২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

وَاِذَا قِیۡلَ لَہُمُ اتَّبِعُوۡا مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ قَالُوۡا بَلۡ نَتَّبِعُ مَاۤ اَلۡفَیۡنَا عَلَیۡہِ اٰبَآءَنَا ؕ اَوَلَوۡ کَانَ اٰبَآؤُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ شَیۡئًا وَّلَا یَہۡتَدُوۡنَ ﴿۱۷۱﴾

১৭১
এবং যখন তাহাদিগকে বলা হয়, ‘আল্লাহ্‌ যাহা নাযেল করিয়াছেন, তোমরা উহার অনুসরণ কর’, তখন তাহারা বলে, ‘না বরং আমরা আমাদের পিতৃপুরুষগণকে১৯৫ যাহার উপর পাইয়াছি, উহারই অনুসরণ করিব। কী! যদিও তাহাদের পিতৃপুরুষগণ বুদ্ধিহীন ছিল এবং সঠিকপথে চলিত না, তথাপিও?
১৯৫। ইহা এক অদ্ভুত ব্যাপার যে, যদিও ধর্ম মানুষের অবিনশ্বর জীবনের সাথে গভীর সম্পর্ক রাখে, তথাপি মানুষ অন্ধের মত পূর্ববতীদের অনুসরণ করিতে থাকে। ইহা সত্যই আক্ষেপের ব্যাপার। সাংসারিক বিষয়াদি, যাহা কেবল মাত্র ইহ-জীবনের সুখ-সুবিধাতে সীমাবদ্ধ, আর তাহাও আংশিকভাবে, সেখানেও মানুষ অতি সযত্নে চিন্তা-ভাবনা করিয়া নিজের জন্য সঠিক পথ বাছিয়া লয়, অন্যকে বিচার-বিবেচনাহীনভাবে অন্ধের মত অনুসরণ করিতে চায় না।

وَمَثَلُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا کَمَثَلِ الَّذِیۡ یَنۡعِقُ بِمَا لَا یَسۡمَعُ اِلَّا دُعَآءً وَّنِدَآءً ؕ صُمٌّۢ بُکۡمٌ عُمۡیٌ فَہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ ﴿۱۷۲﴾

১৭২
এবং যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহাদের অবস্থা সেই ব্যক্তির অবস্থার অনুরূপ যে এমন কিছুকে ডাকে যাহা কেবল ধ্বনি এবং চীৎকার১৯৬ ব্যতীত আর কিছুই শুনে না। তাহারা বধির, মূক, অন্ধ; সুতরাং তাহারা বিবেক-বুদ্ধি খাটায় না।
১৯৬। হযরত রসূলে পাক (সাঃ) অবিশ্বাসীদের কাছে ঐশী-বাণী পৌঁছাইয়া ছিলেন। তিনি যখন তাহাদিগকে আহ্বান করিলেন, তখন অবিশ্বাসীরা তাঁহার আওয়াজ শুনিল বটে, কিন্তু ইহার মর্ম বুঝিতে পারিল না। তাহার কথাগুলি যেন বধিরের কর্ণে পড়িল। ফল এই দাঁড়াইল যে, তাহাদের আধ্যাত্মিক চেতনা বিকল হইয়া গেল এবং তাহারা পশুর মত এত নিম্নস্তরের জন্তুতে পরিণত হইল (৭ঃ১৮০; ২৫ঃ৪৫), যাহারা রাখালের আহ্বান-ধ্বনি তো শুনে, কিন্তু রাখাল কি বলিতেছে তাহা বুঝে না।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُلُوۡا مِنۡ طَیِّبٰتِ مَا رَزَقۡنٰکُمۡ وَاشۡکُرُوۡا لِلّٰہِ اِنۡ کُنۡتُمۡ اِیَّاہُ تَعۡبُدُوۡنَ ﴿۱۷۳﴾

