২০

طه

সূরা তাহা

TaHa

মক্কী ১৩৬ আয়াত ৮ রুকু পারা ১৬

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১৩৬ আয়াত এবং ৮ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

طٰہٰ ۚ﴿۲﴾

২
তাহা।১৮০৭
১৮০৭। ‘তা’ এবং ‘হা’ এই দুইয়ের সংযোজন ‘তাহা’। ইহা আরবের ‘আক্ক্‌’ গোত্রের আঞ্চলিক বচন, ইহার অর্থ ‘হে আমার প্রিয়’ অথবা ‘হে কামেল বা পূর্ণ মানব।’ কাশ্‌শাফ প্রণেতা ইহার অর্থ করিয়াছেন, ‘হে তুমি।’ অন্য কাহারো কাহারো মতে ইহার অর্থ, ‘তুমি শান্তি-প্রাপ্ত হও’ (বায়ান এবং লিসান)। উক্ত বচন এই বাস্তব বিষয়ের প্রতি অঙ্গুলী নির্দেশ করে যে, পবিত্র নবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) পরিপূর্ণরূপে সকল মৌলিক, মানসিক শক্তি, বৈশিষ্ট্য ও চরিত্রগত সহজাত গুণাবলী দ্বারা ভূষিত ছিলেন, যাহা একজন মানুষের পরিপূর্ণ নৈতিক গুণের উচ্চ অবয়ব গঠনে অবদান রাখে। আঁ-হযরত (সাঃ) নিঃসন্দেহে, একজন পূর্ণ বা কামেল মানব ছিলেন,প্রকৃত অর্থে আদর্শ মানুষের এক পূর্ণ নমুনা ছিলেন। টিকা ২৩৪৩ ও ৩০৯১ তে বিস্তারিত দেখুন।

مَاۤ اَنۡزَلۡنَا عَلَیۡکَ الۡقُرۡاٰنَ لِتَشۡقٰۤی ۙ﴿۳﴾

৩
আমরা তোমার উপর কুরআন এই জন্য নাযেল করি নাই যেন তুমি কষ্টে পড়;১৮০৮
১৮০৮। আয়াতটি নবী করীম (সাঃ)-এর জন্য এবং মুসলমানদিগের জন্য সান্ত্বনা ও আশার বাণী বহন করে। পবিত্র গ্রন্থ কুরআনের নির্ভুল এবং পূর্ণাঙ্গ শিক্ষার সহিত ইহা বেমানান যে,ইহার প্রবর্তক তাঁহার প্রেরণের উদ্দেশ্যে ব্যর্থ হইতে পারেন। অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ)-এর প্রচার-কার্য অবশ্যই বিজয় লাভ করিবে। এই আয়াত ক্রুশীয় এই মতবাদেরও খণ্ডন করিয়াছে যে, বিধান বা শরীয়াত এক অভিশাপ। কুরআনে এমন কিছুই নাই যাহা মানব-প্রকৃতির প্রতিকূল এবং যাহার অনুশীলন মানুষকে দুঃখ-দুর্দশায় পতিত করে।

اِلَّا تَذۡکِرَۃً لِّمَنۡ یَّخۡشٰی ۙ﴿۴﴾

৪
বরঞ্চ উপদেশস্বরূপ, ঐ ব্যক্তির জন্য যে (আল্লাহ্‌কে) ভয় করে;

تَنۡزِیۡلًا مِّمَّنۡ خَلَقَ الۡاَرۡضَ وَالسَّمٰوٰتِ الۡعُلٰی ؕ﴿۵﴾

৫
তাঁহার নিকট হইতে নাযেল করা হইয়াছে, যিনি পৃথিবী এবং সুউচ্চ আকাশমণ্ডলকে সৃষ্টি করিয়াছেন।

اَلرَّحۡمٰنُ عَلَی الۡعَرۡشِ اسۡتَوٰی ﴿۶﴾

৬
তিনি অযাচিত-অসীম দাতা, যিনি আরশের উপর সুদৃঢ়ভাবে অধিষ্ঠিত হইয়াছেন।১৮০৯
১৮০৯। সংক্ষেপে ‘আল আরশ’ দ্বারা আল্লাহ্‌তা’লার অলৌকিক গুণকে বুঝায়, অর্থাৎ এই সকল গুণাবলী যাহা পরিভাষাগত ভাবে ‘সিফাতে তান্‌যিহীয়াহ্‌’ নামে পরিচিত। এইগুলি চিরস্থায়ী, অতুলনীয় এবং আল্লাহ্‌তা’লার অনন্য গুণ, যাহা তাঁহার ঐসকল গুণাবলীর মাধ্যমে প্রদর্শিত হইয়া থাকে যেগুলি ‘সিফতে তাশবিহীয়াহ্’ নামে অভিহিত, অর্থাৎ এই সব গুণাবলী মানুষের মধ্যেও কম বেশী পরিদৃষ্ট হয়। প্রথমোক্ত সিফ্‌ত অর্থাৎ আল্লাহ্‌তা’লার অবশ্য অলৌকিক গুণসমূহ ‘আল্ আরশ’ বা খোদার আসন রূপে অভিহিত এবং শেষোক্ত গুণাবলী হইল তাঁহার আরশ বহণকারী। টীকা ৯৮৬ ও ১২৩৩ দ্রষ্টব্য।

لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ وَمَا بَیۡنَہُمَا وَمَا تَحۡتَ الثَّرٰی ﴿۷﴾

৭
আকাশসমূহে যাহা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে এবং এতদুভয়ের মধ্যে যাহা কিছু আছে এবং ভূগর্ভস্থ ভিজা মাটির নীচে যাহা কিছু আছে সকলই তাঁহার।

وَاِنۡ تَجۡہَرۡ بِالۡقَوۡلِ فَاِنَّہٗ یَعۡلَمُ السِّرَّ وَاَخۡفٰی ﴿۸﴾

৮
এবং যদি তুমি উচ্চঃস্বরে কথা বল (অথবা নিম্ন স্বরে কথা বল, সবই তিনি শুনেন), কারণ তিনি গুপ্ত এবং সর্বাধিক লুক্কায়িত বস্তুও জানেন।১৮১০
১৮১০। ‘সির্‌রুন’ (গোপন চিন্তা) দ্বারা মানুষের মনে লুক্কায়িত গোপন চিন্তা বুঝায় যাহা কেবলমাত্র সে একাই জানে এবং ‘আখফা’ (অধিকতর লুক্কায়িত বা গোপন) শব্দ মানুষের সকল আদর্শ চিন্তা এবং উচ্চাকাঙ্খা বুঝায় যাহা ভবিষ্যতের গর্ভে লুক্কায়িত থাকে এবং কখনও তাহার মনে উদয় হয় নাই।

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ ؕ لَہُ الۡاَسۡمَآءُ الۡحُسۡنٰی ﴿۹﴾

৯
আল্লাহ্ তিনি, যিনি ব্যতীত আর কোন মা’বূদ নাই, সকল সুন্দর নাম তাঁহারই।১৮১১
১৮১১। তফসীরাধীন আয়াত উপরোক্ত তিন আয়াতে উল্লেখিত কুরআনের বিস্ময়কর ঐশী-বাণীর কেন্দ্রীভূত বিশুদ্ধ সারাংশ বহন করে। ইহা সেই খোদার অস্তিত্ব। তিনি এক এবং অদ্বিতীয়। তিনি সকল পুর্ণাঙ্গ গুণের অধিকারী এবং কল্পনাসাধ্য সর্বপ্রকার ক্রুটি ও অপূর্ণতা হইতে মুক্ত। সেই জন্যই একমাত্র তিনিই আমাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ইবাদতের অধিকারী বা উহা কেবল তাঁহারই প্রাপ্য।

