৪৮

الفتح

সূরা আল্ ফাত্‌হ

Al-Fath

মাদানী ৩০ আয়াত ৪ রুকু পারা ২৬

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৩০ আয়াত এবং ৪ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

اِنَّا فَتَحۡنَا لَکَ فَتۡحًا مُّبِیۡنًا ۙ﴿۲﴾

২
নিশ্চয় আমরা তোমাকে এক সুস্পষ্ট বিজয় দান করিয়াছি,২৭৬৩
২৭৬৩। “এক সুস্পষ্ট বিজয়” কথাগুলি মনে হয় ‘হুদায়বিয়ার সন্ধি’কে বুঝাইতেছে। এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য যে, মদনী জীবনের প্রথম ছয় বছরে, যদিও মহানবী (সাঃ) তাঁহার শত্রুদের বিরুদ্ধে এত বড় বড় বিজয় অর্জন করিয়াছিলেন যে তাহাদের যুদ্ধ করার ক্ষমতা একেবারে পঙ্গু ও চূর্ণ-বিচূর্ণ হইয়া গিয়াছিল, তথাপি কুরআনে ঐসব বিজয়ের একটিকেও প্রকাশ্য বিজয় বলিয়া অভিহিত করা হয় নাই। এই মহাসম্মান একমাত্র হুদায়বিয়ার সন্ধির জন্য সংরক্ষিত ছিল। অথচ এই সন্ধির শর্তগুলি বাহ্যতঃ মুসলমানদের জন্য অপমানজনক ছিল এবং ইসলামের সম্মানের প্রতি এক অসহনীয় আঘাত ছিল। এতই অসহনীয় ছিল যে, হযরত উমর (রাঃ)-এর মত দৃঢ়চেতা ব্যক্তিও দুঃখে ও লজ্জায় উচ্চৈঃস্বরে বলিয়া উঠিয়াছিলেন, এই শর্তাবলী যদি মহানবী (সাঃ) ছাড়া অন্য কোনও ব্যক্তি দ্বারা সম্পাদিত হইত, তাহা হইলে তিনি এইগুলিকে ঠাট্টা করিয়া উড়াইয়া দিতেন (হিশাম)। প্রকৃতপক্ষে, নিশ্চিতভাবেই এই সন্ধি একটি মহাবিজয় ছিল, এই কারণে যে, ইহা ইসলামের বিস্তৃতি, প্রচার ও প্রসারের পথ অবারিতভাবে খুলিয়া দিল, যাহার ফলে মক্কার পতন ও সারা আরবের বিজয়ের চাবি মুসলমানের হাতে আসিয়া গেল। মহানবী (সাঃ)-এর জন্য এই সন্ধিটি ছিল মহাকুশলীর বিজয়-চাল, যাহার ফলে তাঁহার ‘রাজনৈতিক মর্যাদা, কুরায়শদের স্বাধীন ও সার্বভৌম মর্যাদার সমানই স্বাধীন ও সার্বভৌম বলিয়া স্বীকৃত হইয়া গেল’ (মোহাম্মদ এ্যাট মেডিনা বাই মন্টগোমারী ওয়াট)। মহানবী (সাঃ) স্বপ্নে দেখিয়াছিলেন যে, তিনি তাঁহার একদল সঙ্গী লইয়া কাবা গৃহের তাওয়াফ করিতেছেন। এই স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিবার জন্য তিনি ১,৫০০ জন সাথী লইয়া উমরা (৬২৮ইং) সম্পাদনের উদ্দেশ্যে সেই পবিত্র মাসগুলির মধ্যে রওয়ানা হইলেন, যে মাসগুলিতে