৯

التوبة

সূরা আত্‌ তাওবা

At-Taubah

মাদানী ১২৯ আয়াত ১৬ রুকু পারা ১০–১১

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, ইহাতে ১২৯ আয়াত এবং ১৬ রুকু আছে।

بَرَآءَۃٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖۤ اِلَی الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ؕ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌ ও তাঁহার রসূলের পক্ষ হইতে মোশরেকদের মধ্য হইতে সেই সকল লোকের নিকট দায়িত্ব-মুক্তির ঘোষণা১১৫০ যাহাদের সহিত তোমরা অঙ্গীকার১১৫১ করিয়াছিল (যে আরবে ইসলাম জয়লাভ করিবে)।
১১৫০। “বারায়াতুন” অর্থ সমর্থন ঘোষণা, মওকুফ করা, দোষ-ত্রুটি বা দায়িত্ব প্রভৃতি হইতে নিষ্কৃতি বা ক্ষমা প্রাপ্তি, কোন দাবী হইতে রেহাই বা মুক্তি লাভ, সম্পর্কচ্ছেদ করা, রোগ মুক্তি লাভ করা ইত্যাদি (তাজ, মুফরাদাত)।
১১৫১। ‘আহাদ’ শব্দ এখানে সন্ধি বা মৈত্রী চুক্তিতে আবদ্ধ হওয়া অর্থে ব্যবহার করা হয় নাই, বরং অঙ্গীকারাবদ্ধ বা পবিত্র প্রতিশ্রুতি হিসাবে ব্যবহৃত হইয়াছে যাহা কাহাকেও বাধ্য-বাধকতার বাধনে আবদ্ধ করে (লিসান)। এই আয়াতে এক পবিত্র ঘোষণা দেওয়া আছে যে, ইসলাম এবং নবী করীম (সাঃ) মক্‌কার পতনের দ্বারা সম্পূর্ণরূপে সত্য বলিয়া প্রমাণিত হইয়াছেন। হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) যখন মক্‌কা হইতে বন্ধুহীন অসহায় অবস্থায় বিতাড়িত হইতেছিলেন ও তাঁহার কর্তিত মস্তকের জন্য পুরস্কার ঘোষণা করা হইতেছিল, ঠিক সেই সময়ে দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ইহা ঘোষণা করা হইয়াছিল যে, তিনি বিজয় গৌরবে মক্‌কায় প্রত্যাবর্তন করিবেন (২৮ঃ৮৬) এই ভবিষ্যদ্বাণী মক্‌কার পতনে এবং সমস্ত আরব ভূখণ্ডে ইসলামের শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার মাধ্যমে পূর্ণ হইয়াছিল। এইরূপে নবী করীম (সাঃ) সত্য রূপে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিলেন এবং মক্‌কাবাসীদের দাবী ছিল যে, বারংবার ঘোষণার পূর্ণতারূপে মক্‌কা তাঁহার করতলগত হওয়া উচিৎ ছিল— এই অভিযোগ হইতে মুক্ত হইয়াছিলেন। আরো দেখুন সূরা আনফালের ভূমিকা।

فَسِیۡحُوۡا فِی الۡاَرۡضِ اَرۡبَعَۃَ اَشۡہُرٍ وَّاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ غَیۡرُ مُعۡجِزِی اللّٰہِ ۙ وَاَنَّ اللّٰہَ مُخۡزِی الۡکٰفِرِیۡنَ ﴿۲﴾

