২২

الحج

সূরা আল্‌ হাজ্জ্ব

Al-Hajj

মাদানী ৭৯ আয়াত ১০ রুকু পারা ১৭

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৭৯ আয়াত এবং ১০ রুকু আছে।

ذٰلِکَ ٭ وَمَنۡ یُّعَظِّمۡ حُرُمٰتِ اللّٰہِ فَہُوَ خَیۡرٌ لَّہٗ عِنۡدَ رَبِّہٖ ؕ وَاُحِلَّتۡ لَکُمُ الۡاَنۡعَامُ اِلَّا مَا یُتۡلٰی عَلَیۡکُمۡ فَاجۡتَنِبُوا الرِّجۡسَ مِنَ الۡاَوۡثَانِ وَاجۡتَنِبُوۡا قَوۡلَ الزُّوۡرِ ﴿ۙ۳۱﴾

৩১
এইরূপ (আল্লাহ্‌র আদেশ)। যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র (নির্দেশিত) পবিত্র জিনিষসমূহের সম্মান করিবে ইহা তাহার প্রভুর দৃষ্টিতে তাহার জন্য কল্যাণকর হইবে। (হে মো’মেনগণ) তোমাদের জন্য, সকল চতুষ্পদ জন্তুই হালাল করা হইয়াছে কেবল উহা ছাড়া যাহা (কুরআনে) তোমাদের জন্য (হারাম বলিয়া) বর্ণিত হইয়াছে। অতএব তোমরা প্রতিমাসমূহের অপবিত্রতা হইতে দূরে থাক এবং মিথ্যা কথা বলা হইতেও দূরে থাক —

حُنَفَآءَ لِلّٰہِ غَیۡرَ مُشۡرِکِیۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یُّشۡرِکۡ بِاللّٰہِ فَکَاَنَّمَا خَرَّ مِنَ السَّمَآءِ فَتَخۡطَفُہُ الطَّیۡرُ اَوۡ تَہۡوِیۡ بِہِ الرِّیۡحُ فِیۡ مَکَانٍ سَحِیۡقٍ ﴿۳۲﴾

৩২
আল্লাহ্‌র (ইবাদতের) জন্য একনিষ্ঠ অবস্থায়, কাহাকেও তাঁহার সঙ্গে শরীক না করিয়া। এবং যে কেহ আল্লাহ্‌র সঙ্গে কাহাকেও শরীক করে সে যেন আকাশ হইতে পড়িয়া গেল, অনন্তর পাখী তাহাকে ছোঁ মারিয়া লইয়া গেল অথবা বাতাস তাহাকে উড়াইয়া দূরবর্তী স্থানে নিক্ষেপ করিল।১৯৪৯
১৯৪৯। আল্লাহ্‌তা’লার সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ ও সেরা হইতেছে মানুষ। সমগ্র বিশ্ব— সূর্য, চন্দ্র, নক্ষত্ররাজি, পৃথিবী, মহাসাগর, পর্বতশ্রেণী ইত্যাদি সবই মানবের খেদমতের জন্য সৃজন করা হইয়াছে। মানুষ আধ্যাত্মিক ও নৈতিক গুণের এত উচ্চ মার্গে উঠিতে পারে যে, তাহার ব্যক্তি-সত্তায় ঐশী গুণাবলী প্রতিবিম্বিত হইতে পারে। অতএব যদি অচেতন বস্তুর উপাসনা করার মত অমর্যাদাকর অবস্থায় সে নিজেকে নামাইয়া ফেলে, তাহা হইলে সে আধ্যাত্মিক মহত্বের উচ্চ মার্গ হইতে নৈতিক ও বুদ্ধিগত অসম্মানের অতল তলে পতিত হয়।

ذٰلِکَ ٭ وَمَنۡ یُّعَظِّمۡ شَعَآئِرَ اللّٰہِ فَاِنَّہَا مِنۡ تَقۡوَی الۡقُلُوۡبِ ﴿۳۳﴾

