৭১

نوح

সূরা নূহ

Nooh

মক্কী ২৯ আয়াত ২ রুকু পারা ২৯

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ২৯ আয়াত এবং ২ রুকু আছে।

لِّتَسۡلُکُوۡا مِنۡہَا سُبُلًا فِجَاجًا ﴿٪۲۱﴾

২১
যেন তোমরা উহার প্রশস্ত রাস্তাসমূহের উপর দিয়া বিচরণ করিতে পার।’
সূরা নূহ - রুকু ১

قَالَ نُوۡحٌ رَّبِّ اِنَّہُمۡ عَصَوۡنِیۡ وَاتَّبَعُوۡا مَنۡ لَّمۡ یَزِدۡہُ مَالُہٗ وَوَلَدُہٗۤ اِلَّا خَسَارًا ﴿ۚ۲۲﴾

২২
নূহ বলিয়াছিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তাহারা আমার অবাধ্যতা করিয়াছে এবং এমন এক ব্যক্তির অনুসরণ করিতেছে যাহার ধন-সম্পদ এবং সন্তান-সন্ততি তাহার ক্ষতি বৃদ্ধি ব্যাতিরেকে আর কিছুই করে নাই,

وَمَکَرُوۡا مَکۡرًا کُبَّارًا ﴿ۚ۲۳﴾

২৩
এবং (আমার বিরুদ্ধে) তাহারা বিরাট ষড়যন্ত্র করিয়াছে।

وَقَالُوۡا لَا تَذَرُنَّ اٰلِہَتَکُمۡ وَلَا تَذَرُنَّ وَدًّا وَّلَا سُوَاعًا ۬ۙ وَّلَا یَغُوۡثَ وَیَعُوۡقَ وَنَسۡرًا ﴿ۚ۲۴﴾

২৪
“এবং তাহারা (পরস্পরকে) বলিতেছে, তোমরা তোমাদের মা’বূদদিগকে কখনও পরিত্যাগ করিও না, এবং পরিত্যাগ করিও না ওয়াদ্দ্‌কে এবং না সুওয়া’আকে, এবং না ইয়াগুসকে ও ইয়া’উক্বকে এবং নাস্‌রকে।”৩১৩৪
৩১৩৪। ‘ওয়াদ্দ্‌’ একটি প্রতিমার নাম, যাহাকে দাওমাতুল জন্দলের বানু কল্‌ব জাতি পূজা করিত। ইহা পুরুষ-শক্তির প্রতিভূ হিসাবে পুরুষাকৃতির মূর্তি ছিল। ‘সুত্তয়া’ বনু হযায়ল গোত্রের প্রতিমা ছিল। ইহা স্ত্রী-সৌন্দর্যের প্রতিভূ হিসাবে ছিল স্ত্রী আকৃতির মূর্তি। মুরাদ গোত্রের উপাস্য মূর্তি ছিল ইয়াগূস। আর হামদান গোত্রের পূজা ছিল ঘোড়াকৃতির ‘ইয়াউক’। যুল্‌কিলা উপজাতির উপাস্য দেবতা ছিল নসর– ইহার আকৃতি ছিল ঈগল পাখী বা শকুনের মত। ইহা ছিল দীর্ঘ জীবন বা অন্তর্দৃষ্টির প্রতীক। নূহ (আঃ)-এর জাতি ছিল সর্বাংশে মূর্তি পূজারী। তাহাদের বহু প্রতিমা ছিল। কিন্তু যে পাঁচটির নাম এই আয়াতে বর্ণিত হইয়াছে, এই কয়টাই ছিল সর্বাধিক প্রসিদ্ধ ও জনপ্রিয়। কয়েক শতাব্দী পরে, আরবরাও ইরাক হইতে এইগুলিকে নিজের দেশে নিয়া আসে বলিয়া মনে হয়। আরবদের প্রধান প্রতিমাগুলি ছিল লাত, মানাত এবং উয্‌যা। তাহাদের সর্বাপেক্ষা প্রসিদ্ধ মূর্তি ‘হুবুল’ কে আমীর বিন-লোহাই সিরীয়া হইতে আনিয়াছিল। ইহাও সম্ভব যে, আরবরা তাহাদের দেব-দেবীর নামকে নূহ (আঃ)-এর জাতির প্রতিমাগুলির নামে আখ্যায়িত করিয়াছিল। আরব জাতি ও নূহ (আঃ)-এর জাতি পরস্পরের দূর-বাসীন্দা ছিল না, বরং তাহাদের মধ্যে সাধারণ সংস্রব ও যোগাযোগ ছিল। অতএব, ইহা অসম্ভব বা অযৌক্তিক নহে যে, দুইটি প্রতিবেশী পৌত্তলিক জাতির প্রতিমাগুলির নাম একই ধরণের হইবে।

وَقَدۡ اَضَلُّوۡا کَثِیۡرًا ۬ۚ وَلَا تَزِدِ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا ضَلٰلًا ﴿۲۵﴾

২৫
এবং তাহারা অনেক লোককে পথভ্রষ্ট করিয়াছে, সুতরাং তুমি যালেমদিগকে পথভ্রষ্টতা ব্যতিরেকে অন্য কিছুতে বৃদ্ধি করিও না৷’