ইসলামের পূর্ব হইতেই আরবদেশের প্রচলন ও রীতি অনুযায়ী যুদ্ধ-বিগ্রহ একেবারেই নিষিদ্ধ ছিল। তিনি যখন মক্কার কয়েক মাইল দূরে অবস্থিত ‘উসূফান’ নামক স্থানে পৌঁছিলেন, যখন তিনি তাঁহার পূর্বে-পাঠানো দূতের মারফত অবহিত হইলেন যে, কুরায়শগণ কোন অবস্থাতেই মহানবীকে মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। এই অগ্রদূত দলের নেতা ছিলেন আব্বাদ বিন বিশর। যুদ্ধ পরিহার করার মানসে, রসূলুল্লাহ (সাঃ) রাস্তা পরিবর্তন পূর্বক, বহু দুর্গম ও কষ্টকর প্রস্তরময়, পেঁচালো দীর্ঘপথ ঘুরিয়া হুদায়বিয়াতে পৌঁছিলেন এবং তাবু ফেলিলেন। মহানবী (সাঃ) ঘোষণা করিলেন যে, পবিত্র মক্কার সম্মানের খাতিরে তিনি কুরায়শদের সকল শর্ত মানিতে প্রস্তুত আছেন (হিশাম)। কুরায়শগণ দৃঢ় সঙ্কল্প ছিল যে, মহানবী (সাঃ) যাহা কিছুই বলুন না কেন, তাহারা কোন ক্রমেই তাঁহাকে মক্কায় প্রবেশ করিতে দিবে না। উভয় পক্ষে বহু বাণী আদান-প্রদান করা হইল, যাহাতে সমস্যার একটা শান্তিপূর্ণ সমাধান হইয়া যায়। বহু তর্ক-বির্তক ও সুদীর্ঘ সংলাপ সত্বেও ফলপ্রসূ কিছুই ঘটিল না। মহানবী (সাঃ) নিজের ব্যক্তিগত মর্যাদা ও মান-সম্মানকে উপেক্ষা করিয়াও কুরায়শদের সহিত একটা ন্যায়-সঙ্গত আপোষে উপনীত হইবার জন্য শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত অসীম ধৈর্যের সাথে প্রচেষ্টা চালাইয়া গেলেন। শেষ পর্যন্ত একটা আপোষ-মীমাংসা হইল বটে, কিন্তু চুক্তির শর্তগুলি মুসলমানদের জন্য তত সুবিধাজনক বোধ হইতেছিল না। শর্তগুলি এইরূপঃ “দশ বৎসরের জন্য দুই পক্ষের মধ্যে যুদ্ধ স্থগিত করা হইল। যাহারা মহানবী (সাঃ)-এর পক্ষাবলম্বন করিতে চায় কিংবা তাহার সহিত সন্ধি স্থাপন করিতে চায়, তাহাদিগকে অবাধে তাহা করিতে দেওয়া হইবে। অনুরূপভাবে যাহারা কুরায়শদের পক্ষাবলম্বন করিতে চাহিবে কিংবা তাহাদের সাথে সন্ধি স্থাপন করিতে চাহিবে, তাহারাও তাহা অবাধে করিতে পারিবে। মৈত্রী-জোট গঠনে কোন প্রকার বাধা দেওয়া যাইবে না। যদি কোন মো’মেন ব্যক্তি অভিভাবকের বিনা অনুমতিতে মক্কা ছাড়িয়া মহানবী (সাঃ)-এর কাছে গমন করে, তাহা হইলে ঐ মুসলিম ব্যক্তিকে মক্কায় তাহার অভিভাবকের কাছে ফেরৎ পাঠাইতে হইবে। কিন্তু মহানবী (সাঃ)-এর