২১

الأنبياء

সূরা আল্ আম্বিয়া

Al-Anbiya'

মক্কী ১১৩ আয়াত ৭ রুকু পারা ১৬–১৭

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১১৩ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।

وَاَرَادُوۡا بِہٖ کَیۡدًا فَجَعَلۡنٰہُمُ الۡاَخۡسَرِیۡنَ ﴿ۚ۷۱﴾

৭১
এবং তাহারা তাহার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করিয়াছিল, কিন্ত আমরা তাহাদিগকেই ক্ষতিগ্রস্ত করিলাম।

وَنَجَّیۡنٰہُ وَلُوۡطًا اِلَی الۡاَرۡضِ الَّتِیۡ بٰرَکۡنَا فِیۡہَا لِلۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۷۲﴾

৭২
এবং আমরা তাহাকে এবং লূতকে উদ্ধার করিয়াছিলাম সেই দেশে যেখানে আমরা বিশ্ববাসীর জন্য বরকত রাখিয়াছিলাম।১৯০৩
১৯০৩। হযরত ইব্‌রাহীম ‘ঊর’ (মেসোপটেমিয়া) হইতে ‘হারান’ পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছিলেন এবং আল্লাহ্‌তা’লা কর্তৃক নির্দেশিত হইয়া তিনি সে স্থান হইতে কেনান গিয়াছিলেন, যে দেশ তাঁহার পরবর্তী বংশধরগণকে দেওয়ার জন্য আল্লাহ্‌ নির্ধারিত রাখিয়াছিলেন। এই ভ্রমণের এক নির্দিষ্ট লক্ষ্য এবং বিশেষ উদ্দেশ্য ছিল। ঐশী-পরিকল্পনা এবং কর্মসূচী অনুসরণে পবিত্র নবীগণ অথবা তাহাদের অনুসারীগণকে কোন না কোন সময়ে নিজেদের মাতৃভূমি হইতে হিজরত করিতে হইয়াছে।

وَوَہَبۡنَا لَہٗۤ اِسۡحٰقَ ؕ وَیَعۡقُوۡبَ نَافِلَۃً ؕ وَکُلًّا جَعَلۡنَا صٰلِحِیۡنَ ﴿۷۳﴾

৭৩
এবং আমরা তাহাকে দান করিয়াছিলাম ইসহাককে এবং পৌত্ররূপে ইয়া’কুবকে এবং আমরা তাহাদের সকলকেই সৎকর্মশীল করিয়াছিলাম।

وَجَعَلۡنٰہُمۡ اَئِمَّۃً یَّہۡدُوۡنَ بِاَمۡرِنَا وَاَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡہِمۡ فِعۡلَ الۡخَیۡرٰتِ وَاِقَامَ الصَّلٰوۃِ وَاِیۡتَآءَ الزَّکٰوۃِ ۚ وَکَانُوۡا لَنَا عٰبِدِیۡنَ ﴿ۚۙ۷۴﴾

৭৪
এবং আমরা তাহাদিগকে ইমাম মনোনীত করিয়াছিলাম, তাহারা আমাদের আদেশানুযায়ী (লোকদিগকে) হেদায়াত দিত; এবং আমরা তাহাদের প্রতি নেক কাজ করিতে এবং নামায কায়েম করিতে এবং যাকাত দিতে ওহী করিয়াছিলাম। বস্তুতঃ তাহারা সকলেই আমাদের ইবাদতকারী বান্দা ছিল।

وَلُوۡطًا اٰتَیۡنٰہُ حُکۡمًا وَّعِلۡمًا وَّنَجَّیۡنٰہُ مِنَ الۡقَرۡیَۃِ الَّتِیۡ کَانَتۡ تَّعۡمَلُ الۡخَبٰٓئِثَ ؕ اِنَّہُمۡ کَانُوۡا قَوۡمَ سَوۡءٍ فٰسِقِیۡنَ ﴿ۙ۷۵﴾

৭৫
এবং লূতকে আমরা হিকমত ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম। এবং তাহাকে সেই জনপদ হইতে উদ্ধার করিয়াছিলাম যাহারা জঘন্য কাজ করিত। নিশ্চয় তাহারা অতিশয় মন্দ এবং দুষ্কৃতকারী ছিল।

