১১

هود

সূরা হুদ

Hud

মক্কী ১২৪ আয়াত ১০ রুকু পারা ১১–১২

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১২৪ আয়াত এবং ১০ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

الٓرٰ ۟ کِتٰبٌ اُحۡکِمَتۡ اٰیٰتُہٗ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِنۡ لَّدُنۡ حَکِیۡمٍ خَبِیۡرٍ ۙ﴿۲﴾

২
আলিফ লাম রা।১২৯৩ ইহা এইরূপ কিতাব, যাহার আয়াত সমূহকে সুদৃঢ়১২৯৩-ক করা হইয়াছে; অতঃপর উহাদিগকে সবিস্তারে বর্ণনা করা হইয়াছে১২৯৪ পরম প্রজ্ঞাময়, সর্বজ্ঞ (আল্লাহ্‌)-এর তরফ হইতে।
১২৯৩। আমি আল্লাহ্ সর্বদ্রষ্টা (বিস্তারিত জানার জন্য দেখুন টীকা ১৬)।
১২৯৩-ক। ‘আহকামাহু’ অর্থ তিনি ইহাকে শক্ত করিলেন, দৃঢ় করিলেন, মজবুত করিলেন এবং ত্রুটীবিহীন করিলেন বা অপূর্ণতামুক্ত করিলেন। ‘আহ্কামাত্‌হু আত্-তাযারিবু’-অর্থ পরীক্ষা-নিরীক্ষার অভিজ্ঞতা তাহাকে জ্ঞানী বা বিচারশক্তিতে পরিপক্কতা দান করিল (লেইন)।
১২৯৪। এইখানে ‘ফুসসিলাত্‌’ শব্দটি ‘মুতাশাবেহাত্‌’ (৩ঃ৮এ ব্যবহৃত) শব্দের স্থলাভিষিক্ত, যদ্বারা কুরআন করীমের শিক্ষার বিস্তারিত ব্যাখ্যা করা হইয়াছে। ইসলামের মৌলিক শিক্ষা এইরূপ প্রশ্নাতীত যে, ইহার বিকল্প অসম্ভব। কিন্তু ইসলামের সম্পূর্ণ সত্যতা উপলব্ধি করিতে হইলে, ইহার মৌলিক শিক্ষা এবং উহার বিস্তারিত ব্যাখ্যা উভয়বিধ শিক্ষাই জানা প্রয়োজন। স্মরণ রাখিতে হইবে যে, ব্যাখ্যা মৌলিক বিষয়ের ব্যতিক্রম হইবে না, সমর্থনকারী হইতে হইবে।

اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰہَ ؕ اِنَّنِیۡ لَکُمۡ مِّنۡہُ نَذِیۡرٌ وَّبَشِیۡرٌ ۙ﴿۳﴾

৩
(ইহা এই শিক্ষা দেয়) যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ব্যতিরেকে অন্য কাহারও ইবাদত করিও না; নিশ্চয় আমি তাঁহার নিকট হইতে তোমাদের জন্য সতর্ককারী ও সুসংবাদ দাতা।

وَّاَنِ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡہِ یُمَتِّعۡکُمۡ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّیُؤۡتِ کُلَّ ذِیۡ فَضۡلٍ فَضۡلَہٗ ؕ وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡکُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ کَبِیۡرٍ ﴿۴﴾