৩৩
(প্রকৃত কথা) ইহাই, বস্তুতঃ যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌র নির্ধারিত নিদর্শনসমূহকে সম্মান ও শ্রদ্ধা জ্ঞাপন করিবে, নিশ্চয় তাহার এই কাজকে আন্তরিক তাক্‌ওয়া বলিয়া গণ্য করা হইবে।১৯৫০
১৯৫০। ইসলামের সকল আদেশ ও অধ্যাদেশের মৌলিক উদ্দেশ্য বারংবার আবৃত্তির মাধ্যমে অন্তরে ন্যায়পরায়ণতা ও পবিত্রতার ধারণা জন্মাইয়া দেওয়া, ইহাই তফসীরাধীন আয়াতের অন্তর্নিহিত মর্ম। ইসলামী ইবাদতের সকল নিয়ম-প্রণালী হইল মাত্র উপকরণ স্বরূপ, যেগুলি উক্ত চরম লক্ষ্যে পরিচালিত করে।

لَکُمۡ فِیۡہَا مَنَافِعُ اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی ثُمَّ مَحِلُّہَاۤ اِلَی الۡبَیۡتِ الۡعَتِیۡقِ ﴿٪۳۴﴾

৩৪
এক নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তোমাদের জন্য এইগুলির (কুরবানীর পশু) মধ্যে উপকার১৯৫১ আছে, অতঃপর প্রাচীন গৃহের নিকট উহাদের কুরবানীর স্থান হইবে।
সূরা আল্‌ হাজ্জ্ব - রুকু ৪
১৯৫১। কুরবানীর উদ্দেশ্যে যে সকল পশু মক্কাতে আমদানী করা হয় সেইগুলিকে আরোহণের জন্য বাহনরূপে ব্যাবহার করা যাইতে পারে এবং ভার বহনের কাজে অথবা কুরবানী করার পূর্বে উহাদের দুধ ব্যবহৃত হইতে পারে। অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাজেও উহারা লাগিতে পারে।

وَلِکُلِّ اُمَّۃٍ جَعَلۡنَا مَنۡسَکًا لِّیَذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰہِ عَلٰی مَا رَزَقَہُمۡ مِّنۡۢ بَہِیۡمَۃِ الۡاَنۡعَامِ ؕ فَاِلٰـہُکُمۡ اِلٰہٌ وَّاحِدٌ فَلَہٗۤ اَسۡلِمُوۡا ؕ وَبَشِّرِ الۡمُخۡبِتِیۡنَ ﴿ۙ۳۵﴾

