النحل
An-Nahl
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ১২৯ আয়াত এবং ১৬ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ ও প্রসংগ
এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছে। অবশ্য হযরত ইব্নে আব্বাস ৯৬, ৯৭ এবং ৯৮ আয়াতগুলি অবতীর্ণ হওয়ার ব্যাপারে কিছুটা ভিন্নমত পোষণ করেন এবং তাঁহার মতে এই তিনটি আয়াত মদীনায় নাযেল হইয়াছিল। প্রফেসর নলডিকিও মনে করেন যে, আয়াত ৪৪, ১১২, ১২০, ১২১ এবং ১২৬ ব্যতিরেকে এই সূরাটির বাদ বাকী মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। এই সূরার ভূমিকায় কোন সংক্ষিপ্ত অক্ষরমালা বা ‘হুরূফে মুকাত্তায়াত’ নাই। যেহেতু কোন সূরার বিষয়বস্তু উক্ত সূরার ভূমিকা বা শুরুতে বর্ণিত ‘হুরূফে মুকাত্তায়াত’- এর ভাবের সম্প্রসারণ এবং উহার অন্তর্নিহিত অর্থ দ্বারা সার্বিকভাবে পরিবেশিত হয়। তাই যদি কোন সূরার শুরুতে অনুরূপ অক্ষরমালা না থাকে তাহা হইলে বুঝিতে হইবে যে, পূর্ববতী সূরার বিষয়বস্তু বর্তমান সূরাতেও আলোচিত হইবে এবং বর্তমান সূরার ভাবধারা ও বিষয়বস্তু পূর্ববতী সূরার আলোকে অনুসৃত হইবে। সেই দিক হইতে বর্তমান সূরার বিষয়বস্তুকে মূলতঃ পূর্ববর্তী সূরা ‘আল্ হিজর’-এর ধারাবাহিকতা ও ব্যাপ্তী হিসাবে মনে করিতে হইবে, এবং পূর্ববর্তী সূরার প্রারম্ভে উদ্ধৃত ‘হুরূফে মুকাত্তায়াত’-আলিফ, লাম, রা- এর আলোকেই বর্তমান সূরার বিষয়বস্তু পরিবেশিত হইবে। তবে উপস্থাপনা পদ্ধতি ও বিষয়বস্তুর অনুশীলনের দিক থেকে ইহাতে কিছুটা পার্থক্য পরিলক্ষিত হওয়া স্বাভাবিক।
বিষয়বস্তু
অত্যন্ত সংগত কারণেই বর্তমান সূরার শিরোনাম ‘আন্ নহল’ (অর্থ-মৌমাছি) রাখা হইয়াছে - কেননা এই সূরার ৬৯ আয়াতে বর্ণিত মৌমাছির সহজাত প্রবৃত্তিকে আল্লাহ্তা’লা ওহী হিসাবে অভিহিত করিয়াছেন। এস্থলে ‘ওহী’ শব্দটির অবতারণা করিয়া এই মহা সত্যের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে যে, এই বিশ্বজগতের সুষ্ঠু ও সফল পরিচালনা পদ্ধতি আল্লাহ্তা’লার ‘ওহী’ বা প্রত্যাদেশের উপর নির্ভরশীল - সেই প্রত্যাদেশ প্রকাশ্য, অ-প্রকাশ্য, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ যে শ্রেণীরই হউক না কেন। এই বিষয়টিই আলোচ্য সূরার কেন্দ্রবিন্দু বা সারমর্ম। তদুপরি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসাবে জিহাদের প্রসংগও এই সূরায় বর্ণিত হইয়াছে। ‘জিহাদের’ প্রসংগটি যেহেতু বিভিন্ন মহল কর্তৃক আক্রমণের লক্ষ্য হিসাবে বিবেচিত হইবে, তাই, ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, ঐশী ইশারায় মৌমাছি যেইরূপে