وَاَدۡخَلۡنٰہُ فِیۡ رَحۡمَتِنَا ؕ اِنَّہٗ مِنَ الصّٰلِحِیۡنَ ﴿٪۷۶﴾

৭৬
এবং আমরা তাহাকে আমাদের রহমতের মধ্যে দাখিল করিলাম, নিশ্চয় সে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত ছিল।
সূরা আল্ আম্বিয়া - রুকু ৫

وَنُوۡحًا اِذۡ نَادٰی مِنۡ قَبۡلُ فَاسۡتَجَبۡنَا لَہٗ فَنَجَّیۡنٰہُ وَاَہۡلَہٗ مِنَ الۡکَرۡبِ الۡعَظِیۡمِ ﴿ۚ۷۷﴾

৭৭
এবং (স্মরণ কর) নূহকে, যখন সে ইতিপূর্বে (আমাদিগকে) ডাকিয়াছিল এবং আমরা তাহার দোয়া শুনিয়াছিলাম এবং তাহাকে ও তাহার পরিজনকে এক পরম উৎকণ্ঠা হইতে উদ্ধার করিয়াছিলাম,১৯০৪
১৯০৪। ইহা উল্লেখযোগ্য যে, এই সূরা পরীক্ষা এবং কঠোর দুঃখ-দুর্দশার কথা বিশেষভাবে বর্ণনা করিয়াছে যাহার মধ্য দিয়া অধিকাংশ নবীগণকে তাহাদের নিজ নিজ যুগে অতিক্রম করিতে হইয়াছিল এবং সেই পথেও চলিতে হইয়াছিল যেজন্য আল্লাহ্‌তা’লা তাহাদিগকে সাহায্য করিয়াছিলেন এবং উৎপীড়ন হইতে রক্ষা করিয়াছিলেন। এইগুলির পরিপ্রেক্ষিতে ইহাই বুঝায় যে, সংশ্লিষ্ট নবীগণের মত ইসলাম ধর্মের পবিত্র নবী করীম (সাঃ)-কেও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করিতে হইবে এবং তিনিও এই কঠোর পরীক্ষা হইতে কৃতিত্বের সঙ্গে উত্তীর্ণ হইবেন।

وَنَصَرۡنٰہُ مِنَ الۡقَوۡمِ الَّذِیۡنَ کَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَا ؕ اِنَّہُمۡ کَانُوۡا قَوۡمَ سَوۡءٍ فَاَغۡرَقۡنٰہُمۡ اَجۡمَعِیۡنَ ﴿۷۸﴾

৭৮
এবং আমরা তাহাকে সেই কওমের বিরুদ্ধে সাহায্য করিয়াছিলাম যাহারা আমাদের নিদর্শনসমূহকে মিথ্যা বলিয়া অস্বীকার করিয়াছিল, নিশ্চয় তাহারা নিকৃষ্ট কওম ছিল; ফলে আমরা তাহাদের সকলকেই নিমজ্জিত করিয়াছিলাম।

وَدَاوٗدَ وَسُلَیۡمٰنَ اِذۡ یَحۡکُمٰنِ فِی الۡحَرۡثِ اِذۡ نَفَشَتۡ فِیۡہِ غَنَمُ الۡقَوۡمِ ۚ وَکُنَّا لِحُکۡمِہِمۡ شٰہِدِیۡنَ ﴿٭ۙ۷۹﴾

