২

البقرة

সূরা আল্ বাকারা

Al-Baqarah

মাদানী ২৮৭ আয়াত ৪০ রুকু পারা ১–৩

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৮৭ আয়াত এবং ৪০ রুকু আছে।

وَلَنۡ تَرۡضٰی عَنۡکَ الۡیَہُوۡدُ وَلَا النَّصٰرٰی حَتّٰی تَتَّبِعَ مِلَّتَہُمۡ ؕ قُلۡ اِنَّ ہُدَی اللّٰہِ ہُوَ الۡہُدٰی ؕ وَلَئِنِ اتَّبَعۡتَ اَہۡوَآءَہُمۡ بَعۡدَ الَّذِیۡ جَآءَکَ مِنَ الۡعِلۡمِ ۙ مَا لَکَ مِنَ اللّٰہِ مِنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ﴿۱۲۱﴾ؔ

১২১
এবং ইহুদীগণ কখনও তোমার প্রতি সন্তুষ্ট হইবে না এবং খৃষ্টানগণও না, যতক্ষণ পর্যন্ত না তুমি তাহাদের ধর্মের অনুসরণ করিবে। তুমি বল, ‘নিশ্চয় আল্লাহ্‌র হেদায়াতই প্রকৃত হেদায়াত।’ এবং তোমার নিকট যে জ্ঞান আসিয়াছে উহার পরও যদি তুমি তাহাদের কুপ্রবৃত্তি সমূহের অনুসরণ কর তাহা হইলে আল্লাহ্‌র পক্ষ হইতে তোমার জন্য না কোন বন্ধু হইবে এবং না কোন সাহায্যকারী।

اَلَّذِیۡنَ اٰتَیۡنٰہُمُ الۡکِتٰبَ یَتۡلُوۡنَہٗ حَقَّ تِلَاوَتِہٖ ؕ اُولٰٓئِکَ یُؤۡمِنُوۡنَ بِہٖ ؕ وَمَنۡ یَّکۡفُرۡ بِہٖ فَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡخٰسِرُوۡنَ ﴿۱۲۲﴾٪

১২২
যাহাদিগকে আমরা কিতাব (আল্ কুরআন) দান করিয়াছি, তাহারা যথাযথ ভাবে উহা আবৃত্তি ও অনুসরণ১৪২ করে, তাহারাই ইহার উপর প্রকৃত ঈমান রাখে। এবং যাহারা ইহাকে অস্বীকার করে তাহারাই ক্ষতিগ্রস্ত হইবে।
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ১৪
১৪২। এই আয়াতের প্রথম বাক্যটি মুসলমানদের প্রতি আরোপিত হইয়াছে, ইহুদী বা খৃষ্টানদের প্রতি নহে। কেননা, কুরআনের সত্যিকার অনুসারীরা মুসলমানই; ইহুদী বা খৃষ্টানরাতো কুরআনের অনুসারী হওয়া দূরে থাকুক, তাহারা ইহাকে জাল ও মিথ্যা কিতাব বলিয়া প্রত্যাখ্যান করে (কাতাদা)। ‘ইয়াত্‌লূনা’ এর এই অর্থ, ইবনে আব্বাস, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আতা এবং ইকরিমা কর্তৃক সমর্থিত।

یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اذۡکُرُوۡا نِعۡمَتِیَ الَّتِیۡۤ اَنۡعَمۡتُ عَلَیۡکُمۡ وَاَنِّیۡ فَضَّلۡتُکُمۡ عَلَی الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۱۲۳﴾

১২৩
হে বনী ইসরাঈল! তোমরা আমার সেই নেয়ামতকে স্মরণ কর যে নেয়ামত আমি তোমাদিগকে দান করিয়াছিলাম, এবং আমি (তৎকালীন) সকল বিশ্ববাসীর উপর তোমাদিগকে শ্রেষ্ঠত্ব দান করিয়াছিলাম।

وَاتَّقُوۡا یَوۡمًا لَّا تَجۡزِیۡ نَفۡسٌ عَنۡ نَّفۡسٍ شَیۡئًا وَّلَا یُقۡبَلُ مِنۡہَا عَدۡلٌ وَّلَا تَنۡفَعُہَا شَفَاعَۃٌ وَّلَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ﴿۱۲۴﴾

