৯৩

الضحى

সূরা আয‌্‌‌ যোহা

Ad-Duha

মক্কী ১২ আয়াত ১ রুকু পারা ৩০

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১২ আয়াত এবং ১ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

وَالضُّحٰی ۙ﴿۲﴾

২
কসম পূর্বাহ্নকালীন সূর্য-কিরণের।৩৩৭২
৩৩৭২। ‘প্রাতঃকালীন সূর্য কিরণ’-এর তাৎপর্য হইতে পারে, ইসলামের উদয় ও উন্নতি। এই প্রাতঃকাল দ্বারা ঐ নির্দিষ্ট প্রাতঃকালকেও বুঝাইতে পারে, যে প্রাতঃকালে মহানবী (সাঃ) দশ সহস্র পবিত্র যোদ্ধাকে সঙ্গে নিয়া বিজয়ী নেতা হিসাবে মক্কায় প্রবেশ করিলেন এবং কাবা গৃহকে পৌত্তলিকতার আবর্জনা হইতে মুক্ত করিলেন।

وَالَّیۡلِ اِذَا سَجٰی ۙ﴿۳﴾

৩
কসম রাত্রির, যখন ইহার অন্ধকার (চারিদিকে) ছাইয়া যায়,৩৩৭৩
৩৩৭৩। ‘রাত্রি’ দ্বারা দীর্ঘকাল ধরিয়া ইসলামের ক্রমাবনতি ও অধঃপতনকে নির্দেশ করিতেছে। ‘রাত্রি’ বলিতে ঐ রজনীকেও বুঝাইতে পারে, যাহার অন্ধকারে মহানবী (সাঃ) গৃহত্যাগ করিয়া, আবুবকর (রাঃ)-কে সাথে নিয়া সওরগুহাতে আশ্রয় গ্রহণ করিয়াছিলেন। প্রকৃতপক্ষে, মক্কা ত্যাগের রাত্রি এবং মক্কা বিজয়ের দিবস এই দুইটি অনন্য ঘটনা, মহানবী (সাঃ)-এর সারা জীবনের তথ্যবহুল, ঘটনাসমৃদ্ধ, উত্থান-পতনের ইতিহাসকে আমাদের মানসপটে সংক্ষিপ্তাকারে তুলিয়া ধরে।

مَا وَدَّعَکَ رَبُّکَ وَمَا قَلٰی ؕ﴿۴﴾

৪
তোমার প্রতিপালক তোমাকে পরিত্যাগ করেন নাই এবং (তোমার প্রতি) অসন্তুষ্টও হন নাই।৩৩৭৪
৩৩৭৪। নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতিটি দিন ও প্রতিটি রাত্রি, তাহার বড় বড় বিজয় ও সাময়িক বিফলতা তাঁহার আনন্দ ও কষ্ট, তাঁহার প্রার্থনাপূর্ণ রাত্রি ও কর্মমুখর দিন, এই সবই সাক্ষ্য দান করে যে, আল্লাহ্‌ তাঁহার সাথেই ছিলেন।

وَلَلۡاٰخِرَۃُ خَیۡرٌ لَّکَ مِنَ الۡاُوۡلٰی ؕ﴿۵﴾

৫
এবং নিশ্চয় তোমার পূর্ববর্তী অবস্থা হইতে৩৩৭৫ পরবর্তী অবস্থা তোমার জন্য উৎকৃষ্টতর হইবে।
৩৩৭৫। মহানবী (সাঃ)-এর জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত, পূর্ববর্তী মুহূর্ত হইতে উত্তম ছিল।

وَلَسَوۡفَ یُعۡطِیۡکَ رَبُّکَ فَتَرۡضٰی ؕ﴿۶﴾

৬
এবং তোমার প্রতিপালক শীঘ্রই তোমাকে (সবকিছু) দান করিবেন যাহাতে তুমি সন্তুষ্ট হইয়া যাইবে।

اَلَمۡ یَجِدۡکَ یَتِیۡمًا فَاٰوٰی ۪﴿۷﴾

৭
তিনি কি তোমাকে এতীম পান নাই এবং (নিজ রহমতের ছায়াতলে) আশ্রয় দেন নাই?৩৩৭৬
৩৩৭৬। বাস্তবতার নিরিখে যেমন, মহানবী (সাঃ) এতীম ছিলেন, তেমনি এতিমের জন্য ছিলেন আদর্শ। তাঁহার এতীমাবস্থা ছিল চরম পর্যায়ের। পিতা মারা গেলেন জন্মের পূর্বেই, মাতা মারা গেলেন ষষ্ঠ বৎসরের সময়। আর দাদা আব্দুল মোত্তালিব, যিনি মাতৃহীন নাতির অভিভাকত্ব কাঁধে নিলেন তিনিও চলিয়া গেলেন মাত্র দুই বৎসর পরেই। অতঃপর গরীব চাচার উপরেই পড়িল তাঁহার লালন-পালনের ভার। পিতা-মাতার স্নেহ-বঞ্চিত ছিলেন বালক মুহাম্মদ (সাঃ)। পরে যিনি সকলের সহায় হইলেন, তিনি তাঁহার নিজের শৈশব-কৈশোরে ছিলেন কি নিদারুনভাবে অসহায়! তথাপি তিনি ছোট-বড় সকলের স্নেহ ভালবাসা পাইয়াছিলেন; সঙ্গী-সাথী, সববয়স্কদের সকলের কাছে তিনি ছিলেন অতি আদরের বিশ্বস্ত বন্ধু। নিজের জীবদ্দশায় যে অসীম ভক্তি-শ্রদ্ধা ও ভালবাসা তিনি পাইয়াছেন, উহার তুলনা মানবেতিহাসে খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। তাহার তিরোধানের শত শত বৎসর পরেও কোটি কোটি মানুষের মনের মনিকোঠায় তিনি যে শ্রদ্ধার ও ভালবাসার স্থায়ী আসন লাভ করিয়াছেন ও করিয়া যাইতেছেন, নারীর জঠরে জন্মগ্রহণকারী কোন মানুষ তাহা অতীতেও পায় নাই, ভবিষ্যতেও পাইবে না।