৭৯
এবং দাউদকেও এবং সুলায়মানকেও (স্মরণ কর) যখন তাহারা উভয়ে এক শষ্যক্ষেত্রের ঝগড়া সম্বন্ধে ফয়সালা করিতেছিল১৯০৫ সেই সময় যখন এক কওমের ছাগ-পাল রাত্রিকালে উহা খাইয়া ফেলিয়াছিল এবং আমরা তাহাদের ফয়সালার সাক্ষী ছিলাম।
১৯০৫। বাচনভঙ্গির সৌন্দর্য সাধনকল্পে বর্তমান এবং পরবর্তী কিছু আয়াতে আলংকারিক ভাষার ব্যবহার হইয়াছে। আল্ হারস (অর্থ ফসল, শস্য) শব্দ সোলায়মান (আঃ)-এর দেশ হইতে পারে এবং ‘ঘানামুল কাওম’ (অর্থঃ লোকদিগের ভেড়ার পাল) শব্দসমূহের দ্বারা প্রতিবেশী লুণ্ঠনজীবী বন্য উপজাতিকে বুঝাইতে পারে, যাহারা সোলায়মান (আঃ)-এর দেশ আক্রমণ করিয়াছিল। এই সূত্র সেই কর্মপন্থা সম্পর্কিত, যাহা হযরত দাউদ এবং সোলায়মান (আঃ) সেই সকল হিংস্র উপজাতিগুলির লুণ্ঠন প্রতিহত এবং তাহাদিগকে পরাজিত করিবার জন্য গ্রহণ করিয়াছিলেন। হযরত দাউদ (আঃ) খুব বড় যোদ্ধা ছিলেন, কাজেই তিনি কঠোর শাসন-প্রণালীর পক্ষপাতি ছিলেন। হযরত সোলায়মান (আঃ) কোমল পন্থা অনুসরণ করিতে চাহিতেন এবং উপজাতিগুলির প্রতি বন্ধুত্বের হাত বাড়াইয়া চুক্তিবদ্ধ করিয়া তাহাদিগকে জয় করিতে চাহিয়াছিলেন।

فَفَہَّمۡنٰہَا سُلَیۡمٰنَ ۚ وَکُلًّا اٰتَیۡنَا حُکۡمًا وَّعِلۡمًا ۫ وَّسَخَّرۡنَا مَعَ دَاوٗدَ الۡجِبَالَ یُسَبِّحۡنَ وَالطَّیۡرَ ؕ وَکُنَّا فٰعِلِیۡنَ ﴿۸۰﴾