১২৪
এবং সেই দিনকে ভয় কর যখন কোন আত্মার বিনিময়ে অন্য কোন আত্মা কাজে আসিবে না, এবং তাহার নিকট হইতে কোন মুক্তিপণ কবুল করা হইবে না এবং কোন শাফায়াত তাহার কোন উপকার সাধন করিবে না এবং তাহাদের কোন সাহায্যও করা হইবে না।

وَاِذِ ابۡتَلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ رَبُّہٗ بِکَلِمٰتٍ فَاَتَمَّہُنَّ ؕ قَالَ اِنِّیۡ جَاعِلُکَ لِلنَّاسِ اِمَامًا ؕ قَالَ وَمِنۡ ذُرِّیَّتِیۡ ؕ قَالَ لَا یَنَالُ عَہۡدِی الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۱۲۵﴾

১২৫
এবং (স্মরণ কর) যখন ইব্‌রাহীমকে তাহার প্রভু কতিপয় আদেশবাণী১৪২-ক দ্বারা পরীক্ষা১৪২-খ করিয়াছিলেন এবং সে ঐগুলি পূর্ণ করিয়াছিল, তিনি বলিলেন, ‘আমি নিশ্চয় তোমাকে মানব জাতির জন্য ইমাম১৪৩ নিযুক্ত করিতে চলিয়াছি’ সে বলিল, ‘আমার বংশধরগণের মধ্য হইতেও?’ তিনি বলিলেন, ‘আমার প্রতিশ্রুতি জালেমদের উপর বর্তিবে না।’
১৪২-ক। ‘কলেমাত্‌’ শব্দটি ‘কলেমা’ শব্দের বহুবচন। কলেমা মানে আদেশ (মুফ্‌রাদাত)।
১৪২-খ। ‘ইবতিলা’ এর মাঝে দুইটি অর্থ নিহিত আছেঃ (১) একটি বস্তুর অবস্থা জানা এবং উহার মধ্যে যাহা অজানা তাহা জানিয়া লওয়া, (২) বস্তুটির বা বিষয়টির ভাল বা মন্দ দিক প্রকাশ করিয়া দেওয়া (লেইন)।
১৪৩। ইমাম অর্থ যাহাকে অনুসরণ করা হয়, তাহা মানুষই হউক বা পুস্তকই হউক (মুফ্‌রাদাত)।

وَاِذۡ جَعَلۡنَا الۡبَیۡتَ مَثَابَۃً لِّلنَّاسِ وَاَمۡنًا ؕ وَاتَّخِذُوۡا مِنۡ مَّقَامِ اِبۡرٰہٖمَ مُصَلًّی ؕ وَعَہِدۡنَاۤ اِلٰۤی اِبۡرٰہٖمَ وَاِسۡمٰعِیۡلَ اَنۡ طَہِّرَا بَیۡتِیَ لِلطَّآئِفِیۡنَ وَالۡعٰکِفِیۡنَ وَالرُّکَّعِ السُّجُوۡدِ ﴿۱۲۶﴾

