২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

فِی الدُّنۡیَا وَالۡاٰخِرَۃِ ؕ وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡیَتٰمٰی ؕ قُلۡ اِصۡلَاحٌ لَّہُمۡ خَیۡرٌ ؕ وَاِنۡ تُخَالِطُوۡہُمۡ فَاِخۡوَانُکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ یَعۡلَمُ الۡمُفۡسِدَ مِنَ الۡمُصۡلِحِ ؕ وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَاَعۡنَتَکُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۲۲۱﴾

২২১
ইহকাল সম্পর্কে এবং পরকাল সম্পর্কে। এবং তাহারা তোমাকে এতীমদের সম্পর্কেও জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, ‘তাহাদের কল্যাণার্থে সংশোধন ও উন্নয়নমূলক ব্যবস্থা করা উত্তম কাজ।২৬৬ এবং তোমরা যদি তাহাদের সহিত মিলিয়া মিশিয়া থাক, তাহা হইলে তাহারা তোমাদেরই ভাই। এবং আল্লাহ্ ফাসাদকারীকে সংশোধনকারীর মোকাবেলায় ভাল জানেন।এবং যদি আল্লাহ্ চাহিতেন তাহা হইলে তোমাদিগকেও কষ্টে ফেলিতে পারিতেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।’
২৬৬। এতিমদের ভরণ-পোষণ এক নাজুক ব্যাপার। ইহা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় সামাজিক দায়িত্ব। এতিমগণকে এমনভাবে শিক্ষা-দীক্ষা দেওয়া প্রয়োজন, যাহাতে তাহারা শারীরিক, নৈতিক ও আধ্যাত্মিক কল্যাণের দিকে অগ্রসর হইতে পারে। তাহাদিগকে পরিবারের সদস্য গণ্য করিতে হইবে, তাহারা তোমাদেরই ভাই—এই বাক্যটির মধ্যে এই নির্দেশই রহিয়াছে।

وَلَا تَنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکٰتِ حَتّٰی یُؤۡمِنَّ ؕ وَلَاَمَۃٌ مُّؤۡمِنَۃٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکَۃٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَتۡکُمۡ ۚ وَلَا تُنۡکِحُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَتّٰی یُؤۡمِنُوۡا ؕ وَلَعَبۡدٌ مُّؤۡمِنٌ خَیۡرٌ مِّنۡ مُّشۡرِکٍ وَّلَوۡ اَعۡجَبَکُمۡ ؕ اُولٰٓئِکَ یَدۡعُوۡنَ اِلَی النَّارِ ۚۖ وَاللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلَی الۡجَنَّۃِ وَالۡمَغۡفِرَۃِ بِاِذۡنِہٖ ۚ وَیُبَیِّنُ اٰیٰتِہٖ لِلنَّاسِ لَعَلَّہُمۡ یَتَذَکَّرُوۡنَ ﴿۲۲۲﴾٪