৮০
আমরা সুলায়মানকে বিষয়টি বুঝাইয়া দিয়াছিলাম১৯০৬ এবং আমরা তাহাদের প্রত্যেককে শাসন-ক্ষমতা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম। এবং আমরা পর্বতমালা এবং পক্ষীকুলকেও দাউদের সঙ্গে সেবায় নিয়োজিত করিয়াছিলাম, তাহারা সকলেই (আল্লাহ্‌র) তসবীহ্ করিত।১৯০৭ আমরা সব কিছু করিতে ক্ষমতাবান।
১৯০৬। এই উক্তির মর্ম এই যে, সোলায়মান (আঃ)-এর মধ্যপন্থী এবং আপোষ মনোভাবের কর্মপন্থা সেই সময়ে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে সঠিক এবং উপযুক্ত ছিল। কতক ইহুদী লেখকেরা তাঁহার বিরুদ্ধে এই দোষারোপ করিয়াছিল যে, দুর্বল-পন্থা অনুসরণ করায় তাঁহার রাজ বংশের পতন ঘটিয়াছিল—ইহা ভিত্তিহীন। কিন্তু সোলায়মান (আঃ)-এর পক্ষ সমর্থন এই অর্থে লওয়া সঙ্গত হইবে না যে, দাউদ (আঃ)-এর অনুসৃত সমকালীন কঠোর পন্থা ভ্রান্ত ছিল। এইরূপ ধারণা-জনিত যে কোন ভুল ধারণার অপনোদন করা হইয়াছে—‘এবং তাহাদের প্রত্যেককে শাসন-ক্ষমতা ও জ্ঞান দান করিয়াছিলাম’ এই বাক্যাংশ দ্বারা ইহা সুস্পষ্ট হইয়া গিয়াছে যে, দাউদ এবং সোলায়মান (আঃ) উভয়ের কর্মপন্থাই স্থান, কাল ও অবস্থানুযায়ী সঠিক ও উত্তম ছিল।
১৯০৭। ‘এবং আমরা পর্বতমালা এবং পক্ষীকুলকে দাউদের সঙ্গে সেবায় নিয়োজিত করিয়াছিলাম,তাহারা সকলেই আল্লাহ্‌র তসবীহ্ করিত’ এই শব্দগুলির আক্ষরিকভাবে কেহ কেহ এই অর্থ করেন যে, পর্বত ও পক্ষীকুল দাউদ (আঃ)-এর নিয়ন্ত্রণাধীন ছিল এবং যখন তিনি আল্লাহ্‌র তসবীহ্ করিতেন তখন উহারা তাঁহার সঙ্গে সেই সৎকর্মে যোগদান করিতেন। উক্ত শব্দসমূহের কেবল এই অর্থ হয় যে, ধনীলোকেরা (পর্বতমালা) এবং উচ্চমার্গের রূহানী লোকগণ (পক্ষীকুল) দাউদ (আঃ)-এর সঙ্গে আল্লাহ্‌র মহিমা ঘোষণা এবং প্রশংসা-গীত গাহিত। কুরআন করীমের বহু স্থানে কেবল পর্বতমালা ও পক্ষীকুল নহে, বরং আকাশ এবং যমীনের অন্যান্য সবকিছু—সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্রসমূহ, দিন এবং রাত্রি, পশু, পাখি, নদী, সমুদ্র, বাতাস মেঘমালা ইত্যাদি সকলকেই মানুষের অধীন করা হইয়াছে বলিয়া বর্ণিত আছে (২ঃ১৬৫; ৭ঃ৫৫; ২২ঃ৩৮ এবং ৪৫ঃ১৩-১৪)। ‘জিবাল’ শব্দের অর্থ ইহাও হইতে পারে যে, পাহাড়ের অধিবাসীগণ, যেমন কখনও বাসস্থানের নামানুযায়ী জাতির নামও হইয়া থাকে (১২ঃ৮৩)। এইরূপে পর্বতশ্রেণী হযরত দাউদ (আঃ)-এর অধিনস্থ হওয়ার অর্থ ইহাও হইতে পারে যে, তিনি পর্বতে বসবাসকারী জংলী ও হিংস্র উপজাতিদিগকে জয় করিয়া নিজ শাসনাধীনে আনিয়াছিলেন। তিনি পাহাড়ী বন্য উপজাতিগুলিকে পরাস্তকারী এবং দমনকারী ছিলেন। পার্বত্য জাতিগুলিকে দাউদ (আঃ) কর্তৃক বশে আনার কথা বাইবেলেও উল্লেখ রহিয়াছে (২ শমুয়েল-৫)। অনুরূপভাবে পক্ষীকুল কর্তৃক আল্লাহ্‌তা’লার মহিমা কীর্তন উদযাপিত হওয়া বিস্ময়ের ব্যাপার হওয়া উচিৎ নহে। কুরআনের অন্যত্র আমরা পাঠ করিয়া থাকি যে, সমস্ত জিনিস সজীব অথবা নিষ্প্রাণ, ফিরিশ্‌তা, পশু, পাখি, আসমান এবং যমীন এমনকি প্রকৃতির শক্তি-নিচয়, আল্লাহ্‌তা’লার প্রশংসা গাহিয়া থাকে, কিন্তু মানুষ উহাদের মহিমা বুঝিতে পারে না (১৩ঃ১৪; ১৭ঃ৪৫; ২১ঃ২০-২১; ২৪ঃ৪২; ৬৯ঃ২; ৬১ঃ২, ৬৪ঃ২)। বস্তুতঃ উহারা আল্লাহ্‌তা’লার দ্বারা অর্পিত আপন আপন দায়িত্ব পালন করিয়া চলিয়াছে এবং এইভাবে উহারা প্রমাণ করিতেছে যে, আল্লাহ্‌তা’লা পূর্ণাঙ্গ এবং সম্পূর্ণভাবে ত্রুটি, ক্ষয় এবং অক্ষমতা হইতে মুক্ত। ‘পক্ষীকুল’ শব্দ প্রকৃত পাখীকেও বুঝাইতে পারে। এই অর্থে ইহার মর্ম হইবে যে, হযরত দাউদ (আঃ) পাখীদিগকে বিশেষ প্রশিক্ষণের মাধ্যমে যুদ্ধের সময় সংবাদ বহনের কাজে লাগাইতেন। ইহার মর্ম এইরূপও হইতে পারে যে, পাখীর ঝাঁক হযরত দাউদ (আঃ)-এর বিজয়ী সৈন্য বাহিনীর পশ্চাতে আসিত এবং তাঁহার পরাজিত শত্রুর সৈন্যের মৃত লাশগুলির উপর ভোজ উৎসব করিত।