১২৬
এবং (স্মরণ কর ঐ সময়কে) যখন আমরা এই গৃহকে (কা’বাকে) মানবজাতির জন্য পুনঃপুনঃ মিলন কেন্দ্র১৪৪ এবং নিরাপদ১৪৫ স্থান করিয়াছিলাম এবং (বলিয়াছিলাম) ‘তোমরা মুকামে ইব্‌রাহীমকে (ইব্‌রাহীমের দাঁড়াইবার স্থানকে) নামাযের স্থান রূপে গ্রহণ কর এবং আমরা ইব্‌রাহীম এবং ইসমাঈলকে তাকীদ করিয়াছিলাম, ‘তোমরা উভয়েই আমার গৃহকে তাওয়াফকারী (প্রদক্ষিণকারী) এবং এ’তেকাফকারী এবং রুকূকারী এবং সিজদাকারীগণের জন্য পবিত্র রাখিও।’
১৪৪। মাসাবা এমন স্থানকে বুঝায়, যেখানে যাওয়া পুরস্কারযোগ্য পূণ্যের কাজ। মানুষের সমাগম-স্থল (মুফ্‌রাদাত)। কিছু কিছু হাদীস অনুযায়ী কা’বা গৃহ প্রথমে আদম কর্তৃক নির্মিত হইয়াছিল। কুরআনেও এইরূপই ইশারা পাওয়া যায় (৩ঃ৯৭)। ইহা আদমের বংশধরদের জন্য কিছু কাল পর্যন্ত উপাসনা-কেন্দ্র হিসাবে গণ্য ছিল। সময়ের ব্যবধানে তাহারা নানাভাবে, নানাদিকে, নানা কারণে পৃথক হইয়া পড়িল এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ে বিভক্ত হইয়া বিভিন্ন উপাসনালয় বানাইয়া লইল। ইবরাহীম (আঃ) কা’বাগৃহের পুনর্নির্মাণ করিলেন এবং ইহা তাঁহার পুত্র ইসমাঈল ও তাঁহার বংশের উপাসনাকেন্দ্র হইয়া রহিল। কিন্তু বহুদিন অতিবাহিত হওয়ার পর, এই পবিত্র গৃহ ক্রমে ক্রমে মূর্তিপূজার আখ্‌ড়াতে পরিণত হইয়া গেল। মূর্তির সংখ্যা বাড়িতে বাড়িতে শেষ পর্যন্ত মহানবী (সাঃ)-এর সময়ে তিনশত ষাটটিতে পৌঁছিয়াছিল, যেন বৎসরের প্রতিটি দিনের জন্য এক একটি মূর্তির পূজা হইতে পারে। যাহা হউক, রসূলে করীম (সাঃ)-এর বিশ্বনবী রূপে আগমনের পরে আবার ইহাকে বিশ্বের সকল জাতির উপাসনালয়ে পরিণত করা হইয়াছে। আদম (আঃ)-এর পরে যাহারা পৃথক হইয়া পড়িয়াছিল, তাহাদিগকে একই পৈতৃক কেন্দ্রের দিকে পুনরাকর্ষণ করতঃ মানবতার এক বিরাট ও মহান বিশ্ব-ভ্রাতৃত্ব গঠনের জন্যই বিশ্বনবীকে প্রেরণ করা হইয়াছে।
১৪৫। ‘কা’বা’ এবং উহারই বদৌলত মক্কা, এই দুইটি স্থানকে অর্থাৎ সারা মক্কা শহরটিকে শান্তি ও নিরাপত্তার স্থান বলিয়া ঘোষণা করা হইয়াছে। ইতিহাসের ঊষালগ্ন হইতে আজ পর্যন্ত কত বড় বড় সাম্রাজ্যের উত্থান-পতন হইয়াছে, কত বড় বড় শহর-বন্দর-জনপদ ধূলিসাৎ হইয়াছে, কিন্তু মক্কার শান্তি কখনও তেমন ব্যাহত হয় নাই। অন্যান্য ধর্মের ধর্মকেন্দ্র গুলি এইরূপ শান্তি ও নিরাপত্তার দাবী কখনও করে নাই এবং কার্যতঃ এইরূপ শান্তি-নিরাপত্তা কখনও ভোগ করে নাই। অথচ মক্কা আদিকাল হইতে আজ পর্যন্ত শান্তি-নিরাপত্তার মধ্যেই কাল কাটাইয়াছে। বিদেশী কোন বিজয়ী এই শহরে ঢুকে নাই, ইহা সর্বদাই সেই সব লোকের হাতেই রহিয়াছে, যাহারা ইহাকে শ্রদ্ধার সহিত ভাল বাসিয়াছে।

وَاِذۡ قَالَ اِبۡرٰہٖمُ رَبِّ اجۡعَلۡ ہٰذَا بَلَدًا اٰمِنًا وَّارۡزُقۡ اَہۡلَہٗ مِنَ الثَّمَرٰتِ مَنۡ اٰمَنَ مِنۡہُمۡ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ؕ قَالَ وَمَنۡ کَفَرَ فَاُمَتِّعُہٗ قَلِیۡلًا ثُمَّ اَضۡطَرُّہٗۤ اِلٰی عَذَابِ النَّارِ ؕ وَبِئۡسَ الۡمَصِیۡرُ ﴿۱۲۷﴾

