২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

وَاِذۡ قَالَ رَبُّکَ لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اِنِّیۡ جَاعِلٌ فِی الۡاَرۡضِ خَلِیۡفَۃً ؕ قَالُوۡۤا اَتَجۡعَلُ فِیۡہَا مَنۡ یُّفۡسِدُ فِیۡہَا وَیَسۡفِکُ الدِّمَآءَ ۚ وَنَحۡنُ نُسَبِّحُ بِحَمۡدِکَ وَنُقَدِّسُ لَکَ ؕ قَالَ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ مَا لَا تَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۱﴾

৩১
এবং (স্মরণ কর) যখন তোমার প্রভু ফিরিশ্‌তাগণকে৫৭ বলিলেন৫৭-ক, ‘নিশ্চয় আমি পৃথিবীতে খলীফা নিযুক্ত করিতে চলিয়াছি,’ তাহারা বলিল, ‘তুমি কি ইহাতে এমন কাহাকেও নিযুক্ত করিবে যে ইহাতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করিবে এবং রক্তপাত৫৮ করিবে? অথচ আমরাই তোমার প্রশংসাসহ গুণ কীর্তন৫৯ করিতেছি এবং তোমার পবিত্রতা৬০ ঘোষণা করিতেছি।’ তিনি বলিলেন, ‘নিশ্চয় আমি যাহা জানি তোমরা তাহা জান না৬১।’
৫৭। ‘মালায়েকা’ শব্দটি ‘মালাক’ শব্দের বহুবচন। ‘মালাক’ ‘মালাকা’ হইতে উৎপন্ন যাহার অর্থ সে নিয়ন্ত্রণ করিয়াছিল অথবা ‘আলাকা’ হইতে উৎপন্ন যাহার অর্থ সে পাঠাইয়াছিল। ফিরিশ্‌তাগণকে এইজন্য মালায়েকা বলা হয়, কারণ তাহারা প্রকৃতির শক্তির উপর নিয়ন্ত্রণ খাটান এবং তাহারা আল্লাহ্‌র প্রেরিত পুরুষগণের ও ঐশী সংস্কারকগণের কাছে আল্লাহর বাণীসহ প্রেরিত হন।
৫৭-ক। ‘কালা’ শব্দটি আরবী ভাষায় একটি নিত্যব্যবহার্য সাধারণ শব্দ, যাহার অর্থ সে বলিল- তবে সময় সময় ইহা রূপক ভাবে ব্যবহৃত হয়। প্রকৃত কথোপকথন না হইয়া, একটি অবস্থা বা ঘটনা বিশেষকে বুঝাইবার জন্য রূপক কথোপকথনের আশ্রয় নেওয়া হয়। যেমন এই বাক্যটি ইম্‌তালায়াল হাউযু ওয়া কালা ক্বাৎনী (হাউজটি পূর্ণ হইয়া বলিল, ‘বাস্ ইহাই যথেষ্ট’)। এখানে হাউজটি (চৌবাচ্চা) কথা বলে নাই, তবে হাউজটা পানিতে পরিপূর্ণ হইয়াছে, এই অবস্থাটাকে বুঝাইয়াছে। আল্লাহ্‌তা’লার সহিত ফিরিশ্‌তাদের কথোপকথনকে শাব্দিক কথোপকথন মনে করার প্রয়োজন নাই। পূর্বের উদাহরণটিতে যেরূপ দেখানো হইয়াছে যে, অবস্থা বিশেষকে বুঝাইবার জন্য কথোপকথন না হওয়া সত্ত্বেও বিষয়টির উপর কথোপকথনের কল্পিত রূপ বর্তানো হয়, এই ক্ষেত্রেও তাহাই হইতে পারে। আয়াতটি আসলে ফিরিশ্‌তাদের অবস্থার চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে মাত্র। তাহাদের অবস্থাটিকে শাব্দিক জবাবের রূপ দেওয়া হইয়াছে।
৫৮। ফিরিশতারা আল্লাহ্‌র উদ্দেশ্য সম্বন্ধে সঠিক জ্ঞান লাভের জন্য প্রশ্ন করিয়াছে, বিরূপ মনোভাব দেখাইবার জন্য নয়। তাহারা একথাও ভাবেন নাই বা দাবী করেন নাই যে তাহারা আদম হইতে শ্রেষ্ঠ। আল্লাহ্‌ কর্তৃক পৃথিবীতে প্রতিনিধি প্রেরণের ইচ্ছা পেশ করা হইলে, ফিরিশ্‌তাদের মনে এই কথার উদয় হইল যে, প্রতিনিধি প্রেরণের প্রয়োজন তো তখনই হয় যখন আইন-শৃংখলা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। অতএব, পৃথিবীতে বুঝি এমন মানুষও হইবে যাহারা নিজেরাই আইন-শৃংখলা ভঙ্গ করিয়া রক্তপাত ঘটাইবে। মানুষের ভাল করিবার ও মন্দ করিবার উভয় শক্তিই রহিয়াছে। মানব-শক্তিতে মন্দ করিবার যে দিকটা আছে, ফিরিশ্‌তাদের মনে সেই অন্ধকার দিকটাই প্রকট হইয়া উঠিল। কিন্তু আল্লাহ্‌ জানেন যে মানুষ তাহার মন্দ করিবার শক্তিকে দমন করিয়া, নৈতিকতার চূড়ান্ত উচ্চস্তরে উঠিবে এবং ঐশী-গুণাবলীতে ভূষিত হইয়া পৃথিবীতে নিজেকে আয়নার মত প্রতিফলিত করিবে। মানুষের এই উজ্জ্বল দিকটাই আল্লাহ্‌তা’লা তাঁহার এই বাক্যের মধ্যে তুলিয়া ধরিয়াছেন, ‘আমি জানি, যাহা তোমরা জান না’।
৫৯। ‘নুসাব্বিহ’— এর অর্থ ও তাৎপর্যের জন্য ২৯৮১ টীকা দেখুন।
৬০। ‘তসবীহ্ (মাহাত্ম্য বর্ণনা করা) শব্দটি আল্লাহ্‌র গুণাবলীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়, আর ‘তকদীস’ (পবিত্রতা বর্ণনা করা) শব্দটি আল্লাহ্‌তা’লার কার্যাবলীর ক্ষেত্রে ব্যবহৃত হয়।