وَوَجَدَکَ ضَآلًّا فَہَدٰی ۪﴿۸﴾

৮
এবং তিনি তোমাকে (তোমার জাতির প্রেমে৩৩৭৭) আত্মহারা পাইয়াছিলেন এবং তিনি তোমাকে (তাহাদের সংশোধনের জন্য) হেদায়াত দান করিয়াছিলেন।
৩৩৭৭। ‘যাল্লা’ (ভালবাসায় আত্মহারা) অর্থঃ তিনি কিংকর্তব্যবিমূঢ় অবস্থায় পথ পাইতেছিলেন না, তিনি ভালবাসায় আত্মহারা হইয়া কি যেন খুঁজিতেছিলেন এবং বিরামহীনভাবে খুঁজিতেছিলেন (লেইন)। ‘যাল্লা’ শব্দের বিভিন্ন অর্থের প্রেক্ষিতে আলোচ্য আয়াতের অর্থ হইতে পারেঃ (১) মহানবী (সাঃ) সৃষ্টিকর্তার সন্ধানে পথ খুঁজিয়া বেড়াইতেছিলেন, তখন আল্লাহ্ তাঁহার কাছে শরীয়াত অবতীর্ণ করিয়া আল্লাহ্‌কে পাওয়ার পথ দেখাইয়াছিলেন; (২) তিনি হতবুদ্ধি অবস্থায় তাঁহার লক্ষ্যে পৌঁছাইবার পথ পাইতেছিলেন না—আল্লাহ্ তাঁহাকে পথ দেখাইলেন; (৩) তিনি তাঁহার হতভাগা জাতির ভালবাসায় আত্মহারা হইয়া তাহাদের মঙ্গলের পথ খুঁজিতেছিলেন- আল্লাহ্ তাহাদের জন্য সর্বোত্তম পথ দেখাইয়াছিলেন; (৪) তিনি বিশ্ববাসীর আগোচরে ছিলেন, আল্লাহ্ তাঁহাকে দেখিলেন এবং মাবনজাতিকে আল্লাহ্‌র কাছে পৌঁছাইবার জন্য তাঁহাকে মনোনীত করিলেন। অতএব ‘যাল্লা’ শব্দটি নবী করীম (সাঃ)-এর জন্য নিন্দাসূচক না হইয়া প্রশংসাসূচকভাবে ব্যবহৃত হইয়াছে। পথভ্রান্ত বা পথভ্রষ্ট অর্থে এই শব্দটি মহানবী (সাঃ)-এর জন্য ব্যবহৃত হইতেই পারে না, কারণ কুরআনের অন্যত্র (৫৩ঃ৩) তাঁহাকে ভ্রান্তিমুক্ত ও প্রথভ্রষ্টতা-মুক্ত বলিয়া বর্ণনা করা হইয়াছে। অধিকন্তু, সূরার শেষ ছয়টি আয়াত পরস্পর সম্পর্কযুক্ত অর্থাৎ আয়াত ৭, ৮, ৯-এর সহিত আয়াত ১০, ১১, ১২, ক্রমিকভাবে সম্পর্কযুক্ত। আয়াত ৮ এর ‘যাল্লা’, আয়াত ১১ এর ‘সায়েল’ শব্দের সাথে সম্পর্কিত হইয়া ‘যাল্লার’ অর্থকে পরিষ্কার করিয়া দিয়াছেঃ ‘যে জন আল্লাহ্‌র সাহায্য চাহিয়াছে আল্লাহ্‌র কাছে যাইবার পথ পাইবার জন্য; যে ব্যক্তি সঠিক পথ পাইবার উদ্দেশ্যে সাহায্য চাহিয়াছে। আয়াতটির অন্য অর্থঃ ‘আল্লাহ্‌ তোমাকে তাঁহারই অন্বেষণরত অবস্থায় পাইলেন এবং তোমাকে তাঁহার কোলে (সান্নিধ্যে) তুলিয়া লইলেন।’

وَوَجَدَکَ عَآئِلًا فَاَغۡنٰی ؕ﴿۹﴾

৯
এবং তিনি তোমাকে অভাব-গ্রস্ত পাইয়াছিলেন এবং তিনি তোমাকে সম্পদশালী করিয়াছেন।৩৩৭৮
৩৩৭৮। নবী করীম (সাঃ)-এর জীবন আরম্ভ হইয়াছে নিঃসম্বল এতীম হিসাবে। আর তাঁহার জীবনের অবসান হইল সমগ্র আরব দেশের একচ্ছত্র সম্রাট হিসাবে।

فَاَمَّا الۡیَتِیۡمَ فَلَا تَقۡہَرۡ ؕ﴿۱۰﴾

১০
অতএব যে কোন এতীম হউক, তুমি তাহার সহিত কঠোরতা করিও না,