يونس
Yunus
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ১১০ আয়াত এবং ১১ রুকু আছে।
নাযেল হওয়ার সময় ও স্থান
এই সূরাটি মক্কী জীবনের শেষ পর্যায়ে অর্থাৎ নবী করীম (সাঃ)-এর মক্কায় অবস্থানের শেষ চার কি পাঁচ বৎসর সময়ে অবতীর্ণ হইয়াছিল। কতিপয় তফসীরকারক এই সূরার কোন কোন আয়াত মদীনায় অবতীর্ণ হইয়াছে বলিয়া মত প্রকাশ করিয়াছেন, যদিও ঐতিহাসিক তথ্যের ভিত্তিতে তাহাদের এই অভিমতকে দাঁড় করানো যায় না। বিষয়-বস্তুর স্বরূপ ও বৈশিষ্ট্যের ভিত্তিতেই তাঁহারা এই ধরণের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করিয়াছিলেন বলিয়া মনে হয়। ৯৯ আয়াতে উল্লেখিত হযরত ইউনুস (আঃ)-এর নাম অনুসারে এই সূরাটির নামকরণ করা হইয়াছে।
বিষয়বস্তু
কুরআনের বিষয়বস্তু নিয়া চিন্তা করিলে দেখা যায় যে, ইহার আয়াত সমূহ শুধু পরস্পর সম্বন্ধযুক্তই নয় বরং প্রত্যেক সূরা ইহার পূর্ববতী এবং পরবর্তী সূরার সহিত এক সূক্ষ্ম সম্পর্কে আবদ্ধ। তদুপরি, কুরআনের বিশেষ কতিপয় সূরা অপর কতক সূরার সহিত সন্নিবদ্ধ এবং এইভাবে সমস্ত কুরআন শরীফের মধ্যে এক সুশৃঙ্খল বিন্যাস বিদ্যমান। কুরআনের বিভিন্ন সূরা একে অপরের সাথে একাধিক উপায়ে সম্পর্কযুক্ত এবং যখন ইহাদের ক্রম ও বিন্যাস সম্পর্কে চিন্তা করা যায়, তখন এই বিষয়ে কোন সন্দেহের অবকাশ থাকে না যে, বাস্তবিকই রচনা শৈলীর দিক হইতে কুরআন এক মহান বিস্ময়। বর্তমান সূরাটি ইহার পূর্ববতী সূরার সহিত তিন দিক হইতে সম্পর্কযুক্ত। প্রথমে, ইহা পূর্ববতী সূরার ধারাবাহিকতা বজায় রাখিয়াছে। যেমন, উহার শেষাংশে দুইটি বিষয়ের উল্লেখ করা হইয়াছিলঃ (ক) কুরআনের কোন কোন সূরার নাযেল এবং কাফেরগণ কর্তৃক উহার প্রত্যাখ্যান (৯ঃ১২৭) এবং (খ) আল্লাহ্র পক্ষ হইতে এক রসূল (হযরত মুহম্মদ (সাঃ) প্রেরণ ও তাঁহার শিক্ষা অনুসরণের উপকারিতা (৯ঃ১২৬)। এই সূরাতে উক্ত বিষয়বস্তুর সম্প্রসারণ করিয়া বলা হইয়াছে যে, বস্তুতঃ কুরআন হইতেছে জ্ঞানময় গ্রন্থ, যাহার মধ্যে বিভিন্ন কল্যাণ নিহিত (১০ঃ২) এবং এই ঐশী-বাণীপ্রাপক হযরত রসূল করীম (সাঃ) তাহাদের (মানুষদের) মধ্য থেকেই উদ্ভূত (১০ঃ৩)। দ্বিতীয়তঃ পূর্ববর্তী সূরার বিষয়বস্তুও এই সূরার মধ্যে পরিপূর্ণতা লাভ করিয়াছে । যেমন, উক্ত সূরাতে (যাহা কোন আলাদা সূরা ছিল না, বরং ইহার পূর্ববতী সূরার অংশ বিশেষ ছিল) উল্লেখ করা হইয়াছিল যে, ইসলামের বিজয় ও প্রাধান্যের সময় সমাগত এবং এতদসংক্রান্ত আল্লাহ্তা’লার প্রতিশ্রুতি পূর্ণ শান-শওকতের সহিত