১০

يونس

সূরা ইউনুস

Yunus

মক্কী ১১০ আয়াত ১১ রুকু পারা ১১

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১১০ আয়াত এবং ১১ রুকু আছে।

وَیَقُوۡلُوۡنَ لَوۡلَاۤ اُنۡزِلَ عَلَیۡہِ اٰیَۃٌ مِّنۡ رَّبِّہٖ ۚ فَقُلۡ اِنَّمَا الۡغَیۡبُ لِلّٰہِ فَانۡتَظِرُوۡا ۚ اِنِّیۡ مَعَکُمۡ مِّنَ الۡمُنۡتَظِرِیۡنَ ﴿٪۲۱﴾

২১
এবং তাহারা বলে, তাহার উপর কেন তাহার প্রভুর পক্ষ হইতে কোন নিদর্শন অবতীর্ণ করা হয় নাই? অতএব, তুমি বল, ‘প্রত্যেক অদৃশ্যের জ্ঞান কেবল আল্লাহ্‌রই জন্য। সুতরাং তোমরা অপেক্ষা কর, নিশ্চয় আমিও তোমাদের সহিত অপেক্ষাকারীদের অন্তর্ভুক্ত আছি?’১২৪৯
সূরা ইউনুস - রুকু ২
১২৪৯। ‘শীঘ্র শাস্তি আসিতেছে না কেন’—কাফেরদের এই দাবীর কার্যকর উত্তর এই আয়াতে উল্লেখ করা হইয়াছে। উহাদিগকে বলিবার জন্য হযরত নবী করীম (সাঃ)-কে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে যে, তাহারা নহে,বরং তিনিই আযাব সম্বন্ধে অগ্রিম সংবাদদাতারূপে ইহার বিলম্বের কারণে বিচলিত হওয়ার কথা; কারণ শাস্তি আসার বিলম্বের জন্য তাঁহাকেইতো উপহাসের পাত্রে পরিণত করা হইতেছে এবং তিনি যখন ধৈর্যের সহিত আল্লাহ্‌তা’লার চূড়ান্ত রায়ের অপেক্ষা করিতেছেন, তাহারা কেন অপেক্ষা করিবে না?

وَاِذَاۤ اَذَقۡنَا النَّاسَ رَحۡمَۃً مِّنۡۢ بَعۡدِ ضَرَّآءَ مَسَّتۡہُمۡ اِذَا لَہُمۡ مَّکۡرٌ فِیۡۤ اٰیَاتِنَا ؕ قُلِ اللّٰہُ اَسۡرَعُ مَکۡرًا ؕ اِنَّ رُسُلَنَا یَکۡتُبُوۡنَ مَا تَمۡکُرُوۡنَ ﴿۲۲﴾

২২
এবং যখন আমরা মানুষকে, তাহাদিগকে দুঃখ-যাতনা স্পর্শ করার পর রহমতের আস্বাদ গ্রহণ করাই, তখন সহসা তাহারা আমাদের নিদর্শনাবলীর বিরুদ্ধে পরিকল্পনা আঁটিতে আরম্ভ করে।১২৫০ তুমি বল, ‘আল্লাহ্ পরিকল্পনায় সর্বাধিক ত্বরিত’; নিশ্চয় আমাদের প্রেরিতগণ (ফিরিশ্‌তা)উহা লিখিয়া রাখিতেছে তোমরা যাহার পরিকল্পনা আঁটিতেছ।
১২৫০। করুণা আল্লাহ্‌তা’লার নিকট হইতে আসে, কিন্তু দুর্দশা মানবের মন্দ কর্মেরই ফল।