১২৭
এবং (স্মরণ কর) যখন ইব্‌রাহীম বলিয়াছিল, ‘হে আমার প্রভু! ইহাকে এক নিরাপদ শহর করিও ইহার বাসিন্দাগণের মধ্যে যাহারা আল্লাহ্‌র এবং পরকালের উপর ঈমান রাখিবে তাহাদিগকে ফল-ফলাদির রিয্‌ক দান করিও।’ তিনি বলিলেন, ‘এবং যে অস্বীকার করিবে তাহাকেও আমি কিছুকাল উপভোগ করিতে দিব, অতঃপর আমি তাহাকে আগুনের আযাবের দিকে যাইতে বাধ্য করিব এবং ইহা কত মন্দ গন্তব্য-স্থান!’

وَاِذۡ یَرۡفَعُ اِبۡرٰہٖمُ الۡقَوَاعِدَ مِنَ الۡبَیۡتِ وَاِسۡمٰعِیۡلُ ؕ رَبَّنَا تَقَبَّلۡ مِنَّا ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ السَّمِیۡعُ الۡعَلِیۡمُ ﴿۱۲۸﴾

১২৮
এবং (স্মরণ কর) যখন ইব্‌রাহীম ও ইসমাঈল এই গৃহের ভিত্তি উঠাইতেছিল১৪৬ (এবং দোয়া করিতেছিল) ‘হে আমাদের প্রভু! আমাদের নিকট হইতে (এই সেবা) গ্রহণ কর, নিশ্চয় তুমিই সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী;
১৪৬। ইব্‌রাহীম (আঃ) কা’বার প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন না, পুনর্নির্মাতা ছিলেন; এই বিষয়ে বহু আলোচনা হইয়াছে। কেহ কেহ মনে করেন ইব্‌রাহীম (আঃ) কা’বা গৃহের নির্মাতা, অন্যেরা মনে করেন আদম সর্বপ্রথম কা’বা গৃহ নির্মাণ করিয়াছিলেন। কুরআন (৩ঃ৯৭) এবং সহীহ্ হাদীস এই অভিমতই ব্যক্ত করে যে, ইব্‌রাহীম (আঃ) এই স্থানে গৃহ উঠাইবার পূর্বেও এখানে গৃহাকারের একটি কাঠামো মওজুদ ছিল এবং গৃহটি ধ্বংসপ্রাপ্ত অবস্থায় কেবল চিহ্নস্বরূপ বিদ্যমান ছিল। ‘আল-কাওয়াইদ’ শব্দটি দ্বারা বুঝা যায় গৃহের ভিত্তি সেখানে পূর্বে হইতেই ছিল, যাহাকে ইব্‌রাহীম (আঃ) ও ইসমাঈল (আঃ) উঁচু করিয়া গৃহাকারে উঠাইলেন। তদুপরি, ইব্‌রাহীম (আঃ) যখন শিশু ইসমাঈল ও তাঁহার মাতাকে মক্কায় ছাড়িয়া বিদায় হইতেছিলেন, তখন তিনি দোয়া করিয়াছিলেন, ‘হে আমার প্রভু! আমি আমার বংশের একাংশকে তোমার পবিত্র গৃহের নিকটে অকৃষিযোগ্য উপত্যকায় ছাড়িয়া গেলাম’(১৪ঃ৩৮)। ইহা হইতে বুঝা যায়, পবিত্র গৃহটি ঐ সময়ে সেখানে কোন না কোন অবস্থায় ছিল, যাহা কিছুদিন পরে ইব্‌রাহীম (আঃ) সংস্কার করিয়াছিলেন। হাদীস এই কথা সমর্থন করে (বুখারী)। ঐতিহাসিক দলিলপত্রও এই অভিমতই প্রকাশ করে যে, কা’বা অতি প্রাচীন কালের গৃহ। স্বনামধন্য ঐতিহাসিকগণ, যাহাদের মধ্যে ইসলামের বৈরীগণও রহিয়াছেন, বলিয়াছেন যে, কা’বা অতি পুরাতন স্থান, যাহাকে স্মরণাতীত কাল হইতে পবিত্র মনে করা হইয়া আসা হইতেছে। “ডায়োডোরাস সিকুলাস, সিসিলি (খৃঃপূঃ ৬০) হেজায অঞ্চলের কথা উল্লেখ করিতে গিয়া বলিয়াছিলেন, স্থানটি অধিবাসীদের নিকট পবিত্র ও সম্মানীয়। তিনি আরো বলেন, সেখানে শক্ত পাথরের তৈরী একটি বেদী আছে, যাহা অতি প্রাচীন কালের। সেখানে চতুর্দিকের লোক আসিয়া সমবেত হইয়া থাকে (সঃ এম. ওল্ডফাদার, লণ্ডন, কর্তৃক অনূদিত, ১৯৩৫, বুক অধ্যায়, ৪২, খণ্ড ২য় পৃঃ ২১১-২১৩)। এই কথাগুলি মক্কার কা’বা গৃহ ছাড়া অন্য কিছুর উপর প্রযোজ্য হইতে পারেনা। কেননা আরবদেশের এমন দ্বিতীয় একটি স্থানও নাই যাহা সারা আরব বাসীর সার্বজনীন তীর্থস্থান ছিল এবং সকলের ভক্তি-শ্রদ্ধার ও আকর্ষণের মিলন-কেন্দ্র ছিল। লোক-কাহিনীও ইহাই সাব্যস্ত করে যে, কা’বা স্মরণাতীত কাল হইতে সারা আরবের তীর্থস্থান রূপে পরিগণিত হইয়া আসিয়াছে।’ (ইংরেজী তফসীরের বৃহদাকার সংস্করণ দেখুন- পৃঃ ১৮০-১৮২)।