কোন অনুসারী যদি তাঁহাকে ছাড়িয়া কুরায়শদের কাছে চলিয়া আসে তাহা হইলে তাহাকে ফেরৎ চাওয়া যাইবে না বা ফেরৎ দেওয়া হইবে না। এই বৎসর মক্কানগরীতে প্রবেশ না করিয়াই মহানবী (সাঃ)-কে মদীনায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। অবশ্য পরবর্তী বৎসরে তিনি তাঁহার সাথীগণকে সঙ্গে নিয়া ওমরাহ পালনের জন্য মক্কায় তিনদিন ধরিয়া অবস্থান করিতে পারিবেন, তবে তাহারা কোষাবদ্ধ তরবারী ব্যতীত অন্য কোন প্রকারের অস্ত্র সঙ্গে আনিতে পারিবেন না।” শর্তগুলির দিকে তাকাইলেই মনে হয় যে, এইগুলি অপমানজনক। মুসলমানরা খুবই মনক্ষুণ্ণ হইলেন। তাহাদের মনের গভীর দুঃখানুভূতি ও অপমানবোধ ভাষায় প্রকাশ করা সুকঠিন। তৃতীয় শর্তটি একেবারে অসহনীয় ও যন্ত্রণাদায়ক। কিন্তু মহানবী (সাঃ) শান্ত ও সমাহিত। কেননা, ইসলামের নৈতিক শক্তির উপর তাহার এত গভীর আস্থা ছিল যে, তিনি নিশ্চিত প্রত্যয় রাখিতেন, যে ব্যক্তি একবার ঈমানের স্বাদ লাভ করিয়াছে, সে ঐ ঈমানের খাতিরে আগুনে নিক্ষিপ্ত হওয়া পসন্দ করিবে, তথাপি কুফরীর মধ্যে প্রত্যাবর্তন করিবে না (বুখারী)। তাহা ছাড়াও, সে যেখানেই থাকুক না কেন ইসলামের জন্য এক শক্তির উৎসরূপেই থাকিবে। পরবর্তীকালে এই সন্ধিই একটি ‘প্রকাশ্য বিজয়’ বলিয়া প্রমাণিত হইল। মহানবী (সাঃ)-এর যে সকল সাহাবী এই সন্ধি স্থাপনের কালে হুদায়বিয়ায় উপস্থিত ছিলেন, তাহারা অত্যন্ত গৌরব বোধ করিতেন এবং যথেষ্ট ন্যায়-সঙ্গতভাবেই বলিতেন যে, এই আয়াতের “সুস্পষ্ট বিজয়” বলিতে মক্কা বিজয়কে নয়, বরং হুদায়বিয়ার সন্ধিকেই বুঝাইতেছে (বুখারী) তাঁহাদের মতে অন্য কোন বিজয়ই পরিণামের দিক দিয়া এই সন্ধির চাইতে বড় ও ফলপ্রসূ সাব্যস্ত হয় নাই (হিশাম)। আর, নবী করীম (সাঃ) স্বয়ং ইহাকে মহাবিজয় বলিয়া অভিহিত করিয়াছেন (বায়হাকী)। কুরআন ইহাকে বলিয়াছে, এক সুস্পষ্ট বিজয় (আয়াত-২), মহাসফলতা (আয়াত-৬); মহাপুরস্কার (আয়াত-১১), নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি আল্লাহ্‌তা’লার পূর্ণতম অনুগ্রহ (আয়াত-৩)। কারণ, এই সন্ধিই ইসলামের ধর্মীয় ও রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ও বিজয়সমূহের সদর দরজা খুলিয়া দিয়াছিল।

