৪৯

الحجرات

সূরা আল্ হুজুরাত

Al-Hujurat

মাদানী ১৯ আয়াত ২ রুকু পারা ২৬

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১৯ আয়াত এবং ২ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تُقَدِّمُوۡا بَیۡنَ یَدَیِ اللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَاتَّقُوا اللّٰہَ ؕ اِنَّ اللّٰہَ سَمِیۡعٌ عَلِیۡمٌ ﴿۲﴾

২
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলের সম্মুখে অগ্রবর্তী হইও না,২৭৮৭ এবং আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন কর। নিশ্চয় আল্লাহ্ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞানী।
২৭৮৭। বিশ্বাসীগণকে মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি যথাযোগ্য শ্রদ্ধা, ভক্তি ও সম্ভ্রম প্রদর্শন করার জন্য উপদেশ দেওয়া হইতেছে। তাহারা যেন তাঁহার (সাঃ) প্রতি দ্বিধাহীন আনুগত্য দেখায় এবং বিভিন্ন বিষয়াদিতে তাঁহার সিদ্ধান্ত ও মীমাংসা কি হইবে তাহা পূর্ব হইতেই আঁচ করিয়া তদনুযায়ী কাজ না করে অথবা নিজেদের ইচ্ছাকে তাঁহার ইচ্ছার উপরে স্থান না দেয়।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لَا تَرۡفَعُوۡۤا اَصۡوَاتَکُمۡ فَوۡقَ صَوۡتِ النَّبِیِّ وَلَا تَجۡہَرُوۡا لَہٗ بِالۡقَوۡلِ کَجَہۡرِ بَعۡضِکُمۡ لِبَعۡضٍ اَنۡ تَحۡبَطَ اَعۡمَالُکُمۡ وَاَنۡتُمۡ لَا تَشۡعُرُوۡنَ ﴿۳﴾

৩
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! তোমরা নিজেদের কণ্ঠস্বরকে নবীর কণ্ঠস্বরের উপর উঁচু করিও না,২৭৮৮ এবং তোমরা তোমাদের পরস্পরের মধ্যে উচ্চঃস্বরে কথা বলার ন্যায় তাহার সম্মুখে উচ্চঃস্বরে কথা বলিও না, কারণ ইহাতে তোমাদের কৃত-কর্মসমূহ বিনষ্ট হইয়া যাইবে এবং তোমরা অনুভবও করিতে পারিবে না।
২৭৮৮। এই আয়াতে বিশেষ জোর দেওয়া হইয়াছে যে, মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি সর্বোচ্চ সম্মান ও মর্যাদা প্রদর্শন যেন মুসলমানদের স্বাভাবিক নীতি ও রীতিতে পরিণত হইয়া যায়। এই বিষয় তাহাদের স্বভাব-সিদ্ধ হইয়া যাওয়া চাই যে, তাহারা মহানবী (সাঃ)-এর উপস্থিতিতে উঁচু গলায় কথা না বলে; তাঁহাকে যেন উচ্চঃস্বরে আহ্বান না করে। কেননা, এইরূপ কাজ করা শুধু বেয়াদবীই হইবে না,বরং মহান নেতার প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শনের অভাব-জনিত কারণে দোষী ব্যক্তির নৈতিক ক্ষতি হইতে পারে।

اِنَّ الَّذِیۡنَ یَغُضُّوۡنَ اَصۡوَاتَہُمۡ عِنۡدَ رَسُوۡلِ اللّٰہِ اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ امۡتَحَنَ اللّٰہُ قُلُوۡبَہُمۡ لِلتَّقۡوٰی ؕ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّاَجۡرٌ عَظِیۡمٌ ﴿۴﴾

৪
নিশ্চয় যাহারা নিজেদের কণ্ঠস্বরকে আল্লাহ্‌র রসূলের সম্মুখে চাপা দিয়া রাখে— তাহারাই এমন লোক যাহাদের অন্তরকে আল্লাহ্ তাক্‌ওয়ার জন্য বিশুদ্ধ করিয়া লইয়াছেন।২৭৮৯ তাহাদের জন্য ক্ষমা ও মহাপুরস্কার অবধারিত রহিয়াছে।
২৭৮৯। মহানবী (সাঃ)-এর উপস্থিতিতে নীচুস্বরে কথা বলা দ্বারা তাঁহার প্রতি যথাযোগ্য মর্যাদা প্রদর্শিত হয় এবং আলাপকারীর হৃদয়ের নম্রতা প্রকাশ পায়। অপরপক্ষে অনর্থক স্বর উচ্চ করিয়া কথা বলার মধ্যে প্রকাশ পায় অহঙ্কার ও ঔদ্ধত্য।

اِنَّ الَّذِیۡنَ یُنَادُوۡنَکَ مِنۡ وَّرَآءِ الۡحُجُرٰتِ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡقِلُوۡنَ ﴿۵﴾