১৭৩
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! তোমরা পবিত্র বস্তুসমূহ১৯৭ হইতে আহার কর, যাহা আমরা তোমাদিগকে দিয়াছি, এবং আল্লাহ্‌র শোক্‌রগুযারী কর, যদি তোমরা কেবল তাঁহারই ইবাদত করিয়া থাক।
১৯৭। ভাল, পবিত্র এবং পুষ্টিকর খাদ্য খাও—বাক্যটির তাৎপর্য হইল, মুসলমানকে এমন সব দ্রব্য ব্যবহার হইতে বিরত থাকিতে বলা হইতেছে, যাহা মানুষের শারীরিক, নৈতিক কিংবা আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের ক্ষতি সাধন করে, যদিও শরীয়াতে ইহার ব্যবহার নিষিদ্ধ নহে।

اِنَّمَا حَرَّمَ عَلَیۡکُمُ الۡمَیۡتَۃَ وَالدَّمَ وَلَحۡمَ الۡخِنۡزِیۡرِ وَمَاۤ اُہِلَّ بِہٖ لِغَیۡرِ اللّٰہِ ۚ فَمَنِ اضۡطُرَّ غَیۡرَ بَاغٍ وَّلَا عَادٍ فَلَاۤ اِثۡمَ عَلَیۡہِ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۱۷۴﴾

১৭৪
তিনি তোমাদের জন্য হারাম করিয়াছেন (স্বাভাবিক) মৃত জীব-জন্তু, রক্ত, শূকরের মাংস১৯৮ এবং যাহার উপর আল্লাহ্ ব্যতীত অন্যের নাম উচ্চারিত হইয়াছে। কিন্তু যে ব্যক্তি (প্রয়োজনে) বাধ্য হইয়াছে অথচ সে অবাধ্য ও সীমালঙ্ঘনকারী নহে, তাহা হইলে তাহার উপর কোন পাপ১৯৯ বর্তিবে না, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
১৯৮। শূকর, পশুটির নামই ইহাকে খাবার অনুপযুক্ত ঘোষণা করে। আরবী ‘খিনযীর’ শব্দটি দুইটি শব্দের মিলনে গঠিতঃ খিন্‌য-আরা। ‘খিন্‌য’ অর্থ অতি ঘৃণ্য, আর ‘আরা’ অর্থ ‘আমি দেখি’। ‘খিনযীর’-এর অর্থ দাঁড়ায় “আমি ইহাকে ঘৃণ্যকুৎসিত দেখি”। হিন্দী ভাষায় ইহাকে বলে, ‘শূয়ার’, যাহার অর্থও “আমি ইহাকে অতি ঘূণ্য দেখি”।…… হিন্দীতে এই জন্তুটিকে ‘বদ’ নামেও অভিহিত করা হয়। ‘বদ’ অর্থ নিকৃষ্ট অথবা দোষণীয়। সম্ভবতঃ ইহা মূল আরবী শব্দেরই অনুবাদ।
১৯৯। ‘ইস্‌ম’ অর্থ ‘আইন-বিরুদ্ধ কাজ’ অর্থাৎ পাপ; যাহা একজনকে শাস্তিযোগ্য করে। (আকরাব), যাহা মানুষের মনে (বিবেকে) খারাপ লাগে (মুফরাদত)। যে চারটি বস্তুর নাম এই আয়াতে উল্লেখিত হইয়াছে ইহারাই যে কেবল নিষিদ্ধ বস্তু, তাহা নহে। ইসলাম আরও অনেক বস্তুর ব্যবহার নিষিদ্ধ করিয়াছে। সেগুলিকে সাধারণতঃ দুই শ্রেণীতে ফেলা যায়ঃ (১) ‘হারাম’ বা অবৈধ (২) ‘মম্‌নু’ বা নিষিদ্ধ। এই আয়াতে কেবল ‘হারাম’ বা অবৈধ বস্তুগুলির উল্লেখ রহিয়াছে। নিষিদ্ধ জিনিষগুলির কথা মহানবী (সাঃ)-এর হাদীসে পাওয়া যায়। ‘হারাম’ বস্তুর ব্যবহার মানুষের নৈতিক উৎকর্ষ সাধনের পথে প্রত্যক্ষভাবে বিঘ্ন ঘটায়। কিন্তু ‘মম্‌নু’ বস্তুর ব্যবহার সেই পর্যায়ের না হইলেও উহা হারামের নিকট পর্যায়ের গুরুত্ব বহন করে, তবে উভয় প্রকারের বস্তুই নিষিদ্ধ বটে। এই আয়াতে হারাম বস্তুগুলির দুইটি হইল রক্ত ও মৃত জন্তুর মাংস ভক্ষণ। এই দুইটি বস্তু যে ক্ষতিকর তাহা প্রায় স্বতঃসিদ্ধ। স্বাস্থ্য-বিজ্ঞানীদের অধিকাংশ বিশেষজ্ঞের মতে এইগুলি ক্ষতিকর বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। শূকরের মাংস কেবল যে শারীরিক স্বাস্থ্যের পক্ষে ক্ষতিকর তাহাই নহে, বরং তাহা নৈতিক ও আধ্যাত্মিক স্বাস্থ্যের পক্ষেও ক্ষতিকর বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছে। শূকর আবর্জনা ও ময়লা ভক্ষণ করে এবং পুঁতি গন্ধময় নোংরা-পচা কাদায় থাকিতে ভালবাসে। বিশ্রী অভ্যাসে ইহা অভ্যস্ত এবং উহার মধ্যে যৌন-বিকৃতির বদ লক্ষণসমূহ বিদ্যমান আছে। শূকর-খোরদের ফিতাক্রিমি, গলগণ্ড ক্যানসার, ট্রিচিনা (Encysted Trichina) প্রভৃতি রোগ হইয়া থাকে। শূকর-মাংস খাইলে ট্রিচিনেসিস (Trichinosis) নামক রোগ হইয়া থাকে।