অন্যায় হস্তক্ষেপ হইতে উহার মধুকে রক্ষা করে, তেমনি পবিত্র কুরআন, যাহা ঐশী তত্ব ও জ্ঞানের উৎস বিশেষ, উহাকে রক্ষা করার জন্যও মুসলমানদেরকে জিহাদে অংশ গ্রহণ করিতে হইবে। মো’মেনদেরকে অতঃপর বলা হইয়াছে যে, তাহারা যদি ইচ্ছা করে যে, তাহাদের বন্ধু-বান্ধব ও নিকট আত্মীয়বর্গ কুরআন তথা ইসলামের ডাকে সাড়া দিক তাহা হইলে সর্বাগ্রে তাহাদের হৃদয়ের পবিত্রতা আনয়ন প্রয়োজন। কেননা, হৃদয়ের পবিত্রতা ব্যতিরেকে আল্লাহ্কে জানা অসম্ভব। বস্তুতঃ ধর্মের ব্যাপারে যদি কোন বল প্রয়োগ করা হয়, তাহা হইলে ধর্মের আসল উদ্দেশ্যই পণ্ড হইয়া যায়।
অতঃপর, সূরাটিতে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আলোকপাতপূর্বক বলা হইয়াছে যে, এই পৃথিবীর বুকেও জাতিসমূহকে পুনরুত্থিত করা হয় এবং তাহাদের এক নূতন জীবন লাভ ঘটিয়া থাকে। বস্তুতঃ হিজরতের সাথেই এই পুনরুত্থান শুরু হইয়া যায়। তদনুসারে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কেও মাতৃভূমি ত্যাগ করিয়া মদীনায় হিজরত করিতে হইবে, কেননা তাঁহার অনুসারীদের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার জন্য কাফেরদের সংশ্রব হইতে আলাদা এক স্বতন্ত্র পরিবেশে সুষ্ঠুভাবে নিজেদের ধর্মের তত্ব ও দর্শনের ব্যাপারে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের প্রয়োজন রহিয়াছে। এই প্রসংগের আলোকে উপসংহার হিসাবে বলা হইয়াছে যে, মুসলমানদের আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার জন্য এই পার্থিব জীবনেই যদি হিজরতের প্রয়োজন হয়, তাহা হইলে মানুষের চিরন্তন আধ্যাত্মিক উন্নতির জন্য তো এক শাশ্বত আধ্যাত্মিক হিজরতের আরো অধিক প্রয়োজন এবং মানুষের মৃত্যু-পরবর্তী জীবনই হইতেছে সেই আধ্যাত্মিক হিজরত। এই আধ্যাত্মিক হিজরত পরবর্তী মনজিল মো’মেন ও কাফেরদের জন্য আলাদা হইয়া থাকে। কাফেররা দোযখে প্রবেশ করে এবং মো’মেনরা ঐশী অনুগ্রহের আলোকে স্নাত হইয়া আল্লাহ্তা’লার নৈকট্যের ধাপগুলি অতিক্রম করিতে থাকে। হিজরত প্রসংগে আলোকপাত করিয়া অতঃপর বলা হইয়াছে যে, মদীনায় হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর হিজরত-পরবর্তী সময় মুসলমানদের জন্যও মহান পরিণাম এবং সার্বিক কল্যাণকর বিষয় হিসাবে পরিণত হইবে। ইহার পর সূরাটিতে সংক্ষিপ্তভাবে যে বিষয়ে বলা হইয়াছে তাহা হইল - কেন কাফেরদেরকে অবকাশ দেওয়া হয় এবং সত্য গ্রহণের ব্যাপারে তাহাদেরকে কেন বাধ্য করা হয় না? অতঃপর, অবিশ্বাসী কর্তৃক প্রতিবাদ আকারে পেশকৃত এই প্রসংগেরও অবতারণা করা হইয়াছে যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যদি