২১

الأنبياء

সূরা আল্ আম্বিয়া

Al-Anbiya'

মক্কী ১১৩ আয়াত ৭ রুকু পারা ১৬–১৭

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১১৩ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।

اَوَلَمۡ یَرَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنَّ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ کَانَتَا رَتۡقًا فَفَتَقۡنٰہُمَا ؕ وَجَعَلۡنَا مِنَ الۡمَآءِ کُلَّ شَیۡءٍ حَیٍّ ؕ اَفَلَا یُؤۡمِنُوۡنَ ﴿۳۱﴾

৩১
যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা কি ইহা দেখে নাই যে, আকাশসমূহ ও পৃথিবী উভয়েই সংবদ্ধ (পিণ্ডাকারে) ছিল;১৮৮৪ অতঃপর আমরা উভয়কে চিরিয়া ফাড়িয়া পৃথক করিয়া দিলাম? এবং পানি হইতে আমরা প্রত্যেক জীবিত বস্তুর উদ্ভব করিলাম। তুবও কি তাহারা ঈমান আ্নিবে না?
১৮৮৪। এই আয়াত এক গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। মনে হয় ইহাতে বিশ্বের ভৌতপূর্ব অবস্থার প্রতি ইংগিত করতঃ বলা হইয়াছে যে, সমগ্র বিশ্ব, বিশেষতঃ সৌর জগৎ এক অসংবদ্ধ অবয়বহীন অবস্থা অথবা নীহারিকাবৎ পদার্থ-পিণ্ড হইতে বিবর্তন লাভ করিয়াছে। আল্লাহ্‌তা’লা তাঁহার প্রাকৃতিক নিয়মের মধ্যে যে গতি সঞ্চার করিয়াছিলেন সেই অনুযায়ী বস্তুপিণ্ডকে বিযুক্ত করিয়া দিলেন এবং ইহার বিচ্ছিন্ন টুকরাগুলি সৌর জগতের অংশ হিসাবে রূপ নিল (The Universe Surveyed by Harold Richar & The Nature of the Universe by Fred Hoyle)। অতঃপর আল্লাহ্‌তা’লা পানি হইতে সকল জীবনের সৃষ্টি করিলেন। তফসীরাধীন আয়াতের এই পরোক্ষ অর্থ হয় যে, বস্তু-জগতের মত এক আধ্যাত্মিক জগৎও বিশৃংখল ধারণা এবং হাস্যকর বিশ্বাসের অবয়বহীন অবস্থা হইতে উদ্ভূত হয়। আল্লাহ্‌তা’লা যেমন তাঁহার ক্রুটিমুক্ত জ্ঞানের ভিত্তিতে এবং অভিষ্ট্য লক্ষ্যের পরিকল্পনা অনুযায়ী বস্তুপিণ্ডকে বিভক্ত করিয়াছেন এবং ইহার বিযুক্ত টুকরাগুলি সৌর জগতের অংশে পরিণত করিয়াছেন, ঠিক সেইরূপেই তিনি নৈতিক অধঃগতির মধ্যে গড়াগড়ি খাওয়া বিভ্রান্তিকর ধারণার জগতে এক নূতন আধ্যাত্মিক সুশৃংখল অবস্থা ঘটাইয়া থাকেন। যখন মানবজাতি নৈতিক পতনের সূচী- ভেদ্য অন্ধকারে ডুবিয়া যায় এবং আধ্যাত্মিক পরিমণ্ডল গভীরভাবে কলুষিত হইয়া উঠে, যখন আল্লাহ্‌তা’লা তাঁহার প্রেরিত পবিত্র মহাপুরুষের সত্তায় নূর (জ্যোতিঃ) আবির্ভূত করেন, যিনি মনকে নৈতিক অসচ্চরিত্রতা ও আত্মিক অধঃপতনের অসার অবস্থা হইতে মুক্ত করিয়া সক্রিয় করিয়া তোলেন। ফলে এক আধ্যাত্মিক জগতের জন্ম হয় যাহা ইহার কেন্দ্র হইতে সম্প্রসারিত হইতে আরম্ভ করে এবং অন্তরালবর্তী প্রেরণার তাগিদে প্রাণবন্ত জীবনের পথ-নির্দেশ লাভ করে এবং পরিণামে সমগ্র পৃথিবীকে পরিবেষ্টিত করে।

