয়িক স্বার্থ উদ্ধার করা।

وَمَاۤ اَہۡلَکۡنَا مِنۡ قَرۡیَۃٍ اِلَّا وَلَہَا کِتَابٌ مَّعۡلُوۡمٌ ﴿۵﴾

৫
এবং আমরা কখনও কোন জনপদকে১৪৭৯ (পূর্ব হইতে) উহার জন্য স্থিরীকৃত বিধান১৪৭৯-ক ব্যতিরেকে ধ্বংস করি না।
১৪৭৯। ‘জনপদ’ এখানে জনপদের বাসিন্দা বা জাতি বা যাহাদের নিকট আল্লাহ্‌র নবী প্রেরিত হন তাহাদের প্রতি আরোপিত হইয়াছে। নবী করীম (সাঃ)-এর শহরকে কুরআনে ‘জনপদ জননী’ বলিয়া আখ্যায়িত করা হইয়াছে (৬ঃ৯৩)।
১৪৭৯-ক। ‘প্রকাশ্য ডিক্রী’, ‘স্থিরীকৃত বিধান’ অর্থাৎ আল্লাহ্‌র নবীর বিরূদ্ধবাদীদের ধ্বংসের মিয়াদ বা ‘নির্ধারিত সময়’ যাহা যুগের নবী কর্তৃক ভবিষ্যদ্বাণীরূপে বর্ণিত হইয়া থাকে।

مَا تَسۡبِقُ مِنۡ اُمَّۃٍ اَجَلَہَا وَمَا یَسۡتَاۡخِرُوۡنَ ﴿۶﴾

৬
কোন জাতি তাহার (ধ্বংসের) মিয়াদকে ছাড়াইয়া (বাঁচিয়া) যাইতে পারে না এবং পিছনেও থাকিয়া যাইতে পারে না।

وَقَالُوۡا یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡ نُزِّلَ عَلَیۡہِ الذِّکۡرُ اِنَّکَ لَمَجۡنُوۡنٌ ؕ﴿۷﴾

৭
এবং তাহারা বলিল, ‘হে ঐ ব্যাক্তি যাহার উপর এই যিক্‌র (কুরআন) নাযেল করা হইয়াছে, নিশ্চয় তুমি পাগল,১৪৮০
১৪৮০। ‘মজনূন’ অর্থ পাগল। মজনুন এখানে জিন্ন্‌ বা প্রেতাত্মার প্রভাব হওয়া অথবা সাধারণভাবে ভুতে পাওয়া ব্যক্তি বুঝায় না; পাগল কিংবা যাহার বুদ্ধি-বৃত্তি সংক্রান্ত ইন্দ্রিয়সমূহ নিতান্ত দুর্বল হইয়া গিয়াছে এমন ব্যক্তিকে বুঝায়।

لَوۡ مَا تَاۡتِیۡنَا بِالۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنۡ کُنۡتَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ﴿۸﴾

৮
যদি তুমি সত্যবাদী হইয়া থাক তাহা হইলে কেন আমাদের নিকট ফিরিশ্‌তাদিগকে আনয়ন কর না?’

مَا نُنَزِّلُ الۡمَلٰٓئِکَۃَ اِلَّا بِالۡحَقِّ وَمَا کَانُوۡۤا اِذًا مُّنۡظَرِیۡنَ ﴿۹﴾

৯
আমরা ফিরিশ্‌তাগণকে অবতীর্ণ করি না, যথার্থ প্রয়োজন ব্যাতিরেকে এবং (যখন তাহাদিগকে অবতীর্ণ করি) তখন তাহাদিগকে (কাফেরদিগকে) অবকাশ দেওয়া হয় না১৪৮১
১৪৮১। এখানে অবিশ্বাসীদিগকে বলা হইয়াছে যে, যখন সত্য, ন্যায় ও প্রজ্ঞা (বিলহাক্‌) অনুযায়ী তাহারা ঐশী শাস্তির যোগ্য হইয়া যায়, কেবল তখনই ফিরিশ্‌তা তাহাদের উপর অবতীর্ণ হয় এবং তাহাদিগকে কোন অবকাশ দেওয়া হয় না।