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَکۡتُمُوۡنَ مَاۤ اَنۡزَلَ اللّٰہُ مِنَ الۡکِتٰبِ وَیَشۡتَرُوۡنَ بِہٖ ثَمَنًا قَلِیۡلًا ۙ اُولٰٓئِکَ مَا یَاۡکُلُوۡنَ فِیۡ بُطُوۡنِہِمۡ اِلَّا النَّارَ وَلَا یُکَلِّمُہُمُ اللّٰہُ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ وَلَا یُزَکِّیۡہِمۡ ۚۖ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۱۷۵﴾

১৭৫
নিশ্চয় আল্লাহ্ কিতাব হইতে যাহা নাযেল করিয়াছেন, উহাকে যাহারা গোপন করে, এবং ইহার বিনিময়ে অল্প মূল্য গ্রহণ করে, ইহারাই নিজেদের উদরে শুধু অগ্নিই২০০ ভক্ষণ করে। কেয়ামতের দিন আল্লাহ্ তাহাদের সহিত কথা বলিবেন না এবং তাহাদিগকে পবিত্রও করিবেন না। বস্তুতঃ তাহাদের জন্য যন্ত্রণাদায়ক আযাব রহিয়াছে।
২০০। এই আয়াতের প্রথম বাক্যটির তাৎপর্য এই যে, আগুন যেমন পিপাসা মিটাইতে পারে না, বরং তাহা আরো বাড়াইয়া দেয়, তেমনি এই জগতের বস্তুগুলিও মানুষের মনে শান্তি, সন্তোষ ও তৃপ্তি সৃষ্টি করিতে পারে না, বরং বাসনা-কামনার লেলিহান শিখাই জ্বালাইয়া রাখে।

اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ اشۡتَرَوُا الضَّلٰلَۃَ بِالۡہُدٰی وَالۡعَذَابَ بِالۡمَغۡفِرَۃِ ۚ فَمَاۤ اَصۡبَرَہُمۡ عَلَی النَّارِ ﴿۱۷۶﴾