وَجَعَلۡنَا فِی الۡاَرۡضِ رَوَاسِیَ اَنۡ تَمِیۡدَ بِہِمۡ ۪ وَجَعَلۡنَا فِیۡہَا فِجَاجًا سُبُلًا لَّعَلَّہُمۡ یَہۡتَدُوۡنَ ﴿۳۲﴾

৩২
এবং আমরা পৃথিবীতে দৃঢ় পর্বতমালা সৃষ্টি করিয়াছি যাহাতে ইহা তাহাদিগকে লইয়া কম্পমান না হয়,১৮৮৫ আমরা ইহাতে প্রশস্ত রাস্তাসমূহ বানাইয়াছি, যাহাতে তাহারা সঠিক পথে পরিচালিত হইতে পারে।
১৮৮৫। ‘আন তামিদা বিহিম’ উক্তির অর্থ পাছে ইহা উহাদিগকে লইয়া দুলিয়া না উঠে; উহাদিগকে সহ কম্পমান না হইয়া পড়ে; উহাদিগের উপকারে আসে।মাদা-এর অর্থ ইহাও হয় যে, সে ফায়দা ও মঙ্গল দান করিয়াছিল (আকরাব)। আয়াত আরো এক বৈজ্ঞানিক সত্যের উপর আলোকপাত করে। ভূবিদ্যা বাস্তবে প্রমাণ করিয়াছে যে, পর্বতগুলি বহুল পরিমাণে পৃথিবীকে ভূমিকম্প হইতে নিরাপদ করিয়াছে। শুরুতে ভূগর্ভ বা পৃথিবীর অভ্যন্তর অতীব গরম ছিল। প্রচণ্ড উত্তাপের ফলে যখন পৃথিবীর অভ্যন্তরে গ্যাসের সৃষ্টি হইল, তখন উহা নির্গমনের জন্য চাপ সৃষ্টি করিল এবং এইরূপে প্রচণ্ড আলোড়নে আগ্নেয়গিরির আকার ধারণ করিল (‘মার্ভেলস এণ্ড হিস্টরী অব সায়েন্স’ বাই আলিসন হক্স এবং এনসাইক ব্রিট, ‘জিয়োলজী’ অধ্যায়)। আয়াতের মর্ম ইহাও হইতে পারে যে, পৃথিবীর আপন কক্ষের উপর অটলভাবে আবর্তন করিবার জন্য পর্বতশ্রেণী গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়। পৃথিবী স্থির নিশ্চল নহে বরং সূর্যের চতুর্দিকে আপন কক্ষ পথে প্রদক্ষিণ করে।এই তত্ব আবিষ্কারের বহু পূর্বেই কুরআন করীম প্রকাশ করিয়াছিল যে, ‘পৃথিবী ঘূর্ণায়মান’ (২৭ঃ৮৯ এবং ৩৬ঃ৩৯-৪১)।

وَجَعَلۡنَا السَّمَآءَ سَقۡفًا مَّحۡفُوۡظًا ۚۖ وَّہُمۡ عَنۡ اٰیٰتِہَا مُعۡرِضُوۡنَ ﴿۳۳﴾

৩৩
এবং আমরা আকাশকে সুরক্ষিত ছাদস্বরূপ করিয়াছি,১৮৮৬ তথাপি তাহারা উহার নিদর্শনসমূহ হইতে মুখ ফিরাইয়া লয়।
১৮৮৬। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ-উপগ্রহ ও নক্ষত্রপুঞ্জসহ এই সৌর-জগৎ এমন এক সুশৃংখল এবং সুদৃঢ় নিয়মের অধীনে পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত, যাহা লক্ষ লক্ষ বৎসরব্যাপী বিদ্যমান রহিয়াছে, কখনও পলকের জন্যও এই সমস্ত গ্রহ, নক্ষত্র প্রভৃতির গতিতে সামান্যতম বিচ্যুতি ঘটে নাই। এই সকল জ্যেতিস্কমণ্ডলী ভূমণ্ডলের উপর এবং ইহাতে বিচরণকারী বাসিন্দাগণের দেহ, রুচি, নৈতিক-চরিত্র ও অবস্থার উপর অত্যন্ত সুপ্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে। ঘরের ছাদ যেমন গৃহাভ্যন্তরে বসবাসকারীর জন্য রৌদ্র, বৃষ্টি ও শীত হইতে বাঁচার উপকরণ, ঠিক তেমনভাবেই নভোমণ্ডল নিম্নের পৃথিবীর জন্য আশ্রয়ের কাজ করিয়া থাকে এবং জ্যোতিষ্কমণ্ডলী মানবজাতির উপরে উহাদের হিতকর প্রভাব বিস্তার করিয়া থাকে।

وَہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَ الَّیۡلَ وَالنَّہَارَ وَالشَّمۡسَ وَالۡقَمَرَ ؕ کُلٌّ فِیۡ فَلَکٍ یَّسۡبَحُوۡنَ ﴿۳۴﴾

৩৪
এবং তিনিই রাত্রি ও দিন এবং সূর্য ও চন্দ্র সৃষ্টি করিয়াছেন,১৮৮৬-ক প্রত্যেকেই আকাশে (নিজ নিজ) কক্ষপথে সন্তরণ করিতেছে।
১৮৮৬-ক। রাত্র এবং দিন, সূর্য এবং চন্দ্র সকলকেই আল্লাহ্‌তা’লা সৃষ্টি করিয়াছেন এবং ইহাদের সকলকেই মানবের প্রয়োজনে ও সেবায় নিয়োজিত করিয়াছেন। বস্তুতঃ পৃথিবীতে মানুষের অস্তিত্ব রক্ষার জন্য ইহারা অপরিহার্য।

وَمَا جَعَلۡنَا لِبَشَرٍ مِّنۡ قَبۡلِکَ الۡخُلۡدَ ؕ اَفَا۠ئِنۡ مِّتَّ فَہُمُ الۡخٰلِدُوۡنَ ﴿۳۵﴾

৩৫
এবং আমরা তোমার পূর্বে কোন মানুষকে চিরস্থায়ী জীবন দিই নাই। অতঃপর যদি তুমি মরিয়া যাও তাহা হইলে তাহারা কি চিরকাল (এখানে) জীবিত থাকিবে?১৮৮৭
১৮৮৭। ইসলামের মহানবী (সাঃ)-এর পূর্বের ধর্মীয় পদ্ধতি এবং বিধানসমূহের আধ্যাত্মিক পতন এবং বিলুপ্তি নির্ধারিত ছিল। নবী করীম (সাঃ) প্রদত্ত ইসলামের একমাত্র বিধান যাহা যিন্দা থাকা এবং শেষ সময় পর্যন্ত চলিতে থাকা অবধারিত ছিল। আয়াতের অন্তর্নিহিত মর্ম ইহাও হইতে পারে যে, কোন মানুষই লয় বা মৃত্যু হইতে মুক্ত নহে, এমনকি নবী করীম (সাঃ)ও নহেন। চিরস্থায়ী এবং চিরঞ্জীব হওয়া একমাত্র আল্লাহ্‌তা’লার একান্ত নিজস্ব গুণ।

کُلُّ نَفۡسٍ ذَآئِقَۃُ الۡمَوۡتِ ؕ وَنَبۡلُوۡکُمۡ بِالشَّرِّ وَالۡخَیۡرِ فِتۡنَۃً ؕ وَاِلَیۡنَا تُرۡجَعُوۡنَ ﴿۳۶﴾

৩৬
প্রত্যেক জীব মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করিবে এবং আমরা তোমাদিগকে মন্দ ও ভাল অবস্থা দ্বারা বিশেষভাবে পরীক্ষা করিব। এবং পরিশেষে আমাদের দিকেই তোমাদিগকে ফিরাইয়া আনা হইবে।

وَاِذَا رَاٰکَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اِنۡ یَّتَّخِذُوۡنَکَ اِلَّا ہُزُوًا ؕ اَہٰذَا الَّذِیۡ یَذۡکُرُ اٰلِہَتَکُمۡ ۚ وَہُمۡ بِذِکۡرِ الرَّحۡمٰنِ ہُمۡ کٰفِرُوۡنَ ﴿۳۷﴾

৩৭
এবং যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা যখন তোমাকে দেখে, তখন তাহারা তোমাকে কেবল হাসি-বিদ্রপের পাত্ররূপে বানাইয়া লয় (এবং বলে) ‘এই কি সেই ব্যক্তি যে তোমাদের মা’বূদদিগের (মন্দ বলিয়া) উল্লেখ করে’?১৮৮৭-ক অথচ তাহারাই রহমান আল্লাহ্‌কে স্মরণ করিতে অস্বীকার করে।
১৮৮৭-ক। আরবদের প্রচলিত প্রবাদঃ ‘লাইন যাকারতানী লাতানদামান্না’ অর্থাৎ তুমি যদি আমার কুৎসা গাও, তবে তোমাকে অবশ্যই অনুতাপ করিতে হইবে (লেইন)।

