১৭

بني إسرائيل

সূরা বনী ইসরাঈল

Bani Isra'il

মক্কী ১১২ আয়াত ১২ রুকু পারা ১৪–১৫

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১১২ আয়াত এবং ১২ রুকু আছে।

کُلًّا نُّمِدُّ ہٰۤؤُلَآءِ وَہٰۤؤُلَآءِ مِنۡ عَطَآءِ رَبِّکَ ؕ وَمَا کَانَ عَطَـآءُ رَبِّکَ مَحۡظُوۡرًا ﴿۲۱﴾

২১
আমরা সকলকেই সাহায্য করিয়া থাকি— উহাদিগকেও এবং ইহাদিগকেও—তোমার প্রতিপালকের দানসমূহ হইতে। এবং তোমার প্রতিপালকের দান সীমাবদ্ধ১৬০৫ নহে।
১৬০৫। ঐশী সাহায্য দুই প্রকার হইয়া থাকেঃ (১) সাধারণ সাহায্য যাহার ফলে মুসলমান, খৃষ্টান, ইহুদী, হিন্দু ইত্যাদি সকল মানুষের সর্বপ্রকার সুকর্মের প্রচেষ্টা নিজ নিজ কর্মের পরিধি ও প্রসার অনুযায়ী ফল লাভ করিবে; (২) আল্লাহ্‌তা’লার বিশেষ অনুগ্রহ এবং বিপদে সাহায্য যাহা আধ্যাত্মিক অবস্থার সঙ্গে সীমাবদ্ধ এবং কেবলমাত্র আল্লাহ্‌র প্রকৃত বান্দাকেই উহা দান করা হইয়া থাকে, অবিশ্বাসীদিগকে নহে।

اُنۡظُرۡ کَیۡفَ فَضَّلۡنَا بَعۡضَہُمۡ عَلٰی بَعۡضٍ ؕ وَلَلۡاٰخِرَۃُ اَکۡبَرُ دَرَجٰتٍ وَّاَکۡبَرُ تَفۡضِیۡلًا ﴿۲۲﴾

২২
দেখ! আমরা কিরূপে (এই পার্থিব জীবনে) তাহাদের এক দলকে অপর দলের উপর মর্যাদা দিয়াছি, এবং পরকাল (-এর জীবন) অবশ্যই মর্যাদায় বৃহত্তর এবং মহিমাতেও বৃহত্তর।

لَا تَجۡعَلۡ مَعَ اللّٰہِ اِلٰـہًا اٰخَرَ فَتَقۡعُدَ مَذۡمُوۡمًا مَّخۡذُوۡلًا ﴿٪۲۳﴾

২৩
(সুতরাং) আল্লাহ্‌র১৬০৬ সহিত অন্য কোন মা’বূদ সৃষ্টি করিও না, নতুবা তুমি নিন্দিত, নিঃসহায় হইয়া বসিয়া পড়িবে।
সূরা বনী ইসরাঈল - রুকু ২
১৬০৬। শির্‌ক্‌ (আল্লাহ্‌তা’লার সহিত মিথ্যা মা’বূদকে শরীক) করিলে মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক পতন ঘটে। শির্‌কে ডুবিয়া যাওয়া কোন জাতি বা সম্প্রদায় বাস্তবে নৈতিক বা জাগতিক উন্নতি সাধন করিয়াছিল বলিয়া জানা যায় না। প্রকৃত পক্ষে সকল অশুভের উৎপত্তি হয় শির্‌ক হইতে।

وَقَضٰی رَبُّکَ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّاۤ اِیَّاہُ وَبِالۡوَالِدَیۡنِ اِحۡسَانًا ؕ اِمَّا یَبۡلُغَنَّ عِنۡدَکَ الۡکِبَرَ اَحَدُہُمَاۤ اَوۡ کِلٰہُمَا فَلَا تَقُلۡ لَّہُمَاۤ اُفٍّ وَّلَا تَنۡہَرۡہُمَا وَقُلۡ لَّہُمَا قَوۡلًا کَرِیۡمًا ﴿۲۴﴾

