১৩

الرعد

সূরা আর্‌-রা’দ

Ar-Ra`d

মক্কী ৪৪ আয়াত ৬ রুকু পারা ১৩

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৪৪ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓـمّٓرٰ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ ؕ وَالَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ الۡحَقُّ وَلٰکِنَّ اَکۡثَرَ النَّاسِ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম মীম্ রা।১৪১৯ এইগুলি কামেল কিতাবের আয়াত এবং যাহা তোমার প্রতি তোমার প্রভুর পক্ষ হইতে নাযেল করা হইয়াছে, উহা পরিপূর্ণ সত্য; কিন্তু অধিকাংশ লোক ঈমান আনে না।
১৪১৯। পূর্বের ১০, ১১ এবং ১২ সূরার আরম্ভ ‘আলিফ লাম রা’ এই তিন অক্ষর দ্বারা। বর্তমান সূরার শুরু আলিফ লাম মীম্‌ রা এই চারটি বর্ণ দ্বারা। সংক্ষিপ্ত বর্ণমালার এই পার্থক্য ইংগিত করিতেছে যে, পূর্ববর্তী তিন সূরার বিষয়বস্তু হইতে এই সূরার বিষয়বস্তু কিছু ভিন্নতর। এই চারটি অক্ষর দ্বারা ব্যক্ত হইয়াছে— আমি আল্লাহ্ সর্বজ্ঞানী, সর্বদ্রষ্টা; ‘জ্ঞান’ বা ‘জানা’ এই গুণবাচক বিশেষণ পূর্ববর্তী সূরায় উল্লেখিত দেখা বা দর্শন বিশেষণের সঙ্গে সংযুক্ত হইয়াছে। অর্থাৎ সর্বদ্রষ্টা গুণের সঙ্গে সর্বজ্ঞানী গুণের সংযোজন করা হইয়াছে।

اَللّٰہُ الَّذِیۡ رَفَعَ السَّمٰوٰتِ بِغَیۡرِ عَمَدٍ تَرَوۡنَہَا ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ وَسَخَّرَ الشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ یَّجۡرِیۡ لِاَجَلٍ مُّسَمًّی ؕ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لَعَلَّکُمۡ بِلِقَآءِ رَبِّکُمۡ تُوۡقِنُوۡنَ ﴿۳﴾

৩
আল্লাহ্‌ তিনি, যিনি স্তম্ভ ব্যাতিরেকে আকাশসমূহকে (শূন্যে) উন্নীত করিয়াছেন যাহা তোমরা দেখিতেছ।১৪২০ অতঃপর, তিনি আরশে১৪২০-ক অধিষ্ঠিত হইলেন। এবং তিনি সূর্য ও চন্দ্রকে (তোমাদের) সেবায় নিয়োজিত করিলেন, প্রত্যেকেই এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত (নিজ নিজ কক্ষপথে) গতিশীল। তিনি প্রত্যেক বিষয়ের পরিচালনা করেন (এবং) তিনি আয়াতসমূহকে বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করেন যেন তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের সহিত মিলিত হওয়াতে দৃঢ় বিশ্বাস রাখ।
১৪২০। এই আয়াতের দুই অর্থ হইতে পারেঃ (১) তোমরা দেখিতে পাও আকাশসমূহ স্তম্ভ ব্যতিরেকে দাঁড়াইয়া আছে; (২) আকাশ এমন স্তম্ভের উপর দণ্ডায়মান নহে যাহা তোমরা দেখিতে পার, অর্থাৎ উহাদের অবলম্বন রহিয়াছে কিন্তু তোমরা দেখিতে পাও না। শাব্দিক অর্থে এই আয়াতের অর্থ দাঁড়ায় আকাশমণ্ডলী বিনা স্তম্ভেই দণ্ডায়মান রহিয়াছে। আলংকারিক বা রূপক অর্থে নভোমণ্ডলে যাহা কিছু যথা চন্দ্র, সূর্য, গ্রহ, নক্ষত্ররাজি অবলম্বনের উপর দণ্ডায়মান, কিন্তু পার্থিব মানব-চক্ষে উহা দৃষ্টি গোচর হয় না—দৃষ্টান্ত স্বরূপ মাধ্যাকর্ষণ শক্তি বা চুম্বক শক্তি বা গ্রহরাজির বিশেষ গতিবিধি বা অন্যান্য উপাদান বা উপকরণ যাহা বিজ্ঞান অদ্যাবধি আবিষ্কার করিয়াছে বা ভবিষ্যতে যাহা আবিষ্কৃত হইবে।
১৪২০-ক। আরশ্ অর্থ সিংহাসন। কুরআন করীমে এই শব্দ আধ্যাত্মিক বা পার্থিব বিধানের পূর্ণতা প্রকাশার্থে ব্যবহৃত হইয়াছে। পার্থিব রাজা-বাদশাহ্‌দের প্রচলিত রীতির সঙ্গে এই প্রকাশ ভঙ্গির সাদৃশ্য রহিয়াছে। তাহারা (বাদশাহগণ) গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা সিংহাসনে বসিয়াই দিয়া থাকেন।