২২২
এবং তোমরা মোশরেক নারীগণকে ঈমান না আনা পর্যন্ত বিবাহ করিও না, বস্তুতঃ একজন মো’মেন দাসী একজন মোশরেক মহিলা অপেক্ষা অবশ্যই উত্তম। যদিও সে (তাহার সৌন্দর্য দ্বারা) তোমাদিগকে মুগ্ধ করুক না কেন। এবং মোশরেক পুরুষগণ যতক্ষণ পর্যন্ত না ঈমান আনে, তাহাদের সহিত (মো’মেন নারীগণের) বিবাহ দিও না; বস্তুতঃ একজন মো’মেন দাস একজন মোশরেক পুরুষ অপেক্ষা অবশ্যই উত্তম, যদিও সে তোমাদিগকে মুগ্ধ২৬৭ করুক না কেন। ইহারা তোমাদিগকে আগুনের দিকে আহ্বান করে, এবং আল্লাহ্ নিজ আদেশ দ্বারা (তোমাদিগকে) জান্নাত ও ক্ষমার দিকে আহ্বান করেন। এবং তিনি মানবমণ্ডলীর জন্য নিজ নিদর্শনাবলী সুস্পষ্টভাবে বর্ণনা করেন যেন তাহারা উপদেশ গ্রহণ করিতে পারে।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ২৭
২৬৭। যুদ্ধের বিষয়টির সাথে পৌত্তলিকদেরকে বিবাহ করার ব্যাপারটা ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্ক রাখে। কারণ, যুদ্ধে লিপ্ত থাকার দরুন, যোদ্ধারা অনেক দিন ধরিয়া নিজেদের বাড়ীঘর হইতে বিচ্ছিন্ন থাকেন এবং মুশরিক স্ত্রীলোকদিগকে বিবাহ করিতে প্রলুব্ধ হন। কুরআন এইরূপ বিবাহ করাকে শক্তভাবে নিষেধ করিতেছে। একইভাবে, মুশরেক পুরুষের কাছে মুমেন কন্যা দান নিষিদ্ধ। ধর্মীয়, সামাজিক ও নৈতিক কারণে এই নিষেধাজ্ঞা প্রদান করা হইয়াছে। একজন মুশরেক স্বামী তার স্ত্রীর উপরতো বটেই, ঐ স্ত্রীর গর্ভজাত সন্তানদের উপরেও অত্যন্ত জঘন্য কুপ্রভাব বিস্তার করিবে। একইভাবে একজন মুশরেক স্ত্রী নিজ সন্তানদিগকে নিশ্চয় পৌত্তলিকতার বিষময় শিক্ষার মধ্যে লালন-পালন করিয়া বংশটাকেই সকল পারলৌকিক মঙ্গল হইতে বঞ্চিত করিবে। এতদ্ব্যতীত,মো’মেনের স্ত্রী যদি মুশরেক হয় অথবা মুসলমান স্ত্রীর স্বামী যদি মুশরেক হয়, তাহা হইলে তাহাদের ধ্যান-ধারণা, বিশ্বাস-সংস্কার এবং জীবন-বোধ ইত্যাদি পরস্পর বিপরীত মুখী হইবে, ঐক্য, সমঝোতা ও মনের মিল ব্যাহত হইতে হইতে বিলীন হইয়া, পারিবারিক শান্তিকে বিনষ্ট করিয়া দিবে। ইসলাম কৃতদাসকে নিকৃষ্ট জাত বলিয়া চিহ্নিত করে না। একটি মুসলমান স্ত্রীলোক কৃতদাসী হইলেও একজন স্বাধীন মুসলমানের স্ত্রী হইবার জন্য এক স্বাধীনা মুশরেক নারী হইতে অধিকতর উপযোগী। তেমনি, একজন মুসলমান কৃতদাসও স্বাধীন মুসলমান স্ত্রীলোকের স্বামী হইবার জন্য একজন স্বাধীন মুশরেক পুরুষ হইতে অধিকতর উপযোগী ও শ্রেষ্ঠতর। মুসলমান সমাজে কৃতদাসগণ, তাহাদের ঈমান ও ধর্মপরায়ণতার সুবাদে, উচ্চ সম্মানের অধিকারী ছিলেন। হযরত বেলাল, সাল্‌মান ও সালেম প্রমুখাৎ কৃতদাস ছিলেন, ইসলাম গ্রহণপূর্বক কৃতদাস হইতে মুক্তমানবে পরিণত হইয়া, ধর্মীয় চেতনা ও ধর্মীয় পরিশীলন দ্বারা সারা মুসলমান সমাজে উচ্চ মর্যাদা ও সম্মানের পাত্ররূপে গণ্য হইয়াছিলেন।

وَیَسۡـَٔلُوۡنَکَ عَنِ الۡمَحِیۡضِ ؕ قُلۡ ہُوَ اَذًی ۙ فَاعۡتَزِلُوا النِّسَآءَ فِی الۡمَحِیۡضِ ۙ وَلَا تَقۡرَبُوۡہُنَّ حَتّٰی یَطۡہُرۡنَ ۚ فَاِذَا تَطَہَّرۡنَ فَاۡتُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ اَمَرَکُمُ اللّٰہُ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ التَّوَّابِیۡنَ وَیُحِبُّ الۡمُتَطَہِّرِیۡنَ ﴿۲۲۳﴾

২২৩
এবং তাহারা তোমাকে ঋতুস্রাব সম্বন্ধেও জিজ্ঞাসা করে। তুমি বল, ‘ইহা এক অনিষ্টকর বিষয়, সুতরাং তোমরা ঋতুকালে স্ত্রীদের নিকট হইতে পৃথক থাক, এবং যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা পবিত্র২৬৮ হয় তোমরা তাহাদের নিকট গমন করিও না। সুতরাং যখন তাহারা পবিত্র হয় তখন তোমরা তাহাদের নিকট সেইভাবে গমন কর যেভাবে আল্লাহ্ তোমাদিগকে আদেশ২৬৯ দিয়াছেন। নিশ্চয় আল্লাহ্‌ তওবাকারীগণকে ভালবাসেন এবং পবিত্রতা রক্ষাকারীগণকেও ভালবাসেন।’
২৬৮। আন্তঃসামাজিক বিবাহের আইন-কানুন বর্ণনার পর, বৈবাহিক সম্পর্ক ও স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক দায়িত্ব ও অধিকারাদির বিষয়ও ব্যক্ত করা হইল৷
২৬৯। “এবং আল্লাহ্ যাহা তোমাদের জন্য বিধিবদ্ধ করিয়াছেন, উহার অনুসন্ধান কর” (২ঃ১৮৮) নির্দেশটি এই অর্থে দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে স্বামী-স্ত্রীর মিলন, প্রজননের উদ্দেশ্যের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া সম্পন্ন হয়।

