طه
TaHa
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ১৩৬ আয়াত এবং ৮ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ ও প্রসংগ
এই সূরাটি নবুওয়াতের খুবই গোড়ার দিকে মক্কাতে নাযেল হইয়াছিল। হযরত আবদুল্লাহ্ বিন মাসউদ (রাঃ), যিনি হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর প্রথম দিককার সাহাবাদের অন্যতম, তিনি এই অভিমত ব্যক্ত করেন। পূর্ববর্তী সূরার বিষয়বস্তুতে খৃষ্টান ধর্ম সংক্রান্ত যেসব মতবাদ লইয়া আলোচনা করা হইয়াছে, উহার ধারাবাহিকতা আলোচ্য সূরাতেও বর্তমান। খৃষ্টীয় মতবাদের একটি মৌলিক বিশ্বাস হইতেছে এই যে, ধর্মীয় বিধান বা শরীয়াত একটি অভিশাপ। খৃষ্টানদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যানসূচক এক জোরালো বক্তব্য দ্বারা বর্তমান সূরাটি শুরু হইয়াছে। ইহাতে বলা হইয়াছে যে, শরীয়াত অভিশাপ তো নয়ই, বরং ইহা হইতেছে এক অপার ঐশী অনুগ্রহ ও কল্যাণ। ইহা মানুষের উপরে কোন বোঝা বা কষ্টদায়ক কিছু নহে; বরং ইহার উদ্দেশ্য হইতেছে মানুষের দুঃখ প্রশমিত করা ও তাহাকে আধ্যাত্মিক প্রশান্তি প্রদান করা। বস্তুতঃ পবিত্র কুরআনের ইহা একটি প্রধান উদ্দেশ্যও বটে যাহা যথার্থভাবে ইহার মাধ্যমে পূর্ণতা লাভ করিয়াছে। ইসলামের নবীকে তাই এই সুসংবাদ দ্বারা সান্ত্বনা দেওয়া হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা মানুষের বোঝা লাঘব করার জন্যই পবিত্র কুরআন অবতীর্ণ করিয়াছেন, তাহার অসুবিধা বাড়ানোর জন্য নহে। ইহা মানুষের সকল বড় বড় প্রয়োজন মিটাইতে সক্ষম।
বিষয়বস্তু
সূরাটিতে খৃষ্টানদের উদ্দেশ্যে আরো বলা হইয়াছে যে, পবিত্র কুরআনে অন্তর্ভুক্ত সত্যকে সঠিকভাবে অনুধাবন করার জন্য তাহাদের উচিত সেই অবস্থা ও ঘটনার প্রতি মনোনিবেশ করা— যে অবস্থার মধ্য দিয়া হযরত মূসা (আঃ) অতিক্রম করিয়াছিলেন। বস্তুতঃ আধ্যাত্মিকতার দিক হইতে যখন হযরত মূসা (আঃ)-এর শিক্ষা ও অন্যান্য গুণাবলী পরিপূর্ণতা লাভ করিল এবং একজন নবীর মহান দায়িত্বাবলী সম্পন্ন করিবার যোগ্যতার মাপকাঠিতে তিনি যখন উপযুক্ত বিবেচিত হইলেন তখনই হযরত মূসা (আঃ)-কে ফেরাউনের নিকট যাওয়ার ও ঐশী-বাণী প্রচারের নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল। অবশ্য ফেরাউন আল্লাহ্র বাণীকে গ্রহণ করিতে রাজি হইল না, বরঞ্চ হযরত মূসা (আঃ)-এর প্রতি সে খুবই উদ্ধত ব্যবহার করিল এবং তাঁহাকে হত্যা করিবার প্রচেষ্টা চালাইল। উহার ফলে আল্লাহ্তা’লা মূসা (আঃ)-কে নির্দেশ দিলেন যেন তিনি বনী ইসরাঈলকে লইয়া মিশর হইতে কেনানের পথে বাহির হইয়া পড়েন। ফেরাউন ইহা জানিতে পারিয়া তাহার শক্তিশালী সৈন্যবাহিনীসহ হযরত মূসা (সাঃ)-এর পশ্চাদ্ধাবন করিল, কিন্তু ঐশী আযাবের শিকার