২১

الأنبياء

সূরা আল্ আম্বিয়া

Al-Anbiya'

মক্কী ১১৩ আয়াত ৭ রুকু পারা ১৬–১৭

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১১৩ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

اِقۡتَرَبَ لِلنَّاسِ حِسَابُہُمۡ وَہُمۡ فِیۡ غَفۡلَۃٍ مُّعۡرِضُوۡنَ ۚ﴿۲﴾

২
মানুষের জন্য তাহাদের হিসাব-নিকাশের সময় ঘনাইয়া আসিয়াছে, তথাপি তাহারা অবহেলার সহিত মুখ ফিরাইয়া লইতেছে।

مَا یَاۡتِیۡہِمۡ مِّنۡ ذِکۡرٍ مِّنۡ رَّبِّہِمۡ مُّحۡدَثٍ اِلَّا اسۡتَمَعُوۡہُ وَہُمۡ یَلۡعَبُوۡنَ ۙ﴿۳﴾

৩
তাহাদের নিকট তাহাদের প্রতিপালকের পক্ষ হইতে যে কোন নূতন স্মারক-বাণীই১৮৬৯ আসে, তাহারা একদিকে উহা শুনে, অপরদিকে উহার সহিত ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে।
১৮৬৯। প্রকৃতিগতভাবে প্রত্যেক নবীর বার্তাই এক নূতন বাণী, কিন্তু বিষয়বস্তুর মর্ম এক ও অভিন্ন । কুরআন শরীফে নবী করীম (সাঃ)-কে এইভাবে তুলিয়া ধরা হইয়াছে যে, তিনি নিজের সম্বন্ধে বলিয়াছেন, ‘আমি কোন অভিনব রসূল নহি’ (৪৬ঃ১০)।

لَاہِیَۃً قُلُوۡبُہُمۡ ؕ وَاَسَرُّوا النَّجۡوَی ٭ۖ الَّذِیۡنَ ظَلَمُوۡا ٭ۖ ہَلۡ ہٰذَاۤ اِلَّا بَشَرٌ مِّثۡلُکُمۡ ۚ اَفَتَاۡتُوۡنَ السِّحۡرَ وَاَنۡتُمۡ تُبۡصِرُوۡنَ ﴿۴﴾

৪
তাহাদের অন্তর আমোদ-প্রমোদে বিভোর। এবং যাহারা যুলুম করিয়াছে, তাহারা গোপনে পরামর্শ করিয়া বেড়ায় (এবং বলে) ‘এ যে তোমাদেরই মত একজন মানুষ ব্যতীত কিছু নহে, তবুও কি তোমরা দেখিয়া শুনিয়া তাহার যাদুমন্ত্রের কবলে পড়িবে?’১৮৭০
১৮৭০। প্রত্যেক নবীর বিরুদ্ধে কাফেরদের প্রধান আপত্তি একই রকম যে, তিনি তাহাদেরই মত মরনশীল এক সাধারণ মানুষ (১৪ঃ১১; ২৩ঃ২৫,৩৪; ২৬ঃ১৫৫; ৩৬ঃ১৬ এবং ৬৪ঃ৭)। এই আপত্তির উত্তর ১২ঃ১১০; ১৪ঃ১২; ১৬ঃ৪৪-৪৫ এবং ১৭ঃ৯৬ আয়াতসমূহে দেওয়া হইয়াছে। এই সূরার ৮ আয়াতে ইহার উত্তর দেওয়া হইয়াছে যে, অবিশ্বাসীরা বলে যে, রসূল (সাঃ)-এর মধ্যে সাধারণ মানুষ হইতে ভিন্ন কিছুই নাই, অপর দিকে তাহারা বলে যে, তিনি একজন যাদুকর, অর্থাৎ তিনি একজন শ্রেষ্ঠতর বুদ্ধিমত্তার অধিকারী। আল্লাহ্‌র প্রত্যাদিষ্ট নবীগণকে যাদুকর আখ্যা দেওয়া হইয়া থাকে, কারণ তাহাদের বাণী শ্রবণকারীদিগের উপর ম্যাজিক বা মন্ত্রবৎ প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। এই আয়াতের মধ্যে অবিশ্বাসীদিগের এই স্বীকারোক্তি অন্তর্নিহিত রহিয়াছে যে, কুরআনের আকর্ষণকারী শক্তি রহিয়াছে এবং ইহার শিক্ষা প্রত্যাখ্যান করা একজন নিরপেক্ষ ও ন্যায়-বিচারপরায়ণ মানুষের জন্য সত্যিই কষ্টসাধ্য ব্যাপার।