نِسَآؤُکُمۡ حَرۡثٌ لَّکُمۡ ۪ فَاۡتُوۡا حَرۡثَکُمۡ اَنّٰی شِئۡتُمۡ ۫ وَقَدِّمُوۡا لِاَنۡفُسِکُمۡ ؕ وَاتَّقُوا اللّٰہَ وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ مُّلٰقُوۡہُ ؕ وَبَشِّرِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ ﴿۲۲۴﴾

২২৪
তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেত্রস্বরূপ,২৭০ সুতরাং তোমরা যখন২৭১ যেভাবে চাহ তোমাদের ক্ষেত্রে গমন কর, এবং তোমরা নিজেদের জন্য (উত্তম কিছু) অগ্রে প্রেরণ কর, এবং তোমরা আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন কর, এবং জানিয়া রাখ যে, নিশ্চয় তোমরা তাহার সহিত সাক্ষাৎ করিবে, এবং তুমি মো’মেনগণকে২৭২ সুসংবাদ দাও।
২৭০। ২৪৪ নং টীকা দেখুন।
২৭১। ‘আন্না’ অর্থ (১) যেরূপে, (২) যখন এবং (৩) যেখানে (আকরাব)।
২৭২। কুরআনের ভাষা যে কত অতুলনীয়, অননুকরণীয়, উচ্চাঙ্গীন ও পবিত্র, এই আয়াতটি তাহারই এক উজ্জ্বল সাক্ষী। অতি নাযুক একটি বিষয়কে এমনি চমৎকার, বিচক্ষণ ও চিত্তাকর্ষক ভাষায় বর্ণনা করা হইয়াছে যে, বিবাহের দর্শন ও দাম্পত্য-সম্পর্ক একটি মাত্র সংক্ষিপ্ত বাক্যের মধ্যে লিপিবদ্ধ হইয়া গিয়াছে যথা, “তোমাদের স্ত্রীগণ তোমাদের জন্য ক্ষেত্র স্বরূপ।” স্ত্রী সত্যিই শস্যক্ষেত্রের মত, যেখানে বংশের বীজ বোনা হইয়া থাকে। বুদ্ধিমান কৃষক উত্তম জমি নির্বাচন করে, ভালভাবে তাহা কর্ষণ করে, ভাল বীজ সংগ্রহ করে; অতঃপর, সুসময় পরিপাটিভাবে বীজ বুনে। তেমনি, একজন মো’মেনেরও তাহাই করা উচিত, কেননা শস্য স্বরূপে সে যে সন্তানাদি লাভ করিবে, তাহাদের উপর কেবল তাহার নিজেরই নয় বরং সমগ্র সম্প্রদায়ের ভবিষ্যত নির্ভর করে। এই চরম সত্যকে উপলব্ধি করানোর জন্য এই অমোঘ বাক্যটি ব্যবহার করা হইয়াছে। অতএব, স্ত্রীলোককে কর্ষণ-ভূমি বা শস্যক্ষেত্ররূপে তুলনার মধ্যে নিগূঢ় তত্বকথা রহিয়াছে, যাহা উন্নত মানব-প্রজনন ও নর-নারী সম্পর্কের উপর উজ্জ্বল আলোক-সম্পাত করে।

وَلَا تَجۡعَلُوا اللّٰہَ عُرۡضَۃً لِّاَیۡمَانِکُمۡ اَنۡ تَبَرُّوۡا وَتَتَّقُوۡا وَتُصۡلِحُوۡا بَیۡنَ النَّاسِ ؕ وَاللّٰہُ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۲۵﴾

২২৫
এবং তোমরা তোমাদের শপথের জন্য আল্লাহ্‌কে (প্রতিবন্ধকরূপে) লক্ষ্যস্থল২৭৩ করিও না—তোমাদের পূণ্যকর্ম করার এবং তাক্‌ওয়া অবলম্বন করার এবং মানবমণ্ডলীর মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা করার পথে। বস্তুতঃ আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
২৭৩। “উরযাহ্‌” মানে বাধা। ইহা আল্লাহ্‌র প্রতি অপবাদ ও বদনামের শামিল যে, তিনি সর্বমঙ্গলের আকর হওয়া সত্বেও, তাঁহারই দোহাই দিয়া কেহ মঙ্গলজনক কাজ হইতে হাত গুটাইতে চায়। আল্লাহ্‌র পবিত্র নামের প্রতি ইহা এক অসহনীয় অবমাননা যে, সেই নামকে কেহ অপবিত্র ও উদ্দেশ্যহীন শপথের হাতল হিসাবে ব্যবহার করে। এই আয়াত ও পরবর্তী আয়াত, ২২৭ আয়াতের সূচনার কাজ সম্পাদন করিতেছে। কেননা, ২২৭ আয়াতে স্ত্রী হইতে পৃথক থাকার শপথ নেওয়া সম্বন্ধে নির্দিষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে।