اِنَّا نَحۡنُ نَزَّلۡنَا الذِّکۡرَ وَاِنَّا لَہٗ لَحٰفِظُوۡنَ ﴿۱۰﴾

১০
নিশ্চয় আমরাই এই যিক্‌র (কুরআন) নাযেল করিয়াছি এবং নিশ্চয় আমরাই ইহার হেফাযতকারী।১৪৮২
১৪৮২। এই আয়াতে কুরআন করীমকে অক্ষতরূপে সংরক্ষণ করার যে প্রতিশ্রুতি আছে তাহা এমন সুস্পষ্টরূপে পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছে যে, অন্য কোন প্রমাণ যদি নাও থাকিত, তবু এই সত্যই ইহার (কুরআনের) ইলাহী উৎস প্রমাণের জন্য যথেষ্ট হইত। এই সুরা মক্কাতে নাযেল হইয়াছিল এমন এক সময়ে, যখন আঁ-হযরত (সাঃ) এবং তাঁহার সাহাবাগণের (রাঃ) জীবন চরম বিপজ্জনক অবস্থার মধ্যে ছিল এবং শত্রুপক্ষ নূতন ধর্মমতকে সহজেই নিষ্পেষণ করিয়া সম্পূর্ণরূপে নিশ্চিহ্ন করিয়া দিতে পারিত (Noldeke)। এইরূপ এক অবস্থার মধ্যে কাফেরদিগকে তাহাদের চরম অপচেষ্টা দ্বারা ইহাকে ধ্বংস করার জন্য প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহ্বান জানানো হইয়াছিল এবং এই সাথে তাহাদিগকে সাবধানও করিয়া দেওয়া হইয়াছিল যে, তাহাদের সকল ষড়যন্ত্র আল্লাহ্‌তা’লা ব্যর্থ করিয়া দিবেন, কারণ তিনি স্বয়ং ইহার হেফাযতকারী। এই দাবী ছিল দ্ব্যর্থহীন ও খোলাখুলি এবং শত্রুপক্ষ ছিল শক্তিশালী ও নির্মম; তথাপি কুরআন যাবতীয় বিকৃতি, প্রক্ষেপণ ও হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে নিরাপদ থাকিয়া অব্যাহতভাবে স্বীয় নিরাপত্তার বিজয় ঘোষণা করিয়া চলিয়াছে। কুরআনের বিদ্বেষ-পরায়ণ সমালোচক স্যার উইলিয়াম মুইর বলিয়াছেন, “আমরা খুব জোরের সঙ্গেই বলিতে পারি যে, মুহাম্মদ (সাঃ) কর্তৃক রচিত(?) ‘কুরআনের’ প্রতিটি বাক্যই অপরিবর্তীত, অবিকৃত এবং অকৃত্রিম রহিয়াছে। ... অন্যান্য প্রত্যেক প্রকারের বাহ্যিক বা অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তায় সংরক্ষিত মূল-গ্রন্থ যাহা আমাদের নিকট রহিয়াছে উহাই মুহাম্মদ (সাঃ) স্বয়ং প্রণয়ন করিয়াছিলেন (?) এবং প্রচার করিতেন … তাহাদের গ্রন্থের অবিমিশ্র মূল রচনার সহিত আমাদের ধর্মগ্রন্থের বিভিন্ন পাঠের তুলনা করা আর বৈসাদৃশ্যপূর্ণ বিভিন্ন বস্তুর মধ্যে তুলনা করা একই কথা” (Introduction to the life of Mohammed)। জার্মানের খ্যাতনামা প্রাচ্য ভাষাবিদ অধ্যাপক নোলডিকি লিখিয়াছেনঃ ‘কুরআনের মধ্যে পরবর্তীকালে প্রক্ষেপের অস্তিত্ব প্রমাণ করার জন্য ইউরোপীয় পণ্ডিতগণের সকল প্রচেষ্টা ব্যর্থ হইয়াছে’ (এনসাইক ব্রিট)। বেশ কয়েক বৎসর পূর্বে, কুরআনের মূল-পাঠের পবিত্রতার মধ্যে ডাঃ মিন্‌গানা কর্তৃক ত্রুটি আবিষ্কারের চেষ্টার চরম ব্যর্থতা কুরআনের দাবীর সত্যতাকে মোহরাঙ্কিত করিয়া দিয়াছে যে, নাযেলকৃত সকল ধর্মগ্রন্থের মধ্যে একমাত্র পবিত্র কুরআনই সব রকম প্রক্ষেপ হইতে সম্পূর্ণ মুক্ত রহিয়াছে। (দি লারজার এডিশন অব দি কমেন্টারী, ১২৬৩-৬৬ পৃষ্ঠা দ্রষ্টব্য)।