২
সুতরাং তোমরা সমগ্র দেশে চার মাস বিচরণ কর এবং জানিয়া রাখ যে, তোমরা কখনও আল্লাহ্‌কে (তাঁহার পরিকল্পনায়)১১৫২ বিফল করিতে পারিবে না এবং নিশ্চয় আল্লাহ্‌ কাফেরদিগকে লাঞ্ছিত করিবেন।
১১৫২। মক্‌কার পতনের সাথে এবং হুনায়নের যুদ্ধে হাওয়াযিনদের পরাজয়ে ইসলামের শাসন এবং কর্তৃত্ব সমগ্র হেজাযের উপর পূর্ণরূপে প্রতিষ্ঠিত হইয়াছিল। কোন কোন উপজাতি মুসলমানগণের সহিত সন্ধি স্থাপন করিয়াছিল এবং অস্ত্র পরিত্যাগ করিয়াছিল। এই সন্ধি অবশ্য পালনীয় ছিল। কিন্তু অন্যান্য উপজাতিও ছিল, যাহারা আনুষ্ঠানিকভাবে বা প্রচলিত প্রথানুযায়ী আত্মসমর্পণ করে নাই, তাহারা তাহাদের অস্ত্র পরিহার করে নাই এবং মুসলমানদিগের সহিত এরূপ সন্ধি-চুক্তিও করে নাই যে, তাহারা শান্তি রক্ষা ও আইন শৃংখলা মানিয়া চলার নিশ্চয়তা বিধান করিবে। তাহারা মুসলমানদের বিরুদ্ধে বিরোধিতা শুরু করিয়াছিল, এবং যদিও কার্যতঃ তাহারা পরাভূত হইয়াছিল, তথাপি তাহারা না পরাজয় স্বীকার করিয়াছিল, না তাহারা মুসলমানদের সঙ্গে বসবাস করিতে রাজি ছিল। এই সকল উপজাতির বিরুদ্ধে অভিযান চার মাসের জন্য স্থগিত রাখা হইয়াছিল। উহাদিগকে দেশের সর্বত্র স্বাধীন ভাবে চলিতে দেওয়া হইয়াছিল যাহাতে তাহারা ভালভাবে বুঝিতে পারে যে, মুসলমানদিগকে আর বাধা দিলে ব্যর্থ হইতে হইবে, তখন তাহারা আত্মসমর্পণ করিবে এবং সন্ধি স্থাপন করিবে। এই সকল গোত্রের প্রতি এই আয়াত ইশারা করিতেছে।

وَاَذَانٌ مِّنَ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖۤ اِلَی النَّاسِ یَوۡمَ الۡحَجِّ الۡاَکۡبَرِ اَنَّ اللّٰہَ بَرِیۡٓءٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ۬ۙ وَرَسُوۡلُہٗ ؕ فَاِنۡ تُبۡتُمۡ فَہُوَ خَیۡرٌ لَّکُمۡ ۚ وَاِنۡ تَوَلَّیۡتُمۡ فَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّکُمۡ غَیۡرُ مُعۡجِزِی اللّٰہِ ؕ وَبَشِّرِ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا بِعَذَابٍ اَلِیۡمٍ ۙ﴿۳﴾

