المؤمنون
Al-Mu'minun
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ১১৯ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।
অবর্তীর্ণ হওয়ার সময় ও প্রসঙ্গ
বহু অভ্যন্তরীণ সাক্ষী-প্রমাণ পেশ পূর্বক দেখানো হয় যে, বর্তমান সূরাটি রসূলে করীম (সাঃ)-এর মক্কী-জীবনের শেষের দিকে অবতীর্ণ হইয়াছিল। ইমাম সুয়ূতীর মতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর নিকট মদীনায় হিজরতের পূর্বে মক্কায় অবতীর্ণ সূরাসমূহের মধ্যে ইহাই সর্বশেষ সূরা। তবে, মক্কায় অবতীর্ণ সর্বশেষ সূরা না হইলেও ইহা যে শেষ মক্কী সূরাগুলোর অন্যতম— ইহাতে কোন সন্দেহ নাই। পূর্ববর্তী সূরার শেষাংশে মো’মেনদেরকে আল্লাহ্র দিকে প্রণত হইয়া তাঁহার নির্দেশাবলী মানিয়া চলার আহ্বান জানানো হইয়াছিল। কেননা, ইহাতেই তাহাদের ভবিষ্যত উন্নতি ও প্রগতির গৃঢ় তত্ত্ব নিহিত রহিয়াছে। তাহাদেরকে উহাদের বিরুদ্ধে তলোয়ারের জেহাদ করিতেও অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল তলোয়ার দ্বারাই প্রতিরোধ করা যায়। তাহাদেরকে আরো নির্দেশ দেওয়া হইয়াছিল, যেন তাহারা কুরআনের আলোকে তাহাদের সংগ্রাম চালাইয়া যায় এবং এই প্রতিশ্রুতিও তাহাদেরকে দেওয়া হইয়াছিল যে, যদি তাহারা তাহাদের সেই কর্তব্য সঠিকভাবে সম্পাদন করে, তাহা হইলে তাহারা আল্লাহর সাহায্য প্রাপ্ত হইবে এবং আল্লাহ্ তাহাদিগকে সাফল্য ও বিজয় প্রদান করিবেন। এই প্রতিশ্রুতি ছিল শর্তসাপেক্ষ। তবে আলোচ্য সূরাতে পূর্ব প্রসঙ্গের জের টানিয়া একটি নিশ্চয়তা এইভাবে দেওয়া হইয়াছে যে, বিশ্বাসীদের একটি সম্প্রদায় অবশ্যই জন্মলাভ করিবে, যাহারা পূর্ব বর্ণিত অবস্থা পুরাপুরি মানিয়া চলার ফলশ্রুতিতে অবশ্যই সফলকাম হইবে। কাজেই এই বিষয়টি বিশ্বাসীদের সফলতা) যাহা পূর্ববর্তী সূরাতে একটি অনুমানের আকারে পেশ করা হইয়াছিল, তাহা বর্তমান সূরাতে একটি বাস্তব-ভিত্তিক সত্য হিসাবে সাব্যস্ত করা হইয়াছে।
বিষয়বস্তু
মো’মেনদের বিজয় ও সফলতার সময় উপস্থিত হইয়াছে—এই শুভ সংবাদ দিয়া বর্তমান সূরাটির শুরু। অতঃপর, কতিপয় বৈশিষ্ট্য ও বিশেষ পরিচয়-চিহ্নের বর্ণনা তুলিয়া ধরা হইয়াছে যাহা বস্তুতঃ তাহাদের আধ্যাত্মিক উন্নতি ও উৎকর্ষতার পরিচায়ক। এই বর্ণনার পরপরই অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত অথচ সুন্দরভাবে মানুষের সৃষ্টি-পযায়ের কথা বলা হইয়াছে, যেখানে এক বিন্দু শুক্র হইতে বিভিন্ন বিবর্তনের পর পরিপূর্ণ অবয়বের মানব শিশু জন্ম লাভ করে। অতঃপর, বলা হইয়াছে যে, বাহ্যিকভাবে প্রত্যেক মানব জন্মের শেষে যেমন মৃত্যু ও পুনরুত্থান ঘটিবে, তেমনি জাতি বা সম্প্রদায়সমূহের মধ্যেও উত্থান-পতনের ঘটনা একটি স্বাভাবিক