পরিপূর্ণতা লাভ করিতে যাইতেছে। সুতরাং মো’মেনদেরকে উৎসাহিত করা হইয়াছিল যাহাতে তাহারা নিজেদের হৃদয়কে পরিশুদ্ধ করে যেন আল্লাহ্তা’লা তাহাদের তওবা কবুল করেন। যেহেতু কোন কোন লোকের হৃদয়ে এই সন্দেহের উদ্রেক হইতে পারে যে, তাহাদের পাপের আধিক্যের কারণে হয়তো তাহাদের তওবা গৃহীত হইবে না, তাই এই সূরাতে বলা হইয়াছে যে, আল্লাহ্র রহমত সমস্ত কিছুকে ঘিরিয়া রহিয়াছে এবং ইহা সমস্ত কিছুকেই অতিক্রম করিয়া যায়—যদিও ইহার জন্য সর্বোত্তম অনুশোচনার প্রয়োজন। তৃতীয়তঃ ২ সূরা হইতে ৯ সূরা (যাহারা সংখ্যায় ৭টি, কেননা, পূবেই বলা হইয়াছে যে ৯ সূরাটি কোন আলাদা সূরা নয়, বরং ৮ সূরারই অংশ বিশেষ এবং বিষয় বস্তুর গুরুত্বকে বুঝাইবার জন্যই ইহাকে আলাদাভাবে পেশ করা হইয়াছে) একটি বিশেষ ধরণের প্রসঙ্গকে উপস্থাপন করিয়াছে। কিন্তু এই সূরা হইতে ১৬ সূরা পর্যন্ত সূরাগুলিতে অন্য ধরণের প্রসঙ্গ উপস্থাপিত হইয়াছে। যদিও এই দ্বিতীয় পর্বের সূরাগুলিতে একটু স্বতন্ত্র ও পৃথক ধরণের প্রসঙ্গ বর্ণিত হইয়াছে, তথাপি বিষয়বস্তুর দিক হইতে আবার প্রথম পর্যায়ের সূরার সাথে ইহাদের গভীর সম্পর্ক রহিয়াছে। প্রথম অংশের সূরাগুলিতে হযরত রসূলে করীম (সাঃ) ও তাঁহার সম্পাদিত কাজকর্মের উল্লেখ করিয়া ইসলামের সত্যতা প্রতিপন্ন করা হইয়াছে। সঙ্গে সঙ্গে ইসলামের উন্নত নীতি-পদ্ধতি, ইহার শিক্ষার সৌন্দর্য, সত্যান্বেষীদের জন্য ইহার আধ্যাত্মিক জ্ঞানের গভীরতা ও অন্তর্নিহিত তাৎপর্য এবং ইহার অসাধারণ প্রভাবকে তুলিয়া ধরিয়া ইসলাম গ্রহণের জন্য তাহাদেরকে আহ্বান জানানো হইয়াছে। দ্বিতীয় পর্যায়ের সূরাগুলিতে, যাহার মধ্যে ১০ সূরা হইতে ১৮ সূরাসমূহ অন্তর্ভুক্ত রহিয়াছে, বিশেষ করিয়া নবুওয়াতের বৈশিষ্ট্য ও মানদণ্ড, অতীতের নবী রসূলদের দাবী ও ইতিহাস, মানব বিবেক ও যুক্তিসঙ্গত বিষয়াদি তুলিয়া ধরিয়া নবুওয়াতের প্রয়োজনীয়তা, ধর্মের গুরুত্ব এবং হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাবের উদ্দেশ্যকে অধিক গুরুত্ব সহকারে বর্ণনা করা হইয়াছে।
কাজেই দেখা যাইতেছে যে, উভয় পর্যায়ের সূরা সমূহের মধ্যেই বিষয়বস্তুর দিক হইতে নিবিড় সম্পর্ক বিদ্যমান। পার্থক্য হইল এই যে, প্রথম পর্যায়ের সূরাগুলিতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাব সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণী অথবা পূর্বের কোন নবী রসূলের ভবিষদ্বাণীর পূর্ণতা এবং এইভাবে আঁঃ হযরত (সাঃ)-এর সত্যতার প্রমাণাদির বিষয়ে উল্লেখ করা হইয়াছে। অন্য দিকে, দ্বিতীয় পর্যায়ের সূরাগুলিতে নিজস্ব বৈশিষ্ট্যের আলোকে এবং নবুওয়াতের নৈতিক ও ব্যবহারিক আদর্শের ভিত্তিতে ইসলামের সত্যতাকে বর্ণনা করা হইয়াছে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