مِمَّا خَطِیۡٓــٰٔتِہِمۡ اُغۡرِقُوۡا فَاُدۡخِلُوۡا نَارًا ۬ۙ فَلَمۡ یَجِدُوۡا لَہُمۡ مِّنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ اَنۡصَارًا ﴿۲۶﴾

২৬
তাহাদিগকে তাহাদের পাপাচারের কারণে নিমজ্জিত করা হইল, অতঃপর তাহাদিগকে দাখিল করা হইল আগুনে। তখন তাহারা নিজেদের জন্য আল্লাহ্‌ ব্যতিরেকে কাহাকেও সাহায্যকারী পাইল না।

وَقَالَ نُوۡحٌ رَّبِّ لَا تَذَرۡ عَلَی الۡاَرۡضِ مِنَ الۡکٰفِرِیۡنَ دَیَّارًا ﴿۲۷﴾

২৭
এব নূহ বলিল, ‘হে আমার প্রতিপালক! তুমি ভূপৃষ্ঠে কাফেরদিগের মধ্য হইতে কোন গৃহবাসীকে ছাড়িও না,

اِنَّکَ اِنۡ تَذَرۡہُمۡ یُضِلُّوۡا عِبَادَکَ وَلَا یَلِدُوۡۤا اِلَّا فَاجِرًا کَفَّارًا ﴿۲۸﴾

২৮
কেননা, যদি তুমি তাহাদিগকে ছাড়িয়া দাও তাহা হইলে তাহারা তোমার বান্দাগণকেও পথভ্রষ্ট করিবে এবং তাহারা পাপাচারী এবং কাফের ব্যতিরেকে কাহাকেও জন্ম দিবে না,

رَبِّ اغۡفِرۡ لِیۡ وَلِوَالِدَیَّ وَلِمَنۡ دَخَلَ بَیۡتِیَ مُؤۡمِنًا وَّلِلۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ ؕ وَلَا تَزِدِ الظّٰلِمِیۡنَ اِلَّا تَبَارًا ﴿٪۲۹﴾

২৯
হে আমার প্রতিপালক! তুমি আমাকে, আমার পিতা মাতাকে এবং যে ব্যক্তি মো’মেন হইয়া আমার গৃহে দাখিল হয় তাহাকে এবং সকল মো’মেন পুরুষকে এবং সকল মো’মেন নারীকে ক্ষমা কর, এবং যালেমদিগকে ধ্বংস ব্যতিরেকে আর কিছুতে বৃদ্ধি করিও না।’৩১৩৫
সূরা নূহ - রুকু ২
৩১৩৫। আল্লাহ্‌র নবীগণ দয়া ও করুণায় ভরপুর হইয়া থাকেন। তাহারা করুণা-সিন্ধু। নূহ (আঃ)-এর এই প্রার্থনা হইতে বুঝা যায় যে, তাহার বিরোধিতা ও শত্রুতা দীর্ঘকাল ব্যাপী চলিয়াছিল। অবিরত-অবিশ্রান্তভাবে বহুদিন ধরিয়া তিনি অবহেলিত ও নির্যাতিত হইয়াছিলেন। তিনি তাহাদিগকে সঠিক পথে আনার জন্য যুগ-ব্যাপী অধ্যবসায় সহকারে চেষ্টা চালাইলেন। কিন্তু তাঁহার সকল চেষ্টাই অরণ্যে রোদন হইল। তাঁহার অল্প সংখ্যক অনুসারীদের সাথে আর দু’একজনও যোগদানের সম্ভাবনা যখন থাকিল না। এবং ইহারাও যখন চরম মাত্রার অত্যাচার ও নির্যাতনের শিকারে পরিণত হইল, তদুপরি অবিশ্বাসীদের দুষ্কৃতির পরিধি যখন সকল সীমা ছাড়াইয়া গেল, তখন অবস্থা এতই ভয়াবহ রূপ ধারণ করিল যে, নূহ (আঃ)-এর মত দয়ার্দ্র-হৃদয় ব্যক্তিও তাহাদের জন্য বদ-দোয়া করিতে বাধ্য হইলেন। অবশ্য, এইরূপ একই অবস্থায়, নবী করীম (সাঃ) তাহার শত্রুদের প্রতি যে অতুলনীয় মহানুভবতা ও অসামান্য ধৈর্য প্রদর্শন করিয়াছেন, তাহা জাগতিক জীবনে কল্পনাতীত। উহুদের যুদ্ধে, যখন তাহার দুইটি দাঁত ভাঙ্গিয়া গেল এবং জখমে-জখমে শরীর ভরিয়া গেল, আর সারা দেহ-রক্তে রঞ্জিত হইয়া গেল, তখন সেই চরম অবস্থায়ও তাহার মুখ হইতে যে কথাগুলি স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাহির হইয়া আসিয়াছিল, তাহা ছিলঃ “যে জাতি তাহাদের প্রতি সমাগত নবীকে জখম করিয়াছে এবং তাঁহার মুখমণ্ডলকে রক্তাপ্লুত করিয়াছে শুধু এই কারণে যে, তিনি তাহাদিগকে আল্লাহ্‌র দিকে আহ্বান করেন, সেই জাতি কি করিয়া পরিত্রাণ লাভ করিবে! হে আমার প্রভু আমার জাতিকে তুমি ক্ষমা কর; তাহারা কি করিতেছে, তাহা বুঝে না” (যুরকানী এবং হিশাম)।