বিষয়। কাজেই একটি জাতির মধ্যে এক সময় যদিও আধ্যাত্মিক নবজাগরণ ঘটে, পরবর্তীতে সেই জাতির মধ্যেই পুনরায় আত্মিক অবক্ষয় দেখা দেয় এবং যথাসময়ে অন্য একটি জাতি তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়। বস্তুতঃ, শারীরিক ও আধ্যাত্মিক বিষয়ের উৎকর্ষতা একে অপরের সাথে গভীর সাদৃশ্য রাখে। উভয় ক্ষেত্রেই উহারা সাতটি পর্যায় অতিক্রম করিয়া পরিপূর্ণতায় ধাপে ধাপে উন্নীত হয়। অতঃপর সূরাটিতে এই প্রসংগের অবতারণা করা হইয়াছে যে, পৃথিবীতে সব কিছুই একটি নির্ধারিত পরিমাণ অনুযায়ী প্রেরিত হইয়া থাকে এবং একটি নির্দিষ্ট মেয়াদ পর্যন্ত তাহাদেরকে সংরক্ষণ করা হয়। অতঃপর, উহাদের প্রয়োজন শেষ হইয়া যায় এবং সেইগুলি লয়প্রাপ্ত হয়। একইভাবে পবিত্র কুরআনের পূর্ববতী ধর্ম-বিধানগুলি তাহাদের নিজ নিজ সময়ের প্রয়োজন মিটাইয়াছিল এবং কুরআন নাযেল হওয়ার পর এখন সেগুলি অপ্রচলিত হইয়া গিয়াছে। কাজেই শুধু মাত্র ঐশী হওয়ার কারণেই যে কোন ধর্ম চিরকাল অবিকৃত থাকিয়া যাইবে এমন কোন গ্যারান্টি নাই। শুধু মাত্র পবিত্র কুরআনের ক্ষেত্রেই এই নিশ্চয়তা দেওয়া হইয়াছে যে, উহার শিক্ষা শাশ্বত ও চিরন্তন এবং কেয়ামত কাল পর্যন্ত ইহা সমগ্র মানবজাতিকে আধ্যাত্মিক প্রয়োজন মিটাইতে থাকিবে। অতঃপর, সূরাটিতে মানবকে প্রদত্ত আল্লাহ্তা’লার একাধিক নেয়ামতের কথা বিশেষভাবে বর্ণনা করা হইয়াছে যাহা তাহার পার্থিব জীবন ধারণের জন্য অপরিহার্য। এই বিষয়টিকে সামনে রাখিয়া অতঃপর একটি গুরুত্বপূর্ণ নৈতিক শিক্ষার দিকে সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হইয়াছে। আর তাহা হইল, মানুষের বাহ্যিক প্রয়োজন পূর্ণ করার জন্য যেখানে আল্লাহ্তা’লা এতকিছুর আয়োজন করিয়াছেন, সেক্ষেত্রে তাহার আধ্যাত্মিক চাহিদা মিটাইবার জন্য নিশ্চয় তিনি উহার সমান বা ততোধিক কার্যকরী ব্যবস্থা রাখিয়াছেন। অতঃপর, বলা হইয়াছে যে, আধ্যাত্মিক উৎকর্ষতার জন্য এক অপরিহার্য পূর্ব শর্ত হইতেছে আল্লাহ্র তওহীদের প্রতি বিশ্বাস এবং এই তওহীদ প্রতিষ্ঠার জন্যই পৃথিবীর আদি হইতে বিভিন্ন নবী-রসূলের আবির্ভাব ঘটিয়াছে। হযরত নূহ (আঃ) ও এই তওহীদের বিষয়ই শিক্ষা দিয়াছেন ও ইহার প্রচার করিয়াছেন। তাঁহার পরে বহু নবী-রসূলের আগমন হইয়াছে। তাঁহারা প্রত্যেকেই প্রচার করিয়াছেন যে, আল্লাহ্ এক, তাঁহার কোন শরীক নাই। অতঃপর, তাঁহাদের পরে আগত বহু ঐশী শিক্ষক ও একই বিষয়ে শিক্ষা প্রদান করিয়াছেন। কিন্তু যাহারা অন্ধকারের অনুসারী, তাহারা সব সময়ই এই সব নবী-রসূলের বিরোধিতা করিয়াছে এবং তাহাদেরকে নানাভাবে কষ্ট প্রদান করিয়াছে। সত্য এবং মিথ্যার এই মোকাবিলায় পরিণামে মো’মেনরাই সফলকাম হইয়াছে এবং যাহারা