২৪
এবং তোমার প্রতিপালক তাকীদপুর্ণ এই আদেশ দিয়াছেন যে, তোমরা তাঁহাকে ছাড়া আর কাহারও ইবাদত করিও না এবং পিতামাতার সহিত সদ্ব্যবহার১৬০৭ করিও। যদি তাহাদের একজন বা উভয়ই তোমার জীবদ্দশায় বার্ধক্যে উপনীত হয় তাহা হইলে, তাহাদের উভয়কে তুমি ‘উফ’১৬০৮ পর্যন্ত বলিও না এবং তাহাদিগকে ধমক দিও না, বরং তাহাদের সহিত সম্মানসূচক ও মমতাপূর্ণ কথা বলিও।
১৬০৭। এই আয়াত দ্বারা ঐ সকল নিয়ম-নীতি এবং আচরণ-বিধি সূচিত হইয়াছে যাহা মানিয়া চলিলে জনগোষ্ঠী তাহাদের সংগঠনে বিশুদ্ধতা বা অখণ্ডতা অক্ষুন্ন রাখতে পারে এবং বিচ্ছিন্নতা এবং বিভক্তি ও অবক্ষয় হইতে সংগঠনকে নিরাপদ রাখতে পারে। আল্লাহ্‌তা’লার একত্বে বিশ্বাসকে গৌরবের স্থান দেওয়া হয় এবং শির্‌ককে নিন্দার স্থান। কিন্তু আল্লাহ্‌তা’লার একত্বে বিশ্বাস হইল সেই বীজ যাহা হইতে সকল নৈতিক উৎকর্ষতার জন্ম হয় এবং যাহার অভাব সকল পাপের মূল। ইহাই অর্থাৎ তওহীদের উপর ঈমানই হইতেছে—প্রাকৃতিক নিয়মের বিধান এবং শরীয়াতের বিধান— উভয়ের বুনিয়াদ। ঐশী বিধানের নীতিমালা সম্পূর্ণভাবে আল্লাহ্‌তা’লার একত্ববাদ বা তওহীদের ঈমানের উপর প্রতিষ্ঠিত এক প্রকাশ্য বাস্তবতা যাহা ব্যাখ্যার প্রয়োজন করে না; এমনকি প্রকৃতির বিধান এবং সকল বৈজ্ঞানিক উন্নতির ভিত্তিও স্থাপিত এই বিশ্বাসের উপর। কারণ যদি ধরিয়া নেওয়া হয় যে, একের অধিক সৃষ্টি-কর্তা বা খোদা রহিয়াছেন, তাহা হইলে একাধিক প্রাকৃতিক বিধান অবশ্যম্ভাবী হইয়া পড়ে। অটল এবং অবিচল একক প্রাকৃতিক নিয়মের অভাবে বিজ্ঞানের সকল ক্রমোন্নতি অচল হইয়া যাইবে, কারণ বিজ্ঞানের সর্বপ্রকার আবিষ্কার ও উদ্ভাবন এই বিশ্বাসের উপর নির্ভরশীল যে, এক নির্দিষ্ট ও অপরিবর্তনীয় নিয়ম-নীতি সুসমন্বিত ভাবে সারা বিশ্বকে পরিবেষ্টন করিয়া রহিয়াছে। এই আয়াতের দ্বিতীয় অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ নির্দেশ হইল মানবের নৈতিক আচরণ সম্পর্কে। পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাজনিত বাধ্যবাধকতা ইহার অতি জরুরী অংশ, কারন পিতা মাতাই সর্বপ্রথম মানুষের মনযোগ আল্লাহ্‌র প্রতি পরিচালিত করে এবং পিতা-মাতার চরিত্র দর্পণে ঐশী গুণাবলী প্রতিবিম্বিত হয়;এবং দর্পণ অনুযায়ী চেহারার বাস্তব প্রতিফলন ঘটে। কিন্তু যেখানে আল্লাহ্‌তা’লা সম্পর্কিত নির্দেশ না-বোধক সেখানে পিতা-মাতা সম্পর্কিত আদেশ হাঁ-বোধক। মানুষকে বলা হইয়াছে, যেহেতু তার পক্ষে আল্লাহ্‌তা’লার অনুগ্রহরাজির প্রতিদান দেওয়া সম্ভব নয়, সেহেতু সে যেন অন্ততঃপক্ষে শির্‌ক্‌ থেকে বিরত থাকে এবং পিতা-মাতার ক্ষেত্রে তাহাদের স্নেহ-ভালবাসার প্রতিদানে সে অনেকাংশে সক্ষম হওয়ায় তাহাদের প্রতি উদার ও স্নেহশীল হওয়ার জন্য স্পষ্টরূপে নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে।
১৬০৮। আরবী ভাষায় ‘উফ’ মুখের কথা দ্বারা বিরক্তি প্রকাশ বুঝায় এবং ‘নাহ্‌র’ শব্দ আচরণ বা কাজের দ্বারা বিরাগ প্রকাশ বুঝায়। উভয় শব্দ সংযুক্ত হওয়ায় বর্তমান আয়াতের মর্ম হইতেছে যে, পিতা-মাতার সঙ্গে নির্দয় ব্যবহার করা তো দূরের কথা, কর্কশ এবং রুক্ষভাবে কথা বলাও কাহারও উচিৎ নহে।