আল্লাহ্ কর্তৃক প্রেরিত সত্যিকার রসূল হিসাবে আবির্ভূত হইয়া থাকেন, তাহা হইলে পূর্বেকার নবী-রসূলদের শিক্ষার সহিত তাঁহার শিক্ষার এত পার্থক্য কেন? এই আপত্তির জবাবে বলা হইয়াছে যে, পূর্বেকার নবী-রসূলদের সত্যিকার শিক্ষা সময়ের ব্যবধানে, মানুষের অন্যায় হস্তক্ষেপ ইত্যাদি কারণে আর সঠিক অবস্থায় নেই। তাই, তাহাদের আনীত আসল শিক্ষার সহিত বর্তমানে প্রচলিত শিক্ষার অনেক পার্থক্য, যদিও এইসব শিক্ষা পূর্বেকার নবী-রসূলদের নামেই প্রচারিত হইয়া থাকে। বস্তুতঃ কোন নূতন নবী-রসূল তখনই আবির্ভূত হন, যখন পূর্বেকার ঐশী গ্রন্থাবলীর শিক্ষা বিকৃত হইয়া যায় এবং সেইগুলির ঐশী সংরক্ষণের ওয়াদাও আর বজায় থাকে না। আলোচ্য সূরাতে মৌমাছির দৃষ্টান্ত উল্লেখ করিয়া এই বিষয়ের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে যে, মৌমাছি যেমন ঐশী অনুপ্রেরণায় ফুল ও ফল হইতে ইহার খাদ্য সংগ্রহ করিয়া উহাকে সুস্বাদু ও উপকারী মধুতে পরিবর্তন করে, ঠিক তেমনি মানুষেরও নৈতিক ও আধ্যাত্মিক দিক-নির্দেশনার জন্য ঐশী-বাণী বা প্রত্যাদেশের প্রয়োজন রহিয়াছে। অবশ্য মধুও যেমন মানের দিক হইতে সকল ফুলেই এক প্রকার হয়না, তেমনি সকল মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নতিতেও পার্থক্য রহিয়াছে। মধুর বিভিন্ন রং ও গন্ধের মত যুগে যুগে আগত নবী-রসূলদের প্রতি প্রত্যাদিষ্ট বাণীর নমুনাও ভিন্নতর। ঐশী-বাণীর প্রয়োজনীয়তার কথা বুঝাইতে গিয়া অতঃপর আরো একটি যুক্তির অবতারণা করা হইয়াছে। উহা হইল এই যে, সময়ের ব্যবধানে মানুষ যখন কোন নবীর যুগ হইতে দূরে সরিয়া পড়ে, তখন ধীরে ধীরে কায়েমী স্বার্থ জন্মলাভ করে এবং মানুষ পুরুষানুক্রমে এই স্বার্থচক্র দ্বারা পরিবেষ্টিত হইয়া পড়ে এবং সাধারণ মানুষের সহজাত উন্নতির সকল পথ বন্ধ হইয়া যায়। তখন আল্লাহ্তা’লা স্বীয় স্বাভাবিক নিয়মে একজন নবীকে প্রেরণ করেন, যিনি মানুষ কর্তৃক সৃষ্ট এই স্বেচ্ছাচারিতার বিরুদ্ধে নিরলস সংগ্রাম চালান। সমসাময়িক সমাজের তথাকথিত দলপতি ও প্রধানগণ, যাহারা সকল প্রকার সুযোগ-সুবিধার একচ্ছত্র অধিকারী হইয়া থাকে, তাহাদের ক্ষমতাচ্যূতি ঘটে এবং নবীর নেতৃত্বে সাধারণ মানুষ তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। মানুষের বন্দী দশার মুক্তি ঘটে এবং তাহারা সত্যিকার স্বাধীনতার পরিবেশে শান্তির নিঃশ্বাস নেয়। অতঃপর, সূরাটিতে অবিশ্বাসীদের সতর্ক করিয়া বলা হইয়াছে যে, শীঘ্রই এই কুরআনের বদৌলতে ঐশী বিধান অনুযায়ী এক মহা-পরিবর্তন সাধিত হইবে। সময় সোচ্চার হইয়া এই পরিবর্তনের ঘোষণা দিতেছে