خُلِقَ الۡاِنۡسَانُ مِنۡ عَجَلٍ ؕ سَاُورِیۡکُمۡ اٰیٰتِیۡ فَلَا تَسۡتَعۡجِلُوۡنِ ﴿۳۸﴾

৩৮
মানুষকে ত্বরাপরায়ণ করিয়া সৃষ্টি করা হইয়াছে।১৮৮৮ আমি নিশ্চয় তোমাদিগকে আমার নিদর্শনাবলী দেখাইব, অতএব তোমরা আমার নিকট তাড়াহুড়া করিও না।
১৮৮৮। ‘খুলিকাল্ ইনসানু মিন আজাল’ অর্থ, মানুষকে তাড়াহুড়ার স্বভাব দিয়া সৃষ্টি করা হইয়াছে’ উক্তির মর্ম এই যে, চঞ্চলতা মানব-সত্তার এক অংশ এবং ইহা তাহার চরিত্রের এত লক্ষ্যণীয় বৈশিষ্ট্য যে,বলা যায়,তাহাকে ঠিক যেন অস্থিরতা হইতেই পয়দা করা হইয়াছে। অর্থাৎ সে প্রকৃতিগতভাবেই তাড়াহুড়া প্রিয়। কাহারো চরিত্রের স্বাভাবিক অবস্থা প্রকাশার্থে আরববাসীরা বলিয়া থাকে ‘খুলিকা মিনহু’ অর্থাৎ সে ব্যক্তিকে উহা (সেই প্রকৃতির) দ্বারা সৃষ্টি করা হইয়াছে। একইরূপ প্রকাশ ভঙ্গি কুরআন শরীফের অন্যত্র ব্যবহার হইয়াছে (৭ঃ১৩,৩০ঃ৫৫)।

وَیَقُوۡلُوۡنَ مَتٰی ہٰذَا الۡوَعۡدُ اِنۡ کُنۡتُمۡ صٰدِقِیۡنَ ﴿۳۹﴾

৩৯
এবং তাহারা বলে, ‘যদি তোমরা (হে মুসলমানগণ!) সত্যবাদী হইয়া থাক, তাহা হইলে এই ওয়াদা কখন পূর্ণ হইবে?’

لَوۡ یَعۡلَمُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا حِیۡنَ لَا یَکُفُّوۡنَ عَنۡ وُّجُوۡہِہِمُ النَّارَ وَلَا عَنۡ ظُہُوۡرِہِمۡ وَلَا ہُمۡ یُنۡصَرُوۡنَ ﴿۴۰﴾

৪০
যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা যদি সেই সময়কে জানিত যখন তাহারা আগুনকে১৮৮৯ না তাহাদের মুখমণ্ডল হইতে সরাইতে পারিবে এবং না তাহাদের পৃষ্ঠদেশ হইতে; এবং না তাহাদিগকে কোন প্রকার সাহায্য করা হইবে।
১৮৮৯। এখানে অগ্নি অর্থ যুদ্ধের অগ্নি যাহা কাফেরেরা নিজেরাই প্রজ্জ্বলিত করিয়াছিল এবং উহাতে তাহারাই ধ্বংস হইয়াছিল। তাহারাই ইসলামের বিরুদ্ধে তরবারি উঠাইয়াছিল এবং তরবারি দ্বারাই তাহারা বিনষ্ট হইয়াছিল। ‘তাহাদের মুখমণ্ডল হইতে’ শব্দগুলির মর্ম এই যে, শাস্তি তাহাদের সম্মুখে দেখিবে অর্থাৎ উহার নিদর্শনসমূহ প্রকাশিত এবং দৃষ্টি গোচর হইবে। ‘এবং না তাহাদের পৃষ্ঠদেশ হইতে’ উক্তির মর্ম এই যে, শাস্তি আসিয়া তাহাদিগকে অতর্কিতে ধৃত করিবে। অধিকন্তু শাস্তি তাহাদের সকলকে আচ্ছন্ন করিয়া ফেলিবে— তাহাদের নেতাগণকে এবং সাধারণ জনগণকে (উজুহু শব্দের অন্য অর্থ সর্দারগণ-লেইন)।