৬১। হযরত আদম (আঃ), যিনি প্রায় ছয় হাজার বৎসর পূর্বে পৃথিবীতে বাস করিয়াছিলেন, সাধারণভাবে তাঁহাকেই আল্লাহ্‌র সৃষ্ট প্রথম মানব বলিয়া বিশ্বাস করা হয়। কিন্তু কুরআন এই মতবাদ সমর্থন করে না। এই বিশ্ব, সৃষ্টি ও সভ্যতার বিভিন্ন চক্র বা বলয় অতিক্রম করিয়াছে। বর্তমান মানব জাতির পূর্বপুরুষ আদম চলতি বলয়ের প্রথম সংযোগ কড়া। তিনি আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মধ্যে একেবারে আদি-মানব নহেন, বরং তিনি বর্তমান বলয়ের প্রথম সভ্য মানব, যাহার মাধ্যমে নূতন বলয়ের নব-সভ্যতার ক্রম-বিকাশের নব-ধারা প্রবর্তন করা হইয়াছে। বহু জাতির উত্থান-পতন হইয়াছে। অনেক সভ্যতার আগমন নির্গমন ঘটিয়াছে। আমাদের পিতৃপুরুষ আদমের পূর্বে সভ্যতার পত্তনকারী অন্যান্য আদমও আসিয়াছেন। অন্যান্য জাতি-গোষ্ঠিরও উদ্ভব ও বিনাশ ঘটিয়াছে, অন্যান্য সভ্যতার চক্রও আমাদের আদমের পূর্বেই আসিয়াছে ও গত হইয়াছে। মুসলিম বিশ্বের সুফীকুল শিরোমণি হযরত মুহীউদ্দিন ইব্‌নে আরাবী বলেন যে, তিনি একবার স্বপ্ন দেখিলেন, তিনি কা’বা শরীফের তাওয়াফ করিতেছেন। স্বপ্নের মধ্যেই একজন লোক তাঁহার সম্মুখে আসিয়া দেখা দিলেন এবং নিজেকে তাঁহার পূর্ব-পুরুষ বলিয়া পরিচয় দিলেন। ইব্‌নে আরাবী জিজ্ঞাসা করিলেন, “আপনার মৃত্যু কবে হইয়াছিল”? লোকটি উত্তরে বলিলেন, “চল্লিশ হাজার বৎসরেরও বেশী হইবে, আমার মৃত্যু হইয়াছে।” ইবনে আরাবী বলিলেন, “আদম (আঃ) হইতে আমাদের বর্তমান কাল পর্যন্ত যে সময় অতিবাহিত হইয়াছে, এই দীর্ঘ সময় ত তাহার চাইতেও অনেক বেশী”। ঐ ব্যক্তি বলিলেন, “তুমি কোন্ আদমের কথা বলিতেছ? তোমাদের সর্বনিকটবর্তী আদমের কথা, না অন্য কোন আদমের কথা?” ইব্‌নে আরাবী বলিতেছেন, তখন রসূলুল্লাহ্ (সাঃ)-এর একটি হাদীস তাঁহার মনে পড়িল, যাহার মর্ম হইল, “আল্লাহ্ এক লক্ষেরও বেশী আদমকে পৃথিবীতে প্রেরণ করিয়াছেন।” তখন ইব্‌নে আরাবী নিজে নিজে বলিলেন, “এই ব্যক্তি যিনি আমার পূর্বপুরুষ হইবার দাবী করিতেছেন, তিনি নিশ্চয় পূর্ববর্তী আদমগণের অন্তর্ভুক্ত হইবেন” (ফুতূহাতে মক্কীয়া, ২য় খণ্ড)। এই কথা দাবী করা হইতেছেনা যে, আদম (আঃ)-এর পূর্বে যে মানব-গোষ্ঠী পৃথিবীতে বসবাস করিতেছিল, তাহারা সম্পূর্ণরূপে বিনাশ প্রাপ্ত হইয়া গিয়াছিল। সম্ভবতঃ তাহাদের মধ্যে হইতে কিছু লোক অতি হীন অবস্থায় টিকিয়া ছিল, যাহাদের মধ্যে আদমও একজন ছিলেন। সেই অবস্থায়, আল্লাহ্‌তা’লা তাঁহাকে একটি নূতন মানব-গোষ্ঠীর পূর্বপুরুষ ও একটি নূতন সভ্যতার পত্তনকারী-নবীরূপে নির্বাচন করিলেন। এই হিসাবেই তিনি এক নব জীবনের সূচনাকারী রূপে পরিগণিত হইলেন। যেহেতু খলীফা শব্দের অর্থ উত্তরাধিকারী, সেই হেতু ইহা স্পষ্টতঃ বুঝা যায় যে, আদমের পূর্বেও মানুষ ছিল এবং তিনি তাহাদের উত্তরাধিকারী হইলেন। আমাদের পক্ষে বলা কঠিন, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ার আদিম অধিবাসীরা এই আদমের বংশধর না পূর্ববর্তী কোন আদমের বংশধর। আদম কোথায় জন্মগ্রহণ করিয়াছিলেন এবং কোথায় তাঁহাকে সংস্কারকরূপে অধিষ্ঠিত করা হইয়াছিল, ইত্যাদি ব্যাপারে অনেক কথাই বলা হইয়াছে। সাধারণ বিশ্বাস ইহাই যে, তাঁহাকে বেহেশ্‌তে রাখা হইয়াছিল এবং পরে তাঁহাকে সেখান হইতে বিতাড়িত করিয়া পৃথিবীতে কোথাও স্থানান্তরিত করা হইয়াছিল। কিন্তু “পৃথিবীতে খলীফা নিয়োগ” শব্দগুলি এই অভিমতকে সরাসরি খণ্ডন করে এবং সুস্পষ্টভাবে বলিয়া দেয় যে, আদম পৃথিবীতে বসবাস করিয়াছিলেন এবং পৃথিবীর মধ্যেই সংস্কার কার্যে তাহাকে নিয়োগ করা হইয়াছিল। খুব সম্ভব, প্রথমে তাঁহার বসবাস ছিল ইরাকে, পরে প্রতিবেশী কোনও অঞ্চলে যাইবার জন্য তিনি আল্লাহ্‌তা’লার নির্দেশ প্রাপ্ত হইয়াছিলেন। এই আয়াতের আরও বিস্তারিত ব্যাখ্যার জন্য উর্দু বা ইংরেজী তফ্সীরে কবীর দেখুন।

