الفتح
Al-Fath
ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৩০ আয়াত এবং ৪ রুকু আছে।
অবর্তীর্ণ বা নাযেল হওয়ার সময় ও প্রসঙ্গ
প্রখ্যাত আলেমগণের সকলেরই এই অভিমত যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি স্বাক্ষরের পরে, ষষ্ঠ হিজরীর জিলকদ মাসে, মহানবী (সাঃ) যখন মদীনায় ফিরিতেছিলেন, তখন এই সূরা অবতীর্ণ হইয়াছিল। এই সন্ধিটি ইসলামের ইতিহাসের একটি যুগান্তকারী ঘটনা। আর সেজন্যই ইহার সহিত সংশ্লিষ্ট সকল ছোটখাট বিষয়াদির বিবরণও ইসলামের ইতিহাসে সযত্নে সংরক্ষিত রহিয়াছে। তাই এই সূরা নাযেল হওয়ার স্থান ও সময় সম্বন্ধে পূর্ণ মতৈক্য রহিয়াছে। এই সূরার নাম আল ফাতহ্ (বিজয়)। এই নামকরণ খুবই সার্থক ও যুক্তি-যুক্ত হইয়াছে। আপাতদৃষ্টিতে এই সন্ধি একটি রাজনৈতিক পরাজয় মনে হইলেও পরিশেষে হযরত নবী করীম (সাঃ)-এর জন্য ইহা অনন্য সাধারণ প্রজ্ঞা, বিচক্ষণতা ও দূরদর্শিতার পরিচায়ক বলিয়া প্রমাণিত হইল। কেননা ইহার ফলে মক্কা-বিজয় সহজে সংঘটিত হইল এবং তারই ফলে সারা আরব দেশে অভাবিতভাবে ইসলামের বিজয়-ঝাণ্ডা উড্ডীন হইল৷ পূর্ববর্তী সূরায় শেষের দিকে বিশ্বাসীগণকে অবিশ্বাসীদের বিরুদ্ধে সুনিশ্চিত বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছিল। এই সূরা অতি পরিষ্কার ও দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ঘোষণা করিতেছে যে, প্রতিশ্রুত বিজয়ের দিন এখন আর অনিশ্চিত দূরের বস্তু নহে, বরং সেই দিন অতি সন্নিকটে। বিজয় এতই সন্নিকটে যে, ইহা আসিয়া গিয়াছে বলিলেও চলে। এই বিজয় এতই পূর্ণ ও প্রভাব-বিস্তারী হইবে যে, সংশয়বাদী ব্যক্তিও ইহাকে অস্বীকার করিতে পারিবে না।
বিষয়-বস্তু
সূরাটি এই কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করিয়া আরম্ভ হইয়াছে যে, প্রতিশ্রুত বিজয় দ্বারদেশে উপস্থিত হইয়া গিয়াছে। এই বিজয় হইবে পরিষ্কার, চূড়ান্ত ও সুদূর-প্রসারী। মহানবী (সাঃ)-কে আরো জানানো হইল যে, এই বিজয়ের ফলে এত বিপুল সংখ্যক লোক ইসলাম গ্রহণ করিবে যে, নবদীক্ষিতগণকে ইসলামের ধর্ম-বিশ্বাস, নিয়ম-নীতি ও আচার-আচরণ প্রভৃতি ব্যাপারে শিক্ষিত ও অভ্যস্ত করিয়া তোলা এক বিরাট ও দুঃসাধ্য কাজ হইয়া দাঁড়াইবে। অতএব, এই সুমহান কার্য সঠিকভাবে সম্পাদনের জন্য মহানবীর উচিত আল্লাহ্র সাহায্য প্রার্থনা করা। তাহাছাড়া আল্লাহ্তা’লার কাছে করুণা ও ক্ষমা ভিক্ষা করাও উচিত যাহাতে মানবীয় সীমাবদ্ধতা ও মানব-সুলভ দুর্বলতার কারণে, এই কর্ম-সম্পাদনে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকিয়া না যায়। অতঃপর বলা হইয়াছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির পূর্ণ তাৎপর্য সঠিক মূল্যায়নের অভাবে, মো’মেনগণ কতকটা আশাহত হইলেও আল্লাহ্তা’লা শীঘ্রই তাহাদের মনে শান্তি ও স্বস্তি প্রদান করিবেন এবং যে আনন্দ এখন অবিশ্বাসীরা উপভোগ করিতেছে, তাহা অতি ক্ষণস্থায়ী বলিয়া প্রমাণিত হইবে। মো’মেনগণকে উপদেশ দেওয়া হইতেছে যে, সন্ধি-পত্রে দস্তখত করিয়া মহানবী (সাঃ) তীক্ষ বুদ্ধির পরিচয় দেন নাই, এরূপ মনে করা কোন মো’মেনরই উচিত নয়। কেননা তিনি (সাঃ) হইলেন আল্লাহ্তা’লার প্রেরিত মহাপুরুষ এবং তাঁহার সকল কার্যাবলীই