لَا یُؤَاخِذُکُمُ اللّٰہُ بِاللَّغۡوِ فِیۡۤ اَیۡمَانِکُمۡ وَلٰکِنۡ یُّؤَاخِذُکُمۡ بِمَا کَسَبَتۡ قُلُوۡبُکُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ حَلِیۡمٌ ﴿۲۲۶﴾

২২৬
আল্লাহ্ তোমাদের বৃথা২৭৪ শপথগুলির জন্য তোমাদিগকে পাকড়াও করিবেন না, কিন্তু তিনি তোমাদিগকে পাকড়াও করিবেন উহার জন্য যাহা তোমাদের অন্তর সংকল্পপূর্বক অর্জন করিয়াছে। এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম সহিষ্ণু।
২৭৪। কসম গ্রহণ (শপথ-গ্রহণ) একটি গুরু-গম্ভীর ব্যাপার। তথাপি অনেক লোকেরই বদভ্যাস আছে যে বিনা কারণেই, অর্থহীন শপথ করে। ঐসব অর্থহীন-উদ্দেশ্যহীন কসম, অভ্যাসগত অনাহূত কসম কিংবা রাগের মাথায় গৃহীত কসম কার্যকরী নহে এবং এইজন্য প্রায়শ্চিত্যের প্রয়োজন হয় না!

لِلَّذِیۡنَ یُؤۡلُوۡنَ مِنۡ نِّسَآئِہِمۡ تَرَبُّصُ اَرۡبَعَۃِ اَشۡہُرٍ ۚ فَاِنۡ فَآءُوۡ فَاِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۲۲۷﴾

২২৭
যাহারা নিজেদের স্ত্রীগণ সম্বন্ধে (তাহাদের নিকট হইতে পৃথক হওয়ার) শপথ করে, তাহাদের জন্য অপেক্ষার সময় চার মাস২৭৫ (বিধেয়) হইবে; অতঃপর, যদি তাহারা (এই সময়ের মধ্যে স্বাভাবিক সম্পর্ক স্থাপনকল্পে) প্রত্যাবর্তন করে, তাহা হইলে আল্লাহ্ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
২৭৫। মধ্যবর্তী পর্যায়ে কসম গ্রহণ সংক্রান্ত আয়াতের পরে, কুরআন পুনরায় দাম্পত্য-সম্পর্কের মূল বিষয়ের দিকে ফিরিয়াছে। এই আয়াতে ঐসব লোকের কথা উত্থাপন করা হইয়াছে যাহারা সত্যিকারভাবে তালাক না দিয়া, নিজের স্ত্রীর সাথে দাম্পত্য-সম্পর্ক স্থাপনে বিরত থাকার কসম খাইয়াছে। লক্ষ্যণীয় বিষয় এইযে, তালাকের ব্যাপার উত্থাপনের পূর্ব মুহূর্তে, কুরআন প্রথমে ‘ঋতুস্রাবের’ (২ঃ২২৩) কথা বলিতেছে যখন অস্থায়ী, অপূর্ণ ও অপ্রকৃত বিচ্ছেদ অবলম্বিত হয়। অতঃপর, (এই আয়াতে) অনির্দিষ্টকালের জন্য, সত্যিকার তালাক (বিচ্ছেদ) অবলম্বনের কথা বলা হইতেছে। তারপর পরবর্তী আয়াতগুলিতে বাতিলযোগ্য (প্রত্যাহারযোগ্য) বাস্তব বিচ্ছেদের বিষয় আসিয়াছে এবং সর্বশেষে ২ঃ২৩১ আয়াতে আসিয়াছে অ-বাতিলযোগ্য চূড়ান্ত বিচ্ছেদের কথা। ইহা এক চমৎকার পর্যায়ক্রম, যাহা চূড়ান্ত বিবাহ-বিচ্ছেদের পথে সম্ভাব্য সকল বাধা উপস্থাপন করিয়া, বিবাহ-বন্ধনকে অটুট ও স্থায়ী রাখিতে চায়। ইসলাম যদিও বিবাহ-বিচ্ছেদকে স্বীকৃতি দেয়, তথাপি ইহাকে একটি প্রয়োজনীয় আপদ হিসাবে গণ্য করে। কোন ব্যক্তি যদি তাহার স্ত্রীর সহিত দাম্পত্য-সম্পর্ক ত্যাগ করার শপথ নেয়, তাহা হইলে ইসলাম তাহাকে চার মাস সময় দান করে। এই সময়ের মধ্যে তাহাকে স্ত্রীর সহিত সমঝোতায় আসিয়া দাম্পত্য-সম্পর্ক স্থাপন করিতে হইবে। অন্যথায় বিবাহ-বিচ্ছেদ চূড়ান্ত ও কার্যকরী হইয়া যাইবে। তালাক না দিয়া, অনির্দিষ্ট কালের জন্য স্বামী-স্ত্রীর বিচ্ছেদ, ইসলাম কোন মতেই অনুমোদন করে না। স্ত্রীকে কাছেও রাখে না, আবার তালাকও দেয় না, এই ঝুলন্ত অবস্থায় রাখাকে ইসলাম অতি জঘন্য ও ঘৃণ্য কাজ বলিয়া মনে করে। জাহেলীয়াতের যুগে পুরুষেরা শপথ নিয়া স্ত্রীদের কাছ হইতে অনির্দিষ্ট কালের জন্য বিচ্ছেদ অবলম্বন করিত। এই প্রথাকে ‘ইলা’ বলা হইত। এই অবস্থায় স্ত্রী ঝুলন্ত ও অনিশ্চিত থাকিত। সে না পাইত স্বামী-সঙ্গ, না পারিত অন্য কাহাকেও বিবাহ করিতে।