১৭৬
ইহারাই ঐ সকল লোক যাহারা হেদায়াতের বিনিময়ে পথভ্রষ্টতাকে এবং ক্ষমার বিনিময়ে আযাবকে ক্রয় করিয়াছে, দেখ! অগ্নির উপর তাহারা কতই না ধৈর্যশীল২০১।
২০১। এই কথাগুলির অর্থ, অবিশ্বাসীদের সহ্যশক্তি যেন এতই বেশী যে, নরকাগ্নির যন্ত্রণাও তাহারা সহ্য করিতে পারিবে। এই বাক্যটি ব্যাঙ্গোক্তি স্বরূপ বলা হইয়াছে।

ذٰلِکَ بِاَنَّ اللّٰہَ نَزَّلَ الۡکِتٰبَ بِالۡحَقِّ ؕ وَاِنَّ الَّذِیۡنَ اخۡتَلَفُوۡا فِی الۡکِتٰبِ لَفِیۡ شِقَاقٍۭ بَعِیۡدٍ ﴿۱۷۷﴾٪

১৭৭
ইহা এইজন্য হইবে যে, আল্লাহ্ সত্যসহ এই কিতাব নাযেল করিয়াছেন, এবং যাহারা এই কিতাব সম্বন্ধে মতভেদ করিয়াছে নিশ্চয় তাহারা ঘোর শত্রুতায় (লিপ্ত) আছে।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ২১

لَیۡسَ الۡبِرَّ اَنۡ تُوَلُّوۡا وُجُوۡہَکُمۡ قِبَلَ الۡمَشۡرِقِ وَالۡمَغۡرِبِ وَلٰکِنَّ الۡبِرَّ مَنۡ اٰمَنَ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ وَالۡمَلٰٓئِکَۃِ وَالۡکِتٰبِ وَالنَّبِیّٖنَ ۚ وَاٰتَی الۡمَالَ عَلٰی حُبِّہٖ ذَوِی الۡقُرۡبٰی وَالۡیَتٰمٰی وَالۡمَسٰکِیۡنَ وَابۡنَ السَّبِیۡلِ ۙ وَالسَّآئِلِیۡنَ وَفِی الرِّقَابِ ۚ وَاَقَامَ الصَّلٰوۃَ وَاٰتَی الزَّکٰوۃَ ۚ وَالۡمُوۡفُوۡنَ بِعَہۡدِہِمۡ اِذَا عٰہَدُوۡا ۚ وَالصّٰبِرِیۡنَ فِی الۡبَاۡسَآءِ وَالضَّرَّآءِ وَحِیۡنَ الۡبَاۡسِ ؕ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ صَدَقُوۡا ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُتَّقُوۡنَ ﴿۱۷۸﴾