وَاخۡفِضۡ لَہُمَا جَنَاحَ الذُّلِّ مِنَ الرَّحۡمَۃِ وَقُلۡ رَّبِّ ارۡحَمۡہُمَا کَمَا رَبَّیٰنِیۡ صَغِیۡرًا ﴿ؕ۲۵﴾

২৫
তুমি করুণাভরে তাহাদের উপর বিনয়ের বাহু অবনত রাখিও এবং বলিও, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি তাহাদের উভয়ের প্রতি সেইভাবে রহম কর১৬০৯ যেভাবে তাহারা আমাকে শৈশবে প্রতিপালন করিয়াছিল।’
১৬০৯। সুন্দর উপমার পুনরাবৃত্তি দ্বারা এই আয়াত পিতা-মাতার প্রতি কৃতজ্ঞতাপূর্ণ দয়া-মমতা জানাইতেছে। যেহেতু বাপ-মার স্নেহ ভালবাসার পর্যাপ্ত প্রতিদান সম্ভব নহে, সেই জন্য এই বিষয়ে অপ্রতুলতা এবং ঘাটতি পূরণের উদ্দেশ্যে তাঁহাদের জন্য দোয়া করার আদেশ দেওয়া হইয়াছে। এই দোয়া প্রমাণ করিতেছে যে, পিতা-মাতার বৃদ্ধ বয়সে তাঁহাদের প্রতি স্নেহ-মমতার ব্যবহার করা জরুরী যেরূপভাবে বাপ-মা শৈশবে তাঁহাদের সন্তানের লালন পালনের জন্য করিয়া থাকেন।

رَبُّکُمۡ اَعۡلَمُ بِمَا فِیۡ نُفُوۡسِکُمۡ ؕ اِنۡ تَکُوۡنُوۡا صٰلِحِیۡنَ فَاِنَّہٗ کَانَ لِلۡاَوَّابِیۡنَ غَفُوۡرًا ﴿۲۶﴾

২৬
তোমাদের হৃদয় যাহা কিছু আছে তোমাদের প্রতিপালক তাহা সর্বাধিক অবগত আছেন, যদি তোমরা সৎকর্মপরায়ণ হও তাহা হইলে স্মরণ রাখ যে, যে ব্যক্তি বার বার আল্লাহ্‌র নিকট বিনত হয় নিশ্চয় তিনি তাঁহার প্রতি অতীব ক্ষমাশীল।

وَاٰتِ ذَا الۡقُرۡبٰی حَقَّہٗ وَالۡمِسۡکِیۡنَ وَابۡنَ السَّبِیۡلِ وَلَا تُبَذِّرۡ تَبۡذِیۡرًا ﴿۲۷﴾

