الرعد
Ar-Ra`d
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৪৪ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ ও প্রসংগ
অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছে। ইহার বিষয়বস্তুও এই বক্তব্যের সমর্থন করে। অবশ্য, কিছু কিছু আয়াত মদীনায় নাযেল হইয়াছে বলিয়াও কেহ কেহ অভিমত প্রকাশ করিয়াছেন। যেমন আতা’র মতে 88 আয়াত, কাতাদার মতে ৩২ আয়াত এবং অন্যান্য কতিপয় বিশেষজ্ঞের মতে ১৩–১৫ আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হইয়াছে। পূর্ববর্তী সূরা ইউনুসে (১০ সূরা) বলা হইয়াছে যে, পৃথিবীতে যখনই কোন নবী-রসূলের আবির্ভাব ঘটে, তখন সমসাময়িক লোকেরা নবী-রসূলদের অস্বীকারজনিত কারণে হয় ঐশী শাস্তির সম্মুখীন হয়, নতুবা তাহাদের সৎকর্মের বিনিময়ে তাহাদের প্রতি ঐশী অনুকম্পা প্রদর্শিত হইয়া থাকে। অতঃপর, সূরা হুদ (১১ সূরা) ঐশী শাস্তির বিষয়ে ও সূরা ইউসূফে (১২ সূরা) ঐশী অনুকম্পার বিষয়ে বিশেষ গুরুত্বসহকারে আলোকপাত করা হয়। পূর্ববর্তী তিন সূরাতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রতি অবতীর্ণ ভবিষ্যদ্বাণী কিভাবে পরিপূর্ণতা লাভ করিবে অর্থাৎ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর উত্থান ও বিজয় কিরূপে সম্পন্ন হইবে এবং অন্যান্য সকল ধর্মের উপরে ইসলাম কিন্তবে প্রাধান্য লাভ করিবে– সেই সব বিষয়ে বর্তমান সূরাতে আলোচনা করা হইয়াছে।
বিষয়বস্তু
সূরাটি শুরুতেই এই ঘোষণা দিয়া বক্তব্য রাখিয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা বিভিন্ন দুর্জেয় পথ ও পন্থায় কাজ করিয়া থাকেন। তাহার প্রেরিত নবী রসূলগণও যে পদ্ধতিতে উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেন, তাহাও যথাসময়ে সকলের সামনে প্রকাশিত না হওয়ার পূর্বে প্রায়শঃই গোপন ও লোক-চক্ষুর অন্তরালে থাকিয়া যায়। অতঃপর, একটি বহুল প্রচলিত প্রাকৃতিক বিধানের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিয়া বলা হইয়াছে যে, একই ভূমিতে একই পানি দ্বারা সিক্ত হওয়া সত্বেও যেমন একই প্রকার ফল-ফসল উৎপাদিত হয় না, তেমনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) তৎকালীন যুগের এক বিধর্মী অধ্যুষিত এলাকা মক্কায় জন্মগ্রহণ করিলেও এবং একটি অনুন্নত পরিবেশে (লালিত-পালিত) হইলেও আল্লাহ্তা’লার বিশেষ রহমতে সর্বশ্রেষ্ঠ নবী হিসাবে উন্নীত হইয়াছিলেন। অতঃপর অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে বলা হইয়াছে যে, তাহারা যেন হযরত মুহাম্মদ(সাঃ)-এর বর্তমান দুর্বল অবস্থা বা বাহ্যিক সম্পদের অপ্রতুলতা দেখিয়া তাঁহার মূল্যায়ন না করে, অথবা পরিণামে তাঁহার বিজয় সম্পর্কে যে ঐশী ওয়াদা রহিয়াছে তাহার সফলতা সম্পর্কে সংশয় প্রকাশ না করে। বস্তুতঃ, তাঁহার প্রতিশ্রুত বিজয় বা সফলতা সম্পকে সংশয় প্রকাশের কোন কারণ নাই। পক্ষান্তরে মানবতার এই সীমাহীন দুর্ভোগ ও প্রয়োজনের সময় যদি তাঁহার আবির্ভাব না ঘটিত, তাহা হইলেই বরং আশ্চর্যের বিষয় হইত। এখন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) অবশ্যই সফলতা লাভ করিবেন এবং তাঁহার শত্রুপক্ষ ব্যর্থ মনোরথ হইবে। ইসলামের বিজয়ের লক্ষণসমূহ অচিরেই