১৭৮
ইহা পূণ্যকর্ম নহে যে, তোমরা পূর্ব এবং পশ্চিম দিকে নিজেদের মুখ ফিরাও, বরং প্রকৃত পূণ্যবান ঐ ব্যক্তি যে আল্লাহ্‌ এবং পরকাল এবং ফিরিশ্‌তাগণ এবং কিতাব সমূহ এবং নবীগণের উপর ঈমান আনে; এবং সে তাঁহারই প্রেমে২০২ আত্মীয়স্বজন, এতীম, মিসকীন, মুসাফির, সাহায্যপ্রার্থীগণের এবং বন্দী মুক্তির জন্য ধন-সম্পদ খরচ করে, এবং তাহার নামায কায়েম করে এবং যাকাত দেয় এবং নিজেদের অঙ্গীকার পূর্ণ করে যখন তাহারা কোন অঙ্গীকার করে, এবং দারিদ্রে২০২-ক এবং কষ্টে এবং যুদ্ধকালে ধৈর্যশীল থাকে, ইহারাই ঐ সকল লোক যাহারা নিজদিগকে সত্যবাদী প্রতিপন্ন করিয়াছে এবং ইহারাই প্রকৃত মুত্তাকী।২০৩
২০২। ‘আলা হুব্বিহি’ মানে ‘আল্লাহ্‌র প্রতি ভালবাসার খাতিরে; অর্থের প্রতি ভালবাসা থাকা সত্ত্বেও।
২০২-ক। ‘আল-বা’সা এবং’ আল-বা’স উভয় শব্দই ‘বাউসা’ এবং ‘বা’ইসা’ হইতে উৎপন্ন, যাহার অর্থ ‘সে যুদ্ধে শক্তিশালী ও সাহসী ছিল বা হইল’, সে অভাবে অথবা দুরবস্থায় ছিল কিংবা সে পতিত হইল। ‘আল বা’সা’ অর্থ লড়াইয়ে বা যুদ্ধে সাহস ও শক্তি; যুদ্ধ বা লড়াই;ভীতি;ক্ষতি ইত্যাদি। ‘আয্‌ যার্‌রা’ বিশেষভাবে ব্যক্তিগত দুর্ভোগ, দুঃখ-কষ্ট, রোগ-ভোগ ইত্যাদি বুঝায় এবং আল্-বা’সা হইল ধন-মাল ইত্যাদি সম্পর্কিত কষ্ট যেমন, অভাব ইত্যাদি (লেইন)।
২০৩। এই আয়াতে ইসলামী শিক্ষার সারমর্ম দেওয়া হইয়াছে। ইসলামের মূল বিশ্বাস ও পথ-নির্দেশ, যাহার উপর ভিত্তি করিয়া মানবের সকল কর্মকাণ্ড গঠিত হইবে এবং যাহার সত্যতা ও বিশুদ্ধতার উপর কর্মের ন্যায্যতা ও বিশুদ্ধতা নির্ভর করে, সেই সব মৌলিক বিষয়াদি, যেমন আল্লাহ্‌র প্রতি, আখেরাতের (পরলোকের) প্রতি, ফিরিশ্‌তাদের প্রতি, প্রেরিত-পুরুষগণের প্রতি ও প্রেরিত গ্রন্থাবলীর প্রতি বিশ্বাসের কথা সর্ব প্রথম ব্যক্ত করা হইয়াছে। তারপরে, মানুষের কর্মক্ষেত্রে প্রয়োগ-যোগ্য প্রয়োজনীয় কয়েকটি অধ্যাদেশ উল্লেখিত হইয়াছে।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا کُتِبَ عَلَیۡکُمُ الۡقِصَاصُ فِی الۡقَتۡلٰی ؕ اَلۡحُرُّ بِالۡحُرِّ وَالۡعَبۡدُ بِالۡعَبۡدِ وَالۡاُنۡثٰی بِالۡاُنۡثٰی ؕ فَمَنۡ عُفِیَ لَہٗ مِنۡ اَخِیۡہِ شَیۡءٌ فَاتِّبَاعٌۢ بِالۡمَعۡرُوۡفِ وَاَدَآءٌ اِلَیۡہِ بِاِحۡسَانٍ ؕ ذٰلِکَ تَخۡفِیۡفٌ مِّنۡ رَّبِّکُمۡ وَرَحۡمَۃٌ ؕ فَمَنِ اعۡتَدٰی بَعۡدَ ذٰلِکَ فَلَہٗ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۱۷۹﴾