৩৫
এবং আমরা প্রত্যেক কওমের জন্য কুরবানীর নিয়ম১৯৫২ নির্ধারিত করিয়া দিয়াছি যেন তাহারা আল্লাহ্‌র নাম উহার উপর উচ্চারণ করে যাহা গৃহপালিত চতুষ্পদ জন্তু হইতে তিনি তাহাদিগকে দান করিয়াছেন। স্মরণ রাখিও, তোমাদের মা’বূদ এক-ই মা’বূদ১৯৫৩ সুতরাং তোমরা কেবল তাঁহারই জন্য আত্মসমর্পণ কর এবং বিনয়ী লোকদিগকে সুসংবাদ দাও—
১৯৫২। ‘নাসাকা লিল্লাহে’ অর্থ সে আল্লাহ্‌তা’লার নৈকট্য লাভের উদ্দেশ্যে কুরবানী করিয়াছিল এবং স্বতঃপ্রবৃত্ত হইয়া অবিরাম সৎকর্ম করিয়াছিল। ‘মানসাকা’ শব্দের অর্থ ত্যাগের নিয়ম-প্রণালী; যে স্থানে এইরূপ অনুষ্ঠানাদি পালন করা হয় (আকরাব)। এই আয়াত দ্বারা কুরবানীর বিষয়-বস্তু সূচীত হইয়াছে (তিনটি মূল বিষয়-বস্তুর একটি যাহার সম্বন্ধে এই সূরা আলোচনা করিয়াছে) অপর দুইটি হইল হজ্জ্ এবং জিহাদ। আয়াতটি আরও প্রতিপন্ন করে যে, কুরবানী সম্বন্ধে আদেশ কেবল ইসলামের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নহে। ইহা সকল ধর্মেই সার্বজনীন, কারণ ইহা এক অভিন্ন ঐশী সূত্র হইতে উদ্ভূত। আয়াতে আরও প্রমাণিত হয় যে, ইহা পশুরই কুরবানী ছিল যাহা আদিকাল হইতেই সকল ধর্মের অনুসারীদিগের উপর নির্দেশ করা হইয়াছিল এবং মানুষ বলির নিষ্ঠুর প্রথা পরবর্তী কালের প্রবর্তন। এতদৃষ্টে মূল শব্দ ‘নাসাকা’ বিভিন্ন অর্থে (লেইন), প্রকৃত ও অকৃত্রিম কুরবানী তিন প্রকার অত্যাবশ্যক বৈশিষ্ট্যের অধিকারীঃ (ক) ইহা স্বেচ্ছাকৃত এবং স্বতঃস্ফূর্ত হওয়া উচিত; (খ) এই কুরবানী পবিত্রতম উদ্দেশ্যে হইতে হইবে; (গ) ইহা পার্থিব বিবেচনা প্রসূত কুরবানী হইলে চলিবে না।
১৯৫৩। আয়াতটি দুই প্রকার অর্থ বহন করে। (১) কুরবানীর নিয়ম-প্রণালী সর্ব ধর্মে সার্বজনীন, যদিও উহারা একে অপর হইতে আপন আপন উৎপত্তির স্থান ও কালের দিক হইতে বহুদূর ব্যবধানে পৃথক পৃথক। এই বাস্তব ঘটনা ইহাই প্রমাণ করে যে, আদিতে তাহারা সকলেই একই সর্বোচ্চ উৎস হইতে উদ্ভূত এবং সকল জাতির খোদাই এক ও অভিন্ন খোদা। (২) কুরবানীর অন্তর্নিহিত উদ্দেশ্য হইতেছে আমাদের উচ্চাকাংখা ও উচ্চাভিলাস, আমাদের সর্বপ্রকার ধারণা, কল্পিত আদর্শ এমনকি প্রাণ ও সম্মান আল্লাহ্‌তা’লার জন্য ত্যাগ করতঃ তাঁহার তৌহীদ অর্থাৎ একত্ব উপলব্ধি করা এবং ঘোষণা করা। ইসলাম ধর্মে কুরবানীর ধারণা, ক্রুদ্ধ দেব-দেবীকে সন্তুষ্ট করা নহে, অথবা কাহারও পাপের প্রায়শ্চিত্ত করাও নহে; বরং আল্লাহ্‌র জন্য এবং আল্লাহ্‌র পথে ব্যক্তির সমস্ত কিছুর কুরবানী করা।

الَّذِیۡنَ اِذَا ذُکِرَ اللّٰہُ وَجِلَتۡ قُلُوۡبُہُمۡ وَالصّٰبِرِیۡنَ عَلٰی مَاۤ اَصَابَہُمۡ وَالۡمُقِیۡمِی الصَّلٰوۃِ ۙ وَمِمَّا رَزَقۡنٰہُمۡ یُنۡفِقُوۡنَ ﴿۳۶﴾

৩৬
তাহারা এমন লোক যে, যখন তাহাদের নিকট আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ করা হয় তখন তাহাদের হৃদয় ভয়ে কাঁপিয়া উঠে, এবং (ঐ সকল লোককেও সুসংবাদ দাও) যাহারা তাহাদের উপর আগত বিপদাবলীতে ধৈর্য ধারণ করে এবং তাহারা নামায কায়েম করে এবং তাহাদিগকে আমরা যাহা কিছু রিয্‌ক দান করিয়াছি উহা হইতে তাহারা খরচ করে।

وَالۡبُدۡنَ جَعَلۡنٰہَا لَکُمۡ مِّنۡ شَعَآئِرِ اللّٰہِ لَکُمۡ فِیۡہَا خَیۡرٌ ٭ۖ فَاذۡکُرُوا اسۡمَ اللّٰہِ عَلَیۡہَا صَوَآفَّ ۚ فَاِذَا وَجَبَتۡ جُنُوۡبُہَا فَکُلُوۡا مِنۡہَا وَاَطۡعِمُوا الۡقَانِعَ وَالۡمُعۡتَرَّ ؕ کَذٰلِکَ سَخَّرۡنٰہَا لَکُمۡ لَعَلَّکُمۡ تَشۡکُرُوۡنَ ﴿۳۷﴾