قٰلَ رَبِّیۡ یَعۡلَمُ الۡقَوۡلَ فِی السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ ۫ وَہُوَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ﴿۵﴾

৫
সে (রসূল) বলিল, ‘আমার প্রভু সকল কথাই জানেন উহা আকাশে (বলা) হউক বা পৃথিবীতে (বলা) হউক। এবং তিনিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।’১৮৭১
১৮৭১। ইসলামের বিরুদ্ধে কাফেরদের সকল গোপন এবং প্রকাশ্য চক্রান্ত ও ষড়যন্ত্র আল্লাহ্‌তা’লা জানেন এবং তিনি আঁ-হযরত (সাঃ) এবং তাঁহার অনুগৃহীত বান্দাগণের দোয়া শোনেন এবং তিনি অবিশ্বাসীদিগের সমস্ত কুপরিকল্পনা ব্যর্থ করিয়া দেন।

بَلۡ قَالُوۡۤا اَضۡغَاثُ اَحۡلَامٍۭ بَلِ افۡتَرٰٮہُ بَلۡ ہُوَ شَاعِرٌ ۚۖ فَلۡیَاۡتِنَا بِاٰیَۃٍ کَمَاۤ اُرۡسِلَ الۡاَوَّلُوۡنَ ﴿۶﴾

৬
(তাহাই নহে) বরং তাহারা বলিয়াছে, ‘ইহা (কুরআন) কেবল এলোমেলো স্বপ্ন, বরং সে নিজে এই সব কথা রচনা করিয়া লইয়াছে, বরং সে একজন কবি।১৮৭২ অতএব সে যেন আমাদের নিকট কোন নিদর্শন লইয়া আসে যেরূপে পূর্ববর্তীদিগকে (রসূলগণকে) নিদর্শন সহ পাঠানো হইয়াছিল।’
১৮৭২। তফসীরাধীন আয়াতে কুরআন সম্পর্কে কাফেরদের তিনটি ভিন্ন ভিন্ন আপত্তির উল্লেখ রহিয়াছে। প্রথমটি হইল কুরআন তালগোল-পাকানো স্বপ্ন বা অলীক কল্পনার সংমিশ্রণ। কিন্তু, যেহেতু ইহাতে সুন্দর এবং সুবিন্যস্ত বিন্যাস প্রণালী বিদ্যমান রহিয়াছে এবং যেহেতু ইহা সংশ্লিষ্ট বিষয় সামগ্রীকভাবে উপস্থাপন করে এবং অতুলনীয় শিক্ষা বহন করে, সেহেতু ইহার বিরুদ্ধে অবিশ্বাসীদিগের যুক্তি টিকাইয়া রাখিতে তাহাদের নিষ্ফল অবস্থা গভীরভাবে অনুভব করিতে পারিয়া তাহারা পূর্ব-যুক্তি পরিত্যাগ করিয়া নূতন যুক্তির অবতারণা করিয়া বলে যে, তিনি (নবী করীম-সাঃ) নিজে ইহা মিথ্যা রচনা করিয়াছেন। কিন্তু পুনরায় তাহারা উপলদ্ধি করে যে, জীবনব্যাপী আঁ-হযরত (সাঃ) সার্বজনীনভাবে ‘বিশ্বস্ত’ এবং ‘সত্যবাদী’ বলিয়া সুখ্যাত ও বিবেচিত ছিলেন, তাই তাহারা এই আপত্তিও পরিত্যাগ করে এবং তাঁহাকে কবি এবং যাদুকর আখ্যায়িত করিতে থাকে। এই সকল অভিযোগ ও আপত্তি ক্রমান্বয়ে উল্লেখিত হইয়াছে এবং কাফেরদিগের একটানা পূর্ব-যুক্তি পরিত্যাগ করিয়া নূতন যুক্তির অবতারণার মধ্যেই নিহিত রহিয়াছে তাহাদের এই স্বীকারোক্তি যে, আপত্তিগুলি নির্বোধ, স্ববিরোধী এবং বিচারের ধোপে টিকে না। কাজেই কুরআন করীম এইগুলিকে এখানে প্রত্যাখ্যান করিয়াছে।

مَاۤ اٰمَنَتۡ قَبۡلَہُمۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ اَہۡلَکۡنٰہَا ۚ اَفَہُمۡ یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۷﴾

৭
তাহাদের পূর্বে কোন জনপদ—যেগুলিকে আমরা ধ্বংস করিয়াছি—ঈমান আনে নাই, অতএব ইহারা কি কখনও ঈমান আনিবে?