১৭৯
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! নিহত ব্যক্তিগণ সম্বন্ধে তোমাদের উপর ‘কিসাস’ (সমান সমান প্রতিশোধ) গ্রহণ করা বিধিবদ্ধ হইল, স্বাধীন পুরুষদের পরিবর্তে স্বাধীন পুরুষ, দাসের পরিবর্তে দাস এবং নারীর পরিবর্তে নারী, কিন্তু যাহার জন্য তাহার নিহত ভ্রাতার পক্ষ হইতে (রক্ত-পণের) কিয়দংশ ক্ষমা করিয়া দেওয়া হয়, সেক্ষেত্রে (রক্ত-পণের বাকী অংশ উসুল করিবার জন্য) ন্যায়-সংগত নিয়মের অনুসরণ করিতে হইবে, এবং (হত্যাকারীর পক্ষ হইতে) তাহাকে (নিহত ব্যক্তির পক্ষকে) ন্যায্যভাবে (রক্ত-পণের বাকী অংশ) আদায় করিতে হইবে, ইহা হইতেছে তোমাদের প্রভুর পক্ষ হইতে (দণ্ডভার) লাঘব-ব্যবস্থা এবং রহমত, কিন্তু ইহার পর যে ব্যক্তি সীমালঙ্ঘন করিবে তাহার জন্য যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি২০৪ রহিয়াছে।
২০৪। এই আয়াতে সাধারণ আইনের একটি অত্যাবশ্যকীয় নীতি বিধৃত রহিয়াছে। তাহা এই যে, মানুষ সকলেই সমান। অতএব, কোনও প্রকার বৈষম্য ব্যতিরেকে প্রত্যেক দোষী ব্যক্তিকেই তাহার দোষের অনুপাতে শাস্তি দিতে হইবে। অবশ্য, যাহার বিরুদ্ধে দোষ করা হইয়াছে সে যদি ক্ষমা করে, কিংবা নিহত ব্যক্তির আত্মীয়স্বজন যদি ক্ষমা করে এবং ঐ রূপ ক্ষমা করা যদি অবস্থার প্রেক্ষিতে সমাজের জন্য শুভ ও মঙ্গল-জনক হইবে বলিয়া মনে করা হয়, কেবল তখনই দোষী ব্যক্তিকে ক্ষমা করা যাইতে পারে। ‘তোমাদের জন্য আইন করা হইল’ কথাগুলি দ্বারা বুঝা যায়, প্রতিশোধ-গ্রহণ বা প্রতিকার-বিধান করা বাধ্যতা-মূলক (ফরয)। অপরাধী ব্যক্তির আইনানুগ শাস্তিবিধান না করা ঐশী নির্দেশের পরিপন্থী। ইহা ঐশী-বিধানকে অমান্য করার শামিল। ইহা মনে করা ঠিক হইবে না যে, হত্যাকারীকে শাস্তি দেওয়ার দায়িত্ব আত্মীয়দের উপরই ন্যস্ত। কেননা, “তোমাদের উপর ন্যস্ত” (আলাইকুম) কথাটি হইতে স্পষ্ট বুঝা যায়, এই দায়িত্ব আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী কর্তৃপক্ষের উপর ন্যাস্ত। তবে, আত্মীয়কে অবশ্য ক্ষমা করার অধিকার দেওয়া হইয়াছে। একদিকে যেমন কর্তৃপক্ষ আইনানুযায়ী অপরাধীকে শাস্তিদানে বাধ্য এবং নিজ গুণে ক্ষমা করিতে অক্ষম, তেমনি অন্যদিকে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা নিজের হাতে আইন লইয়া নিজেরাই অপরাধীর শাস্তি দিতে পারেন না। শাস্তি-প্রদানের ক্ষেত্রে এই আয়াতে অপরাধীদের মধ্যে কোনই তারতম্য করে নাই। বাক্যটি সর্বসাধারণকে লক্ষ্য করিয়া ব্যাবহৃত হইয়াছে, সকল হত্যাকারীকেই এক পাল্লায় ওযন করা হইয়াছে। হত্যাকারীর অবস্থান, মর্যাদা কিংবা ধর্মকে বিবেচনায় আনা হয় নাই। জাতি, বর্ণ, ধর্ম এবং সামাজিক প্রতিপত্তি ও পদ মর্যাদা নির্বিশেষে হত্যাকারীকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হইবে। তবে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের অনুমোদন সাপেক্ষে নিহত ব্যক্তির উত্তরাধিকারীরা তাহাকে ক্ষমা করিতে পারেন। এই বিষয়ে বর্ণিত মহানবী (সাঃ)-এর হাদীসগুলি সুস্পষ্ট (ইবনে মাজাহ্ঃ মাবুদ্‌ দিয়াৎ)। রসূলে পাক (সাঃ)-এর সাহাবীগণ (রাঃ) এই বিষয়ে একমত যে, যুদ্ধহীন অবস্থায় একজন অমুসলিমকে বা অবিশ্বাসীকে হত্যা করিলে, হত্যাকারী মুসলমানকে মৃত্যুদণ্ড দিতে হইবে (তাবারী-৪৪ খণ্ড) । রসূলে করীম (সাঃ) শান্তির অবস্থায়, একজন অমুসলমানকে হত্যা করার জন্য, একজন মুসলমান হত্যাকারীর মৃত্যুদণ্ডের আদেশ স্বয়ং দিয়াছিলেন (দার কুৎনী)। “স্বাধীন ব্যক্তির জন্য স্বাধীন ব্যক্তি, কৃতদাসের জন্য কৃতদাস, স্ত্রীলোকের জন্য স্ত্রীলোক” এই কথাগুলি দ্বারা ইহা বুঝায় না যে, একজন কৃতদাসের হত্যার জন্য হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তিকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইবে না কিংবা একজন পুরুষকে হত্যার জন্য হত্যাকারিণী স্ত্রীলোককে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইবে না, ইত্যাদি। ব্যক্তির সামাজিক অবস্থান ও মর্যাদা কিংবা স্ত্রী-পুরুষ বিবেচনা, কোনও মতেই এই আইনের প্রয়োগকে ব্যাহত করিতে পারে না। তবে, “স্বাধীন ব্যক্তি স্বাধীন ব্যক্তির জন্য....... ” একটি বিশেষ ধরণের প্রচলিত উক্তি। এইরূপ অভিব্যক্তির আশ্রয় এই কারণে গ্রহণ করা হইয়াছে, যাহাতে আরবদের একটা সুপরিচিত সামাজিক রীতিকে স্মরণ করাইয়া দিয়া উহার মূলোৎপাটন করা লক্ষ্য হিসাবে নির্দিষ্ট হইয়া যায়। রীতিটি এই ছিল যে, হত্যাকারী এবং নিহত ব্যক্তিদের ব্যক্তিগত সামাজিক মর্যাদা, ইত্যাদি বিবেচনা করিয়া, শাস্তির কথা ভাবা হইত অর্থাৎ মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ করিয়া, সেই ভেদাভেদ অনুযায়ী অপরাধের পরিমাণেও ভেদাভেদ এবং তারতম্য করা হইত এবং একই অপরাধের জন্য, ভিন্ন জনের ক্ষেত্রে ভিন্ন-ভিন্ন পরিমাপে শাস্তি প্রয়োগ করা হইত। আরও একটি অন্যায় প্রথা এই ছিল যে, হত্যাকারী স্বাধীন ব্যক্তির বিনিময়ে তাহার কৃতদাসকে হত্যা করা হইত। এই আয়াতে প্রদত্ত নির্দেশ ঐসব কুপ্রথাকে চিরতরে বিলোপ করার জন্য প্রণয়ন করা হইয়াছে। বস্তুতঃ, প্রতিকারের নির্দেশটি একটি বাক্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ। এই বাক্যটি হইল, নিহতের পক্ষে ন্যায়-ভিত্তিক প্রতিশোধ গ্রহণ তোমাদের জন্য বাধ্যতামূলক কর্তব্য বলিয়া নির্ধারণ করা হইল, এই বাক্যটি স্বয়ং সম্পূর্ণ, পূর্ণ অর্থবহ স্বতন্ত্র বাক্য। পরবর্তী কথাটি- “স্বাধীন ব্যক্তির জন্য স্বাধীন ব্যক্তি, কৃতদাসের জন্য কৃতদাস এবং স্ত্রীলোকের জন্য স্ত্রীলোক” অতিরিক্ত সংযোজন, যাহা নির্ধারিত আইনের অংশ নহে। ইহা আরবদের পূর্বোল্লিখিত রীতিনীতির খণ্ডনের উদ্দেশ্যে এবং তাহার অযৌক্তিকতা প্রকাশের জন্য সংযোজিত হইয়াছে এবং তিনটি উদাহরণ দিয়া বুঝানো হইয়াছে, আইনকে কিভাবে প্রয়োগ করিতে হইবে। আরবী ব্যাকরণে এইরূপ প্রকাশ ভঙ্গীকে জুম্‌লা ইস্তিনাফিয়া বলা হয় এবং ইহা কৌশলগত ভাবে পূর্বোল্লিখিত বাক্যে নিহিত কোনও প্রশ্নের জওয়াব-স্বরূপ হইয়া থাকে এবং ইহার পূর্বে কোনও সংযোগ-অব্যয় বসে না। এইরূপ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট বাক্যটিতে যে প্রশ্নটির উত্তর দেওয়া হয়, তাহা প্রায়ই উহ্য থাকে, প্রকাশিত থাকেনা (মুখ্তাসার)। আঁ-হযরত (সাঃ) বলিয়াছেন” যে ব্যক্তি তাহার কৃতদাসকে হত্যা করিবে তাহাকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হইবে “(ইবনে মাজাহ্)। অন্যত্র তিনি বলিয়াছেন” “মুসলমান সকলের রক্তই এক প্রকারের, প্রতিশোধ গ্রহণ আইনে ইহাতে তারতম্য করা চলিবে না” (নিসাই)।