الٓرٰ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡکِتٰبِ الۡحَکِیۡمِ ﴿۲﴾
اَکَانَ لِلنَّاسِ عَجَبًا اَنۡ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلٰی رَجُلٍ مِّنۡہُمۡ اَنۡ اَنۡذِرِ النَّاسَ وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اَنَّ لَہُمۡ قَدَمَ صِدۡقٍ عِنۡدَ رَبِّہِمۡ ؕؔ قَالَ الۡکٰفِرُوۡنَ اِنَّ ہٰذَا لَسٰحِرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۳﴾
اِنَّ رَبَّکُمُ اللّٰہُ الَّذِیۡ خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ فِیۡ سِتَّۃِ اَیَّامٍ ثُمَّ اسۡتَوٰی عَلَی الۡعَرۡشِ یُدَبِّرُ الۡاَمۡرَ ؕ مَا مِنۡ شَفِیۡعٍ اِلَّا مِنۡۢ بَعۡدِ اِذۡنِہٖ ؕ ذٰلِکُمُ اللّٰہُ رَبُّکُمۡ فَاعۡبُدُوۡہُ ؕ اَفَلَا تَذَکَّرُوۡنَ ﴿۴﴾
اِلَیۡہِ مَرۡجِعُکُمۡ جَمِیۡعًا ؕ وَعۡدَ اللّٰہِ حَقًّا ؕ اِنَّہٗ یَبۡدَؤُا الۡخَلۡقَ ثُمَّ یُعِیۡدُہٗ لِیَجۡزِیَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ بِالۡقِسۡطِ ؕ وَالَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَہُمۡ شَرَابٌ مِّنۡ حَمِیۡمٍ وَّعَذَابٌ اَلِیۡمٌۢ بِمَا کَانُوۡا یَکۡفُرُوۡنَ ﴿۵﴾
ہُوَ الَّذِیۡ جَعَلَ الشَّمۡسَ ضِیَآءً وَّالۡقَمَرَ نُوۡرًا وَّقَدَّرَہٗ مَنَازِلَ لِتَعۡلَمُوۡا عَدَدَ السِّنِیۡنَ وَالۡحِسَابَ ؕ مَا خَلَقَ اللّٰہُ ذٰلِکَ اِلَّا بِالۡحَقِّ ۚ یُفَصِّلُ الۡاٰیٰتِ لِقَوۡمٍ یَّعۡلَمُوۡنَ ﴿۶﴾
اِنَّ فِی اخۡتِلَافِ الَّیۡلِ وَالنَّہَارِ وَمَا خَلَقَ اللّٰہُ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ لَاٰیٰتٍ لِّقَوۡمٍ یَّتَّقُوۡنَ ﴿۷﴾
اِنَّ الَّذِیۡنَ لَا یَرۡجُوۡنَ لِقَآءَنَا وَرَضُوۡا بِالۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا وَاطۡمَاَنُّوۡا بِہَا وَالَّذِیۡنَ ہُمۡ عَنۡ اٰیٰتِنَا غٰفِلُوۡنَ ۙ﴿۸﴾
اُولٰٓئِکَ مَاۡوٰٮہُمُ النَّارُ بِمَا کَانُوۡا یَکۡسِبُوۡنَ ﴿۹﴾
اِنَّ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ یَہۡدِیۡہِمۡ رَبُّہُمۡ بِاِیۡمَانِہِمۡ ۚ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہِمُ الۡاَنۡہٰرُ فِیۡ جَنّٰتِ النَّعِیۡمِ ﴿۱۰﴾