رَبَّنَا وَاجۡعَلۡنَا مُسۡلِمَیۡنِ لَکَ وَمِنۡ ذُرِّیَّتِنَاۤ اُمَّۃً مُّسۡلِمَۃً لَّکَ ۪ وَاَرِنَا مَنَاسِکَنَا وَتُبۡ عَلَیۡنَا ۚ اِنَّکَ اَنۡتَ التَّوَّابُ الرَّحِیۡمُ ﴿۱۲۹﴾

১২৯
হে আমাদের প্রভু! তুমি আমাদের উভয়কে তোমার জন্য আত্মসমর্পণকারী কর এবং আমাদের বংশধরগণের মধ্য হইতেও তোমার এক আত্মসমর্পণকারী উম্মত সৃষ্টি কর, এবং তুমি আমাদিগকে আমাদের ইবাদতের নিয়ম পদ্ধতি প্রদর্শন কর; এবং আমাদের প্রতি সদয় দৃষ্টিপাত কর, কারণ তুমিই পুনঃপুনঃ সদয় দৃষ্টিপাতকারী, পরম দয়াময়।

رَبَّنَا وَابۡعَثۡ فِیۡہِمۡ رَسُوۡلًا مِّنۡہُمۡ یَتۡلُوۡا عَلَیۡہِمۡ اٰیٰتِکَ وَیُعَلِّمُہُمُ الۡکِتٰبَ وَالۡحِکۡمَۃَ وَیُزَکِّیۡہِمۡ ؕ اِنَّکَ اَنۡتَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۱۳۰﴾٪