وَاِنۡ عَزَمُوا الطَّلَاقَ فَاِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲۲۸﴾

২২৮
এবং যদি তাহারা তালাক২৭৬ দেওয়ার সংকল্প করে তাহা হইলে নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
২৭৬। এই আয়াত দ্বারা আরম্ভ হইয়াছে তালাক-বিষয়ক ইসলামী আইন। এই আইন অনুযায়ী, ন্যায় সঙ্গত কারণে, স্বামী তাহার স্ত্রীকে ‘তালাক’ দিবার অধিকার প্রাপ্ত হইল। তবে এই অধিকার কদাচিৎ, কেবল মাত্র অতি অপরিহার্য অবস্থায়ই প্রয়োগ করা যাইতে পারে।

وَالۡمُطَلَّقٰتُ یَتَرَبَّصۡنَ بِاَنۡفُسِہِنَّ ثَلٰثَۃَ قُرُوۡٓءٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَہُنَّ اَنۡ یَّکۡتُمۡنَ مَا خَلَقَ اللّٰہُ فِیۡۤ اَرۡحَامِہِنَّ اِنۡ کُنَّ یُؤۡمِنَّ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ وَبُعُوۡلَتُہُنَّ اَحَقُّ بِرَدِّہِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ اِنۡ اَرَادُوۡۤا اِصۡلَاحًا ؕ وَلَہُنَّ مِثۡلُ الَّذِیۡ عَلَیۡہِنَّ بِالۡمَعۡرُوۡفِ ۪ وَلِلرِّجَالِ عَلَیۡہِنَّ دَرَجَۃٌ ؕ وَاللّٰہُ عَزِیۡزٌ حَکِیۡمٌ ﴿۲۲۹﴾٪