لِّیَغۡفِرَ لَکَ اللّٰہُ مَا تَقَدَّمَ مِنۡ ذَنۡۢبِکَ وَمَا تَاَخَّرَ وَیُتِمَّ نِعۡمَتَہٗ عَلَیۡکَ وَیَہۡدِیَکَ صِرَاطًا مُّسۡتَقِیۡمًا ۙ﴿۳﴾

৩
যেন আল্লাহ্ তোমাকে ক্ষমা করেন২৭৬৪ তোমার ত্রুটি-বিচ্যুতি২৭৬৫ যাহা পূর্বে (তোমার প্রতি আরোপিত) হইয়াছে এবং ভবিষ্যতে২৭৬৬ হইতে পারে, এবং তোমার উপর নিজ নেয়ামতকে পূর্ণ করেন এবং তোমাকে সরল-সুদৃঢ় পথে পরিচালিত করেন;
২৭৬৪। এই আয়াতের অর্থ করিতে গিয়া অনেকেই জানিয়া শুনিয়া কদর্থ করিয়াছেন। আরবী বাগ্‌ধারা ও ব্যবহার রীতি সম্বন্ধে জ্ঞান না থাকায় খৃষ্টান লেখকেরা ভুলবশতঃ এই অর্থ করিয়াছেন যে, মহানবী (সাঃ)ও হয় তো কখনও নৈতিক ভ্রান্তিতে পতিত হইয়াছিলেন। মুসলমানদের কাছে ইহা বিশ্বাসের অঙ্গ যে, আল্লাহ্‌র নবীগণ নিষ্পাপ জন্মগ্রহণ করেন এবং আজীবন নিষ্পাপ থাকেন। ইহাই কুরআনের শিক্ষা। তাঁহারা আল্লাহ্‌র নির্দেশের বিপরীতে কিছু বলেন না এবং কিছু করেনও না (২১ঃ২৮)। যেহেতু, তাহাদিগকে মানুষের পাপ-মুক্তির জন্য প্রেরণ করা হইয়া থাকে, সেই হেতু ইহা স্বাভাবিক যে, তাঁহারা স্বয়ং পাপ করিতে পারেন না। তদুপরি, মহানবী (সাঃ) হইলেন সকল নবীর উচ্চে শীর্ষস্থানীয়, পবিত্র নবীদের মধ্যে পবিত্রতম। কুরআনে বহু আয়াত রহিয়াছে যাহা অত্যন্ত উজ্জ্বল ও জোরালো ভাষায় নবী করীম (সাঃ)-এর নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক, পূত-পবিত্র জীবনের সাক্ষ্য প্রদানকারী (যেমন-২ঃ১৩০; ৩ঃ৩২; ৩ঃ১৬৫; ৬ঃ১৬৩; ৭ঃ১৫৮; ৮ঃ২৫; ৩৩ঃ২২; ৪৮ঃ১১; ৫৩ঃ৩-৪, ৬৮ঃ৫ এবং৮১ঃ২০-২২)। লি-ইয়াগফিরার অর্থ ২৬১২ টীকায় দেখুন।
২৭৬৫। নবী করীম (সাঃ)-এর মত এত উচ্চমার্গের কোন মানুষ, যিনি নৈতিক অধঃপতনের গর্ভে নিমজ্জিত একটি জাতিকে আধ্যাত্মিক উন্নতির চরম শিখরে লইয়া গেলেন, তিনি কখনও বিন্দু মাত্র নৈতিক দোষে দোষী হইতে পারেন না। তবুও তাঁহার বিরুদ্ধাচারীরা অনর্থক দোষারোপ করিয়া তাঁহাকে দোষী সাব্যস্ত করিতে নিষ্ফল চেষ্টা করে। এই আয়াতের একটি সোজা-সরল, শব্দ হইল ‘যানবুন’। এই ‘যানবুন’ শব্দটির আশ্রয় নিয়া চরিত্র হননের অপচেষ্টা করা হইয়াছে। আসলে এই শব্দটির অর্থ হইল মানুষের স্বভাব-সুলভ দুর্বলতা ও ভ্রান্তি যাহা অনিষ্টকর ফলোদয় ঘটায়। পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হইয়াছে, প্রতিশ্রুত বিজয় আসার সাথে সাথে এত অগণিত লোক ইসলামে প্রবেশ করিবে যে, তাহাদিগকে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষায় শিক্ষিত করা এবং তাহাদের চারিত্রিক পরিবর্তন ও উৎকর্ষ সাধন এক দুঃসাধ্য কাজ হইয়া দাঁড়াইবে। সেই কাজে অনেক স্বাভাবিক ত্রুটি-বিচ্যুতি থাকিয়া যাইবে। এই আয়াতে ইহাই বুঝানো হইতেছে যে, আল্লাহ্‌তা’লা রসূলে করীম (সাঃ)-কে ঐসব ত্রুটি-বিচ্যুতির অশুভ ফলাফল হইতে রক্ষা করিবেন। এই জন্যই কুরআনের যেসব স্থানে মহানবী (সাঃ)-কে বিজয়ের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হইয়াছে, সেই সব স্থানেই তাহাকে নিজের ‘যানব’ (স্বভাব-সুলভ দুর্বলতা) হইতে আল্লাহ্‌র কাছে সাহায্য প্রার্থনা করিতে উপদেশ দেওয়া হইয়াছে, যাহাতে তাঁহার মানব-সুলভ অসামর্থ্য ও সীমাবদ্ধতা তাঁহার সুমহান উদ্দেশ্য সম্পাদনের পথে বাধা হইয়া না দাঁড়ায়। প্রণিধানযোগ্য বিষয়টি এই যে, ‘জুনাই’ ‘জুরম’, ‘ইসম’ এবং ‘যন্‌ব’ এই চারিটি শব্দ কাছাকাছি ধরণের অর্থ প্রকাশ করে। কিন্তু প্রথমোক্ত তিনটি শব্দ আল্লাহ্‌তা’লার নবীগণের সম্বন্ধে কুরআনে একটি স্থানেও ব্যবহৃত হয় নাই। ইহা দ্বারা স্পষ্ট বুঝা যায় যে, ঐ তিনটি শব্দের যে মন্দ তাৎপর্য রহিয়াছে, ‘যানব’ শব্দটির মধ্যে তাহা নাই। ইহা ছাড়াও, যদি একান্তই ‘যান্‌ব’ শব্দটি পাপ বা অপরাধ অর্থে ব্যবহৃত হইয়াও থাকে, তাহা হইলেও কুরআনে ব্যবহৃত বাগ্‌ধারা অনুযায়ী যান্‌বাকা অর্থ দাঁড়াইবে, ‘তুমি যেসব অপরাধ করিয়াছ বলিয়া তাহারা অপবাদ দেয়,’ অথবা ‘তোমার বিরুদ্ধে তাহারা যেসব অপরাধ করিয়াছে’। ‘যানব’ শব্দটির শেষোক্ত অর্থটি নিলে, এই আয়াতের ‘লাকা’ শব্দটির অর্থ দাড়াইবে তোমার খাতিরে। কুরআনের অন্যত্র (৫ঃ৩০), ঠিক এই ধরণের একটি দৃষ্টান্ত হইলঃ ‘ইসমী’ (আমার পাপ), যাহার সঠিক তাৎপর্য হইল, “আমার বিরুদ্ধে যে সকল পাপকার্য সংঘটিত হইয়াছে।” এইভাবে আলোচ্য আয়াতের মর্মার্থ ইহাই দাঁড়াইতেছে যে, হুদায়বিয়ার সন্ধি যাহা মহানবী (সাঃ)-এর জন্য মহাবিজয়ের সূচনা করিল, উহার ফলে নবী করীম (সাঃ)-এর প্রতি যেসব পাপ, অপরাধ, দোষ ইত্যাদি শত্রুরা এতদিন আরোপ করিয়া আসিয়াছিল যথা,—তিনি প্রবঞ্চক, জুয়াচোর, আল্লাহ্ ও মানবের বিরুদ্ধে মিথ্যারোপকারী ইত্যাদি— এই সব কিছুই মিথ্যা প্রতিপন্ন হইবে। কেননা, সকল প্রকারের শত্রু-মিত্র এখন মহানবী (সাঃ)-এর অনুসারীগণের সহিত অবাধে মিলা-মিশা ও আলাপ-আলোচনার সুযোগে তাঁহার সম্বন্ধে প্রকৃত তত্ব, তথ্য ও সত্য অবগত হইতে পারিবে। এই অর্থও হইতে আপত্তি নাই যে, তোমার শত্রুরা তোমার বিরুদ্ধে যে সব পাপকার্য ও অপরাধ করিয়াছে, কেবল তোমারই খাতিরে, তাহাদের সেই সব পাপ ও অপরাধ ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইবে। প্রকৃত পক্ষে, বাস্তবে তাহাই ঘটিয়াছিল। যখন মক্কার পতন ঘটিল এবং আরব জাতি ইসলাম গ্রহণ করিল, তখন তাহাদের পূর্বকৃত পাপ ও অপরাধসমূহ ক্ষমা করিয়া দেওয়া হইল। প্রসঙ্গও এই অর্থই সমর্থন করে। অন্যথায় ‘যান্‌ব’ শব্দের অর্থ ‘পাপ’ ধরিয়া লইয়া, এখানে পাপ মোচনের কথা বলা হইয়াছে মনে করিলে, রসূলে করীম (সাঃ)-এর সুস্পষ্ট বিজয় লাভ ও তাঁহার প্রতি আল্লাহ্‌তা’লার পরিপূর্ণ অনুগ্রহ বর্ষণ কথাগুলির সাথে পাপ-মোচনের কথা মোটেই খাপ-খায় না। অতএব এই অর্থ এখানে অচল, উপরে বর্ণিত অর্থ ও ব্যাখ্যাই সঠিক।
২৭৬৬। “অতীত ও ভবিষ্যতে পাপ” কথাগুলি দ্বারা রসূলে পাক (সাঃ)-এর বিরুদ্ধে শত্রুদের দ্বারা অতীতে আরোপিত এবং ভবিষ্যতে আরোপিতব্য পাপের অভিযোগগুলি বুঝায়। এই অভিযোগসমূহ সম্পূর্ণভাবে মিথ্যা প্রমাণিত ও অপসারিত হইবে এবং রসূলে পাক (সাঃ) সম্পূর্ণ নিষ্পাপ-নিষ্কলঙ্ক সাব্যস্ত হইবেন।