১৩০
হে আমাদের প্রভু! তুমি তাহাদের মধ্য হইতে তাহাদের জন্য এক রসূল আবির্ভূত কর, যে তাহাদের নিকট তোমার আয়াতসমূহ আবৃত্তি করিবে এবং তাহাদিগকে পূর্ণ  কিতাব ও হিক্‌মত শিক্ষা দিবে এবং তাহাদিগকে পরিশুদ্ধ করিবে; নিশ্চয় তুমিই মহাপরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়১৪৭।’
সূরা আল্ বাকারা - রুকু ১৫
১৪৭। এই আয়াতটি সমস্ত সূরাটির বিষয়বস্তুর সারাংশ। অত্র আয়াতে উল্লেখিত বিষয়গুলি ক্রমানুসারে এই দীর্ঘ সূরাটিতে পর্যালোচনা করা হইয়াছে। অর্থাৎ প্রথমে আসিয়াছে নিদর্শনাবলী, তৎপর গ্রন্থ, তৎপর শরীয়াতের হিকমত, তৎপর জাতীয় উন্নতির পন্থাসমূহ (সূরার ভূমিকা দেখুন)। এখানে লক্ষ্য করা যাইতে পারে যে, কুরআনে ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর দুইটি প্রার্থনার উল্লেখ আছে। একটি ইস্‌হাকের বংশধরদের জন্য প্রার্থনা, অপরটি ইসমাঈলের বংশধরদের জন্য প্রার্থনা। প্রথম প্রার্থনাটি বর্ণিত হইয়াছে ২ঃ১২৫ আয়াতে এবং দ্বিতীয় প্রার্থনাটি বর্ণিত হইয়াছে আলোচ্য আয়াতে। ইস্‌হাকের বংশধরদের জন্য প্রার্থনাকালে, তিনি ঐ বংশে ইমাম বা সংস্কারক পাঠাইবার কথা বলিয়াছিলেন, কিন্তু তাঁহাদের কাজকর্ম বা মর্যাদা সম্বন্ধে কিছুই উল্লেখ করে নাই। তাহাতে বুঝা যায় ইস্‌হাক-বংশে সাধারণভাবে ধর্ম-সংস্কারকগণ আগমন করিবেন। কিন্তু এই আয়াতে আমরা দেখিতে পাই তিনি আল্লাহ্‌র কাছে প্রার্থনা করিয়াছিলেন, তাঁহার বংশধরগণের মধ্যে এক মহানবী প্রেরণের জন্য। ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর গৃহ হইতে উদ্ভূত দুইটি শাখার এই বাস্তব চিত্র, এই পার্থক্যের মধ্যেই নিহিত রহিয়াছে। ১২৫ নং আয়াত—১৩০ আয়াতে ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর দুইটি পৃথক প্রার্থনার উল্লেখ করিয়া সূরাটি ইশারায় জানাইয়া দিতে চায় যে, ইব্‌রাহীম (আঃ) কেবল ইস্‌হাকের বংশধরদের উন্নতির জন্যই প্রার্থনা করেন নাই; বরং তাঁহার প্রথম পুত্র ইস্‌মাঈলের বংশের উন্নতির জন্যও দোয়া করিয়াছিলেন। ইস্‌হাকের বংশধরেরা তাহাদের অসৎ কর্মের পরিণতিতে নবুওয়াত প্রাপ্তি হইতে বঞ্চিত হইয়া গেল। অতএব, এই আয়াতে প্রার্থিত ও প্রতিশ্রুত নবীর উত্থান ইব্‌রাহীম (আঃ)-এর বংশের অপর শাখা ইসমাঈলের বংশধর হইতে হওয়া ছাড়া কোন পথ নাই। এই প্রতিশ্রুত নবী যে ইস্‌মাঈলীয় হইবেন, উহার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণের জন্য কুরআন অতিশয় যুক্তিযুক্ত ভাবে, ইব্‌রাহীম (আঃ) ও তাঁহার জ্যেষ্ঠ পুত্র ইসমাঈল (আঃ) কর্তৃক কাবা-গৃহ নির্মাণ ও ইব্‌রাহীম (আঃ) কর্তৃক জ্যেষ্ঠপুত্রের বংশাবলীর উন্নতির জন্য প্রার্থনা, এই দুইটি বিষয় সাথে সাথেই উল্লেখ করিয়াছে। এই স্বাভাবিক সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সমালোচক খৃষ্টানেরা দুইটি প্রশ্ন তুলে (১) ইসমাঈল সম্বন্ধে এই ধরণের কোন প্রতিশ্রুতি আল্লাহ্‌তা’লা ইব্‌রাহীমকে দিয়াছিলেন বলিয়া বাইবেলে উল্লেখ নাই, (২) আল্লাহ্ ইব্‌রাহীম (আঃ)-কে প্রতিশ্রুতি দিয়া থাকিলেও, ইসলামের নবী যে ইসমাঈলের বংশধর উহার কোন প্রমাণ নাই। প্রথম আপত্তির উত্তর এই যে, যদি ইসমাঈল সম্বন্ধে কোন ভবিষ্যদ্বাণী বা প্রতিশ্রুতি বাইবেলে লিপিবদ্ধ নাও থাকে, তাহা দ্বারা এই কথা নিশ্চয় বুঝায় না যে, এইরূপ ভবিষ্যদ্বাণী মোটেই করা হয় নাই। তাহাছাড়া, যদি বাইবেলের সাক্ষ্য দ্বারা ইস্‌হাক ও তাঁহার বংশধর সম্বন্ধীয় প্রতিশ্রুতি সত্য বলিয়া স্বীকৃতি পায়, তাহা হইলে কুরআনের সাক্ষ্য দ্বারা ইসমাঈল ও তাঁহার বংশধর সম্বন্ধীয় প্রতিশ্রুতি সত্য বলিয়া স্বীকৃতি পাইবে না কেন? কিন্তু আসলে, বাইবেল ইসমাঈল ও তাঁহার বংশধরকে ভুলে নাই। ইহাতে সুনিশ্চিত ভাবে ইসমাঈল ও তাঁহার বংশাবলীর উন্নতির কথা ঠিক সেইভাবে বলা হইয়াছে যেইভাবে ইস্‌হাক ও তাঁহার বংশাবলীর উন্নতির কথা বলা হইয়াছে (আদি পুস্তক- ১৬ঃ১০-১২; ১৭; ৬-১০; ১৭ঃ১৮-২০)। প্রকৃত সত্য ইহাই যে, ইসমাঈল সম্বন্ধে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল এবং ইস্‌হাক সম্বন্ধে যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল, উভয় প্রতিশ্রুতিই মূলতঃ একই ধরণের, পার্থক্য নগণ্য। উভয়েই আল্লাহ্‌র আশীর্বাদপুষ্ট হইবেন; উভয়ে ফলপ্রসূ হইবেন; উভয়েরই বংশবৃদ্ধি বিরাটাকারে হইবে, উভয়েই বিরাট জাতিতে পরিণত হইবেন এবং উভয়ের বংশধরের মধ্যে রাজত্ব ও রাজ্য লাভ ঘটিবে। সুতরাং উভয় ভ্রাতা সম্পর্কে প্রদত্ত প্রতিশ্রুতির মাঝে যেহেতু মৌলিক কোন পার্থক্য নাই, অতএব ইস্‌হাকের বংশ যে সব পুরস্কারে ভূষিত হইবে, ইসমাঈলের বংশও সেইসব পুরস্কার লাভ করিবে, ইহা স্বীকার করিতেই হইবে। আর এই সত্য খ্যাতনামা জ্ঞানী খৃষ্টানগণও স্বীকার করিয়াছেন (দি স্কফিল্ড রেফারেন্স বাইবেল, পৃঃ ২৫)। দ্বিতীয় আপত্তি, মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যে ইসমাঈলের বংশধর এই কথার প্রমাণ নাই। এই আপত্তিও অবান্তর। কারণঃ- (১) যে কুরাইশ বংশে রসূলে করীম (সাঃ) জন্ম গ্রহণ করিয়াছিলেন তাহা পুরাকাল হইতেই ইসমাঈলের বংশধর বলিয়া দাবী করিয়া আসিতেছিল এবং সমগ্র আরবের লোক ইহা স্বীকার করিয়া আসিতেছিল। (২) কুরাইশ অথবা অন্যান্য গোত্র, যাহারা নিজেদেরকে ইসমাঈলের বংশধর বলিয়া দাবী করিত, তাহাদের এই দাবী মিথ্যা হইয়া থাকিলে, যাহারা সত্যিকার ইসমাঈল বংশের ছিল, তাহারা নিশ্চয় আপত্তি জানাইত। এমনকি, বংশ-ব্যাপারে বর্ণচূরি, আরবদেশে সে সময় খুন-খারাবীর কারণ হইয়া দাঁড়াইত; কিন্তু এ বিষয়ে কোন