ہُوَ الَّذِیۡ یُسَیِّرُکُمۡ فِی الۡبَرِّ وَالۡبَحۡرِ ؕ حَتّٰۤی اِذَا کُنۡتُمۡ فِی الۡفُلۡکِ ۚ وَجَرَیۡنَ بِہِمۡ بِرِیۡحٍ طَیِّبَۃٍ وَّفَرِحُوۡا بِہَا جَآءَتۡہَا رِیۡحٌ عَاصِفٌ وَّجَآءَہُمُ الۡمَوۡجُ مِنۡ کُلِّ مَکَانٍ وَّظَنُّوۡۤا اَنَّہُمۡ اُحِیۡطَ بِہِمۡ ۙ دَعَوُا اللّٰہَ مُخۡلِصِیۡنَ لَہُ الدِّیۡنَ ۬ۚ لَئِنۡ اَنۡجَیۡتَنَا مِنۡ ہٰذِہٖ لَنَکُوۡنَنَّ مِنَ الشّٰکِرِیۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
তিনিই তোমাদিগকে স্থলে এবং জলে পরিভ্রমণ করান, এমন কি যখন তোমরা জাহাজে অবস্থান কর এবং উহা তাহাদিগকে লইয়া মৃদুমন্দ বায়ুভরে চলিতে থাকে এবং উহাতে তাহারা আনন্দে উৎফুল্ল হইয়া ওঠে, এমন সময় উহাদের উপর এক প্রচণ্ড ঝঞ্ঝা বায়ু বহিয়া যায় এবং সকল দিক হইতে তাহাদের উপর তরঙ্গমালা ভাঙ্গিয়া পড়ে এবং তাহারা ধারণা করে যে, তাহারা পরিবেষ্টিত হইয়া পড়িয়াছে, তখন তাহারা আল্লাহ্‌কে, তাঁহার প্রতি বিশুদ্ধ চিত্তে আনুগত্য প্রকাশ করিয়া (এই বলিয়া) ডাকে, ‘যদি তুমি আমাদিগকে এই বিপদ হইতে উদ্ধার কর, তাহা হইলে নিশ্চয় আমরা কৃতজ্ঞদিগের অন্তর্ভুক্ত হইব।’১২৫১
১২৫১। মৃদুমন্দ বায়ু যেমন কোন কোন সময় প্রবল ঝড়ে পরিণত হয় এবং ব্যাপক ধ্বংসের কারণ হয়, তদ্রুপ কাফেরদিগকে দেওয়া অবকাশ তাহাদের ধ্বংসের প্রাথমিক অংশ বলা যাইতে পারে। অবিশ্বাসীদিগকে এই প্রকাশ্য সত্য ভালভাবে উপলব্ধি করাইবার জন্য, তাহাদের সমুদ্র-যাত্রার আনন্দ ও ঝুঁকির প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করা হইয়াছে।

فَلَمَّاۤ اَنۡجٰہُمۡ اِذَا ہُمۡ یَبۡغُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ ؕ یٰۤاَیُّہَا النَّاسُ اِنَّمَا بَغۡیُکُمۡ عَلٰۤی اَنۡفُسِکُمۡ ۙ مَّتَاعَ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۫ ثُمَّ اِلَیۡنَا مَرۡجِعُکُمۡ فَنُنَبِّئُکُمۡ بِمَا کُنۡتُمۡ تَعۡمَلُوۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
অতঃপর, যেমনি তিনি তাহাদিগকে উদ্ধার করেন অমনি তাহারা পৃথিরীতে অন্যায়ভাবে বিদ্রোহাচরণ করিতে আরম্ভ করে। হে মানবমণ্ডলী! পার্থিব জীবনের ভোগ- বিলাসে তোমাদের বিদ্রোহাচরণ তোমাদের নিজেদের বিরুদ্ধেই দাঁড়াইবে। অতঃপর, আমাদের নিকটই তোমাদিগকে ফিরিয়া আসিতে হইবে এবং আমরা তোমাদিগকে জানাইয়া দিব যাহা কিছু তোমরা করিতেছিলে।