৩
এবং আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলের পক্ষ হইতে হজ্জেআকবর (মহোত্তর ও বৃহত্তর হজ্জ)-এর১১৫৩ দিন জনসাধারণের প্রতি এই ঘোষণা যে১১৫৩-ক, আল্লাহ্‌ মোশরেকদের নিকট হইতে দায়িত্ব মুক্ত১১৫৪ এবং তাঁহার রসূলও। সুতরাং যদি তোমরা তওবা কর তাহা হইলে ইহা তোমাদের জন্য কল্যাণজনক হইবে এবং যদি তোমরা বিমুখ হও তাহা হইলে জানিয়া রাখ যে, তোমরা আল্লাহ্‌কে (পরিকল্পনায়) বিফল করিতে পারিবে না। এবং যাহারা অবিশ্বাস করিয়াছে তাহাদিগকে শাস্তির সংবাদ দাও,
১১৫৩। “হজ্জে আকবর” অর্থাৎ মহোত্তর ও বৃহত্তর হজ্জ। উহাকে হজ্জে আকবর বলা হইয়াছিল কারণ ইহাই সর্বপ্রথম হজ্জ ছিল, যাহা মুসলমানদের নিয়ন্ত্রণে পালন করা হইয়াছিল।
১১৫৩-ক। “আযান” অর্থ সতর্কীকরণ, প্রকাশ্য ঘোষণা বা আহ্বান (লেইন)।
১১৫৪। কার্যতঃ পূর্ববর্তী আয়াতে যেখানে “বারাআতুন” শব্দ দ্বারা সত্যতা প্রতিষ্ঠার ঘোষণাকে অর্থাৎ ইসলামের পূর্ণ বিজয়ের অঙ্গীকার বা ভবিষ্যদ্বাণী বাস্তবে পূর্ণ হওয়াকে বুঝায়, তদ্বিপরীতে বর্তমান আয়াতে ঐ শব্দ দ্বারা কোন ব্যক্তি বা বস্‌তু হতে দোষমুক্ত হওয়া বুঝায়, অর্থাৎ তাহার বা ইহার সঙ্গে আর কিছু করণীয় নাই (লেইন)। বর্তমান আয়াত এবং ইহার পরবর্তী আয়াতের অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা ৯ঃ১-২ আয়াতদ্বয়ে অন্তর্ভুক্ত ঘোষণা হইতে ভিন্ন, কারণ বস্তুতঃ ৯ঃ১-২ আয়াতদ্বয়ে এই সত্য প্রতিপাদিত করা হইয়াছে যে, পৌত্তলিকদিগের নিকট আঁ-হযরত (সাঃ) কর্তৃক দেওয়া প্রতিশ্রুতি পূর্ণতা লাভ করিয়াছিল; পক্ষান্তরে বর্তমান আয়াত হইতেছে তাহাদের সহিত সকল প্রকার সম্পর্কচ্ছেদ সম্পর্কিত। সম্বন্ধের বিচ্ছেদ দ্বারা ইহা মনে করা সমীচীন হইবে না যে,এই আয়াত মুসলমানদিগকে সকল সন্ধি-চুক্তি হইতে অব্যাহতি দিয়াছে বা মুক্ত বলিয়া ঘোষণা করিয়াছে, কারণ যেমন পরবর্তী আয়াত ইহা সুস্পষ্ট করিয়া দিয়াছে যে, সন্ধি-চুক্তি সকল ক্ষেত্রে পালনীয় এবং অলঙ্ঘনীয়। নবম হিজরী সনে তাবুকের যুদ্ধ হইতে প্রত্যাবর্তনের পর নবী করীম (সাঃ) হযরত আলী (রাঃ)-কে তাঁহার প্রতিনিধিরূপে হজ্জে আকবর-এর অনুষ্ঠানে মক্‌কায় প্রেরণ করিলেন। সেখানে তিনি প্রকাশ্যে ঘোষণা করিয়াছিলেনঃ (১) “এই বৎসরের পরে কোন পৌত্তলিক বায়তুল্লাহ্ অর্থাৎ কা’বা শরীফের নিকটবর্তী হইতে পারিবে না, (২) যাহারা আত্মসমর্পণ করে নাই এইরূপ পৌত্তলিক গোত্রগুলির সহিত রসূল করীম (সাঃ)-এর কৃত সন্ধি বা চুক্তিপত্রসমূহ বহাল থাকিবে এবং তাহাদের চুক্তির মেয়াদ পর্যন্ত বিশ্বস্ততার সহিত উহা মানিয়া চলা হইবে। কিন্তু যাহাদের সহিত নবী করীম (সাঃ) সন্ধি বা শান্তি চুক্তিতে আবদ্ধ বা যাহারা তাঁহার নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করিয়াছে, তাহারা ব্যতীত কোন পৌত্তলিক হেজাযে থাকিতে পারিবে না”। পৌত্তলিক গোত্রগুলির অপরিবর্তিত বিশ্বাসঘাতী আচরণ দ্বারা এবং পবিত্র চুক্তির অস্বীকার দ্বারা হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর তাবুক অভিযানের জন্য মদীনা হইতে অনুপস্থিত কালে (৮ঃ৫৭) ব্যাপক আকারে চুক্তি লংঘন করায় এই আদেশ কেবল সম্পূর্ণ ন্যায়-সঙ্গতই ছিল না বরং অন্যান্য রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক বিবেচনাতেও এই ঘোষণা জরুরী ছিল। হেজায যখন মুসলিম জাতির ধর্মীয় এবং রাজনৈতিক কেন্দ্রে পরিণত হইয়া গিয়াছিল তখন ইহার স্বার্থ সংরক্ষণার্থে সময়ের এই চাহিদাই ছিল যে, সকল অসঙ্গত এবং ক্ষতিকারক আদি কারণসমূহ যাহা ইহার অখণ্ডতার প্রতি হুমকী স্বরূপ হইতে পারে এবং সদ্য প্রতিষ্ঠিত বর্দ্ধীষ্ণু মুসলমান সম্প্রদায়ের জন্য বিপজ্জনক হইতে পারে, তাহা হইতে ইহাকে মুক্ত করা।