আল্লাহ্তা’লার তত্বাবধানে ও পরিচালনায় বা হেদায়াতে হইয়া থাকে। মো’মেনদের উচিত, তাহাকে বিশ্বাস করা, সাহায্য করা ও শ্রদ্ধা করা। সূরাতে এই কথাও বলা হইয়াছে যে, মো’মেনগণ ঐ সময়েই আল্লাহ্র সন্তুষ্টি অর্জন করিয়াছিল যখন তাহারা ‘বৃক্ষের নীচে’ বসিয়া রসূলে পাক (সাঃ)-এর আনুগত্য করার এরূপ শপথ নিয়াছিল যে, তাহারা মহাবিপদের মুখেও তাঁহার পাশে দাঁড়াইবে, এমন কি প্রাণ বিসর্জন দিবে তথাপি তাহাকে বিসর্জন দিবে না। ইহা আল্লাহ্তা’লারই এক পরিকল্পনা ছিল যে, ঐ সময়ে যুদ্ধ সংঘটিত হইবে না। মক্কায় সেই সময়ে বেশ কয়েকজন নিবেদিত-প্রাণ, সত্য-সরল মুসলমান বাস করিতেন, যাহাদিগকে মদীনার মো’মেনগণ জানিতেন না। ঐ সময় যুদ্ধ হইলে ঐ মুসলমানরা অজান্তেই মারা পড়িতেন। অতঃপর মোনাফেক ও পশ্চাদপসরণকারীর দলকে ভর্ৎসনা করা হইয়াছে এবং তাহাদের দ্বৈত-নীতিকে উলঙ্গভাবে প্রকাশ করা হইয়াছে। যখনই তাহাদিগকে আল্লাহ্র পথে যুদ্ধ করার আহবান জানানো হয়, তাহারা নতুন নতুন বাহানা আবিষ্কার করিয়া পিছনে থাকিয়া যাইতে চায়। কিন্তু তাহাদের এই মিথ্যা বাহানা ও নির্বোধ ওজর-আপত্তি আত্ম-প্রবঞ্চনা ছাড়া আর কিছুই নয়। সূরাটি শেষ দিকে পুনরায় এই বিষয়ের প্রতি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়াছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি এক বিরাট বিজয় বলিয়া প্রমাণিত হইবে এবং এই বিজয়ের পিছনে আরো অনেক বিজয় ছুটিয়া আসিবে, এমন কি আশেপাশের দেশগুলি মুসলমানদের হস্তগত হইয়া যাইবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
اِنَّا فَتَحۡنَا لَکَ فَتۡحًا مُّبِیۡنًا ۙ﴿۲﴾
لِّیَغۡفِرَ لَکَ اللّٰہُ مَا تَقَدَّمَ مِنۡ ذَنۡۢبِکَ وَمَا تَاَخَّرَ وَیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکَ وَیَہۡدِیَکَ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ۙ﴿۳﴾
وَّیَنۡصُرَکَ اللّٰہُ نَصۡرًا عَزِیۡزًا ﴿۴﴾
ہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ السَّکِیۡنَۃَ فِیۡ قُلُوۡبِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ لِیَزۡدَادُوۡۤا اِیۡمَانًا مَّعَ اِیۡمَانِہِمۡ ؕ وَلِلّٰہِ جُنُوۡدُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا ۙ﴿۵﴾
لِّیُدۡخِلَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَیُکَفِّرَ عَنۡہُمۡ سَیِّاٰتِہِمۡ ؕ وَکَانَ ذٰلِکَ عِنۡدَ اللّٰہِ فَوۡزًا عَظِیۡمًا ۙ﴿۶﴾
وَّیُعَذِّبَ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقٰتِ وَالۡمُشۡرِکِیۡنَ وَالۡمُشۡرِکٰتِ الظَّآنِّیۡنَ بِاللّٰہِ ظَنَّ السَّوۡءِ ؕ عَلَیۡہِمۡ دَآئِرَۃُ السَّوۡءِ ۚ وَغَضِبَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ وَلَعَنَہُمۡ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَہَنَّمَ ؕ وَسَآءَتۡ مَصِیۡرًا ﴿۷﴾
وَلِلّٰہِ جُنُوۡدُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا ﴿۸﴾
اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِیۡرًا ۙ﴿۹﴾
لِّتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَتُعَزِّرُوۡہُ وَتُوَقِّرُوۡہُ ؕ وَتُسَبِّحُوۡہُ بُکۡرَۃً وَّاَصِیۡلًا ﴿۱۰﴾