হইয়া সে বনী ইসরাঈলের চোখের সামনেই সাগরে নিমজ্জিত হইল। অতঃপর, মূসা (আঃ) তুর পর্বতে আরোহণ করিলেন যেখানে তাঁহার নিকট বিধান নাযেল হইল। সূরাটিতে ইহার পর একটি সূক্ষ্ম বিষয়ের অবতারণা করিয়া খৃষ্টানদিগকে তিরস্কার করা হইয়াছে। তাহাদেরকে বলা হইয়াছে যে, হযরত ঈসা (সাঃ)-এর পূর্বে বনী ইসরাঈলীরা তাহাদের বিধান মতে আল্লাহ্র অস্তিত্বে বিশ্বাসী ছিল এবং তৎপরবর্তী শরীয়াত অর্থাৎ কুরআনের শিক্ষাতেও আল্লাহ্র একত্ব এবং বিধান বা শরীয়াতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে অত্যন্ত গুরুত্ব সহকারে ঘোষণা রহিয়াছে। তথাপি ইহা কি করিয়া সম্ভব যে, অত্যন্ত দৃঢ় ও স্পষ্টভাবে ঘোষিত এই দুইটি একত্ববাদী বিশ্বাসের মধ্যবর্তী স্থানে খৃষ্টানদের তথাকথিত ত্রিত্ববাদ ও ‘বিধান মাত্রই অভিশাপ’ জাতীয় বিপরীতমুখী ধারণার প্রবর্তন হইতে পারে? অতঃপর, খৃষ্টানজাতির উদ্দেশ্যে পুনরায় বলা হইয়াছে যে, তাহাদের পাপ ও অন্যায় আচরণের প্রতিফল হিসাবে তাহারা এক ঐশী শাস্তির সম্মুখীন হইবে, যাহা তাহাদের জাগতিক উন্নতি উপভোগের এক হাজার বৎসর পরে সংঘটিত হইবে। ইহার মধ্যে শেষের তিন শতাব্দী হইবে তাহাদের উন্নতি ও উৎকর্ষতা লাভের ক্ষেত্রে সব চাইতে অধিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ। এই অব্যাহত উন্নতির ফলে তাহারা ঐশী-শাস্তি সম্পর্কিত সাবধান-বাণীকে অবজ্ঞাভরে প্রত্যাখ্যান করিবে। অথচ ইহা ঐশী ওয়াদা যাহা অবশ্যই সংঘটিত হইবে এবং প্রতীচ্যের খৃষ্টীয় জাতিসমূহ এই ভয়াবহ আযাবের শিকার হইবে। যেমন বলা হইয়াছে, “উহারা তোমাকে পর্বতসমূহ সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করে। বল আমার প্রতিপালক উহাদিগকে সমূলে উৎপাটন করিয়া বিক্ষিপ্ত করিয়া দিবেন—(আয়াত ১০৬ও ১০৭)।” এস্থলে পর্বতসমূহ দ্বারা পর্বতের মত সুউচ্চ ও ক্ষমতাধর পশ্চিমের খৃষ্টান জাতিসমূহকে বুঝানো হইয়াছে। অতঃপর, যে বিষয়বস্তু লইয়া সূরাটি শুরু হইয়াছিল সেই প্রসঙ্গের পুনরাবৃত্তি করা হইয়াছে। যেমন, পবিত্র কুরআন যেহেতু আরবদের জাতীয় ভাষা অর্থাৎ আরবীতে অবতীর্ণ হইয়াছে, তাই ইহার বাণী ও তাৎপর্যকে সহজে উপলব্ধি করা তাহাদের পক্ষে সম্ভব হইয়াছিল। তদুপরি খৃষ্টীয় ধর্মগ্রন্থের মত ইহাতে রূপক ও উপমার আড়ালে আসল বিষয়বস্তুকে প্রচ্ছন্ন করিয়া পেশ করা হয় নাই। পক্ষান্তরে বিষয়বস্তুর অস্পষ্টতার পবিবর্তে ইহার শিক্ষা সহজ ও বোধগম্য ভাষায় পরিবেশিত হইয়াছে। অতঃপর, বিধান বা শরীয়াতের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে পুনরায় অত্যন্ত শক্তিশালী ও জোরালো যুক্তির অবতারণা করিয়া দেখানো হইয়াছে যে, বিধান কোন অভিশাপ নয়, বরং ইহা একটি মহান ঐশী অনুগ্রহ। অতঃপর, ‘জান্নাত’ হইতে আদমের (আঃ) নির্বাসিত হওয়ার ঘটনা উল্লেখ করা হইয়াছে। বস্তুতঃ, এই ঘটনার কাঠামোকে কেন্দ্র করিয়াই খৃষ্টীয় প্রায়শ্চিত্তবাদকে দাঁড় করানো হইয়াছে, অথচ, আসল বিষয় বুঝিতে হয় খৃষ্টানরা ভুল করিয়াছে, নতুবা উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে তাহারা ইহার ভুল ব্যাখ্যা করিয়াছে এবং ভূল বর্ণনা দিয়াছে। আসল কথা হইতেছে, এক নির্দিষ্ট ঐশী পরিকল্পনা অনুযায়ী হযরত আদম (আঃ)-এর জন্ম সংঘটিত হইয়াছিল এবং ঐশী পরিকল্পনার লক্ষ্য কখনো ব্যর্থ হয় না। বাইবেলের বর্ণনানুযায়ী দেখা যায় যে, “ঈস্বর আপনার প্রতিমূর্তিতে মানুষকে (অর্থাৎ আদমকে) সৃষ্টি করিলেন” (আদিপুস্তক-১ঃ২৭)। এবং পরবর্তীতে এই আদমই বিবি হওয়া কর্তৃক প্রতারিত হইয়া পাপ কাজ করিয়া ফেলিলেন। পবিত্র কুরআন এই প্রসঙ্গে বর্ণনায় যথার্থ প্রজ্ঞার পরিচয় দিয়াছে। বলা হইয়াছে যে, স্বয়ং আল্লাহ্তা’লার গুণাবলী ও প্রতিমূর্তিতে সৃষ্ট আদম (আঃ)-এর পক্ষে এই ধরণের পঙ্কিলতায় নিপতিত হওয়া বে-মানান। বরং ইহা ছিল হযরত আদমের (আঃ) একটি অনিচ্ছাকৃত ভুল। যেমন বলা হইয়াছে— আমি তো ইতিপূর্বে আদমের প্রতি নির্দেশ দান করিয়াছিলাম, কিন্তু সে ভুলিয়া গিয়াছিল এবং এই ব্যাপারে তাহার মধ্যে কোন অবাধ্যতার সংকল্প ছিল না (আয়াত ১১৬)। পরিশেষে অবিশ্বাসীদের উদ্দেশ্যে কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ পূর্বক সূরাটিতে বলা হইয়াছে যে, তাহাদের নিজস্ব কল্পনা বা অভিসন্ধি মোতাবেক কখনই কোন নিদর্শন বা মোজেযা তাদেরকে দেখানো হইবে না। তবে, অনেক সুস্পষ্ট ঐশী নিদর্শনাদি যাহার বর্ণনা পূর্ববর্তী গ্রন্থসমূহে বিদ্যমান রহিয়াছে - তাহা অবশ্যই তাহাদেরকে দেখানো হইবে। এইসব সুস্পষ্ট প্রমাণাদির পরেও যদি তাহারা ঐশী বাণীকে অস্বীকার করিতে থাকে, তাহা হইলে সত্য-প্রত্যাখ্যানজনিত কারণে পূর্ববতী রসূলদের অস্বীকারকারীদের মত তাহাদেরকেও ঐশী শাস্তি ভোগ করিতে হইবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
طٰہٰ ۚ﴿۲﴾
مَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡقُرۡاٰنَ لِتَشۡقٰۤی ۙ﴿۳﴾
اِلَّا تَذۡکِرَۃً لِّمَنۡ یَّخۡشٰی ۙ﴿۴﴾
تَنۡزِیۡلًا مِّمَّنۡ خَلَقَ الۡاَرۡضَ وَالسَّمٰوٰتِ الۡعُلٰی ؕ﴿۵﴾
اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی ﴿۶﴾
لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ وَمَا بَیۡنَہُمَا وَمَا تَحۡتَ الثَّرٰی ﴿۷﴾
وَاِنۡ تَجۡہَرۡ بِالۡقَوۡلِ فَاِنَّہٗ یَعۡلَمُ السِّرَّ وَاَخۡفٰی ﴿۸﴾
اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ لَہُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی ﴿۹﴾
وَہَلۡ اَتٰٮکَ حَدِیۡثُ مُوۡسٰی ۘ﴿۱۰﴾