وَعَلَّمَ اٰدَمَ الۡاَسۡمَآءَ کُلَّہَا ثُمَّ عَرَضَہُمۡ عَلَی الۡمَلٰٓئِکَۃِ ۙ فَقَالَ اَنۡۢبِـُٔوۡنِیۡ بِاَسۡمَآءِ ہٰۤؤُلَآءِ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۳۲﴾

৩২
এবং তিনি আদমকে যাবতীয়৬২ নাম৬২-ক শিক্ষা দিলেন, অতঃপর উহাদিগকে৬২-খ ফিরিশ্‌তাগণের সম্মুখে রাখিলেন এবং বলিলেন, ‘তোমরা আমাকে এইগুলির নাম বল, যদি তোমরা সত্যবাদী হও।’
৬২। ‘কুল্লাহা’—সব, শব্দটি এখানে একেবারে সর্বসাকল্য অর্থে ব্যবহৃত হয় নাই, বরং প্রয়োজনীয় সবকিছু বুঝাইতেছে। কুরআনে এই শব্দটি অনুরূপ অর্থে অন্যত্রও ব্যবহৃত হইয়াছে (৬ঃ৪৫,২৭ঃ১৭,২৪;২৮ঃ৫৮)।
৬২-ক। ‘আসমা’ শব্দটি ‘ইসম’ এর বহুবচন, যাহার অর্থ নাম বা গুণ। একটি বস্তুর চিহ্ন বা দাগ (লেইন, মুফরাদাত)। ‘আসমা’ শব্দটি এখানে কি অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা নিয়া কুরআনের ব্যাখ্যাকারকদের মধ্যে মতভেদ রহিয়াছে। অনেকে মনে করেন আল্লাহ্‌ আদমকে বস্তু সমূহের ও গুণাগুণের নাম শিখাইয়া ছিলেন অর্থাৎ ভাষাজ্ঞান শিখাইয়াছিলেন। ইহাতে কোনও সন্দেহ নাই যে, সভ্যতা অর্জন করিতে হইলে, ভাষার প্রয়োজন। ভাষা ছাড়া মানুষ সভ্য হইতে পারে না। আল্লাহ্ নিশ্চয় আদমকে ভাষার রীতি-নীতি শিখাইয়াছিলেন। কিন্তু নৈতিক গুণাবলী লাভের জন্য আরো কিছু আস্‌মা (নাম ও গুণ) মানুষের শিখা দরকার। ঐ সব ‘আসমার’ কথা কুরআনে (৭ঃ১৮১) আছে। আল্লাহ্‌তা’লার গুণাবলীর সঠিক ও স্পষ্ট ধারণা ও জ্ঞান না থাকিলে মানুষ ঐশী আলোকে আলোকিত হইতে পারে না। কাজেই ইহা প্রয়োজন ছিল যে, আল্লাহ্‌তা’লা প্রথমেই আপন গুণাবলীর সহিত আদমকে পরিচিত করাইয়া দেন, যাহাতে তাহার পক্ষে আল্লাহ্‌র স্বরূপ বুঝিতে এবং তাঁহার নৈকট্য লাভ করিতে অসুবিধা না হয়। অন্যথায়, ইহা সম্ভব ছিল যে, তিনি আল্লাহ্‌র নৈকট্য লাভ হইতে বঞ্চিত হইয়া দূরে সরিয়া পড়িতেন। কুরআনের বর্ণনা অনুসারে মানুষ ও ফিরিশ্‌তার মাঝে পার্থক্য এই যে, মানুষ আল্লাহ্‌র গুণাবলীর (আসমাউল হুসনার) প্রতিচ্ছবি হইতে পারে, কিন্তু ফিরিশ্‌তার মধ্যে আল্লাহ্‌র অল্প কয়েকটি গুণ মাত্র প্রতিফলিত হয়। ফিরিশ্‌তার নিজস্ব ইচ্ছা বলিতে কিছুই নাই। তাহারা আল্লাহ্‌ প্রদত্ত কর্তব্যগুলি যান্ত্রিক ভাবে সম্পাদন করিয়া থাকেন(৬৬ঃ৭)। অন্যদিকে মানুষকে স্বকীয় ইচ্ছায় স্বাধীনভাবে কাজ করিবার শক্তি প্রদান করা হইয়াছে যাহার কারণে সে নিজের বুদ্ধি-বিবেচনা ও সদিচ্ছা খাটাইয়া আপন কর্ম শক্তিকে কাজে লাগাইয়া সৃষ্টিকর্তার গুণাবলীর প্রকাশস্থল হইতে পারে।