وَہَلۡ اَتٰٮکَ حَدِیۡثُ مُوۡسٰی ۘ﴿۱۰﴾

১০
এবং তোমার নিকট কি মূসার বৃত্তান্ত পৌঁছিয়াছে?১৮১২
১৮১২। ইতিহাসের সর্বপ্রকার স্বীকৃত নিয়ম-নীতির বিপরীতে ফ্রয়েড (Freud) তাহার ‘মূসা এবং একেশ্বরবাদ’ (Moses and Monotheism) গ্রন্থে এক সম্পূর্ণ অভিনব মতের অস্পষ্ট আভাষ দিয়াছেন যে, হযরত মূসা (আঃ) ইসরাঈলী ছিলেন না, তিনি ইহুদী বংশীয় ছিলেন না এবং ইসরাঈলীগণ কখনও মিশরে বসবাস করে নাই। ফ্রয়েড তাহার এই অদ্ভুত দাবীর সমর্থনে নিম্ন বর্ণিত যুক্তির অবতারণা করিয়াছেনঃ (১) ‘মূসা’ এক মিশরীয় নাম, (২) আল্লাহ্‌তা’লার তৌহীদ (একত্ববাদ)-এর ধারণা মূলতঃ মিশর দেশীয়, প্রাচীন মিশরীয় রাজা ইখনাতেন (বা আখেনাতেন) কর্তৃক প্রথমে ইহা কল্পিত এবং গৃহীত হইয়াছিল; (৩) মূসা নিজে মিশরীয় ছিলেন বিধায় তিনি উহা মিশরবাসীদিগের নিকট হইতে অনুকরণ করিয়াছিলেন এবং ইসরাঈলীগণের মধ্যে প্রচার করিয়াছিলেন। যেহেতু মূসা মিশরীয় ছিলেন, সেই জন্য তিনি হিব্রু ভাষায় নিজেকে স্পষ্টরূপে প্রকাশ করিতে পারিতেন না। এই সকল যুক্তি বাস্তব ঘটনা-ভিত্তিক নহে। ‘মূসা’ নিশ্চিতরূপে একটি হিব্রু শব্দ, ইহা আরবী এবং হীব্রু উভয় ভাষা হইতে নির্গত। কিন্তু আদৌ যদি মূসা নামটি মিশরীয় হইয়া থাকে তথাপি ইহা প্রতিপন্ন হয় না যে, মূসা মানুষটিও মিশরীয় ছিলেন। যেহেতু ইসরাঈলীগণ মিশরে ফেরাউনের শাসনাধীন জাতি ছিল সেই কারণে মিশরীয় নাম অবলম্বন করা তাহাদের পক্ষে আপাতদৃষ্টিতে স্বাভাবিক ও ন্যায়-সঙ্গত ছিল। অধীনস্থ জাতির লোকেরা তাহাদের শাসকগণের নাম এবং তাহাদের পোশাক-পরিচ্ছদ, চাল-চলন এবং প্রথা ইত্যাদি অনুকরণ করিয়া গৌরব অনুভব করিয়া থাকে। একেশ্বরবাদ ধারণার আদি উৎস মিশর, প্রাচীন মিশরীয় রাজা আখেনাতেন কর্তৃক উহা প্রথম কল্পিত ও গৃহীত এবং তাহার দ্বারা ইসরাঈলীগণের মধ্যে প্রচারিত হইয়াছিল, এই যুক্তিও সমভাবে ভ্রান্ত। কোন বিশেষ কল্পিত বিষয়বস্তু কোন জাতির একচেটিয়া বলিয়া মনে করা অযৌক্তিক। বিচ্ছিন্ন লোক বা জনগোষ্ঠী একে অন্যের নিকট হইতে গ্রহণ না করিয়া স্বাধীনভাবে অভিন্ন ধারণা বা কল্পনা করিতে পারে। কিন্তু এমনকি যদি ধরিয়া নেওয়া হয় যে, আল্লাহ্‌তা’লার তৌহীদের মতবাদ মূলতঃ মিশরীয় তাহা হইলেও মূসা (আঃ) মিশরের অধিবাসী ছিলেন, এই অনুমান সঠিক প্রমাণিত হয় না। একজন আমেরিকান বা এক জার্মান যদি কোন ধারণা বা বিশ্বাস একজন ইংরেজ হইতে নিতে পারে, তাহা হইলে একজন ইহুদী কেন একজন মিশরবাসীর নিকট হইতে কোন ধ্যান-ধারণা গ্রহণ করিতে পারিবে না? সত্য কথা এই যে, আল্লাহ্‌তা’লার একত্ববাদের ধারণা মিশর বা সিরিয়াবাসীদের দ্বারা কল্পিত নহে, না অন্য কোন জাতির লোকেরা কল্পনা করিয়াছিল। ইহার উৎস আল্লাহ্‌তা’লার বাণী বা ওহী-ইলহাম। হযরত মূসা (আঃ) মিশর দেশীয় ছিলেন, ফ্রয়েডের এই দাবীর অতিরিক্ত ভিত্তি যাত্রা পুস্তক ৪ঃ১০ এর উপর, যাহাতে বলা হইয়াছে যে, তিনি (মূসা) কথা বলায় মন্থর ছিলেন এবং নিজেকে স্পষ্টভাবে প্রকাশ করিতে পারিতেন না, এবং ফ্রয়েড সাহেব খামখেয়ালীভাবে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছিয়াছেন যে, মূসা (আঃ) হিব্রুভাষায় আস্তে আস্তে কথা বলিতেন। পক্ষান্তরে কুরআন এবং বাইবেল দ্বারা সমর্থিত সম্পর্ণ ঘটনা এই যে, ফেরাউনের নিকট যাইয়া তাঁহার মিশন প্রচারের জন্য যখন আল্লাহ্‌তা’লা কর্তৃক আদিষ্ট হইয়াছিলেন, তখন মূসা (আঃ) আল্লাহ্‌তা’লার নিকট কাতর নিবেদন করিয়াছিলেন এই কারণে যে, জিহ্বার জড়তা হেতু তিনি নিজেকে পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ করিতে অক্ষম ছিলেন। তর্কের খাতিরে ইহাই যদি যুক্তি হয় যে, মূসা (আঃ) ফেরাউনের ভাষায় অর্থাৎ মিশর দেশের ভাষায় স্বাধীনভাবে নিজেকে প্রকাশ করিতে পারিতেন না, তাহা হইলে ইহাতে সুস্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে, হযরত মূসা (আঃ) মিশরীয় ছিলেন না। প্রকৃত পক্ষে, আরবী এবং হীব্রু ভাষাবিদ্যার দলীল-প্রমাণের সহিত ইহুদীজাতির ঐতিহাসিক এবং বংশানুক্রমিক ঐতিহ্যের দলীল-প্রমাণ মিলিতভাবে কুরআন এবং বাইবেলে বর্ণিত হযরত মূসা (আঃ)-এর সম্পর্কে ঘটনাবলীর সঙ্গে যুক্ত হইয়া সব কিছু এই যুক্তিকে সত্য বলিয়া সমর্থন করে ও প্রমাণ করে যে, হযরত মূসা (আঃ) মিশর দেশীয় ছিলেন না এবং তাঁহার নাম মূলতঃমিশরীয় ছিল না। (দি লারজার এডিশন অব দি কমেন্টারী ১৬২১-১৬২৩ পৃঃ দ্রষ্টব্য)।