দৃশ্যমান হইয়া উঠিবে এবং আজ যাহারা ইসলামের বড় বড় বিরোধী ও দুশমন, তাহাদের সন্তান-সন্ততিও অদূর ভবিষ্যতে ইসলাম গ্রহণ করিয়া ইহার সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় গ্রহণ করিবে । আল্লাহ্তা’লা বিরুদ্ধবাদীদের নিকট হইতে সব রকমের সাহায্য-সহযোগিতা উঠাইয়া লইবেন এবং ধীরে ধীরে তাহাদের প্রতাপ ও প্রতিপত্তি লোপ পাইতে থাকিবে। যেহেতু সর্ব প্রকার প্রাকৃতিক নিয়মও আল্লাহ্তা’লারই নিয়ন্ত্রণাধীন, তাই হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর পরিণাম সফল করিবার জন্য তথা ইসলামের বিজয়ের সূচনার জন্য এখন আল্লাহ্তা’লা সকল প্রাকৃতিক নিয়ম তাঁহার অনুকূলে আনিয়া দিবেন। মোশরেকদের মিথ্যা উপাস্যগুলির পক্ষে এই নূতন ধর্মমতকে অর্থাৎ ইসলামের অগ্রযাত্রাকে প্রতিহত করিবার কোন প্রকার শক্তিই থাকিবে না। অতঃপর, সুরাটিতে হযরত নবী করীম (সাঃ)-এর আধ্যাত্মিকতার মহান শক্তির ইঙ্গিত দিয়া বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লার রহমতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) আধ্যাত্মিক মহান শক্তিতে এতই বলীয়ান হইবেন যে, তিনি একাই বিরুদ্ধবাদীদের পরাজিত করিতে যথেষ্ট, যেভাবে একজন চক্ষুষ্মান ব্যক্তি একদল অন্ধ ব্যক্তিকে পরাজিত করিতে সক্ষম। আসল কথা হইতেছে এই যে, আল্লাহ্তা’লার একত্ববাদের মোকাবিলায় বহু-ঈশ্বরবাদ কিছুতেই টিকিতে পারে না এবং একইভাবে মিথ্যা মা’বুদের উপাসকরাও সত্য মা’বুদের ইবাদতকারীদের বিরুদ্ধে কখনো মোকাবিলা করিতে পারে না। সত্যের শত্রুরা বিলোপ হইতে থাকিবে এবং পরিণামে ফেনা বা বুদ্বুদের ন্যায় নিশ্চিহ্ন হইয়া যাইবে। যাহারা অল্প বুদ্ধিসম্পন্ন, তাহারাই শুধু বাহিরের ফেনা বা বুদবুদৃকেই বড় করিয়া দেখে, ইহার নীচে যে নির্মল পানির ধারা প্রবাহিত, তাহা তাহারা দেখিতে পায় না। অথচ ফেনা বা বুদবুদ অচিরেই নিশ্চিহ্ন হইয়া যায় এবং নীচের নির্মল পানি ও স্বর্ণ থাকিয়া যায়। ঠিক একইভাবে বহু-ঈশ্বরবাদীদের ভ্রান্ত ধারণা ও অগভীর বিশ্বাস অচিরেই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইবে এবং কুরআনের মহান শিক্ষা ও উদার নীতি থাকিয়া যাইবে। যেহেতু কুরআনের শিক্ষা মানুষের প্রকৃতি ও বিবেক-সম্মত, তাই ইহা মানুষের অন্তরে স্থান করিয়া লইবে এবং ধীরে ধীরে তাহারা অনুভব করিতে সক্ষম হইবে যে, সত্য কোন দিকে—বিশেষ করিয়া যখন তাহারা কাফের ও মো’মেনদের নৈতিক মূল্যবোধের পার্থক্য সম্পর্কে তুলনা করিবে। বড় বড় নিদর্শন দেখানো হইবে এবং পবিত্র কুরআন ও ইহার সত্যিকার অনুসারীদের হৃদয়ের ঐশী দীপ্তিতে বহু আশ্চর্য ঘটনা সংঘটিত হইবে। জাগতিক দিক হইতে বড় বড় দুর্গ ও আশ্রয়স্থল বিজিত হইবে। ইহা ছাড়া অন্যতম নিদর্শন হইবে এই যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর স্বজাতি তাহাকে মক্কা হইতে বিতাড়িত করিবে এবং তাহার বিরুদ্ধে তরবারি তুলিয়া লইবে। কিন্তু ইসলাম উত্তরোত্তর জয়যুক্ত হইতে থাকিবে যতদিন না অবিশ্বাস ও বিরোধিতার কেন্দ্রস্থল মক্কা নগরীতে ইসলামের অনুসারীরা বিজয়ীর বেশে প্রবেশ করিবে। চিরদিনের মত আরব হইতে মূর্তিপূজা বিদূরিত হইবে এবং ইসলামের দৃঢ় ভিত্তি সেখানে প্রতিষ্ঠিত হইবে। সারা বিশ্ব প্রত্যক্ষ করিবে যে, এইসব নিদর্শনাদি ও আমূল পরিবর্তন আল্লাহ্তা’লার অশেষ শক্তি ও অনুগ্রহের ফলেই সম্ভব হইয়াছে, কোন মানবীয় শক্তির ফলে নহে। সূরাটিতে সত্যের বিরুদ্ধবাদীদের পরাজয় ও ধ্বস সম্পর্কিত এই ধরণের অনেক ভবিষ্যদ্বাণী রহিয়াছে এবং সাথে সাথে ইসলামের মহান ভবিষ্যত সম্পর্কেও অনেক সুসংবাদ রহিয়াছে।