اِلَّا الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ ثُمَّ لَمۡ یَنۡقُصُوۡکُمۡ شَیۡئًا وَّلَمۡ یُظَاہِرُوۡا عَلَیۡکُمۡ اَحَدًا فَاَتِمُّوۡۤا اِلَیۡہِمۡ عَہۡدَہُمۡ اِلٰی مُدَّتِہِمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۴﴾

৪
কিন্তু মোশরেকদের মধ্যে তাহারা ব্যতীত যাহাদের সহিত তোমরা অঙ্গীকারাবদ্ধ হইয়াছ, অতঃপর তাহারা তোমাদের সহিত অঙ্গীকার পালনে কোন ত্রুটি করে নাই এবং তোমাদের বিরুদ্ধে তাহারা কাহাকেও সাহায্য করে নাই।১১৫৫ সুতরাং তোমরা তাহাদের সহিত তাহাদের অঙ্গীকার উহাদের নির্ধারিত সময় পর্যন্ত পূর্ণ কর, নিশ্চয় আল্লাহ্‌ মুত্তাকীগণকে ভালবাসেন।
১১৫৫। এই সকল গোত্রগুলি ছিল বনু খুযাহ্‌, বনু মুদ্‌লিজ, বনু বক্‌র, বনু দাম্‌রাহ এবং বনু সুলাইম গোত্রের কিছু সংখ্যক লোক। প্রসঙ্গক্রমেই এই আয়াত, ইসলাম কোন চুক্তি এবং সন্ধিরশর্তাদিকে কিরূপ পবিত্র গণ্য করে, তাহা অত্যন্ত চিত্তাকর্ষকভাবে তুলিয়া ধরিয়াছেন।

فَاِذَا انۡسَلَخَ الۡاَشۡہُرُ الۡحُرُمُ فَاقۡتُلُوا الۡمُشۡرِکِیۡنَ حَیۡثُ وَجَدۡتُّمُوۡہُمۡ وَخُذُوۡہُمۡ وَاحۡصُرُوۡہُمۡ وَاقۡعُدُوۡا لَہُمۡ کُلَّ مَرۡصَدٍ ۚ فَاِنۡ تَابُوۡا وَاَقَامُوا الصَّلٰوۃَ وَاٰتَوُا الزَّکٰوۃَ فَخَلُّوۡا سَبِیۡلَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۵﴾