৫
যাহারা কামরাসমূহের পিছন হইতে তোমাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকাডাকি করে— তাহাদের অধিকাংশই বুদ্ধি খাটায় না।২৭৯০
২৭৯০। মহানবী (সাঃ)-এর গৃহের বাহির হইতে তাঁহাকে উচ্চৈঃস্বরে ডাকা যেমনি অশোভনীয় তেমনি ইহা ব্যক্তিগত নির্জনতার উপরে অনধিকার প্রবেশ স্বরূপ। ইহাতে তাঁহার ব্যক্তি-সত্তার প্রতি শ্রদ্ধার অভাব প্রকাশ পায় এবং তাঁহার মহামূল্য সময়ের অপচয় ঘটে। কেবলমাত্র অভদ্র ব্যক্তিই এইরূপ বোকামীপূর্ণ আচরণ করিতে পারে।

وَلَوۡ اَنَّہُمۡ صَبَرُوۡا حَتّٰی تَخۡرُجَ اِلَیۡہِمۡ لَکَانَ خَیۡرًا لَّہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ غَفُوۡرٌ رَّحِیۡمٌ ﴿۶﴾

৬
এবং তুমি বাহির হইয়া তাহাদের নিকট আসা পর্যন্ত যদি তাহারা ধৈর্য ধারণ করিত তাহা হইলে ইহা তাহাদের জন্য খুব উত্তম হইত এবং আল্লাহ্‌ অতীব ক্ষমাশীল, পরম দয়াময়।

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡۤا اِنۡ جَآءَکُمۡ فَاسِقٌۢ بِنَبَاٍ فَتَبَیَّنُوۡۤا اَنۡ تُصِیۡبُوۡا قَوۡمًۢا بِجَہَالَۃٍ فَتُصۡبِحُوۡا عَلٰی مَا فَعَلۡتُمۡ نٰدِمِیۡنَ ﴿۷﴾

৭
হে যাহারা ঈমান আনিয়াছ! যদি কোন দুষ্কৃতকারী তোমাদের নিকট কোন গুরুত্বপূর্ণ সংবাদ লইয়া আসে তাহা হইলে তোমরা ভালরূপে তদন্ত কর,২৭৯১ যেন এইরূপ না হয় যে, অজ্ঞাতসারে তোমরা কোন জাতিকে কষ্ট দাও এবং পরে তোমরা যে (ভুল) কাজ কর উহার জন্য অনুতপ্ত হও।
২৭৯১। মক্কা-বিজয়ের পরে প্রায় সারাটা আরব দেশই ‘ইসলাম’ গ্রহণ করিল। কিন্তু তবুও কয়েকটি বিশেষ গোত্র নতুন ধর্ম গ্রহণ করিতে শুধু অস্বীকারই করিল না, বরং মুসলমানের বিরুদ্ধে মরণ-কামড়ের জন্য সংকল্পবদ্ধ হইল৷ তদুপরি, রোমান-সাম্রাজ্য এবং পারস্য-সাম্রাজ্যও নিজ নিজ সাম্রাজ্যের সীমান্তবর্তী আরব এলাকায় ইসলামের অভ্যুদয় দেখিয়া এই নব-শক্তি সম্বন্ধে সজাগ ও সচেতন হইয়া উঠিল। তাহাদের একচ্ছত্র শক্তি ও মর্যাদার প্রতি ইসলাম হুমকি হইয়া উঠিতেছে ভাবিয়া মুসলমানদের সহিত মোকাবেলা ও যুদ্ধ করা অনিবার্য হইয়া উঠিয়াছে বলিয়া তাহারা মনে ধারণা পোষণ করিতে লাগিল। এমতাবস্থায়, ‘ভালরূপে তদন্ত কর’ এই প্রত্যাদেশটি খুবই সময়োপযোগী ও দরকারী উপদেশ। মুসলমানগণকে বলা হইতেছে যে, যদিও যুদ্ধের জরুরী পরিস্থিতিতে শত্রুকে রুখিবার জন্য তাৎক্ষণিক কর্ম তৎপরতা অতীব প্রয়োজনীয়, তথাপি সাবধানতা ও সতর্কতা অবলম্বন করা উচিত যেন অনুসন্ধান ব্যতিরেকেই গুজবকে সত্য সংবাদ মনে করিয়া কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা না হয়। কেননা, স্বভাবতঃই যুদ্ধাবস্থায় নানারূপ মিথ্যা কল্প-কাহিনী ছড়াইয়া পড়ে। অতএব, পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও সত্য যাচাইয়ের পরই এইগুলির ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত।

وَاعۡلَمُوۡۤا اَنَّ فِیۡکُمۡ رَسُوۡلَ اللّٰہِ ؕ لَوۡ یُطِیۡعُکُمۡ فِیۡ کَثِیۡرٍ مِّنَ الۡاَمۡرِ لَعَنِتُّمۡ وَلٰکِنَّ اللّٰہَ حَبَّبَ اِلَیۡکُمُ الۡاِیۡمَانَ وَزَیَّنَہٗ فِیۡ قُلُوۡبِکُمۡ وَکَرَّہَ اِلَیۡکُمُ الۡکُفۡرَ وَالۡفُسُوۡقَ وَالۡعِصۡیَانَ ؕ اُولٰٓئِکَ ہُمُ الرّٰشِدُوۡنَ ۙ﴿۸﴾