শিরোনাম
সূরাটির অন্তর্নিহিত মূলভাব প্রকৃতপক্ষে তাহাই যাহা উপরে উল্লেখ করা হইয়াছে। এই মূলভাবের সহিত সামঞ্জস্য রাখিয়াই নামকরণ করা হইয়াছে ‘আর্ রা’দ’ বা বজ্র। বৃষ্টির সাথে সাথে যেমন বজ্র ও বিদ্যুৎ থাকে, ঠিক তেমনি সঙ্গত কারণেই ঐশী বৃষ্টি বা কুরআনের অবতরণের সঙ্গে সঙ্গেও আধ্যাত্মিক বজ্র ও বিদ্যুতের আর্বিভাব ঘটিয়াছে। ইসলামের আধ্যাত্মিক শক্তিই সেই বজ্র-শক্তি। যাহারা ইহাকে তরবারী দিয়া ধ্বস করিতে চায়, তাহারা তরবারী দ্বারাই ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে। আর যাহারা ইহার প্রতি আনুগত্য করে, তাহারাই পরিণামে সম্মান ও প্রতিপত্তির অধিকারী হইবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
الٓـمّٓرٰ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ ؕ وَالَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ الۡحَقُّ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۲﴾
اَللّٰہُ الَّذِیۡ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیۡرِ عَمَدٍ تَرَوۡنَہَا ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ بِلِقَآءِ رَبِّکُمۡ تُوۡقِنُوۡنَ ﴿۳﴾
وَہُوَ الَّذِیۡ مَدَّ الۡاَرۡضَ وَجَعَلَ فِیۡہَا رَوَاسِیَ وَاَنۡہٰرًا ؕ وَمِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ جَعَلَ فِیۡہَا زَوۡجَیۡنِ اثۡنَیۡنِ یُغۡشِی الَّیۡلَ النَّہَارَ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ ﴿۴﴾
وَفِی الۡاَرۡضِ قِطَعٌ مُّتَجٰوِرٰتٌ وَّجَنّٰتٌ مِّنۡ اَعۡنَابٍ وَّزَرۡعٌ وَّنَخِیۡلٌ صِنۡوَانٌ وَّغَیۡرُ صِنۡوَانٍ یُّسۡقٰی بِمَآءٍ وَّاحِدٍ ۟ وَنُفَضِّلُ بَعۡضَہَا عَلٰی بَعۡضٍ فِی الۡاُکُلِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّعۡقِلُوۡنَ ﴿۵﴾
وَاِنۡ تَعۡجَبۡ فَعَجَبٌ قَوۡلُہُمۡ ءَاِذَا کُنَّا تُرٰبًا ءَاِنَّا لَفِیۡ خَلۡقٍ جَدِیۡدٍ ۬ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۶﴾
وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالسَّیِّئَۃِ قَبۡلَ الۡحَسَنَۃِ وَقَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہِمُ الۡمَثُلٰتُ ؕ وَاِنَّ رَبَّکَ لَذُوۡ مَغۡفِرَۃٍ لِّلنَّاسِ عَلٰی ظُلۡمِہِمۡ ۚ وَاِنَّ رَبَّکَ لَشَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ﴿۷﴾
وَیَقُوۡلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَوۡلَاۤ اُنۡزِلَ عَلَیۡہِ اٰیَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ ؕ اِنَّمَاۤ اَنۡتَ مُنۡذِرٌ وَّلِکُلِّ قَوۡمٍ ہَادٍ ﴿٪۸﴾
اَللّٰہُ یَعۡلَمُ مَا تَحۡمِلُ کُلُّ اُنۡثٰی وَمَا تَغِیۡضُ الۡاَرۡحَامُ وَمَا تَزۡدَادُ ؕ وَکُلُّ شَیۡءٍ عِنۡدَہٗ بِمِقۡدَارٍ ﴿۹﴾
عٰلِمُ الۡغَیۡبِ وَالشَّہَادَۃِ الۡکَبِیۡرُ الۡمُتَعَالِ ﴿۱۰﴾