اِنَّمَا مَثَلُ الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا کَمَآءٍ اَنۡزَلۡنٰہُ مِنَ السَّمَآءِ فَاخۡتَلَطَ بِہٖ نَبَاتُ الۡاَرۡضِ مِمَّا یَاۡکُلُ النَّاسُ وَالۡاَنۡعَامُ ؕ حَتّٰۤی اِذَاۤ اَخَذَتِ الۡاَرۡضُ زُخۡرُفَہَا وَازَّیَّنَتۡ وَظَنَّ اَہۡلُہَاۤ اَنَّہُمۡ قٰدِرُوۡنَ عَلَیۡہَاۤ ۙ اَتٰہَاۤ اَمۡرُنَا لَیۡلًا اَوۡ نَہَارًا فَجَعَلۡنٰہَا حَصِیۡدًا کَاَنۡ لَّمۡ تَغۡنَ بِالۡاَمۡسِ ؕ کَذٰلِکَ نُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّتَفَکَّرُوۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
পার্থিব জীবনের দৃষ্টান্ত ঐ পানির ন্যায় যাহা আমরা মেঘ হইতে বর্ষণ করি, অতঃপর উহার সহিত ভূমি হইতে উৎপন্ন দ্রব্য সংমিশ্রিত হয়, যাহা মানুষ ও গবাদি পশু ভক্ষণ করে, এমন কি ধরণী নিজ সুন্দর রূপ পরিগ্রহ করে ও সুশোভিত হয় এবং উহার মালিকগণ মনে করে যে, উহা তাহাদের পূর্ণ আয়ত্বে আসিয়াছে, ঠিক এমনই সময় রাত্রিকালে বা দিনের বেলায় উহার উপরে আমাদের আদেশ আসিয়া পড়ে; অতঃপর আমরা উহাকে এমন ভাবে কর্তিত ক্ষেত্রে পরিণত করিয়া দেই যেন গতকালও এখানে কিছুই ছিল না।১২৫২ এইরূপে আমরা চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলী বিস্তারিত ভাবে বর্ণনা করি।
১২৫২। এই নীতি-কথার অন্তর্নিহিত অর্থ হইলঃ যখন জাতি অহঙ্কারী ও অন্তঃসার-শূন্য হইয়া পড়ে এবং জীবনকে হাল্কাভাবে গ্রহণ করে, তখন তাহাদের অধঃপতন আরম্ভ হয় এবং তাহারা দুঃখে পতিত হয়।

وَاللّٰہُ یَدۡعُوۡۤا اِلٰی دَارِ السَّلٰمِ ؕ وَیَہۡدِیۡ مَنۡ یَّشَآءُ اِلٰی صِرَاطٍ مُّسۡتَقِیۡمٍ ﴿۲۶﴾

২৬
এবং আল্লাহ্ শান্তির১২৫৩ আবাসের দিকে আহ্বান করেন, এবং তিনি যাহাকে চাহেন সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করেন।
১২৫৩। “সালাম” অর্থ-নিরাপদ, নিরাপত্তা, ‘দোষ বা ত্রুটি,অপূর্ণতা, কলঙ্ক বা অসৎ অভ্যাসমুক্ত’, অথবা ইহার অর্থ শান্তি, আনুগত্য এবং জান্নাত। আল্লাহ্‌তা’লার এক নামও ‘সালাম’ (লেইন)।

لِلَّذِیۡنَ اَحۡسَنُوا الۡحُسۡنٰی وَزِیَادَۃٌ ؕ وَلَا یَرۡہَقُ وُجُوۡہَہُمۡ قَتَرٌ وَّلَا ذِلَّۃٌ ؕ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ الۡجَنَّۃِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۷﴾

২৭
যাহারা উত্তম কার্য করে তাহাদের জন্য আছে উত্তম বিনিময়১২৫৪ এবং আরও অধিক (আশিস)।১২৫৫ কালিমা এবং লাঞ্ছনা তাহাদের মুখমণ্ডলকে আচ্ছন্ন করিবে না। ইহারাই জান্নাতের অধিবাসী; তাহারা তথায় চিরকাল বসবাস করিবে।
১২৫৪। ‘আল্ হুস্‌না’ অর্থ আনন্দদায়ক পরিণাম; বিজয়, ব্যগ্রতা ও তৎপরতা। উক্তিটির মর্ম হইল যে, (১) বিশ্বাসীগণ এক সুখময় পরিণামে পৌঁছিবে; (২) তাহারা কৃত-কার্যতা লাভ করিবে, এবং (৩) আল্লাহ্‌তা’লা তাহাদিগকে আগ্রহী এবং কর্মতৎপর করিবেন।
১২৫৫। “যিয়াদাহ্” (অর্থ আরো বেশী) শব্দের মর্ম হইতেছে যে, মো’মেনগণ তাহাদের পুরস্কার স্বরূপ আল্লাহকে লাভ করিবে, এবং ‘আল্‌ হুস্‌না’ (আরও এক অর্থ আল্লাহ্‌র দৃষ্টি) শব্দ উক্ত ধারণাকে সমর্থন করে।