وَہُوَ الَّذِیۡ مَدَّ الۡاَرۡضَ وَجَعَلَ فِیۡہَا رَوَاسِیَ وَاَنۡہٰرًا ؕ وَمِنۡ کُلِّ الثَّمَرٰتِ جَعَلَ فِیۡہَا زَوۡجَیۡنِ اثۡنَیۡنِ یُغۡشِی الَّیۡلَ النَّہَارَ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ ﴿۴﴾

৪
এবং তিনিই যমীনকে বিস্তৃত করিয়াছেন এবং উহাতে পর্বতসমূহ এবং প্রবহমান নদীসমূহ সৃষ্টি করিয়াছেন, এবং উহার মধ্যে প্রত্যেক প্রকার ফল দুইটি করিয়া জোড়ায় জোড়ায়১৪২১ সৃষ্টি করিয়াছেন। তিনি দিনকে রাত্রি দ্বারা ঢাকিয়া দেন। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে চিন্তাশীল লোকদের জন্য বহু নিদর্শন রহিয়াছে।
১৪২১। যদিও এই আয়াত শুধু ফলের প্রতি ইঙ্গিত করিয়াছে, অন্যত্র কুরআন করীম ব্যক্ত করে যে, আল্লাহ্‌তা’লা সকল বস্তুর জোড়া সৃষ্টি করিয়াছেন (৩৬ঃ৩৭,৫১ঃ৫০)। ইহা এমন বাস্তব সত্য যাহা সকল ধর্মগ্রন্থের মধ্যে কুরআনই সর্বপ্রথম বিবেচনার জন্য উপস্থাপন করিয়াছে। বৈজ্ঞানিকগণ, অজৈব পদার্থের মধ্যেও স্ত্রী - পুরুষ অর্থাৎ জোড়া আবিষ্কার করার কাজে লাগিয়া গিয়াছেন। এই আয়াত বাস্তব ঘটনার প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করে যে, প্রাকৃতিক বিধান বা নিয়মের অধীনে সকল বস্তুরই যেমন জোড়া রহিয়াছে, সেইরূপে মানবের বুদ্ধি ও বিচারশক্তির ক্ষেত্রেও ইহা প্রযোজ্য। স্বর্গীয় জ্যোতিঃ বা নূরের আলো যদি মানব বুদ্ধির উপর পতিত না হয়, তবে মানুষ প্রকৃত জ্ঞান পাইতে পারে না। ইলহাম এবং মানবের বিচারশক্তি এই দু’য়ের সংযোজন বা সম্মিলন নির্ভুল ও সত্য জ্ঞানের জন্ম দেয়।

وَفِی الۡاَرۡضِ قِطَعٌ مُّتَجٰوِرٰتٌ وَّجَنّٰتٌ مِّنۡ اَعۡنَابٍ وَّزَرۡعٌ وَّنَخِیۡلٌ صِنۡوَانٌ وَّغَیۡرُ صِنۡوَانٍ یُّسۡقٰی بِمَآءٍ وَّاحِدٍ ۟ وَنُفَضِّلُ بَعۡضَہَا عَلٰی بَعۡضٍ فِی الۡاُکُلِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّعۡقِلُوۡنَ ﴿۵﴾