وَمَاۤ اَرۡسَلۡنَا قَبۡلَکَ اِلَّا رِجَالًا نُّوۡحِیۡۤ اِلَیۡہِمۡ فَسۡـَٔلُوۡۤا اَہۡلَ الذِّکۡرِ اِنۡ کُنۡتُمۡ لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۸﴾

৮
এবং আমরা তোমার পূর্বেও কেবল পুরুষগণকেই (রসূলরূপে) পাঠাইয়াছি, যাহাদের প্রতি আমরা ওহী করিতাম। সুতরাং যদি তোমরা না জানিয়া থাক তাহা হইলে আহ্‌লে কিতাবগণকে (পূর্ববর্তী ঐশী-কিতাবের অনুগামী) জিজ্ঞাসা করিয়া দেখ।

وَمَا جَعَلۡنٰہُمۡ جَسَدًا لَّا یَاۡکُلُوۡنَ الطَّعَامَ وَمَا کَانُوۡا خٰلِدِیۡنَ ﴿۹﴾

৯
এবং আমরা সেই সব রসূল কে না এমন দেহ দিয়াছিলাম যে তাহারা আহার করিত না এবং না তাহারা চিরকাল বাঁচিয়া থাকিবার অধিকারী ছিল।১৮৭৩
১৮৭৩। যদিও অবিশ্বাসীগণ আল্লাহ্‌তা’লার প্রেরিত সকল নবীকেই সাধারণ মরণশীল মানুষ মনে করিত তথাপি তাঁহাদের প্রত্যেকের জন্য একই আপত্তি অপরিবর্তনীয়ভাবে বারংবার উত্থাপিত হইয়াছিল যে, সাধারণ মরণশীল মানুষের মতই তিনি পানাহার করেন এবং রাস্তায় চলাচল করেন এবং সকল মানবীয় দৈহিক চাহিদা ও প্রয়োজনের অধীন তিনি (২৫ঃ৮)। আত্মপক্ষ সমর্থনে এই মাপকাঠির উপর ভিত্তি করিয়াই উহারা তাঁহাকে প্রত্যাখ্যান করিয়াছিল। এখানে কাফেরদিগের এই স্ববিরোধী মনোভাবের প্রতি পরোক্ষ ইংগিত করা হইয়াছে। তাহারা এই সরল সহজ বাস্তবকে বুঝিতে চাহে না। আয়াতটির মর্ম এই যে, নবীগণ আবির্ভূত হইয়া থাকেন মানবের জন্য নমুনা স্বরূপ এবং কিরূপে তাঁহারা আদর্শ হিসাবে কাজ করিতেন যদি তাঁহারা তাহাদের মত মানুষ না হইতেন এবং যদি তাহাদের মত বস্তু জগতের দৈহিক প্রয়োজনের অধীন না হইতেন ? মানব-সত্তা হইয়া রক্ত-মাংসের চাহিদা, ক্ষয় বা মৃত্যু হইতে তাঁহারা মুক্ত ছিলেন না।

ثُمَّ صَدَقۡنٰہُمُ الۡوَعۡدَ فَاَنۡجَیۡنٰہُمۡ وَمَنۡ نَّشَآءُ وَاَہۡلَکۡنَا الۡمُسۡرِفِیۡنَ ﴿۱۰﴾

১০
অতঃপর আমরা তাহাদের সহিত যে ওয়াদা করিয়াছিলাম উহা আমরা পূর্ণ করিয়া দেখাইয়াছিলাম; এবং আমরা তাহাদিগকে এবং যাহাদিগকে আমরা চাহিয়াছিলাম তাহাদিগকে উদ্ধার করিয়াছিলাম এবং সীমালঙঘনকারীগণকে ধ্বংস করিয়াছিলাম।