এবং এই নূতন শিক্ষা অর্থাৎ কুরআন এমন একটি গ্রন্থ যাহার মধ্যে পরিপূর্ণ শিক্ষার সকল গুণ ও উপকরণ বিদ্যমান রহিয়াছে। এই নূতন শিক্ষা, তথা কুরআনের অনুসারীরা অচিরেই সফলতা লাভ করিবে এবং সকল প্রকার ক্ষমতা ও কর্তৃত্ব তাহাদের হাতে চলিয়া যাইবে। সকল প্রকার অবিশ্বাসের বিরুদ্ধে বাস্তবিকই এক কঠোর সংগ্রাম পরিচালিত হইবে এবং অসত্যের সকল নেতা ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে। সূরাটির শেষের দিকে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে উদ্দেশ্য করিয়া বলা হইয়াছে যে, তাহার প্রচারের ক্ষেত্র এখন উত্তরোত্তর বৃদ্ধি প্রাপ্ত হইবে, যাহার আওতায় খৃষ্টান ও ইহুদীরাও অন্তর্ভুক্ত হইবে। ইহার ফলে নূতন উত্তেজনা ও বিরোধিতা দেখা দিবে এবং মুসলমানেরা বিভিন্ন দিক হইতে দুঃখ-কষ্টের শিকার হইবে। কিন্তু ইসলামের যে ঐশী প্রতিশ্রুতি তাহা সর্বাবস্থায় বলবৎ থাকিবে এবং বাধা-বিপত্তির মধ্যেও ইহা ক্রমাগত সাফল্যের দিকে আগাইয়া যাইবে। অপর দিকে ইসলামের যাহারা শত্রু তাহারা তাহাদের অন্যায় আচরণ অনুযায়ী অর্জিত ভাগ্য বরণ করিবে অর্থাৎ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
اَتٰۤی اَمۡرُ اللّٰہِ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡہُ ؕ سُبۡحٰنَہٗ وَتَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ﴿۲﴾
یُنَزِّلُ الۡمَلٰٓئِکَۃَ بِالرُّوۡحِ مِنۡ اَمۡرِہٖ عَلٰی مَنۡ یَّشَآءُ مِنۡ عِبَادِہٖۤ اَنۡ اَنۡذِرُوۡۤا اَنَّہٗ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّاۤ اَنَا فَاتَّقُوۡنِ ﴿۳﴾
خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ ؕ تَعٰلٰی عَمَّا یُشۡرِکُوۡنَ ﴿۴﴾
خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ مِنۡ نُّطۡفَۃٍ فَاِذَا ہُوَ خَصِیۡمٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۵﴾
وَالۡاَنۡعَامَ خَلَقَہَا ۚ لَکُمۡ فِیۡہَا دِفۡءٌ وَّمَنَافِعُ وَمِنۡہَا تَاۡکُلُوۡنَ ﴿۪۶﴾
وَلَکُمۡ فِیۡہَا جَمَالٌ حِیۡنَ تُرِیۡحُوۡنَ وَحِیۡنَ تَسۡرَحُوۡنَ ﴿۪۷﴾
وَتَحۡمِلُ اَثۡقَالَکُمۡ اِلٰی بَلَدٍ لَّمۡ تَکُوۡنُوۡا بٰلِغِیۡہِ اِلَّا بِشِقِّ الۡاَنۡفُسِ ؕ اِنَّ رَبَّکُمۡ لَرَءُوۡفٌ رَّحِیۡمٌ ۙ﴿۸﴾
وَّالۡخَیۡلَ وَالۡبِغَالَ وَالۡحَمِیۡرَ لِتَرۡکَبُوۡہَا وَزِیۡنَۃً ؕ وَیَخۡلُقُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۹﴾
وَعَلَی اللّٰہِ قَصۡدُ السَّبِیۡلِ وَمِنۡہَا جَآئِرٌ ؕ وَلَوۡ شَآءَ لَہَدٰٮکُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ﴿٪۱۰﴾