আপত্তি ও ঝগড়া-বিবাদ উপস্থিত হয় নাই। (৩) আদি পুস্তকের ১৭ঃ২০ শ্লোকে আল্লাহ্‌ প্রতিশ্রুতি দিয়াছিলেন যে, তিনি ইসমাঈলকে বহু আশীর্বাদ দান করিবেন, তাহার বংশ ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি করিবেন, তাহাকে বিরাট জাতিতে পরিণত করিবেন এবং দ্বাদশ রাজার পিতা বানাইবেন। আরবের লোকেরাই যদি তাঁহার বংশধর না হইয়া থাকে, তাহা হইলে ঐ প্রতিশ্রুত জাতি কোথায়? আরবের ইসমাঈলীয় গোত্রগুলিই এই ক্ষেত্রে একমাত্র দাবীদার। (৪) আদিপুস্তকের ২১ঃ৮-১৪ শ্লোকের বর্ণনা মতে সারার সন্তুষ্টির জন্য হাগারকে (হাজেরা) বাড়ী ছাড়িতে হইয়াছিল। তাহাকে যদি হেজাজে লইয়া যাওয়া না হইয়া থাকে, তাহা হইলে তাহার বংশধরেরা কোথায় আছে, আর তাহার নির্বাসন স্থলই বা কোথায়? (৫) আরবের ভৌগলিকরা সকলেই একমত যে হেজাজের পাহাড়গুলিই ফারান নামে অভিহিত হইত (মুজামুল বুলদান)। (৬) বাইবেলের মতে, ইসমাঈলের বংশধরেরা ‘হাবিলা হইতে শূর পর্যন্ত’ এলাকায় বসবাস করিত (আদিপুস্তক- ২৫ঃ১৮)। ‘হাবিলা হইতে শূর পর্যন্ত’ শব্দগুলি দ্বারা আরবদেশের একপ্রান্ত হইতে অপর প্রান্ত পর্যন্ত বুঝায় (বিব সাইক্ প্রণেতা জে, ঈভি, লণ্ডন, ১৮৩২)। (৭) বাইবেল ইসমাঈলকে ‘উয়াইল্ড ম্যান’ বলিয়াছে (আদিপুস্তক ১৬ঃ১২) এখানে ‘উয়াইল্ড ম্যান’ শব্দটির অর্থ ‘গৃহবাসী বা গৃহাবদ্ধ’ নয় এমন মানুষ; স্বাধীনভাবে বিচরণকারী মানুষ; বা মরুচারী লোক। আরবী শব্দটির অর্থও তাহাই। (৮) এমন কি পল পর্যন্ত স্বীকার করিয়াছেন যে, হাগার (হাজেরা)-এর সাথে আরব দেশের সম্পর্ক আছে (গালাতীয়- ৪ঃ২৫)। (৯) কেদার ইসমাঈলের পুত্রদের একজন ছিলেন এবং ইহা স্বীকার করা হইয়া থাকে যে, তাহার বংশধরেরা আরবদেশের দক্ষিণাংশে বসবাস করিত (বিব, সাইক, লণ্ডন, ১৮৬২)।(১০) প্রফেসার সি.সি. টরী বলেন, “আরবেরা হিব্রু ঐতিহ্য ও কাহিনী অনুযায়ী ইসমাঈল বংশীয়। ........ ঐ বারজন যুবরাজ (আদিপুস্তক- ১৭ঃ২০) যাহাদের নাম পরে (আদিপুস্তক- ২৫ঃ১৩ এফ এফতে উল্লেখিত হইয়াছে, আরবের গোত্র বা জেলাগুলির প্রতিনিধিত্বকারী ব্যক্তিত্ব ছিলেন, যাহাদের মধ্যে কেদার, দুমা (দুমাতুল জান্দাল) এবং তেইমা সুপ্রসিদ্ধ।” আরব দেশের লোকেরা এক মহান জাতি (জিউইশ ফাউণ্ডেশন অব ইসলাম, পৃঃ ৮৩)। “শারীরিক গঠন-প্রকৃতি, ভাষা, স্থানীয় কৃষ্টি-কাহিনী ও বাইবেলের সাক্ষ্যের ভিত্তিতে, প্রধানতঃ ও সত্তাগত ভাবে ইসমাঈলীয়” (সাইক্লোপিডিয়া অব বিব্লিকেল লিটারেচার, নিউ ইয়র্ক, পৃঃ ৬৮৫)। (১১) “আমরা সর্বদাই হাগারের (হাজেরার) পুত্রগণের অন্যায় মনোবৃত্তিকে দোষারোপ করিতে থাকিব, বিশেষ করিয়া কুরাইশগণকে, কেননা তাহারা জানোয়ারের মত” (লীভ্‌স্‌ ফ্রম থ্রি এনসিয়েন্ট কুরান্‌স, সম্পাদক রেভারেণ্ড মিন্‌গানা ডি.ডি, ইন্‌ট্রো ১৩শ)।