৫
এবং ভূ-পৃষ্ঠে পরস্পর সংলগ্ন বহু (বিচিত্র) ভূ-খণ্ড আছে, এবং আঙ্গুরের বাগান সমূহও, আর আছে শস্য-ক্ষেত্র এবং এমন খর্জুরবৃক্ষ যাহার কতক একই মূল হইতে উদ্‌গত একাধিক বৃক্ষবিশেষ এবং পক্ষান্তরে কতক একমুল হইতে উদ্‌গত একই বৃক্ষ বিশেষ—(অথচ) উহাদিগকে একই পানি দ্বারা সিঞ্চিত করা হয়, তথাপি ফলের১৪২২ দিক দিয়া আমরা কতককে অপর কতকগুলির উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিই। নিশ্চয়ই ইহার মধ্যে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য নিদর্শন রহিয়াছে।
১৪২২। এই বাক্য বুঝাইতেছে যে, একই পানি দ্বারা সিঞ্চিত বৃক্ষরাজি স্বাদে ও রঙ্গে ভিন্ন ভিন্ন ফল দিয়া থাকে, তখন আল্লাহ্‌র রসূল (সাঃ) একই শহরে এবং একই জনগোষ্ঠিতে বাস করিয়াও কেন তাহাদের উপরে শ্রেষ্ঠত্ব লাভ করিতে পারিবেন না— বিশেষতঃ তিনি যখন ওহী ইলহাম-ভিত্তিক জীবনীশক্তির দ্বারা প্রতিপালিত এবং বিরুদ্ধবাদীরা শয়তানের অধীনে লালিত ?

وَاِنۡ تَعۡجَبۡ فَعَجَبٌ قَوۡلُہُمۡ ءَاِذَا کُنَّا تُرٰبًا ءَاِنَّا لَفِیۡ خَلۡقٍ جَدِیۡدٍ ۬ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِرَبِّہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ الۡاَغۡلٰلُ فِیۡۤ اَعۡنَاقِہِمۡ ۚ وَاُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۶﴾

৬
এবং যদি তুমি বিস্মিত হও, তাহা হইলে তাহাদের এইরূপ বলা অধিক বিস্ময়কর যে, ‘যখন আমরা মাটিতে পরিণত হইয়া যাইব, তখনও আমাদিগকে কি নূতন সৃষ্টিতে আসিতে হইবে?’ উহারাই তাহাদের প্রভুকে অস্বীকার করে, এবং  ইহাদেরই গলদেশে থাকিবে শৃঙ্খল,১৪২৩ এবং ইহারাই আগুনের অধিবাসী হইবে, তাহারা সেখানে বাস করিতে থাকিবে।
১৪২৩। গলদেশে শৃঙ্খল অর্থাৎ তাহাদের মিথ্যা বিশ্বাস এবং দুষ্কর্মের শিকল বা বেড়ি।

وَیَسۡتَعۡجِلُوۡنَکَ بِالسَّیِّئَۃِ قَبۡلَ الۡحَسَنَۃِ وَقَدۡ خَلَتۡ مِنۡ قَبۡلِہِمُ الۡمَثُلٰتُ ؕ وَاِنَّ رَبَّکَ لَذُوۡ مَغۡفِرَۃٍ لِّلنَّاسِ عَلٰی ظُلۡمِہِمۡ ۚ وَاِنَّ رَبَّکَ لَشَدِیۡدُ الۡعِقَابِ ﴿۷﴾

৭
এবং তাহারা তোমার নিকটে কল্যাণের পূর্বে দ্রুত অকল্যাণের কামনা করে, অথচ তাহাদের পূর্বে তাহাদের ন্যায় লোকদের উপর দৃষ্টান্ত-মূলক শাস্তি আসিয়াছিল। এবং নিশ্চয় তোমার প্রভু লোকদের প্রতি তাহাদের যুলুম সত্বেও বড়ই ক্ষমাশীল, এবং নিশ্চয়ই তোমার প্রভু কঠোর শাস্তিদাতা।

وَیَقُوۡلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَوۡلَاۤ اُنۡزِلَ عَلَیۡہِ اٰیَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ ؕ اِنَّمَاۤ اَنۡتَ مُنۡذِرٌ وَّلِکُلِّ قَوۡمٍ ہَادٍ ﴿٪۸﴾

৮
এবং যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা বলে, তাহার প্রভুর নিকট হইতে কেন তাহার উপর কোন নিদর্শন১৪২৪ নাযেল করা হয় নাই? অথচ তুমি একজন সতর্ককারী মাত্র। এবং প্রত্যেক জাতির জন্য হেদায়াতদাতা আছে।
সূরা আর্‌-রা’দ - রুকু ১
১৪২৪। ‘আয়াতুন’ নিদর্শন বা চিহ্ন। ইহার অপরিবর্তনীয় অর্থ হইল শাস্তি বা আযাবের নিদর্শন, যদি না সংশ্লিষ্ট প্রসঙ্গ ভিন্ন অর্থের প্রতি ইঙ্গিত করে।

اَللّٰہُ یَعۡلَمُ مَا تَحۡمِلُ کُلُّ اُنۡثٰی وَمَا تَغِیۡضُ الۡاَرۡحَامُ وَمَا تَزۡدَادُ ؕ وَکُلُّ شَیۡءٍ عِنۡدَہٗ بِمِقۡدَارٍ ﴿۹﴾

৯
আল্লাহ্‌ জানেন যাহা প্রত্যেক নারী ধারণ করে এবং জরায়ুসমূহ যাহা অপরিণত গর্ভপাত করে এবং যাহা কিছু পরিবর্ধন করে,১৪২৫ এবং তাঁহার নিকট প্রত্যেক বস্তুর এক পূর্ণ পরিমাপ আছে।
১৪২৫। পূর্বে ৪ আয়াতে বলা হইয়াছে যে, বিশ্বের সকল বস্তুরই জোড়া রহিয়াছে এবং আধ্যাত্মিক জগতেও সেইরূপ বিশেষ ব্যক্তি পুরুষ-সুলভ প্রভাব বিস্তার করে এবং অন্যেরা স্ত্রী-সুলভ সেই প্রভাব গ্রহণ করিয়া থাকে। বর্তমান আয়াতে ইহাই ব্যক্ত হইয়াছে যে, নবী করীম (সাঃ)- এর ব্যক্তি-সত্তার মধ্যে আধ্যাত্মিক পুরুষ-সত্তার আবির্ভাব ঘটিয়াছে যাহার সমর্থন বা ছাপ ব্যতিরেকে অন্য কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিক মর্যাদায় উন্নীত হইতে পারে না। এই আয়াত আরো প্রকাশ করিতেছে যে, আল্লাহ্‌তা’লাই ভালভাবে জানেন যে, মক্কাবাসীদের প্রকৃতিগত সামর্থ্য ও স্বাভাবিক যোগ্যতা স্বর্গীয় নেয়ামতের প্রভাব গ্রহণ করিবে, না শয়তানী প্রভাবে পরিচালিত হইবে, এবং কোন্‌ প্রভাব বৃদ্ধি পাইতে থাকিবে আর কোন্‌টি ধ্বংস প্রাপ্ত হইবে। যাহারা রসূল করীম (সাঃ)-কে গ্রহণ করে এবং তাঁহার ছাপ প্রাপ্ত হয় তাহারা উন্নতি করিবে, প্রভাবশালী ও শক্তিশালী হইবে, তাহাদের সংখ্যা বৃদ্ধি পাইবে এবং তাঁহার বিরুদ্ধবাদীরা ক্রমশঃ দুর্বল হইয়া লোপ পাইতে থাকিবে।

عٰلِمُ الۡغَیۡبِ وَالشَّہَادَۃِ الۡکَبِیۡرُ الۡمُتَعَالِ ﴿۱۰﴾

১০
তিনি অদৃশ্য এবং দৃশ্যের জ্ঞাতা, তিনিই শ্রেষ্ঠ, অতীব উচ্চ।