নবী-রসূলদের অস্বীকারকারী ছিল তাহারা পরাজিত ও হতাশ হইয়াছে। আল্লাহ্তা’লার নেককার বান্দারা তাঁহাদের প্রভুকে ভয় করে, তাহার নিদর্শনাবলীতে ঈমান আনে, আল্লাহ্র তওহীদের ব্যাপারে তাঁহারা দৃঢ়ভাবে বিশ্বাসী, তাঁহাদের সাধ্যমত তাঁহারা সৎ কাজ করে এবং এতদৃসত্বেও তাঁহারা ভীত থাকে যে, সম্ভবতঃ তাহারা তাহাদের দায়িত্ব ও কর্তব্য সঠিকভাবে পালন করে নাই। সৎ কাজ সম্পাদনে তাহারা একে অপরের সাথে প্রতিযোগিতা করে। অতঃপর, কাফেরদেরকে সতর্ক করিয়া বলা হইয়াছে যে, যদি তাহারা ঐশী-বাণীকে ক্রমাগত অস্বীকার করিতে থাকে তবে পরিণামে তাহারা ঐশী শাস্তিতে নিপতিত হইবে। কিন্তু এই সতর্কতা সত্বেও অবিশ্বাসীরা তাহাদের মন্দ কাজ হইতে বিরত হয় না, বরং পাপাচারে তাহারা আরো বেশী লিপ্ত হইয়া পড়ে। এমন অবস্থায় সত্য সত্যই একদিন ঐশী আযাবের সময় আসিয়া উপস্থিত হয়, তখন তাহারা মিনতি করিতে থাকে যে, অন্ততঃ তাহাদের সংশোধনের জন্য একবার হইলেও তাহাদিগকে শেষ সুযোগ দেওয়া হউক। কিন্তু তখন বিলম্ব হইয়া যায়,তাহাদের কৃত-কর্মের শেষ সীমায় তাহারা উপনীত হয়, তাই সেই আযাব তাহাদের ভোগ না করিয়া আর উপায় থাকে না। সেই অবস্থায় তাহারা উপলব্ধি করে যে, সারা জীবন ভোগ-বিলাস সত্বেও অল্প সময়ের ঐশী আযাব কতই না কষ্টকর! পরিশেষে, একটি গুরুত্বপূর্ণ আধ্যাত্মিক বিষয়ের অবতারণা করিয়া সুরাটি শেষ হইয়াছে। উহাতে বলা হইয়াছে যে, মানুষকে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে সৃষ্টি করা হয় নাই। মানব জীবনের একটি মহৎ উদ্দেশ্য রহিয়াছে। তাই ঐশী অনুশাসন, নবী-রসূলের মিশন, ইত্যাদি বিষয়ের সত্যতা সম্পর্কে মানুষের সন্দেহ পোষণ করা উচিত নয়। কেননা, একদিন তাহার প্রভুর সমীপে তাহাকে তাহার কৃত কর্মের জবাবদিহি করিতে হইবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
قَدۡ اَفۡلَحَ الۡمُؤۡمِنُوۡنَ ۙ﴿۲﴾
الَّذِیۡنَ ہُمۡ فِیۡ صَلَاتِہِمۡ خٰشِعُوۡنَ ۙ﴿۳﴾
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنِ اللَّغۡوِ مُعۡرِضُوۡنَ ﴿ۙ۴﴾
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِلزَّکٰوۃِ فٰعِلُوۡنَ ۙ﴿۵﴾
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِفُرُوۡجِہِمۡ حٰفِظُوۡنَ ۙ﴿۶﴾
اِلَّا عَلٰۤی اَزۡوَاجِہِمۡ اَوۡ مَا مَلَکَتۡ اَیۡمَانُہُمۡ فَاِنَّہُمۡ غَیۡرُ مَلُوۡمِیۡنَ ۚ﴿۷﴾
فَمَنِ ابۡتَغٰی وَرَآءَ ذٰلِکَ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡعٰدُوۡنَ ۚ﴿۸﴾
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ لِاَمٰنٰتِہِمۡ وَعَہۡدِہِمۡ رٰعُوۡنَ ۙ﴿۹﴾
وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَلٰی صَلَوٰتِہِمۡ یُحَافِظُوۡنَ ۘ﴿۱۰﴾