৫
এবং যখন নিষিদ্ধ মাস সমূহ১১৫৫-ক অতিক্রান্ত হইবে তখন তোমরা মোশরেকদের১১৫৬ (এই বিশেষ দলকে) যেখানে পাও হত্যা কর, তাহাদিগকে গ্রেফতার কর, তাহাদিগকে অবরুদ্ধ কর, এবং তাহাদের জন্য প্রত্যেক ঘাঁটিতে ওঁৎ পাতিয়া থাক। কিন্তু যদি তাহারা তওবা করে এবং নামায কায়েম করে ও যাকাত দেয় তাহা হইলে তাহাদের পথ ছাড়িয়া দাও।১১৫৭ নিশ্চয় আল্লাহ্‌ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।
১১৫৫-ক। “নিষিদ্ধ মাসসমূহ” হইল জিল্‌কদ্‌, জিল্‌হজ্জ, মুহাররম এবং রজব; প্রথম তিনটি হইল হজ্জে আকবর-এর মাস, পরন্তু শেষের মাসটিতে আরবগণ সাধরণতঃ ওমরাহ্ পালন করিত (২ঃ১৯৫ ও ২ঃ২১৮)। “আশ্‌শাহ্‌রুল হারাম” উক্তির অর্থ “পবিত্র মাসসমূহ” নহে, বরং “নিষিদ্ধ মাসসমূহ” এবং ইহা উপরে ৯ঃ২ আয়াতে উল্লেখিত চার মাস। উক্ত মাসগুলিতে উল্লেখিত পৌত্তলিকদিগকে দেশের সর্বত্র নির্ভয়ে ভ্রমণ করিতে অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল যাহাতে তাহারা নিজেরাই দেখিয়া বুঝিতে পারে যে, ইসলাম বিজয়ী হইয়াছিল কি না এবং আল্লাহ্‌তা’লার কথা পূর্ণ হইয়াছিল কি না। এবং যে সময়ের মধ্যে সকল শত্রুতা বা সংগ্রাম স্থগিত রাখা হইয়াছিল, সেই সময়সীমা অতিক্রান্ত হইয়া গেলে প্রকাশ্যে স্বীকৃত ইসলামের এমন সব শত্রুদের বিরুদ্ধে জেহাদ পুনরারম্ভ করা হইয়াছিল যাহারা নিজেদের মধ্যে বিরুদ্ধাচরণ শুরু করিয়াছিল এবং বারংবার তাহাদের প্রতিশ্রুত চুক্তি ভঙ্গ করিতেছিল। এই চূড়ান্ত শর্তের যথার্থতা ৯ঃ৮-১৩ আয়াত সমূহে বর্ণিত হইয়াছে। যে সকল পৌত্তলিক অবিশ্বস্ততা ও বিশ্বাসঘাতকতার কারণে দোষী ছিল না, তাহাদিগকে নিরাপত্তা দেওয়া হইয়াছিল (৯:৪,৭)।
১১৫৬। যে সকল পৌত্তলিক মুসলমানদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়াছিল এবং তখন পর্যন্ত তাহাদের নূতন সন্ধির প্রস্তাব করে নাই তাহাদিগকে বুঝাইতেছে।
১১৫৭। যাহাদের হাতে মুসলমানগণ নিদারুণ যন্ত্রণাদায়ক ক্ষতির শিকার হইয়াছিল, সেইরূপ শত্রুদিগকেও ক্ষমা করা হইত যদি তাহারা অনুতপ্ত হইয়া স্বেচ্ছায় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিত। প্রকৃত ঘটনা ছিল এই যে, পৌত্তলিকদের মধ্যে এমন অনেক লোক ছিল যাহারা অন্তরের অন্তঃস্থলে ইসলামের সত্যতা সম্বন্ধে নিশ্চিত হইয়াছিল, কিন্তু হয় অহংকার বশতঃ বা নির্যাতনের ভয়ে অথবা এইরূপ অন্যান্য কারণে তাহাদের ঈমানকে প্রকাশ করিতে বিরত থাকিত। এই আয়াত উক্ত প্রকার লোকদিগকে নিশ্চয়তা দিয়াছিল যে, তাহাদিগের মধ্যে যদি কেহ ইসলাম ধর্মের উপর এমন কি যুদ্ধ চলাকালীন সময়েও ঈমান আনার কথা প্রকাশ করিত, তাহা হইলেও তাহার এই স্বীকৃতি কপটতাপূর্ণ বা জীবন রক্ষার জন্য বলিয়া ধরিয়া নেওয়া হইত না। বরং তাহাকে মুসলমান বলিয়াই গণ্য করা হইত।

وَاِنۡ اَحَدٌ مِّنَ الۡمُشۡرِکِیۡنَ اسۡتَجَارَکَ فَاَجِرۡہُ حَتّٰی یَسۡمَعَ کَلٰمَ اللّٰہِ ثُمَّ اَبۡلِغۡہُ مَاۡمَنَہٗ ؕ ذٰلِکَ بِاَنَّہُمۡ قَوۡمٌ لَّا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿٪۶﴾

৬
এবং যদি মোশরেকদের মধ্য হইতে কেহ তোমার নিকট আশ্রয় চাহে তাহা হইলে তাহাকে আশ্রয় দাও যেন সে আল্লাহ্‌র বাণী শুনিতে পায়, অতঃপর তাহাকে তাহার নিরাপদ স্থানে পৌঁছাইয়া দাও।১১৫৮ ইহা এই জন্য যে, তাহারা এমন এক জাতি যাহারা কিছুই অবগত নহে।
সূরা আত্‌ তাওবা - রুকু ১
১১৫৮। এই আয়াত সুস্পষ্টরূপে প্রমাণ করে যে, অস্ত্রের বলে পৌত্তলিকদিগকে ইসলাম গ্রহণে বাধ্য করিতে যুদ্ধ করা হয় নাই, কারণ এই আয়াত অনুযায়ী যুদ্ধাবস্থায়ও পৌত্তলিকদিগকে মুসলিম শিবিরে অথবা কেন্দ্রস্থানে সত্যকে জানার উদ্দেশ্যে আসার অনুমতি দেওয়া হইয়াছিল। তৎপর তাহাদের নিকট সত্য প্রচার করিয়া ইসলামের শিক্ষা সম্বন্ধে তাহাদিগকে জানাইয়া দেওয়ার পর যদি তাহারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিতে অনীহা প্রকাশ করিত তাহা হইলে তাহাদিগের নিরাপদ স্থানে তাহাদিগকে পৌঁছাইয়া দেওয়া হইত। এইরূপ দেদীপ্যমান শিক্ষা সত্বেও ইসলামের বিরুদ্ধে ইহার প্রচারের জন্য পরমত-অসষ্ণিুতা বা বল-প্রয়োগ অথবা বল-প্রয়োগে প্রশ্রয়দানের অভিযোগ আরোপ করা চরম অবিচার বা যুলুম ছাড়া আর কিছুই নহে।