সংক্ষেপে, এই আয়াতের তাৎপর্য ইহাই যে, আল্লাহ্ প্রথমে আদমের মধ্যে স্বাধীন ইচ্ছা উপ্ত করিলেন, তাহাকে আল্লাহ্‌র গুণাবলী বুঝিবার ও জানিবার প্রয়োজনীয় শক্তি সামর্থ্য প্রদান করিলেন এবং তৎপর ঐসব গুণাবলীর জ্ঞান দান করিলেন। ‘আসমা’ বলিতে, বিভিন্ন জিনিসের মধ্যে যে সব অন্তর্নিহিত গুণাবলী রহিয়াছে তাহাও বুঝায়। যেহেতু, মানুষকে প্রাকৃতিক শক্তি সমূহের ব্যবহার দ্বারা বাঁচিতে ও উন্নতি করিতে হইবে, সেই জন্য আল্লাহ্‌ মানুষকে প্রাকৃতিক শক্তি ও বস্তুসমূহের অন্তর্নিহিত ও বাহ্যিক গুণাবলীর জ্ঞান লাভের ক্ষমতা প্রদান করিয়াছেন।
৬২-খ। হুম (তাহাদের বা তাহাদিগকে) সর্বনামটির ব্যবহার দ্বারা বুঝা যাইতেছে যে, এখানে কোন প্রাণহীন জড় বস্তুর কথা বলা হয় নাই। কেননা আরবী ভাষায় এই ধরণের সর্বনাম কেবলমাত্র ‘যুল উকূল’ বা বিচারবুদ্ধি-সম্পন্ন প্রাণীর জন্যই ব্যবহার করা হয়। অতএব, এই অভিব্যক্তিটির অর্থ দাঁড়াইবে, আল্লাহ্‌তা’লা ফিরিশ্‌তাগণের দিব্য-দৃষ্টি দান করিয়া তাহাদেরকে আদমের বংশে ভবিষ্যতে আগমনকারী আল্লাহ্‌র গুণাবলী প্রকাশক, ধার্মিক ও অসামান্য মহাপুরুষদিগকে দেখাইয়া প্রশ্ন করিলেন, ‘তোমরাও কি এমনি ভাবে তাহাদের মত, আমার গুণাবলী প্রকাশে সক্ষম হইবে?’ উত্তরে ফিরিশ্‌তাগণ নিজেদের অসামর্থ্যও অক্ষমতা প্রকাশ করিল। তাই “আমাকে তাহাদের নাম বল” বাক্যটিতে উপরোক্ত অর্থই প্রকাশ পাইতেছে।

قَالُوۡا سُبۡحٰنَکَ لَا عِلۡمَ لَنَاۤ اِلَّا مَا عَلَّمۡتَنَا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَلِیۡمُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۳۳﴾

৩৩
তাহারা বলিল, ‘তুমি পবিত্র ও মহান! তুমি আমাদিগকে যাহা শিক্ষা দিয়াছ উহা ব্যতীত আমাদের কোন জ্ঞান নাই; নিশ্চয় তুমি সর্বজ্ঞানী, পরম প্রজ্ঞাময়।’৬৩
৬৩। ফিরিশ্‌তারা নিজেদের সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা সম্বন্ধে অবহিত থাকায়, স্পষ্টভাবে স্বীকার করিলেন যে, মানুষ যেভাবে ও যে পরিমাণে আল্লাহ্‌র গুণাবলীর প্রতিফলন ঘটাইতে সক্ষম, তাহারা সেই পরিমাণে সক্ষম নহেন। আল্লাহ্‌তা’লা’র প্রজ্ঞা ফিরিশ্‌তাদিগকে যে সীমাবদ্ধ গণ্ডীতে আল্লাহ্‌র মহিমা প্রকাশের শক্তি দিয়াছেন, উহার অতিরিক্ত করা তাহাদের পক্ষে সম্ভব নয়, ফিরিশ্‌তারা তাহা অকপটে স্বীকার করিলেন।

قَالَ یٰۤاٰدَمُ اَنۡۢبِئۡہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۚ فَلَمَّاۤ اَنۡۢبَاَہُمۡ بِاَسۡمَآئِہِمۡ ۙ قَالَ اَلَمۡ اَقُلۡ لَّکُمۡ اِنِّیۡۤ اَعۡلَمُ غَیۡبَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ۙ وَاَعۡلَمُ مَا تُبۡدُوۡنَ وَمَا کُنۡتُمۡ تَکۡتُمُوۡنَ ﴿۳۴﴾

৩৪
তিনি বলিলেন, ‘হে আদম! তুমি তাহাদিগকে উহাদের নাম বলিয়া দাও’; অতঃপর যখন সে তাহাদিগকে উহাদের নাম বলিয়া দিল, তিনি বলিলেন, ‘আমি কি তোমাদিগকে বলি নাই যে, নিশ্চয় আমি আকাশ সমূহের ও পৃথিবীর গোপন বিষয়সমূহ অবগত আছি এবং যাহা তোমরা প্রকাশ কর এবং যাহা তোমরা গোপন৬৪ কর, আমি সবই জানি?’
৬৪। যখন ফিরিশ্‌তারা স্বীকার করিলেন যে, তাহারা সকল ঐশী-গুণাবলীর প্রতিফলন ঘটাইতে সক্ষম নহেন এবং ইহাও স্বীকার করিলেন যে, আদম সেই ক্ষমতা রাখেন, তখন আল্লাহ্‌র ইচ্ছা অনুযায়ী আদম নিজের মধ্যে উপ্ত বিভিন্নমুখী প্রাকৃতিক শক্তিসমূহ প্রকাশ করিয়া, ইহাদের ব্যাপকতা ফিরিশ্‌তাদিগকে দেখাইলেন। এইরূপে, আদম প্রমাণ করিলেন যে, এমন ধরণের সৃষ্টির প্রয়োজন রহিয়াছে যাহারা আল্লাহ্‌র কাছ হইতে ইচ্ছা শক্তি ও কর্মের স্বাধীনতা লাভ করিয়া, সদিচ্ছা-প্রণোদিত হইয়া সৎপথ অবলম্বন করে (ও অসৎ পথ বর্জন করে) এবং আল্লাহ্‌তা’লার মহিমা ও মাহাত্ম্যের প্রকাশক হয়।