وَلَکُمۡ فِی الۡقِصَاصِ حَیٰوۃٌ یّٰۤاُولِی الۡاَلۡبَابِ لَعَلَّکُمۡ تَتَّقُوۡنَ ﴿۱۸۰﴾

১৮০
হে বিচার বুদ্ধি-সম্পন্ন ব্যক্তিগণ! তোমাদের জন্য ‘কিসাস’ গ্রহণের বিধানের মধ্যে জীবন-ব্যবস্থা রহিয়াছে যেন তোমরা তাক্‌ওয়া২০৪-ক অবলম্বন করিতে পার।
২০৪-ক। ইসলামে প্রতিশোধ গ্রহণের আইন হত্যাকার্য বন্ধ করার একটি কার্যকরী উপায়। জীবনের নিরাপত্তার জন্য ইহা অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। মানুষের জীবনকে নিয়া যে ব্যক্তি ছিনিমিনি খেলে, সে মানব-সমাজে বসবাস করার যোগ্যতা ও অধিকার হারাইয়া ফেলে। হত্যাকারীকে ক্ষমা করা কিংবা হত্যাকারীর শাস্তি রহিত করা বা কম করা একমাত্র তখনই সম্ভবপর, যখন অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে ইহা নির্ণিত হয় যে, ক্ষমা করিলে বা কম শাস্তি দিলে সংশ্লিষ্ট সকলের পক্ষেই তাহা সুফল বহন করিবে (৪২ঃ৪১)। এইরূপে, ইসলাম একদিকে অপরাধ দমনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা নিয়াছে, অপরদিকে পরোপকার ও করুণার মহৎ গুণাবলী প্রদর্শনের দরজাও খোলা রাখিয়াছে। মৃত্যুদণ্ড রহিত করার অবিরাম ও সুদীর্ঘ প্রচেষ্টা সত্বেও, আজিও মৃতু্যদণ্ডদানের বিধান বিশ্বের অধিকাংশ দেশে বিভিন্নরূপে প্রচলিত থাকায় ইহাই প্রমাণিত হয় যে, ইসলামের এই অধ্যাদেশটির মধ্যে প্রজ্ঞা ও যুক্তি রহিয়াছে। মৃত্যুদণ্ড রহিত করণের অত্যুৎসাহী প্রবক্তারা এখন পর্যন্ত ইহার বিকল্প ব্যবস্থা হিসাবে কিছু আবিস্কার করিতে পারেন নাই। তাহারা এই কথা বলিতে নিজেরাই বাধ্য হইয়াছেন, “দীর্ঘকালীন কারাদণ্ড উপযুক্ত বিকল্প তো নয়ই, বরং আরো ভয়াবহ” (ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট ইন দি টুয়েনটিয়েথ সেঞ্চুরী, প্রণেতা ঈ, রয় কালভার্ট, জি .পি, পুটন্যাম, লণ্ডন ১৯৩০)।