৪
এবং ইহাও (শিক্ষা দেয়) যে, তোমরা তোমাদের প্রভুর নিকট ক্ষমা প্রার্থনা কর; অতঃপর তাঁহার দিকে প্রত্যাবর্তন কর;১২৯৫ তিনি এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তোমাদিগকে উত্তম পার্থিব সম্পদ দান করিবেন। এবং প্রত্যেক অনুগ্রহের যোগ্য ব্যাক্তিকে নিজ অনুগ্রহ দান করিবেন এবং যদি তোমরা ফিরিয়া যাও তাহা হইলে আমি তোমাদের উপর নিশ্চয় এক মহা (ভীতিপুর্ণ) দিবসের শাস্তির আশঙ্কা করিতেছি।
১২৯৫। এই আয়াতে দেখা যায় যে, মানুষের আধ্যাত্মিক উন্নয়নে তওবার স্থান ইস্তেগফারের পরে এবং উচ্চ পর্যায়ের। পূর্বে-কৃতপাপসমূহের কুফল হইতে আল্লাহ্‌র আশ্রয় প্রার্থনা করার পর সর্বান্তকরণে আল্লাহ্‌তা’লার দিকে প্রত্যাবর্তিত হওয়ার নাম ‘তওবা’। আল্লাহ্‌তা’লার নৈকট্য লাভের জন্য ইহা হইতে উৎকৃষ্টতর পন্থা চিন্তা করা যায় কি?

اِلَی اللّٰہِ مَرۡجِعُکُمۡ ۚ وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۵﴾

৫
আল্লাহ্‌র দিকেই তোমাদের প্রত্যাবর্তন এবং তিনি সকল বিষয়ের উপর সর্বশক্তিমান।

اَلَاۤ اِنَّہُمۡ یَثۡنُوۡنَ صُدُوۡرَہُمۡ لِیَسۡتَخۡفُوۡا مِنۡہُ ؕ اَلَا حِیۡنَ یَسۡتَغۡشُوۡنَ ثِیَابَہُمۡ ۙ یَعۡلَمُ مَا یُسِرُّوۡنَ وَمَا یُعۡلِنُوۡنَ ۚ اِنَّہٗ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۶﴾

৬
শুন! নিশ্চয় তাহারা তাহাদের বক্ষঃকে কুঞ্চিত করিয়া রাখে যাহাতে তাহারা তাঁহার নিকট হইতে নিজদিগকে (তাহাদের মন্দ চিন্তাগুলিকে১২৯৬) লুকাইয়া রাখিতে পারে। শুন! যখন তাহারা নিজদিগকে পোষাকাবৃত করে তখনও তিনি জানেন যাহা তাহারা লুকাইয়া রাখে এবং যাহা তাহারা প্রকাশ করে। নিশ্চয় তিনি তাহাদের অন্তরের কথাকে ভালভাবে জানেন।
১২৯৬। অবিশ্বাসীগণ তাহাদের মনের সন্দেহ ও আপত্তিগুলি মনের মধ্যেই লুক্কায়িত রাখে, অপনোদনের জন্য ইচ্ছা প্রকাশ করে না। এই কারণেই তাহারা সত্য গ্রহণে বঞ্চিত এবং সন্দেহমুক্ত হওয়ার উদ্দেশ্যে মনের কথা প্রকাশে অস্বীকৃতি জ্ঞাপন করে।

وَمَا مِنۡ دَآبَّۃٍ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَی اللّٰہِ رِزۡقُہَا وَیَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّہَا وَمُسۡتَوۡدَعَہَا ؕ کُلٌّ فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۷﴾