وَاِذۡ قُلۡنَا لِلۡمَلٰٓئِکَۃِ اسۡجُدُوۡا لِاٰدَمَ فَسَجَدُوۡۤا اِلَّاۤ اِبۡلِیۡسَ ؕ اَبٰی وَاسۡتَکۡبَرَ ٭۫ وَکَانَ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۳۵﴾

৩৫
এবং (সেই সময়কে স্মরণ কর) যখন আমরা ফিরিশ্‌তাগণকে বলিয়াছিলাম, ‘তোমরা আদমের আনুগত্য৬৫ কর’; তখন তাহারা আনুগত্য করিল। কেবল ইবলীস৬৬ ব্যতিরেকে,৬৭ সে অমান্য করিল এবং নিজেকে অনেক বড় মনে করিল; বস্তুতঃ সে ছিল কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত।
৬৫। আদম (আঃ) আল্লাহ্‌তা’লার গুণাবলীর প্রতিফলক ও নবী হওয়ার কারণে, আল্লাহ্ ফিরিশ্‌তাগণকে তাঁহার সেবা-সাহায্য এবং মান্য করার আদেশ দিলেন। আরবী ‘উসজুদু’ অর্থ ‘আদমকে সিজদা কর’ নহে, কেননা কুরআন সুনির্দিষ্টভাবে আল্লাহ্ ছাড়া অন্য কাহাকে (বা অন্য কোনও কিছুকে) সিজদা করা নিষেধ করে (৪১ঃ৩৮)। অতএব, ফিরিশ্‌তাকে এইরূপ আদেশ নিশ্চয় দেওয়ার কথা নহে। আদেশটির অর্থ হইল “তোমরা আমাকে সিজদা করিয়া কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর যে, আমি আদমকে সৃষ্টি করিলাম।” এস্থলে ‘লাম’ তা’লিলীয়্যা (কারণ বুঝাইবার জন্য) হইবে।
৬৬। ‘ইব্‌লীস্‌’ শব্দটি আবলাসা হইতে উৎপন্ন, যাহার ধাতুগত অর্থ (১) তাহার গুণ কমিল; (২) সে নিরাশ হইল বা আল্লাহ্‌র রহমতের আশা ছাড়িয়া দিল; (৩) সে তাহার আশা-পূরণে বাধা-প্রাপ্ত হইল; (৪) সে হতোদ্যম হইল; (৫) সে হতভম্ব হইয়া রাস্তা দেখিতে পাইল না। এই ধাতুগত অর্থগুলি হইতে বুঝা যায়, ইবলীস এমনই এক সত্তা যাহার মধ্যে ভালোর মাত্রা অতি অল্প এবং মন্দের মাত্রা অনেক বেশী রহিয়াছে। নিজের অবাধ্যতার কারণে, আল্লাহ্‌র রহমতের আশা হইতে নিজেকে বঞ্চিত করিয়াছে এবং হতভম্ব ও কিংকর্তব্য-বিমূঢ় অবস্থায় পথ পাইতেছে না। ইব্‌লীসকে প্রায়শঃ শয়তান মনে করা হয়, তবে সময় সময় কিছু কিছু বিষয়ে এতদুভয়ের মধ্যে পার্থক্যও দেখা যায়। এই কথা স্পষ্ট বুঝিয়া রাখা দরকার যে, ইব্‌লীস ফিরিশ্‌তাদের অন্তর্গত নহে। কেননা ইব্‌লীসকে বর্ণনা করা হইয়াছে আল্লাহ্‌তা’লার আদেশ অমান্যকারী বিদ্রোহী রূপে। অপর পক্ষে ফিরিশ্‌তাকে বর্ণনা করা হইয়াছে চির-অবনত, বিনীত ও আজ্ঞাবহ রূপে (৬৬ঃ৭)। ইব্‌লীসের প্রতি আল্লাহ্ ক্রুদ্ধ হইলেন, কেননা ফিরিশ্‌তাদের মত তাহাকেও আদেশ করা হইয়াছিল—আদমকে