هود
Hud
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ১২৪ আয়াত এবং ১০ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ
হযরত ইব্নে আব্বাস, আল্ হাসান, ইকরিমা, মুজাহিদ, কাতাদাহ্ এবং জাবির ইব্নে যায়েদের মতে এই সূরাটি মক্কায় নাযেল হইয়াছে, অবশ্য মোকাতিলের মতে ইহার ১৩, ১৮ এবং ১১৫ আয়াত ব্যতীত সমস্ত সূরাটিই মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছে। তাঁহার ধারণায় উল্লেখিত আয়াত তিনটি মদীনায় নাযেল হইয়াছে।
বিষয়বস্তু
পূর্ববতী সূরাতে আল্লাহ্র নবী-রসূলদের বিরুদ্ধবাদী লোকদের তিন শ্রেণীতে বিভক্ত করা হইয়াছিলঃ (১) যাহাদেরকে সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করা হইয়াছিল, (২) যাহাদেরকে পুরাপুরি অবকাশ দেওয়া হইয়াছিল, এবং (৩) যাহাদের আংশিক ধ্বংস করা হইয়াছিল এবং আংশিক রক্ষা করা হইয়াছিল। আলোচ্য সূরাটিতে প্রথম শ্রেণীর বিরুদ্ধবাদীদের প্রসঙ্গ উত্থাপন করিয়া বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা হূদের কওমকে এমন সম্পূর্ণ ভাবে ধ্বংস করিয়াছিলেন যে, তাহাদের কোন কিছুই আর অবশিষ্ট ছিল না, এবং তিনি তাহাদের পরিবর্তে অন্য এক কওমের উদ্ভব ঘটাইয়া তাহাদের মাধ্যমে এক নূতন কর্মকাণ্ডের বা মানব সভ্যতার এক নূতন বুনিয়াদের কাজ শুরু করিয়াছিলেন। সূরাটিতে এই দিকেও ইঙ্গিত করা হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা সব সময়ই মানুষকে পর্যবেক্ষণ করেন এবং তাহাদের কাজ-কর্মের অনুরূপ তাহাদের সাথে ব্যবহার করেন এবং সময় ও পরিবেশের চাহিদানুযায়ী তাহাদের জন্য হেদায়াতের বন্দোবস্ত করেন। এই হেদায়াতের বন্দোবস্ত যেহেতু মানুষের মঙ্গলের জন্যই জারী করা হয়, তাই যাহারা ইহার সুফল হইতে ইচ্ছাকৃত ভাবে দূরে সরিয়া যায়, তাহারা এক ধরণের নৈতিক মৃত্যুবরণ করে। এইভাবেই আল্লাহ্তা’লার হেদায়াতের প্রক্রিয়া চলিতে থাকে। যেভাবে এক প্রজন্মের অন্তর্ধানের পর নূতন আরেক প্রজন্মের মানুষ তাহাদের স্থলাভিষিক্ত হয়, তদ্রুপ ধর্মীয় দিক হইতেও এক মতবাদের পরে আরেক মতবাদ জন্মলাভ করে। সূরাটিতে ইহাও বলা হইয়াছে যে, সাময়িকভাবে ঐশী আদেশ-নির্দেশ প্রতিপালন না করিয়াও কেহ জাগতিক উন্নতি লাভ করিতে পারে, কিন্তু জগতের ইতিহাসে শাশ্বত স্মৃতি ও অমর কীর্তি যাহারা লাভ করিতে চায়, এমন স্থায়ী উন্নতি আল্লাহ্তা’লা তাহাদেরকেই দান করেন যাহারা আল্লাহ্ ও মানুষের প্রতি ন্যায়নিষ্ঠ ও অকপট। অতঃপর, যুক্তি ও কারণ বর্ণনা পূর্বক বলা হইয়াছে কেন মো’মেনরা কাফেরদের উপর জয় লাভ করিবে এবং কাফেররা সত্যের মোকাবিলায় ব্যর্থতায় পর্যবসিত হইবে। যুগে যুগে প্রদর্শিত এই ঐশী ব্যবস্থাকে বুঝাইবার জন্য সূরাটিতে কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত পেশ করিয়া বলা হইয়াছে যে, এক সময় যাহারা পার্থিব শক্তি ও সম্পদে শক্তিশালী এবং সংখ্যায় অধিক ছিল, তাহারাও বাহ্যিক দৃষ্টিতে দুর্বল আল্লাহ্র নবী-রসূলদের সাথে মোকাবিলা করিয়া পরিণামে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। হযরত নূহ (আঃ), হুদ (আঃ), সালেহ (আঃ), লুত (আঃ), শোআয়ব(আঃ)-এর কওমের ধ্বংসপ্রাপ্ত হওয়ার ঘটনা সেই সত্যেরই বাস্তব প্রমাণ। অতঃপর, সূরাটিতে হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উল্লেখও করা হইয়াছে, যদিও তাহা হযরত লুত (আঃ)-এর ঘটনার সঙ্গিত প্রসঙ্গক্রমে আসিয়াছে। হযরত ইবরাহীম (আঃ)-এর উল্লেখের পর হযরত মূসা (আঃ) সম্পর্কেও এক সংক্ষিপ্ত বর্ণনা দেওয়া হইয়াছে। অবশ্য এই বর্ণনায় বনী ইস্রাঈল সম্পর্কে প্রত্যক্ষ কোন উল্লেখ নাই, বরং ফেরাউনের সীমাতিক্রম ও অন্যায় আচরণের উল্লেখ করা হইয়াছে যে, ফেরাউন ঐশী নির্দেশ অস্বীকারের পরিণামস্বরূপ তাহার উদ্ধত কওমসহ ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছিল।
অতঃপর, মো’মেনদেরকে সতর্ক করা হইয়াছে যেন তাহারা ঐ সমস্ত লোকের সঙ্গে সম্পর্ক না রাখে যাহাদের উপর ঐশী শাস্তি নির্ধারিত হইয়া রহিয়াছে। কেননা, এমতাবস্থায় উহাদের জন্য নির্ধারিত শাস্তিতে তাহারাও নিপতিত হইয়া পড়িতে পারে। অতঃপর, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-কে ঐ সমস্ত অবিশ্বাসীদের ধ্বংসাত্মক পরিণতি সম্পর্কে অযথা চিন্তা করিতে বারণ করা হইয়াছে, যাহারা বারবার সতর্ক করা সত্বেও সত্যকে গ্রহণ করে নাই। বস্তুতঃ তাহারা কখনই সত্যকে গ্রহণ করিবে না, যেভাবে পূর্ববর্তী অনেক নবীদের কওমও সত্যকে গ্রহণ করে নাই এবং পরিণামে ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়াছে। এই সূরায় ঐশী আযাবের এমন কিছু ঘটনার দৃষ্টান্ত পেশ করা হইয়াছে এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মহান দায়িত্বের প্রতি এইভাবে আলোকপাত করা হইয়াছে যে, হাদীসের রেওয়ায়াত অনুযায়ী আমরা জানিতে পারি যে, স্বয়ং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) বলিয়াছেন, “সূরা হুদ আমার অকাল বার্ধক্য আনিয়া দিয়াছে” (মনসুর)। এই বাণীর আসল তাৎপর্য ইহাই যে, ঐশী শাস্তি বিষয়ক সূরা হুদের বিষয়বস্তু হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর কোমল হৃদয়ে এত গভীর মর্মপীড়ার উদ্রেক করিত যে, কাফেরদের উপর ঐশী আযাবের চিন্তায় তিনি উদ্বিগ্ন থাকিতেন। এই উদ্বিগ্নতার