২২৯
এবং তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীগণ নিজেদের ব্যাপারে তিন ঋতুকাল২৭৭ পর্যন্ত প্রতীক্ষা করিবে, এবং যদি তাহারা আল্লাহ্ এবং পরকালের উপর ঈমান রাখে, তাহা হইলে তাহারা জানিয়া রাখুক যে, আল্লাহ্‌ তাহাদের গর্ভাশয়ে যাহা সৃষ্টি করিয়াছেন তাহা গোপন করা তাহাদের জন্য বৈধ হইবে না, এবং তাহাদের স্বামীগণ ইহার (নির্ধারিত সময়ের) মধ্যে তাহাদিগকে (নিজেদের স্ত্রীত্বে) পুনরায় গ্রহণ করার সমধিক হকদার হইবে যদি তাহারা আপোস মীমাংসা২৭৮ করিতে চাহে। এবং ন্যায়সংগতভাবে কতক অধিকার নারীদের জন্য (পুরুষদের উপর) আছে যেরূপে কতক অধিকার (পুরুষদের জন্য) নারীদের উপর আছে কিন্তু নারীদের উপর পুরুষদের (এক প্রকার) প্রাধান্য২৭৯ আছে। বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ মহাপরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ২৮
২৭৭। ‘কুরূ’ ‘কুর বা কার’ শব্দের বহুবচন, যাহার অর্থ একটি সময়-সীমা ; ঋতুস্রাবকাল; ঋতুস্রাবকালীন সময়ের পূর্ববতী বা পরবর্তী সুস্থাবস্থা ; ঋতুস্রাবের অবসান ; ঋতুস্রাব ও সুস্থাবস্থার যুগ্ন সময় অর্থাৎ পূর্ণ এক মাস; যে সময়ে সুস্থাবস্থা হইতে স্ত্রীলোকেরা ঋতুস্রাবের অবস্থায় প্রবেশ করে (মুহীত ও মুফরাদাত)। নবী করীম (সাঃ)-এর সাহাবীগণের মধ্যে হযরত আবুবকর ও হযরত উমর (রাঃ) এবং ইসলামী আইন-বিদ ইমামগণের মধ্যে হযরত আবু হানিফা ও হযরত আহমদ বিন হাম্বল ‘কুর’ বলিতে ঋতুস্রাবের সময়টিকে বুঝিতেন। অন্যদিকে হযরত আয়েশা ও ইবনে উমর (রাঃ) এবং ইমাম মালিক ও ইমাম শাফিই ঋতু-স্রাব-কাল বাদ দিয়া সুস্থাবস্থার সময়টাকে ‘কুর’ মনে করিতেন। উভয়দিকে সম-ওজনের অভিমত থাকায়, মুসলমানের পক্ষে যে কোন অভিমত গ্রহণযোগ্য। তবে সব কিছু মিলাইয়া যুক্তি-তর্কগুলিকে একত্র করিয়া দেখিলে (সেগুলির উপস্থাপন এখানে নিষ্প্রয়োজন), এই উপসংহারে পৌছা যায় যে, প্রথমোক্ত অভিমতই অধিকতর যুক্তি-গ্রাহ্য। তবে যদি কেহ নিরাপদ সীমানায় থাকিতে পসন্দ করেন, তাহার পক্ষে উভয় অভিমতকে সম্মান দিয়া ‘কুর’ এর অর্থ ‘সম্পূর্ণ মাসই’ ধরা ভাল।
২৭৮। সকল আইন-সঙ্গত বিষয়ের মধ্যে, আল্লাহ্‌র কাছে সর্বাপেক্ষা ঘৃণ্য হইল ‘তালাক’ (দাউদ)। তাই এর চারিদিকে বেড়া দিয়া, বাধা দিয়া, সীমা দিয়া, রাখা হইয়াছে। যেমন (ক) ঋতুমুক্ত হওয়ার পরে, যদি স্বামী ঐ পরিষ্কৃত অবস্থার সময়ে স্ত্রী-গমন করিয়া না থাকে, তাহা হইলে কেবলমাত্র সেই সুস্থ অবস্থাতেই একটি তালাক দিতে পারে। (খ) তালাক দেওয়ার কথা ঘোষণা করার পর, স্ত্রী তিনটি ঋতুকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করিবে (প্রায় তিনমাস কাল )। এই সময়টি ‘ইদ্দৎ’ বা অপেক্ষার সময় বলা হয়। এইভাবে, স্বামীকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়, যাহাতে সে তাহার কাজের সকল দিক্ পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে বিবেচনা করিতে পারে এবং তাহার মনের মধ্যে যদি ঐ স্ত্রী সম্বন্ধে ভালবাসার অগ্নি-স্ফুলিঙ্গ কিছু থাকিয়া থাকে, তবে সেটা যেন জ্বলিয়া উঠে ও নিজেকে পুনঃ প্রতিষ্ঠিত করে। (গ) স্ত্রী যদি গর্ভবতী হয়, তাহা হইলে স্বামী হইতে এই কথাটি লুকাইবে না, কেননা সন্তান প্রসবকাল পর্যন্ত যে দীর্ঘ সময় ব্যয়িত হইবার কথা, সেই সময়ে দম্পতির মধ্যে সমঝোতা সৃষ্টির যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকে। (ঘ) পূর্ণ ও অখণ্ডণীয় (বাইন) তালাকের জন্য তিন দফায় তিন মাসে প্রত্যেক ঋতুস্রাবের পর তালাক ঘোষণা প্রয়োজন। প্রথম দফার এবং দ্বিতীয় দফার তালাক ঘোষণার পরেও ইচ্ছা করিলে স্বামী স্ত্রীকে নিজের কাছে নিয়া যাইবার অধিকার ও সুযোগ পায়। এমনকি তালাকের পরবর্তী সময় অতিবাহিত হইয়া গেলেও তৃতীয় দফায় তালাক ঘোষণার পূর্বে স্বামী স্ত্রীকে নূতনভাবে বিবাহ করিয়া মিলিত হইতে পারে।
২৭৯। ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষেত্রে স্বামী ও স্ত্রীর অধিকার সমান। তবুও, ৪ঃ৩৫ অনুযায়ী, পুরুষের শারীরিক সুযোগ-সুবিধা বেশী থাকায় এবং তজ্জনিত কারণে অভিভাবকত্বের দায়িত্বের ও পারিবারিক খরচ-পত্রের বোঝা বহনের দরুন, পরিবারে স্বামীর কিছুটা প্রাধান্য থাকে।