মান্য করা ও সাহায্য করার জন্য কিন্তু সে তাহা অমান্য করিল (৭ঃ১৩)। অধিকন্তু, যদি ইবলীসকে পৃথকভাবে কোনও আদেশ নাও দেওয়া হইয়া থাকে, তথাপি ফিরিশ্‌তাদিগকে আদেশ দানের মধ্যবর্তিতায় তাহা সকলের উপরেই প্রযোজ্য হইয়া যায়। কেননা, বিশ্বজগতের বিভিন্ন অংশের রক্ষণাবেক্ষণকারী হওয়ার কারণে, ফিরিশ্‌তাদের প্রতি প্রদত্ত নির্দেশ অন্যান্য সকল বস্তু ও জীবের উপরও সমভাবে বর্তাইবে। ইব্‌লীস একটি গুণবাচক নাম। ফিরিশ্‌তাদের প্রতিপক্ষ ও বিরোধিতাকারী অশুভ চক্রকে, শব্দটির ধাতুগত অর্থেই, ইব্‌লীস নাম দেওয়া হইয়াছে। কুরআনে, ২ঃ৩৭ আয়াতে যে শয়তানের কথা বলা হইয়াছে, সে যে ইব্‌লীস নহে, তাহা স্পষ্ট হইয়া উঠে যখন আমরা দেখিতে পাই যে, কুরআনে যেখানেই আমরা আদমের বিষয়ে বর্ণিত হইতে দেখি,তখনই ইব্‌লীস ও শয়তানের দুইটি নাম পাশা পাশি প্রাপ্ত হই। কিন্তু প্রত্যেক স্থানেই আমরা এতদুভয়ের মধ্যে একটা সতর্ক পার্থক্য লক্ষ্য করি। যেখানেই আমরা ফিরিশ্‌তার বিপরীত মুখী, আদমের আনুগত্য করিতে অস্বীকারকারী সত্তার উল্লেখ পাই, সেখানেই তাহাকে ইব্‌লীস নামে আখ্যায়িত হইতে দেখি। আর যেখানেই আমরা আদমের বিরুদ্ধে প্রতারণাকারী ও তাহাকে উদ্যান হইতে বিতাড়নের চক্রান্তকারী সত্তার উল্লেখ দেখি, সেখানেই তাহাকে শয়তান নামে অভিহিত পাই। এই পার্থক্য যাহা কমপক্ষে কুরআনের দশটি স্থানে মওজুদ আছে, (২ঃ৩৫,৩৭, ৭ঃ১২,২১, ১৫ঃ৩২, ১৭ঃ৬২, ১৮ঃ৫১, ২০ঃ১১৭, ১২১, ৩৮ঃ৭৫), তাহা অতিশয় তাৎপর্যপূর্ণ। ইহাতে স্পষ্ট হইয়া উঠে যে, ইব্‌লীস ও শয়তান এক নহে। শয়তান আদমের প্রতারণাকারী। ইব্‌লিস আদমের জাতিরই অন্তর্ভুক্ত। কুরআনের অন্যত্র বলা হইয়াছে, ‘ইব্‌লীস আল্লাহ্‌র গুপ্ত সৃষ্টির(জিন্নের) অন্তর্ভুক্ত এবং ফিরিশ্‌তার বিপরীতে আল্লাহ্‌র বাধ্যতা বা অবাধ্যতা করার সামর্থ্য রাখে (৭ঃ১২-১৩, ১৮ঃ৫১)।
৬৭। ‘ইল্লা’ শব্দটি দ্বারা ‘ব্যতিক্রম’ বুঝায়। আরবীতে ইস্‌তিস্‌না (ব্যতিক্রম) দুই প্রকার (১) ‘ইস্‌তিস্‌নায়ে মুত্তাসিল’ দ্বারা একই জাতীয় জিনিষের মধ্যে ব্যতিক্রম নির্দেশ করে, (২) ‘ইস্‌তিস্‌নায়ে মুন্‌কাতি’ দ্বারা ব্যতিক্রম-ধর্মী বস্তুটি ভিন্ন জাতীয় বলিয়া নির্দেশ করে। আলোচ্য আয়াতে ‘ইল্লা’ শব্দটি ‘ইস্‌তিস্‌নায়ে মুন্‌কাতি’, ইব্‌লীস ফিরিশ্‌তা জাতীয় নয়, ভিন্ন জাতীয়।