وَالَّذِیۡنَ کَسَبُوا السَّیِّاٰتِ جَزَآءُ سَیِّئَۃٍۭ بِمِثۡلِہَا ۙ وَتَرۡہَقُہُمۡ ذِلَّۃٌ ؕ مَا لَہُمۡ مِّنَ اللّٰہِ مِنۡ عَاصِمٍ ۚ کَاَنَّمَاۤ اُغۡشِیَتۡ وُجُوۡہُہُمۡ قِطَعًا مِّنَ الَّیۡلِ مُظۡلِمًا ؕ اُولٰٓئِکَ اَصۡحٰبُ النَّارِ ۚ ہُمۡ فِیۡہَا خٰلِدُوۡنَ ﴿۲۸﴾

২৮
এবং যাহারা মন্দ কার্য করিবে, মন্দ কার্যের প্রতিফল উহার অনুরূপ হইবে এবং লাঞ্ছনা তাহাদিগকে আচ্ছন্ন করিবে; তাহাদিগকে আল্লাহ্ হইতে রক্ষা করিবার কেহ থাকিবে না; তাহাদের চেহারাগুলিকে যেন রাত্রির এক টুকরা দ্বারা অন্ধকারাচ্ছন্ন করা হইয়াছে,১২৫৬ এই সকল লোকই আগুনের অধিবাসী, তাহারা তথায় দীর্ঘকাল থাকিবে।
১২৫৬। এই আয়াতের মধ্যে কতিপয় গুরুত্বপূর্ণ সত্য নিহিতঃ (ক) পুণ্যের পুরস্কার বহুগুণ (পূর্ববর্তী আয়াত দেখুন),আর পাপের প্রতিদান সমপরিমাণ; (খ) যাহারা আল্লাহ্‌র বিধান লঙ্ঘন করে তাহারা উচ্চ আদর্শের অনুপ্রেরণা লাভে এবং মহৎ উচ্চাকাঙ্খা হইতে নিবৃত্ত হইয়া যায় এবং উদ্যম হারাইয়া ফেলে এবং তাহাদের মধ্যে নেতৃত্বদানের উচ্চাভিলাষ থাকে না এবং কেবল অন্যের অনুকরণে অভ্যস্ত হইয়া পড়ে; (গ) এইরূপ অবস্থায় পতিত হইয়া এবং আল্লাহ্‌তা’লার অসন্তুষ্টি অর্জন করতঃ তাহারা বিপদাদিতে আল্লাহ্‌তা’লার সাহায্য সহায়তা হইতে বঞ্চিত হয়; (ঘ) অসাধু লোকের অন্যায় অবিচার এবং পাপ কর্মসমূহ দীর্ঘদিন গোপন থাকিতে পারে না—আগে হউক বা পরে হউক প্রকাশ হইয়াই পড়ে।

وَیَوۡمَ نَحۡشُرُہُمۡ جَمِیۡعًا ثُمَّ نَقُوۡلُ لِلَّذِیۡنَ اَشۡرَکُوۡا مَکَانَکُمۡ اَنۡتُمۡ وَشُرَکَآؤُکُمۡ ۚ فَزَیَّلۡنَا بَیۡنَہُمۡ وَقَالَ شُرَکَآؤُہُمۡ مَّا کُنۡتُمۡ اِیَّانَا تَعۡبُدُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
এবং (স্মরণ কর) সেই দিনকে যেদিন আমরা তাহাদের সকলকে একত্রিত করিব, অতঃপর যাহারা শির্‌ক করিয়াছিল, আমরা তাহাদিগকে বলিব, ‘তোমরা এবং তোমরা যাহাদিগকে শরীক করিয়াছিলে সকলেই স্ব স্ব স্থানে (দাঁড়াইয়া) থাক।’ অতঃপর, আমরা তাহাদিগকে একে অপর হইতে পৃথক করিয়া দিব, তখন তাহাদের শরীকগণ বলিবে, ‘তোমরা আদৌ আমাদের উপাসনা করিতে না;

فَکَفٰی بِاللّٰہِ شَہِیۡدًۢا بَیۡنَنَا وَبَیۡنَکُمۡ اِنۡ کُنَّا عَنۡ عِبَادَتِکُمۡ لَغٰفِلِیۡنَ ﴿۳۰﴾

৩০
সুতরাং তোমাদের এবং আমাদের মধ্যে সাক্ষী হিসাবে আল্লাহ্‌ই যথেষ্ট। আমরা নিশ্চয়ই তোমাদের উপাসনা সম্বন্ধে অনবহিত ছিলাম।’