کَیۡفَ یَکُوۡنُ لِلۡمُشۡرِکِیۡنَ عَہۡدٌ عِنۡدَ اللّٰہِ وَعِنۡدَ رَسُوۡلِہٖۤ اِلَّا الَّذِیۡنَ عٰہَدۡتُّمۡ عِنۡدَ الۡمَسۡجِدِ الۡحَرَامِ ۚ فَمَا اسۡتَقَامُوۡا لَکُمۡ فَاسۡتَقِیۡمُوۡا لَہُمۡ ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُتَّقِیۡنَ ﴿۷﴾

৭
আল্লাহ্‌র নিকট এবং তাঁহার রসূলের নিকট (এ সকল) মোশরেকদের কিভবে চুক্তি হইতে পারে, কেবল মাত্র সেই সকল (মোশরেক) ব্যতীত যাহাদের সহিত তোমরা পবিত্র মসজিদের নিকটে চুক্তি করিয়াছিলে? সুতরাং যতক্ষণ পর্যন্ত তাহারা তোমাদের সহিত (চুক্তিতে) সুদৃঢ় থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত তোমরাও তাহাদের সহিত (চুক্তিতে) সুদৃঢ় থাক।১১৫৯ নিশ্চয় আল্লাহ্ মুত্তাকীগণকে ভালবাসেন।
১১৫৯। এই আয়াত হইতে বুঝা যায় যে, যুদ্ধের অনুমতি কেবলমাত্র সেই সকল অমুসলমানদিগের বিরুদ্ধে ছিল যাহারা বারংবার পবিত্র চুক্তি ভঙ্গ করিয়াছিল এবং বিশ্বাসঘাতকতা পূর্বক মুসলমানদের উপর আক্রমণ করিয়াছিল। বাকী আন্যান্য লোকদিগের ব্যাপারে মুসলমানগণকে আদেশ দেওয়া হইয়াছিল যে, তাহারা যেন উহাদের সহিত প্রতিশ্রুতিসমূহ বিশ্বস্ততার সঙ্গে এবং শক্তভাবে মানিয়া চলে। ৯ঃ৪ আয়াতের মত বর্তমান আয়াতও প্রতিশ্রুতি এবং সন্ধি-চুক্তি পালন করাকে সততা এবং ধার্মিকতার কাজ বলিয়া বর্ণনা করে, য়াহা আল্লাহ্তা‘লা পসন্দ করেন। কুরআন করীম অত্যন্ত জোরের সাথে এবং পুনঃ পুনঃ মুসলমানগণকে সন্ধি-চুক্তির প্রতি বিশ্বস্ততা রক্ষা করার জন্য আদেশ দিয়াছে।

کَیۡفَ وَاِنۡ یَّظۡہَرُوۡا عَلَیۡکُمۡ لَا یَرۡقُبُوۡا فِیۡکُمۡ اِلًّا وَّلَا ذِمَّۃً ؕ یُرۡضُوۡنَکُمۡ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَتَاۡبٰی قُلُوۡبُہُمۡ ۚ وَاَکۡثَرُہُمۡ فٰسِقُوۡنَ ۚ﴿۸﴾