وَقُلۡنَا یٰۤاٰدَمُ اسۡکُنۡ اَنۡتَ وَزَوۡجُکَ الۡجَنَّۃَ وَکُلَا مِنۡہَا رَغَدًا حَیۡثُ شِئۡتُمَا ۪ وَلَا تَقۡرَبَا ہٰذِہِ الشَّجَرَۃَ فَتَکُوۡنَا مِنَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۳۶﴾

৩৬
এবং আমরা বলিলাম, ‘হে আদম! তুমি ও তোমার স্ত্রী বাগানটিতে৬৮ বসবাস কর, এবং উহা হইতে যেখানে তোমাদের ইচ্ছা৬৮-ক তৃপ্তি সহকারে আহার কর, কিন্তু এই গাছটির৬৯ নিকট যাইও না, নচেৎ তোমরা যালেমদের অন্তর্ভুক্ত হইয়া যাইবে।’
৬৮। ‘জান্নাত’ শব্দটি এ স্থলে বেহেশ্‌তকে বুঝাইতেছে না, বরং ইহার শাব্দিক অর্থ বাগানকে বুঝাইতেছে। বেহেশ্‌ত-তুল্য যে উদ্যানে আদম (আঃ) কে প্রথম বসবাস করার জন্য দেওয়া হইয়াছিল, সেই উদ্যানের কথাই এখানে উল্লেখিত হইয়াছে। ইহা বেহেশ্‌ত বা স্বর্গ হইতে পারে না। ইহার প্রথম কারণ এই যে, আদমকে পৃথিবীতেই থাকার জন্য সৃষ্টি করা হইয়াছিল (২ঃ৩৭)। দ্বিতীয় কারণ এই যে, বেহেশ্‌ত এমনই এক স্থান, যাহাতে প্রবেশকারীকে কখনও বিতাড়িত করা হয় না (১৫ঃ৪৯)। অথচ পরবর্তী আয়াতেই আদমকে এই জান্নাত ছাড়িয়া চলিয়া যাইতে বলা হইয়াছে। ইহা দ্বারা বুঝা যায়, যে জান্নাতে (বাগানে) আদমকে প্রথমে থাকিতে দেওয়া হইয়াছিল, তাহা এই পৃথিবীর বুকেই ছিল। স্থানটি ফল-পুষ্পসমাকীর্ণ সবুজ বনানীর ছায়া-মণ্ডিত হওয়ায় ইহাকে জান্নাত নামে অভিহিত করা হইয়াছে। আধুনিক গবেষণা মূলে জানা গিয়াছে যে, ঐ স্থানটি ইরাক বা আসিরিয়ায় ব্যাবিলনের ‘ইডেন গার্ডেন’ বা স্বর্গোদ্যান ছিল (এনসাইক্লোপিডিয়া বৃটানিকায় ‘উর’ অধ্যায় দেখুন)।
৬৮-ক। “উহা হইতে যেখানে তোমাদের ইচ্ছা তৃপ্তিসহকারে আহার কর” বাক্যটি দ্বারা বুঝা যায়, আদম প্রথমে যে স্থানটিতে ছিলেন, সে স্থানটি কাহারও মালিকানাধীন ছিল না। আল্লাহ্ সেই স্থানটি তাহাকে দিয়া কার্যতঃ তাহাকে সেখানকার অধিপতি করিলেন।
৬৯। ‘শাজারাহ’ মানে গাছ। বাইবেলের মতে এই গাছটি ছিল জ্ঞান-বৃক্ষ যাহার ফল ভক্ষণে ভাল-মন্দের জ্ঞান লাভ ঘটে। কিন্তু কুরআনের বর্ণনা অনুযায়ী দেখা যায় যে, ঐ নিষিদ্ধ গাছের ফল ভক্ষণের ফলশ্রুতিতে আদম ও হাওয়া উলঙ্গ হইয়া গেলেন। ইহাতে বুঝা যায়, ইহা মোটেই জ্ঞান-বৃক্ষ ছিল না, বরং কুফল সৃষ্টিকারী কোন বৃক্ষ ছিল, যাহার কারণে আদমের মধ্যে দুর্বলতার প্রকাশ ঘটিল। কুরআনের অভিমতই সত্য। কেননা, মানবকে জ্ঞান হইতে বঞ্চিত করা, মানুষ সৃষ্টির উদ্দেশ্যকেই নস্যাৎ করিয়া দেয়। একটি বিষয়ে অবশ্য কুরআন ও বাইবেল মতৈক্য পোষণ করে বলিয়া মনে হয়, তাহা এই যে, গাছটি সত্যিই আক্ষরিক অর্থে বৃক্ষ ছিল না, বরং একটি প্রতীক ছিল মাত্র। কারণ, পৃথিবীর বুকে এমন কোন গাছ ছিল বা আছে বলিয়া জানা নাই, যাহার ফল-ভক্ষণে মানুষ ভাল ও মন্দের জ্ঞান প্রাপ্ত হয় অথবা নগ্ন হইয়া যায়। অতএব, এই বৃক্ষটি অন্য কোন কিছুর প্রতিনিধিত্বকারী প্রতীক বৈ অন্য কিছু নহে। ‘শাজারা’ অর্থ ‘ঝগড়া-বিবাদ’ও হয়। কুরআনের অন্যত্র দুই প্রকারের ‘শাজারার’ উল্লেখ আছেঃ (১) শাজারাহ্ তৈয়্যবা (ভাল গাছ) এবং (২) শাজারাহ্ খবিস (মন্দ গাছ) (১৪ঃ২৫,২৭)। পবিত্র বস্তু, পবিত্র শিক্ষা ও পবিত্র কর্মকে ভাল গাছের সহিত এবং মন্দ বস্তু, মন্দ চিন্তা ও মন্দকর্মকে মন্দ গাছের সহিত সমতুল্য দেখানো হইয়াছে। এই ব্যাখ্যার পরিপ্রেক্ষিতে আয়াতটির অর্থ দাঁড়াইবে (১) আদমকে ঝগড়া-বিবাদ পরিহার করিয়া চলিবার নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল, (২) বিবিধ প্রকার অনিষ্টকারী বিষয় হইতে বাচিয়া থাকার জন্য তাহাকে সাবধান করিয়া দেওয়া হইয়াছিল।

فَاَزَلَّہُمَا الشَّیۡطٰنُ عَنۡہَا فَاَخۡرَجَہُمَا مِمَّا کَانَا فِیۡہِ ۪ وَقُلۡنَا اہۡبِطُوۡا بَعۡضُکُمۡ لِبَعۡضٍ عَدُوٌّ ۚ وَلَکُمۡ فِی الۡاَرۡضِ مُسۡتَقَرٌّ وَّمَتَاعٌ اِلٰی حِیۡنٍ ﴿۳۷﴾