৭
এবং ভূপৃষ্ঠে এমন কোন বিচরণকারী জীব নাই যাহার রিয্‌কের১২৯৭ দায়িত্ব আল্লাহ্‌র উপর নাই। এবং তিনি জানেন উহাদের অস্থায়ী আবাসস্থল১২৯৮ এবং উহাদের স্থায়ী আবাসস্থল। সবকিছু এক সুস্পষ্ট কিতাবে (লিপিবদ্ধ) আছে।
১২৯৭। আল্লাহ্‌তা’লা তাঁহার সকল সৃষ্টের উপজীবিকা সরবরাহ করিয়াছেন। এমন কি তিনি ঐসব কীটাণুকীট এবং সরীসৃপ যাহারা মৃত্তিকাগর্ভে বাস করে তাহাদের জন্যও জীবন ধারণের উপকরণ সৃষ্টি করিয়াছেন। মানুষের জ্ঞান-বুদ্ধি বুঝিতে অক্ষম যে, অসংখ্য পোকা-মাকড় ও কীট-পতঙ্গ যাহারা মাটির উপরে এবং মাটির নীচে বাস করে, কিরূপে এবং কোথা হইতে তাহারা খাদ্য পাইয়া থাকে। মানুষ এই বিশ্ব-জগতের রহস্যের সমাধান করিয়াছে বলিয়া যাহারা ধারণা করেন, তাহারা এখনো সকল প্রকার জীবন সম্বন্ধেই জ্ঞাত নহেন, আর ইহাদের বিভিন্ন রকমের খাদ্যপোকরণ, যাহার উপর উহারা বাঁচিয়া থাকে, উহা জানাতো দূরের কথা। কিন্তু আল্লাহ্ ইহাদের সকলের জন্য প্রচুর পরিমাণে খাদ্যসম্ভার সরবরাহ করিয়া রাখিয়াছেন। এই আয়াতে এই তত্বই ব্যক্ত হইয়াছে যে, আল্লাহ্‌তা’লা যখন তাঁহার সৃষ্টির নিকৃষ্টতম জীবের দৈহিক প্রোয়োজন পূর্ণ করিয়াছেন, তখন ইহা কিভাবে সম্ভব যে, তাঁহার শ্রেষ্ঠ সৃষ্টি মানবের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক প্রয়োজনানুরূপ উপজীবিকার সুব্যবস্থাকে উপেক্ষা করিতে পারেন। উহাতে সকল জীবের শুধু স্থায়ী এবং অস্থায়ী বাসস্থানের প্রতি ইঙ্গিত করে নাই, পরন্তু তাহাদের শক্তি ও সামর্থ্যের উৎকর্ষ সাধনের চরম সীমাও নির্দেশ করিতেছে।
১২৯৮। ‘মুসতাকার’ এবং ‘মুসতাওদা’ অর্থ কেবলমাত্র অস্থায়ী ও স্থায়ী বাসস্থানের প্রতিই ইশারা বুঝায় না, বরং কোন কিছুর চরম বা নির্ধারিত সীমাও ইংগিত করে। উহা স্থান-কাল, নিয়োজিত পরিসর ও কোন অধ্যায়ের শেষ সীমার প্রতিও ইংগিত বহন করে (লেইন)।

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ وَّکَانَ عَرۡشُہٗ عَلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَلَئِنۡ قُلۡتَ اِنَّکُمۡ مَّبۡعُوۡثُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡمَوۡتِ لَیَقُوۡلَنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۸﴾