৩৭
আর যে কুরবানীর উষ্ট্রগুলি, আমরা ঐগুলিকে তোমাদের জন্য আল্লাহ্‌র নিদর্শনাবলীর অন্তর্গত করিয়াছি। উহাদের মধ্যে তোমাদের জন্য অনেক মঙ্গল নিহিত আছে; অতএব, উহাদিগকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করাইয়া উহাদের উপর আল্লাহ্‌র নাম উচ্চারণ কর। এবং যখন উহারা নিজেদের পার্শ্বে ঢলিয়া পড়ে, তখন তোমরা উহা হইতে নিজেরাও আহার কর এবং আহার করাও অল্পেতুষ্ট-ধৈর্যশীল অভাবীদিগকে এবং দারিদ্রে কাতর ব্যক্তিদিগকেও।১৯৫৪ এইভাবে আমরা উহাদিগকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করিয়া দিয়াছি যেন তোমরা কৃতজ্ঞতা প্রকাশ কর।
১৯৫৪। কুরবানীর জন্য মক্কায় উটগুলিকে যবহ্ করা এরূপ এক প্রতীক স্বরূপ যে, মানুষ তাহার স্রষ্টা এবং প্রভুর পথে জীবন দিতে প্রস্তুত, যেমন করিয়া উষ্ট্রগুলি উহাদের নিজ মালিকের জন্য প্রাণ দেয়। ইহাই হইল কুরবানীর চরম উদ্দেশ্য এবং লক্ষ্য। আয়াতে উল্লেখিত অপর উদ্দেশ্যসমূহ দ্বিতীয় পর্যায়ভুক্ত। যখন সে একটি পশুকে কুরবানী করে, তখন হজ্জযাত্রীকে স্মরণ করাইয়া দেয় যে, ইহা আল্লাহ্‌র এক নিদর্শন স্বরূপ। এই আয়াত আরও প্রমাণ করে যে, কুরবানীকৃত পশুর গোশ্‌ত সঠিকভাবে বন্টন করা উচিৎ যেন অপচয় না হয়।

لَنۡ یَّنَالَ اللّٰہَ لُحُوۡمُہَا وَلَا دِمَآؤُہَا وَلٰکِنۡ یَّنَالُہُ التَّقۡوٰی مِنۡکُمۡ ؕ کَذٰلِکَ سَخَّرَہَا لَکُمۡ لِتُکَبِّرُوا اللّٰہَ عَلٰی مَا ہَدٰٮکُمۡ ؕ وَبَشِّرِ الۡمُحۡسِنِیۡنَ ﴿۳۸﴾