ভাবটিই, রহমাতুল্লিল আলামীন হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মানস-পটে জাগরূক থাকিত। তদুপরি, যথাযথভাবে মো’মেনদের তা’লীম-তররীয়াতের মহান দায়িত্ব তো ছিলই, এই উভয়বিধ চিন্তার ফলেই তাঁহার অকাল বার্ধক্য আসিয়া গিয়াছিল। অবশ্য, পরিশেষে হযরত রসূলে করীম (সাঃ)-এর অনুসারীদের জন্য যে মহান বিজয় ও উন্নতি নির্ধারিত রহিয়াছে উহার সুসংবাদসহ তাহাকে সান্তনা দেওয়া হইয়াছে এবং সর্বাবস্থায় একমাত্র আল্লাহ্রই উপর তাঁহাকে বিশ্বাস ও ভরসা স্থাপন করিতে বলা হইয়াছে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
الٓرٰ ۟ کِتٰبٌ اُحۡکِمَتۡ اٰیٰتُہٗ ثُمَّ فُصِّلَتۡ مِنۡ لَّدُنۡ حَکِیۡمٍ خَبِیۡرٍ ۙ﴿۲﴾
اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰہَ ؕ اِنَّنِیۡ لَکُمۡ مِّنۡہُ نَذِیۡرٌ وَّبَشِیۡرٌ ۙ﴿۳﴾
وَّاَنِ اسۡتَغۡفِرُوۡا رَبَّکُمۡ ثُمَّ تُوۡبُوۡۤا اِلَیۡہِ یُمَتِّعۡکُمۡ مَّتَاعًا حَسَنًا اِلٰۤی اَجَلٍ مُّسَمًّی وَّیُؤۡتِ کُلَّ ذِیۡ فَضۡلٍ فَضۡلَہٗ ؕ وَاِنۡ تَوَلَّوۡا فَاِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡکُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ کَبِیۡرٍ ﴿۴﴾
اِلَی اللّٰہِ مَرۡجِعُکُمۡ ۚ وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۵﴾
اَلَاۤ اِنَّہُمۡ یَثۡنُوۡنَ صُدُوۡرَہُمۡ لِیَسۡتَخۡفُوۡا مِنۡہُ ؕ اَلَا حِیۡنَ یَسۡتَغۡشُوۡنَ ثِیَابَہُمۡ ۙ یَعۡلَمُ مَا یُسِرُّوۡنَ وَمَا یُعۡلِنُوۡنَ ۚ اِنَّہٗ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۶﴾
وَمَا مِنۡ دَآبَّۃٍ فِی الۡاَرۡضِ اِلَّا عَلَی اللّٰہِ رِزۡقُہَا وَیَعۡلَمُ مُسۡتَقَرَّہَا وَمُسۡتَوۡدَعَہَا ؕ کُلٌّ فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۷﴾
وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ وَّکَانَ عَرۡشُہٗ عَلَی الۡمَآءِ لِیَبۡلُوَکُمۡ اَیُّکُمۡ اَحۡسَنُ عَمَلًا ؕ وَلَئِنۡ قُلۡتَ اِنَّکُمۡ مَّبۡعُوۡثُوۡنَ مِنۡۢ بَعۡدِ الۡمَوۡتِ لَیَقُوۡلَنَّ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ ہٰذَاۤ اِلَّا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۸﴾
وَلَئِنۡ اَخَّرۡنَا عَنۡہُمُ الۡعَذَابَ اِلٰۤی اُمَّۃٍ مَّعۡدُوۡدَۃٍ لَّیَقُوۡلُنَّ مَا یَحۡبِسُہٗ ؕ اَلَا یَوۡمَ یَاۡتِیۡہِمۡ لَیۡسَ مَصۡرُوۡفًا عَنۡہُمۡ وَحَاقَ بِہِمۡ مَّا کَانُوۡا بِہٖ یَسۡتَہۡزِءُوۡنَ ﴿٪۹﴾
وَلَئِنۡ اَذَقۡنَا الۡاِنۡسَانَ مِنَّا رَحۡمَۃً ثُمَّ نَزَعۡنٰہَا مِنۡہُ ۚ اِنَّہٗ لَیَـُٔوۡسٌ کَفُوۡرٌ ﴿۱۰﴾