৮
কিরূপে (ইহা হইতে পারে)? অথচ যদি তাহারা তোমাদের উপর জয়যুক্ত হয় তাহা হইলে তাহারা তোমাদের ব্যাপারে আত্মীয়তা১১৬০ ও চুক্তির১১৬১ কখনও মর্যাদা রক্ষা করিবে না। তাহারা তোমাদিগকে তাহাদের মুখের কথায় সন্তুষ্ট করে, অথচ (তাহারা যাহা বলে তাহা) তাহাদের অন্তর অস্বীকার করে, বস্তুতঃ তাহাদের অধিকাংশই দুস্কৃতিপরায়ণ।
১১৬০। “ইল্লুন” অর্থ আত্মীয়তা বা নৈকট্য, রক্তের সম্পর্ক সদ্বংশজাত, সন্ধি বা অঙ্গীকার, নিরাপত্তার জন্য প্রতিশ্রুতি বা নিশ্চয়তা (লেইন ও মুফরাদাত)।
১১৬১। “যিম্মা” অর্থ প্রতিশ্রুতি, সন্ধি, চুক্তি, অঙ্গীকার, দায়িত্ব বা কর্তব্য, প্রাপ্য বা অধিকার যাহার প্রতি অবহেলা করিলে এক ব্যক্তিকে দোষ দেওয়া হয় (লেইন)। “আহলুয যিমুাহ্” শব্দদ্বয় সেই সকল অমুসলিম গোষ্ঠীর জন্য ব্যবহৃত হয় যাহাদের সহিত মুসলিম রাষ্ট্র চুক্তি-বদ্ধ এবং যাহারা রাষ্ট্রকে মাথা পিছু কর দেয়, যাহার বিনিময়ে রাষ্ট্র তাহাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তার দায়িত্ব গ্রহণ করে (লেইন)। তফসীরাধীন আয়াত অধিকতর সুস্পষ্ট করিয়া দিয়াছে যে, যুদ্ধ ঘোষণার আদেশ কেবল এইরূপ অবিশ্বাসীদের প্রতিই প্রযোজ্য যাহারা ইসলামের বিরুদ্ধে শত্রুতা শুধু প্রথমেই আরম্ভ করে নাই, অধিকন্তু উহারা বিশ্বাসঘাতকও ছিল, তাহারা না আত্মীয়তার মর্যাদা রাখিত, না চুক্তির শর্ত ও অঙ্গীকার রক্ষা করিত।

اِشۡتَرَوۡا بِاٰیٰتِ اللّٰہِ ثَمَنًا قَلِیۡلًا فَصَدُّوۡا عَنۡ سَبِیۡلِہٖ ؕ اِنَّہُمۡ سَآءَ مَا کَانُوۡا یَعۡمَلُوۡنَ ﴿۹﴾

৯
তাহারা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহের বিনিময়ে স্বল্প মূল্য গ্রহণ করিয়াছে এবং (লোকদিগকে) তাঁহার পথ হইতে ফিরাইয়া রাখিয়াছে। নিশ্চয় তাহারা যাহা করিতেছে উহা অত্যন্ত মন্দ।

لَا یَرۡقُبُوۡنَ فِیۡ مُؤۡمِنٍ اِلًّا وَّلَا ذِمَّۃً ؕ وَاُولٰٓئِکَ ہُمُ الۡمُعۡتَدُوۡنَ ﴿۱۰﴾

১০
তাহারা কোন মো’মেনের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা ও চুক্তির মর্যাদা রক্ষা করে না।১১৬২ বস্তুতঃ ইহারাই সীমালংঘনকারী।
১১৬২। বর্তমান ও পূর্ববর্তী এই দুই আয়াত যুক্তি দ্বারা সেই সকল পৌত্তলিকদিগের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার আদেশের যথার্থতা প্রমাণ করে (৯ঃ৫)। কারণগুলি হইলঃ (১) তাহারা ছিল কপট, বিশ্বাসঘাতক এবং নিজদিগকে মুসলমানদের মিত্র বলিয়া প্রকাশ করিত, কিন্তু মুসলমানরা তাহাদের উপর বিশ্বাস স্থাপন সত্বেও তাহারা যখনই কোন ক্ষতির সুযোগ পাইত,তখনই প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করিত; (২) তাহারা আত্মীয়তার বন্ধনকেও উপেক্ষা করিত এবং শুধু ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করার কারণে নিজেদের অতি নিকট আত্মীয়বর্গকেও তাহারা হত্যা করিত (৯ঃ৮); (৩) তাহাদের যুদ্ধের লক্ষ্যই ছিল লোকদিগকে ইসলাম গ্রহণে বাধা সৃষ্টি করা (৯ঃ৯); (৪) তাহারাই মুসলমানদিগকে প্রথমে আক্রমণ করিত (৯ঃ১৩)।