৩৮
উহাদের মাংস ও উহাদের রক্ত কখনও আল্লাহ্‌র নিকট পৌঁছে না, বরং তাঁহার নিকট তোমাদের তরফ হইতে তাক্‌ওয়া পৌছে।১৯৫৫ এইভাবে তিনি উহাদিগকে তোমাদের সেবায় নিয়োজিত করিয়া দিয়াছেন যেন তোমরা আল্লাহ্‌র শ্রেষ্ঠত্ব ঘোষণা কর, যেহেতু তিনি তোমাদিগকে হেদায়াত দান করিয়াছেন। এবং তুমি সৎকর্মশীলদিগকে সুসংবাদ দাও।
১৯৫৫। তফসীরাধীন আয়াত কুরবানীর প্রকৃত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য এবং উহার সারাংশ ও অভ্যন্তরীণ অবস্থার উপর সমুজ্জ্বলভাবে আলোকপাত করিয়াছে। ইহা এই সর্বোচ্চ শিক্ষা প্রদান করে যে, কুরবানীর বাহ্যিক ক্রিয়া আল্লাহ্‌তা’লাকে সন্তুষ্ট করে না বরং এই অনুষ্ঠানের পশ্চাতে তাক্ওয়া, প্রেরণা ও অন্তর্নিহিত শক্তিই তাঁহাকে খুশী করে। কুরবানীকৃত পশুর গোশ্‌ত এবং রক্ত আল্লাহ্‌র নিকট পৌঁছে না, অন্তরের তাক্‌ওয়াই কেবল তাঁহার নিকট গ্রহণযোগ্য। তাহাদের নিকট আপন ও প্রিয় যাহা কিছু আছে আল্লাহ্‌তা’লা উহার সর্বপ্রকারের কুরবানী তলব করেন এবং গ্রহণ করিয়া থাকেন— আমাদের পার্থিব সহায় সম্পদ, প্রিয় ভাবাদর্শ, আমাদের সম্মান, এমনকি নিজ জীবন পর্যন্ত। বাস্তবিক পক্ষে আল্লাহ্‌তা’লা পশুর রক্ত এবং গোশ্‌ত আমাদের নিকট হইতে চাহেন না এবং আশা করেন না, কিন্তু তিনি আমাদের আত্মোৎসর্গ চাহেন। তবে, ইহা মনে করা ভুল হইবে যে, যেহেতু বাহ্যিক ক্রিয়ানুষ্ঠানের আড়ালে সক্রিয় মনের ভাবই গুরত্বপূর্ণ, সেই জন্য বাহ্যিক কর্মানুষ্ঠানের কোন মূল্য নাই। ইহা সত্য যে, কুরবানীর বাহ্যিক ক্রিয়া খোসা স্বরূপ এবং উহার অভ্যন্তরীণ প্রেরণা উহার শাঁস, তদনুরূপভাবে কোন বস্তুর দেহাবরণ উহার শাঁস বা সারাংশের মতই অতি জরুরী, কারণ কোন আত্মা দেহ ছাড়া থাকে না এবং কোন শাঁস খোসা ব্যতীত থাকিতে পারে না।

اِنَّ اللّٰہَ یُدٰفِعُ عَنِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ لَا یُحِبُّ کُلَّ خَوَّانٍ کَفُوۡرٍ ﴿٪۳۹﴾

৩৯
যাহারা ঈমান আনিয়াছে নিশ্চয় আল্লাহ্ তাহাদের পক্ষ হইতে (শত্রুকে) প্রতিহত করেন।১৯৫৬ নিশ্চয় আল্লাহ্ ভালবাসেন না বিশ্বাসঘাতক, অকৃতজ্ঞকে।
সূরা আল্‌ হাজ্জ্ব - রুকু ৫
১৯৫৬। এই আয়াত দ্বারা জিহাদ সম্পর্কিত বিষয়াদির উপস্থাপনা আরম্ভ হইয়াছে। কুরবানীর বিষয়বস্তু জিহাদের সহিত অতি গুরত্বপূর্ণ বিষয়ে ভূমিকা স্বরূপ উপযুক্ত অংশ গঠন করিয়াছে। মুসলমানদিগকে আত্ম-রক্ষার্থে যুদ্ধের অনুমতি দেওয়ার পূর্বাহ্নে কুরবানীর গুরুত্ব সম্বন্ধে অবহিত করা হইয়াছিল। এই আয়াত ইসলাম ধর্মে জেহাদের ধারণাকে সুস্পষ্টরূপে আলোকিত করিয়াছে। আয়াত প্রতিপন্ন করে যে, জিহাদ হইতেছে সত্যের জন্য যুদ্ধ করা। কিন্তু কার্যতঃ ইসলাম ধর্ম আক্রমণাত্মক যুদ্ধের অনুমতি দেয় না, পক্ষান্তরে কাহারো সম্মান, দেশ বা বিশ্বাস রক্ষার্থে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়াকে ইসলাম সর্বোচ্চ নৈতিক কর্তব্য বলিয়া বিবেচনা করে। মানুষ আল্লাহ্‌তা’লার মহোত্তম সৃষ্টি। সে আল্লাহ্‌র সৃষ্টির মধ্যে সর্বোৎকৃষ্ট, সৃষ্টির উদ্দেশ্য এবং শেষ পরিণতি। মর্তলোকে মানুষ আল্লাহ্‌তা’লার খলীফা বা প্রতিনিধি এবং তাঁহার সমগ্র সৃষ্টির সেরা (২ঃ৩১)। ইহাই হইতেছে ইসলাম ধর্মে বিশ্বমানবের উচ্চ মর্যাদাপূর্ণ স্থান। অতএব ইহা খুবই স্বাভাবিক, যে ধর্ম মানুষকে এইরূপে উচ্চ মর্যাদার আসনে উন্নীত করিয়াছে, উহা সঙ্গতরূপেই মানব জীবনের প্রতি মহান গুরুত্ব এবং পবিত্রতা সংযুক্ত করিয়াছে। কুরআন করীমের মতে, সমস্ত কিছুর মধ্যে মানবের জীবন সর্বাপেক্ষা পবিত্র এবং অলংঘনীয়। কুরআন করীমে নির্দিষ্টভাবে বর্ণিত পরিস্থিতির অধীন ব্যতীত ইহা (জীবন) হরণ করা বা পবিত্রকে অপবিত্র করা নিষিদ্ধ (৫ঃ৩৩; ১৭ঃ৩৪)।ইহা মানুষের অমূল্য সম্পদ—সম্ভবতঃ ইহা স্বয়ং জীবন হইতেও অধিকতর মূল্যবান। মানব জীবনের সঙ্গে, কুরআন যে সর্বোচ্চ পবিত্রতা সংযোজন করিয়াছে, তাহা মানুষের অমূল্য অধিকার, নৈতিক-চেতনা বা নীতিবোধের স্বীকৃতি প্রদানে এবং ইহার পবিত্রতা এবং অলংঘনীয়তা ঘোষণা করিতে ব্যর্থ হইতে পারে না। এই অমূল্য অধিকার সংরক্ষণ করিবার জন্যই মুসলমানদিগকে অস্ত্রধারণের অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল।