২৭
এবং আত্মীয়কে তাহার প্রাপ্য দাও, এইরূপে মিসকীন ও পথচারীগণকেও; এবং (তোমাদের ধন-সম্পদ) কোন প্রকার অপব্যয় করিও না।

اِنَّ الۡمُبَذِّرِیۡنَ کَانُوۡۤا اِخۡوَانَ الشَّیٰطِیۡنِ ؕ وَکَانَ الشَّیۡطٰنُ لِرَبِّہٖ کَفُوۡرًا ﴿۲۸﴾

২৮
নিশ্চয় অপব্যয়কারীগণ শয়তানের ভাই, এবং শয়তান তাহার প্রভুর প্রতি বড়ই অকৃতজ্ঞ।১৬১০
১৬১০। যে ব্যক্তি আল্লাহ্‌ প্রদত্ত দানের সদ্ব্যবহার করে না সে আল্লাহ্‌তা’লার নিকট অকৃতজ্ঞতার অপরাধে অপরাধী এবং যে ব্যক্তি নিজের অর্থ-সম্পদের অপব্যয় করে সে প্রকৃত পক্ষে তাহার উপরে সদ্বব্যবহারের জন্য অর্পিত কর্তব্য এড়াইয়া চলার পন্থা গ্রহণ করে।

وَاِمَّا تُعۡرِضَنَّ عَنۡہُمُ ابۡتِغَآءَ رَحۡمَۃٍ مِّنۡ رَّبِّکَ تَرۡجُوۡہَا فَقُلۡ لَّہُمۡ قَوۡلًا مَّیۡسُوۡرًا ﴿۲۹﴾

২৯
এবং যদি তুমি তোমার প্রভুর বিশেষ রহমত লাভের জন্য, যাহার প্রত্যাশায় তুমি আছ, তাহাদের দিক হইতে মুখ ফিরাও তাহা হইলে (সেই ক্ষেত্রেও) তাহাদের সহিত নম্রভাবে কথা১৬১১ বলিও।
১৬১১। আপাতঃ দৃষ্টিতে নিতান্ত দরিদ্র বা নিঃস্ব হইলেও যদি সন্দেহ হয় যে, সেই ব্যক্তিকে সাহায্য করিলে তাহার উপর বিরূপ প্রতিক্রিয়া হইবে এমতাবস্থায় তাহাকে অগ্রাহ্য করা যাইতে পারে; দৃষ্টান্ত স্বরূপ সেই সাহায্যপ্রার্থী পেশাদার ভিক্ষুক হইলে বা অন্য কোন বদ অভ্যাসের কবলে পতিত হইলে এইরূপ অবস্থায় ভিখারীকে সান্তুনাদায়ক কথা দ্বারা ফিরাইয়া দেওয়া যাইতে পারে।

وَلَا تَجۡعَلۡ یَدَکَ مَغۡلُوۡلَۃً اِلٰی عُنُقِکَ وَلَا تَبۡسُطۡہَا کُلَّ الۡبَسۡطِ فَتَقۡعُدَ مَلُوۡمًا مَّحۡسُوۡرًا ﴿۳۰﴾

৩০
এবং (কৃপণতা বশতঃ) তুমি তোমার হাত তোমার স্কন্ধে বাঁধিয়া রাখিও না এবং (অপব্যয় করিয়া) উহা সম্পূর্ণরূপে প্রসারিতও করিও না—নতুবা তুমি নিন্দিত, ক্লান্ত১৬১২ হইয়া বসিয়া পড়িবে।
১৬১২। মো’মেনকে এমন কৃপণ হওয়া উচিৎ নহে যে, প্রকৃত প্রয়োজনের সময়ে সে তাহার অর্থ খরচ করে না বা কোন চিন্তা-ভাবনা না করিয়া অপ্রয়োজনে টাকা-পয়সা অপব্যয় করিয়া উড়াইয়া দেয়; ফলে যখন জাতীয় স্বার্থে অর্থ-সম্পদের প্রয়োজন দেখা দেয় তখন তাহার নিজস্ব অবদান রাখার মত কোন সামর্থ্য থাকে না। ইহাতে তাহাকে মনোকষ্ট পাইতে হয়।