اَلطَّلَاقُ مَرَّتٰنِ ۪ فَاِمۡسَاکٌۢ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ تَسۡرِیۡحٌۢ بِاِحۡسَانٍ ؕ وَلَا یَحِلُّ لَکُمۡ اَنۡ تَاۡخُذُوۡا مِمَّاۤ اٰتَیۡتُمُوۡہُنَّ شَیۡئًا اِلَّاۤ اَنۡ یَّخَافَاۤ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ؕ فَاِنۡ خِفۡتُمۡ اَلَّا یُقِیۡمَا حُدُوۡدَ اللّٰہِ ۙ فَلَا جُنَاحَ عَلَیۡہِمَا فِیۡمَا افۡتَدَتۡ بِہٖ ؕ تِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ فَلَا تَعۡتَدُوۡہَا ۚ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الظّٰلِمُوۡنَ ﴿۲۳۰﴾

২৩০
এইরূপ তালাক্‌ দুইবার (ঘোষিত) হইতে পারে; অতঃপর (স্ত্রীকে) ন্যায়সঙ্গত ভাবে রাখিতে হইবে অথবা সদয়ভাবে বিদায়২৮০ দিতে হইবে। এবং তোমাদের জন্য উহা হইতে কিছু (ফেরৎ) গ্রহণ করা বৈধ হইবে না যাহা তোমরা তাহাদিগকে দিয়াছ,২৮১ কেবল সেইক্ষেত্র ব্যাতিরেকে যখন তাহারা উভয়ে আশংকা করে যে, তাহারা আল্লাহ্‌র সীমাসমুহ রক্ষা করিতে পারিবে না। অতঃপর, তোমরা যদি আশঙ্কা কর যে তাহারা (স্বামী ও স্ত্রী) দুইজন আল্লাহ্‌র সীমাসমূহ রক্ষা করিতে পারিবে না, তাহা হইলে কোন পক্ষেরই পাপ হইবে না যদি স্ত্রী মুক্তিপণ২৮২ হিসাবে কিছু দিয়া দেয়। এইগুলি আল্লাহ্‌র সীমা, সুতরাং তোমরা উহা লংঘন করিও না, এবং যাহারা আল্লাহ্‌র সীমাসমূহ লংঘন করে প্রকৃতপক্ষে তাহারাই যালেম।
২৮০। এই আয়াতে তালাকের (বিবাহ-বিচ্ছেদ) পঞ্চম বাধাটি বর্ণিত হইয়াছে। যে ব্যক্তি বিবাহ-বিচ্ছেদ কামনা করে, তাহাকে তিনবার পৃথক-পৃথকভাবে তিন মাসে ‘তালাকের’ ঘোষণা প্রকাশ করিতে হইবে। প্রত্যেকটি তালাকের ঘোষণা ভিন্ন ভিন্ন সময়ে, স্ত্রীর তিনটি ঋতু-মুক্তির সময়ে সহবাস না করা অবস্থায় উচ্চারিত হইতে হইবে। একই সময়ে পরপর তিনবার বা দুইবার ‘তালাক’ উচ্চারণ অনুমোদনযোগ্য নয়। “মাররাতান” (দুইবার) শব্দ দ্বারা ইহাই বুঝায় যে, দুইটি ভিন্ন সময়ে ইহা ঘটিতে হইবে; একই সময়ে দুইবার ঘটিতে পারে না। হযরত রসূল করীম (সাঃ) একই সময়ে বহুবার “তালাক” উচ্চারণকে, ‘এক তালাক’ গণ্য করিতেন (তিরমিযি ও দাউদ)। নিসাই হইতে বর্ণিত আছে যে, একবার আঁ-হযরত (সাঃ) কে বলা হইল যে, এক ব্যক্তি একই নিশ্বাসে তিনবার ‘তালাক’ উচ্চারণ করিয়াছে। তিনি ইহাতে অত্যন্ত ক্ষোভ প্রকাশ করিয়া বলিলেন, “কী ! আমি তোমাদের মধ্যে বর্তমান থাকাবস্থায়ই তোমরা আল্লাহ্‌র গ্রন্থকে (কুরআনকে) খেলার বস্তু বানাইবে?” প্রথম দুইবারের তালাকের ক্ষেত্রে, মধ্যবর্তী সময়ের মধ্যে স্বামী স্বীয় স্ত্রীকে, স্ত্রীর সম্মতি-অসম্মতি ব্যতিরেকেইে পুনঃ গ্রহণ করিতে পারে। কিন্তু মধ্যবর্তী সময় অতিক্রান্ত হইয়া গেলে, কেবল স্ত্রীর অনুমতি নিয়া পুনর্বিবাহের