৮
এবং তোমরা জানিয়া রাখ যে, তোমাদের মধ্যে আল্লাহ্‌র রসূল রহিয়াছে; যদি অনেক বিষয়ে সে তোমাদের কথা মানিয়া চলে, তাহা হইলে অবশ্যই তোমরা কষ্টে পড়িবে,২৭৯২ কিন্তু আল্লাহ্ তোমাদের দৃষ্টিতে ঈমানকে প্রিয় করিয়া দিয়াছেন, এবং তোমাদের অন্তরে ইহাকে মনোরম করিয়া দিয়াছেন; এবং কুফরী, দুষ্কৃতি এবং অবাধ্যতাকে তিনি তোমাদের দৃষ্টিতে ঘৃণ্য করিয়া দেখাইয়াছেন। ইহারাই সৎ পথে কায়েম আছে।
২৭৯২। এখানে মুসলমানদিগকে উপদেশ দেওয়া হইতেছে যে, নবী করীম (সাঃ) কার্য সম্পাদনের জন্য তাহাদের পরামর্শ চাহিতে পারেন। তবে, এই কথা মনে করা কখনও ঠিক হইবে না যে, তাহাদের দেওয়া উপদেশ ও পরামর্শগুলি গ্রহণ করা ও কার্যে রূপায়িত করা তাঁহার জন্য বাধ্যতামূলক। তিনি তো আল্লাহ্‌তা’লার দ্বারা পরিচালিত দিব্য-দৃষ্টির অধিকারী এবং কর্তব্য সম্পাদনের দায়িত্বও তাঁহারই। তাঁহার সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত ও প্রশ্নাতীত।

فَضۡلًا مِّنَ اللّٰہِ وَنِعۡمَۃً ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌ حَکِیۡمٌ ﴿۹﴾

৯
ইহা আল্লাহ্‌র পক্ষ হইতে অনুগ্রহ ও নেয়ামত স্বরূপ। এবং আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞানী, পরম প্রজ্ঞাময়।

وَاِنۡ طَآئِفَتٰنِ مِنَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ اقۡتَتَلُوۡا فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَہُمَا ۚ فَاِنۡۢ بَغَتۡ اِحۡدٰٮہُمَا عَلَی الۡاُخۡرٰی فَقَاتِلُوا الَّتِیۡ تَبۡغِیۡ حَتّٰی تَفِیۡٓءَ اِلٰۤی اَمۡرِ اللّٰہِ ۚ فَاِنۡ فَآءَتۡ فَاَصۡلِحُوۡا بَیۡنَہُمَا بِالۡعَدۡلِ وَاَقۡسِطُوۡا ؕ اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الۡمُقۡسِطِیۡنَ ﴿۱۰﴾

১০
এবং যদি মো’মেনদের দুইদল পরস্পর লড়াইয়ে লিপ্ত হয়, তাহা হইলে তাহাদের উভয়ের মধ্যে তোমরা মীমাংসা করাইবে;২৭৯৩ যদি (মীমাংসার পরে) তাহাদের উভয়ের মধ্য হইতে একদল অপর দলের উপর বিদ্রোহ করিয়া আক্রমণ করে তাহা হইলে তোমরা সকলে মিলিয়া যে বিদ্রোহ করিয়াছে তাহার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করিয়া যাইবে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আল্লাহ্‌র নির্দেশের দিকে ফিরিয়া আসে। যদি সে ফিরিয়া আসে, তাহা হইলে তোমরা তাহাদের উভয়ের মধ্যে ন্যায়পরায়ণতার সহিত মীমাংসা করাইয়া দিবে এবং সুবিচার করিবে। নিশ্চয় আল্লাহ্ সুবিচারকারীদেরকে ভালবাসেন।
২৭৯৩। ইসলামী রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ও সংহতির প্রতি বড় হুমকি হইল আত্ম-কলহ, যাহা কখনও কখনও দুই দলের মধ্যে কিংবা দুইটি দ্বিমতপোষণকারী গ্রুপের মধ্যে বাধিয়া যায়। এই আয়াতে এইরূপ মত-বিরোধ ও বিবাদ-বিসংবাদ কার্যকরীভাবে মিটাইবার পন্থা বর্ণিত হইয়াছে। যদিও প্রাথমিকভাবে, মুখ্যতঃ মুসলমানের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব-কলহের অবসান কল্পে ন্যায়-ভিত্তিক, চমৎকার ও কার্যকরী মীমাংসা-নীতি এই আয়াতে ব্যক্ত করা হইয়াছে, তথাপি কার্যকরী জাতি-সংঘ ও জাতি-পুঞ্জের স্থাপনকল্পে ও ইহার স্থায়িত্ব রক্ষাকল্পে উক্ত নীতিকে ভিত্তি হিসাবে গ্রহণ করা বিশেষ প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক শান্তি বজায় রাখার ব্যাপারে এই নীতি-মালা এক বিরাট রক্ষা-কবচ।