اُذِنَ لِلَّذِیۡنَ یُقٰتَلُوۡنَ بِاَنَّہُمۡ ظُلِمُوۡا ؕ وَاِنَّ اللّٰہَ عَلٰی نَصۡرِہِمۡ لَقَدِیۡرُ ﴿ۙ۴۰﴾

৪০
যাহাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা হইতেছে তাহাদিগকে (আত্মরক্ষার্থে যুদ্ধ করার) অনুমতি দেওয়া হইল, কারণ তাহাদের উপর যুলুম করা হইতেছে,১৯৫৭ এবং নিশ্চয় আল্লাহ্ তাহাদিগকে সাহায্য করিতে পূর্ণ ক্ষমতাবান—
১৯৫৭। বিজ্ঞ ব্যক্তিরা এ ব্যাপারে একমত যে, ইহাই প্রথম আয়াত যাহা মুসলমানদিগকে আত্ম-রক্ষার্থে অস্ত্র হাতে তুলিয়া লওয়ার অনুমতি দিয়াছিল। ইহা নীতি নির্ধারণ করিয়া দিয়াছে যে, অবস্থা বিশেষে মুসলমানগণ আত্ম-রক্ষামূলক যুদ্ধে অবতীর্ণ হইতে পারে এবং পরবর্তী আয়াতসমূহের পাশাপাশি ইহা ঘোষণা করিয়াছে, কি কারণে অস্ত্রহীন ও জাগতিক উপায়-উপকরণবিহীন অল্প সংখ্যক মুসলমান আত্ম-রক্ষার্থে যুদ্ধ করিতে বাধ্য হইয়াছিল। তাহারা মক্কার জীবনে অনেক বৎসর অবিরাম কঠোর নির্যাতন ভোগ করিবার পর মদীনায় হিজরত করিলে, সেখানেও শত্রু তীব্র ঘৃণায় তাহাদের পিছনে ধাওয়া করিয়া তাহাদিগকে হয়রানি ও ব্যতিব্যস্ত করিয়াছিল। এই আয়াতে প্রথম কারণ স্বরূপ বলা হইয়াছে যে, তাহারা নির্যাতিত হইয়াছিল।