মাধ্যমে তাহাকে পুনঃগ্রহণ করা যাইতে পারে। কিন্তু তৃতীয় বার তালাক ঘোষণার পর, স্বামীর আর কোন সুযোগ বা অধিকার থাকে না এবং পুরাপুরি বিচ্ছেদ ঘটিয়া যায়। এক সাহাবী একদিন রসূল করীম (সাঃ)কে জিজ্ঞাসা করিলেন, কুরআনতো মাত্র দুইটি তালাকের উল্লেখ করিয়াছে, তৃতীয়টি কোথা হইতে আসিল? উত্তরে রসূল করীম (সাঃ) এই আয়াতে “অথবা সদয়ভাবে বিদায় দিতে হইবে” বাক্যটির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করিলেন। ইহার তাৎপর্য এই যে, প্রথম দুইবার তালাকের পরও স্বামী স্ত্রীকে রাখিতে পারিত কিংবা সম্মতি নিয়া তাহাকে পুনর্বিবাহ করিতে পারিত। কিন্তু সে যদি স্থায়ী বিচ্ছেদ ও অখণ্ডণীয় তালাকই চায়, তাহা হইলে স্ত্রীকে দাম্পত্যবন্ধন হইতে পুরাপুরি মুক্তি দিতে হইবে। এই কথাই ‘সদয়ভাবে বিদায় দিতে হইবে’ বাক্যটিতে বলা হইয়াছে, যাহার অর্থ হইল তৃতীয়বার তালাক উচ্চারণ করিয়া মুক্তি দাও ( জরীর ও মুসনাদ) পরবর্তী আয়াতে ইহা আরও পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে। অতএব, এখানে ‘তসরীহ্‌’ শব্দের দ্বারা ‘তালাক’ বুঝাইয়াছে।
২৮১। যখন কোন ব্যক্তি স্ত্রীকে তালাক দেয়, তখন সে তাহার প্রদত্ত দেন-মহর ও অন্যান্য বস্তু যাহা স্ত্রীকে দিয়াছিল, এই সব হইতে সে বঞ্চিত হয়। তালাক দানের পূর্ব পর্যন্ত সে যদি দেন-মহরের অর্থ পরিশোধ করিয়া না থাকে, তাহা হইলে ‘তালাক’ কার্যকরী করার পূর্বেই তাহা পরিশোধ করিতে হইবে। তাহাছাড়া, দাম্পত্য জীবনে যাহা কিছু সে স্ত্রীকে দান করিয়াছে, তাহা ফেরৎ লইবার অধিকার তাহার থাকে না।
২৮২। তবে, যে ক্ষেত্রে স্ত্রী নিজেই স্বামী হইতে বিচ্ছিন্ন ও মুক্ত হইতে চায়, যাহাকে ইসলামী পরিভাষায় ‘খোলা’ বলা হয়, সেইক্ষেত্রে স্ত্রী তাহা ‘কাজী’ বা বিচারকের মাধ্যমে লাভ করিতে পারে। “উভয়ে আশঙ্কা করে” কথাদ্বারা ন্যায়-অন্যায়ের আশংকা বুঝায় এবং কাজীর মাধ্যমে ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হওয়া এই ক্ষেত্রে প্রয়োজন। এরূপ ক্ষেত্রে স্ত্রীকে সম্পূর্ণভাবে কিংবা আংশিক ভাবে, তাহার মহরানার টাকা ও স্বামীর প্রদত্ত অন্যান্য জিনিসপত্র ছাড়িয়া দিতে হয়, তাহা সমঝোতার মাধ্যমেই হউক অথবা কাজীর ফয়সালার মাধ্যমেই হউক। কায়েস বিন সাবিতের স্ত্রী জামিলার বিবাহ-বিচ্ছেদ খোলার একটা প্রকৃষ্ট উদাহরণ। স্বামী কায়েসের উগ্র স্বভাবের কারণে জামিলা, বিবাহ-বিচ্ছেদের খোলার আবেদন জানাইলেন। তিনি বলিলেন যে, স্বামীর সাথে তাহার বনিবনা হইতেছে না, কারণ উভয়ের মন-মেযাজ এতই পার্থক্য যে সামঞ্জস্য বিধান সম্ভব নয়। মহানবী (সাঃ) তাহার খোলার আবেদন মঞ্জুর করিলেন, তবে তাহার স্বামীর প্রদত্ত বাগানটি স্বামীকে ফেরৎ দিতে হইল (বুখারী)।