৩৭
কিন্তু শয়তান৭০ ইহা দ্বারা (উহা হইতে) তাহাদের উভয়ের পদস্খলন ঘটাইল এবং তাহাদিগকে উহা (অবস্থান) হইতে বহিস্কৃত করিল যাহাতে তাহারা ছিল এবং আমরা বলিলাম, ‘তোমরা সকলে এখান হইতে চলিয়া যাও, তোমরা একে অপরের শত্রু এবং তোমাদের জন্য এক (নির্দিষ্ট) সময় পর্যন্ত এই পৃথিবীতে৭১ বসবাসের স্থান এবং জীবিকা নির্বাহের উপকরণ (নির্ধারিত) আছে।’
৭০। এই আয়াতের প্রথম বাক্যাংশ দুইটি দ্বারা বুঝা যায়, শয়তান জাতীয় কোনও সত্তা আদম ও তাহার সঙ্গিনীকে ভুলাইয়া, প্রতারণাপূর্বক তাহাদের নির্ধারিত স্থান হইতে সরাইয়া নিয়াছিল এবং তাহাদের আরামের অবস্থা হইতে বঞ্চিত করিয়াছিল। ২ঃ৩৫ আয়াতের ব্যাখ্যায় দেখানো হইয়াছে, যে সত্তা প্রবঞ্চনার মাধ্যমে আদমকে কষ্টে নিপতিত করিয়াছিল সে শয়তান, ইব্‌লীস নহে। পরন্তু ইব্‌লীস সেই বিদ্রোহী সত্তা যে আদমের আনুগত্য করিতে বা সহযোগিতা করিতে অস্বীকার করিয়াছে। কাজেই এখানে শয়তান বলিতে ইব্‌লীসকে বুঝায় নাই, আদমের সময়ের অন্য কাহাকেও বুঝাইয়াছে, যে আদমের শত্রু ছিল। এই কথার আরও সমর্থন ১৭ঃ৬৬-তে পাওয়া যায়। সেখানে দেখা যায়, ইব্‌লীস আদমের কোন ক্ষতি সাধন করিতে পারিবে না। অথচ শয়তান কিছু ক্ষতি সাধন করিয়াছে। ‘শয়তান’ শব্দটি ‘ইব্‌লীস’ শব্দ হইতে বহু ব্যাপকতর অর্থ বহন করে। আদমকে আনুগত্য করিতে অস্বীকারকারী জিন্নের অন্তর্ভুক্ত দুরাচারীকে বলা হইয়াছে ইব্‌লীস, যে অশুভ শক্তির প্রতিনিধিত্বকারী নেতা। অন্যদিকে যে কোনও মন্দ ও ক্ষতিকর বস্তু বা জীব-জন্তু, মানব বা মানবাত্মা, রোগ-শোক বা অন্য সব কিছুকেই ‘শয়তান’ বলা যায়। অতএব ইব্‌লীস ও ইব্‌লীসের সঙ্গী সাথীরাও শয়তান, সত্যের শত্রুরাও শয়তান, দুষ্ট ও দুষ্কৃতকারী মানুষেরাও শয়তান, ক্ষতিকর জন্তুও শয়তান, মারাত্মক ব্যাধিসমূহও শয়তান। কুরআন, হাদীস ও আরবী সাহিত্যে এমন ভূরি ভূরি দৃষ্টান্তে পরিপূর্ণ রহিয়াছে যেখানে শয়তান শব্দটি স্বাধীনভাবে এই সব বস্তুর যে কোন একটি বা সবটির জন্যই ব্যবহৃত হইয়াছে।
৭১। কুরআন কোনও ব্যক্তির জীবিতাবস্থায় আকাশে যাওয়া ও সেখানে থাকার কথা মোটেই সমর্থন করে না। এই আয়াত স্পষ্টভাবে বলিয়া দিতেছে যে, এই পৃথিবীই মানুষের জীবনব্যাপী থাকিবার একমাত্র নির্দিষ্ট স্থান। অতএব, ঈসা (আঃ) অথবা অন্য কাহারও আকাশে যাওয়া ও সেখানে জীবিত থাকার ধারণাকে এই আয়াত প্রত্যাখ্যান করে।

فَتَلَقّٰۤی اٰدَمُ مِنۡ رَّبِّہٖ کَلِمٰتٍ فَتَابَ عَلَیۡہِ ؕ اِنَّہٗ ہُوَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ﴿۳۸﴾

৩৮
অতঃপর আদম স্বীয় প্রভুর নিকট হইতে কিছু (দোয়া বিষয়ক) বাক্য শিক্ষালাভ করিল (এবং তদনুযায়ী দোয়া করিল)। ফলে তিনি তাহার প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত করিলেন।নিশ্চয় তিনিই পুনঃপুনঃ সদয় দৃষ্টিপাতকারী, পরম দয়াময়।

قُلۡنَا اہۡبِطُوۡا مِنۡہَا جَمِیۡعًا ۚ فَاِمَّا یَاۡتِیَنَّکُمۡ مِّنِّیۡ ہُدًی فَمَنۡ تَبِعَ ہُدَایَ فَلَا خَوۡفٌ عَلَیۡہِمۡ وَلَا ہُمۡ یَحۡزَنُوۡنَ ﴿۳۹﴾

৩৯
আমরা বলিলাম, ‘চলিয়া যাও তোমরা সকলে এখান হইতে। অতঃপর, যদি কখনও তোমাদের নিকট আমার সন্নিধান হইতে হেদায়াত আসে, তখন যাহারা আমার হেদায়াতের অনুসরণ করিবে, তাহাদের কোন ভয়৭২ থাকিবে না এবং তাহারা দুঃখিতও৭৩ হইবে না।’
৭২। ‘খাউফ’ ভবিষ্যত সম্বন্ধে ভয় নির্দেশক।
৭৩। ‘হুযন’ সাধারণতঃ বিগত বিষয়ের সম্বন্ধে ভয় নির্দেশ করে।

وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا وَکَذَّبُوۡا بِاٰیٰتِنَاۤ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿٪۴۰﴾

৪০
কিন্তু যাহারা অবিশ্বাস করিবে এবং আমাদের নিদর্শনাবলীকে মিথ্যা বলিয়া প্রত্যাখ্যান করিবে, ইহারাই আগুনের অধিবাসী; তথায় তাহারা বসবাস৭৪ করিতে থাকিবে।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ৪
৭৪। ইসলাম দোযখের চিরস্থায়িত্বে বিশ্বাস করে না, বরং শাস্তি দ্বারা সংশোধিত করার স্থান মনে করে, যেখানে পাপীরা পাপের পরিমাণ ও গভীরতা অনুযায়ী এক দীর্ঘ সময় পর্যন্ত আধ্যাত্মিক পরিচর্যা বা চিকিৎসার অধীনে থাকিয়া পাপ-মুক্ত হয়। দেখুন ১৩৫১ টীকা।