৮
এবং তিনিই আকাশসমূহ এবং পৃথিবীকে ছয় দিনে১২৯৯ সৃষ্টি করিয়াছেন; এবং তাহার আরশ পানির উপরে অবস্থিত১৩০০ যেন তিনি তোমাদিগকে পরীক্ষা করেন যে, তোমাদের মধ্যে কর্মের ক্ষেত্রে কে সর্বোত্তম। এবং যদি তুমি বল, ‘নিশ্চয় তোমরা মৃত্যুর পর পুনরুত্থিত হইবে,’ যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা নিশ্চয় বলিবে, ‘ইহা স্পষ্ট ধোকা ব্যতীত আর কিছু নহে।’
১২৯৯। ৯৮৪ টীকা দ্রষ্টব্য।
১৩০০। যেহেতু কুরআন করীমে বারংবার উল্লেখ রহিয়াছে যে, সকল প্রকার জীবনের উৎস পানি (২ঃ৩১; ২৫ঃ৫৫; ৭৭ঃ২১, ও ৮৬ঃ৭) “তাঁহার আরশ পানির উপর অবস্থিত”-এর অর্থ হইবে যে, আল্লাহ্‌তা’লার গুণাবলী তাঁহার সৃষ্টজীবের মাধ্যমে প্রকাশিত; সর্বোপরি মানবের মাধ্যমে, সকল প্রকার সৃষ্টির চরমত্বের বিকাশস্থল অর্থাৎ সৃষ্টির সেরা মানুষ দ্বারা আল্লাহ্‌তা’লার কামেল সিফ্‌ত বা পূর্ণ গুণাবলী প্রকাশ পায়। আবার উক্ত আয়াতের এই অর্থও হয় যে, আল্লাহ্‌তা’লার সিফ্‌ত বা গুণাবলী মানুষের উপর তাঁহার ‘ওহীর’ দ্বারা প্রকাশ পায়। যেমন কুরআন শরীফের একাধিক স্থানে পানিকে ওহীর সঙ্গে তুলনা করা হইয়াছে। “মৃত্যুর পর নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে” এই বাক্যে বলা হইয়াছে যে, এই সৃষ্টির বিধান ইহাই ব্যক্ত করিতেছে যে, মানুষকে তাহার মৃত্যুর পর পুনরায় জীবিত করা হইবে। কারণ এই বিশাল জগতের সৃষ্টি,যাহাতে এক স্বাধীন ও সংকল্পবদ্ধ মানব জীবনের অস্তিত্ব বিরাজ করিতে পারে, পরিষ্কার নির্দেশ করিতেছে যে, এই মানব জীবন সৃষ্টির এক মহৎ উদ্দেশ্য রহিয়াছে, কিন্তু ইহলৌকিক জীবন স্থায়ী নহে, এক অস্থায়ী অস্তিত্ব, যাহা অনেক পরীক্ষা-নিরীক্ষার মধ্যে অতিবাহিত করিতে হয়। অতঃপর, এই ক্ষণস্থায়ী বা কিছু কালের পরীক্ষা ক্ষেত্র অতিক্রম করিয়া তাহাকে অবশ্যই একদিন পারলৌকিক বা স্থায়ী জীবনে প্রবেশ করিতে হইবে এবং উহাই মানুষের চিরস্থায়ী বাসস্থান যেখানে তাহাকে উল্লেখিত পরীক্ষার ফলাফল বা পুরস্কার প্রদান করা হইবে।

وَلَئِنۡ اَخَّرۡنَا عَنۡہُمُ الۡعَذَابَ اِلٰۤی اُمَّۃٍ مَّعۡدُوۡدَۃٍ لَّیَقُوۡلُنَّ مَا یَحۡبِسُہٗ ؕ اَلَا یَوۡمَ یَاۡتِیۡہِمۡ لَیۡسَ مَصۡرُوۡفًا عَنۡہُمۡ وَحَاقَ بِہِمۡ مَّا کَانُوۡا بِہٖ یَسۡتَہۡزِءُوۡنَ ﴿٪۹﴾

৯
এবং যদি আমরা এক নির্দিষ্ট কাল পর্যন্ত তাহাদের উপর (নির্ধারিত) আযাবকে স্থগিত রাখি তাহা হইলে তাহারা নিশ্চয় বলিবে, ‘ইহাকে কিসে রুখিয়া রাখিয়াছে?’ শুন! যেদিন উহা তাহাদের নিকট আসিবে, সেদিন তাহাদের নিকট হইতে উহা সরানো যাইবে না, এবং যে আযাবের বিষয় তাহারা উপহাস করিত উহা তাহাদিগকে পরিবেষ্টন করিবে।
সূরা হুদ - রুকু ১

وَلَئِنۡ اَذَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنَّا رَحۡمَۃً ثُمَّ نَزَعۡنٰہَا مِنۡہُ ۚ اِنَّہٗ لَیَـُٔوۡسٌ کَفُوۡرٌ ﴿۱۰﴾

১০
এবং যদি আমরা মানুষকে আমাদের তরফ হইতে কোন প্রকার রহমতের স্বাদ গ্রহণ করাই, অতঃপর আমরা তাহার নিকট হইতে উহা প্রত্যাহার করি তখন সে অবশ্যই নিরাশ ও অকৃতজ্ঞ হইয়া যায়।