وَّیَنۡصُرَکَ اللّٰہُ نَصۡرًا عَزِیۡزًا ﴿۴﴾

৪
এবং আল্লাহ্‌ তোমাকে অতি শক্তিশালী সাহায্য দান করেন।২৭৬৭
২৭৬৭। হুদায়বিয়ার সন্ধির পরে পরেই, আল্লাহ্‌র বিরাট সাহায্য নামিয়া আসে এবং আরব ভূমিতে এমন বিদ্যুৎবেগে ইসলামের প্রচার ও প্রসার ঘটিতে থাকে যে, দেখিতে দেখিতে মহানবী (সাঃ) একজন স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রপতিরূপে স্বীকৃতি লাভ করেন।

ہُوَ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلَ السَّکِیۡنَۃَ فِیۡ قُلُوۡبِ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ لِیَزۡدَادُوۡۤا اِیۡمَانًا مَّعَ اِیۡمَانِہِمۡ ؕ وَلِلّٰہِ جُنُوۡدُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَلِیۡمًا حَکِیۡمًا ۙ﴿۵﴾

৫
তিনিই তো মো’মেনদের অন্তরে প্রশান্তি২৭৬৮ নাযেল করিয়াছেন, যেন তাহারা তাহাদের পূর্বেকার ঈমানের সহিত আরও ঈমানে বৃদ্ধি লাভ করে, বস্তুতঃ আকাশসমূহের ও পৃথিবীর সকল সৈন্যদল আল্লাহ্‌রই; এবং আল্লাহ্‌ সর্বজ্ঞানী, পরম প্রজ্ঞাময়—
২৭৬৮। এই বক্তব্য হইতে স্পষ্ট বুঝা যায যে, হুদায়বিয়ার সন্ধির শর্তগুলি দ্বারা যদিও মুসলমানেরা সাময়িকভাবে মন ক্ষুন্ন হইয়াছিলেন, তথাপি আল্লাহ্‌র পথে কুরবানীর ময়দানে ও জিহাদেরক্ষেত্রে তাহাদের মনের প্রশান্তি সামান্যতম ব্যাহত হয় নাই। তাহারা দৃঢ় প্রত্যয়ী ছিলেন যে, ঐশী সেনাদল তাহাদের সাথে আছেন। এই কারণেই আমরা দেখিতে পাই যে, হুদায়বিয়াতে যখন একটি গুজব ছড়াইয়া পড়িল যে, মক্কাবাসীদের কাছে প্রেরিত মহানবী (সাঃ)-এর দৃত হযরত উসমান (রাঃ)-কে হত্যা করা হইয়াছে তখন মহানবী (সাঃ) মুসলমানদিগকে তাঁহার কাছে অঙ্গীকার করিতে আহ্বান জানাইলেন যে, হযরত উসমানের হত্যার প্রতিশোধ লইবার জন্য তাহারা তাঁহার পতাকাতলে সমবেতভাবে প্রাণপণ যুদ্ধ করিতে প্রস্তুত আছে কিনা। তখন প্রত্যেকটি মুসলমান বিনা ব্যতিক্রমে, নিদ্বিধায় এই প্রতিজ্ঞা নিজ নিজ মুখে উচ্চারণ করিয়াছিল যে, তাহারা প্রস্তত।

لِّیُدۡخِلَ الۡمُؤۡمِنِیۡنَ وَالۡمُؤۡمِنٰتِ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَا وَیُکَفِّرَ عَنۡہُمۡ سَیِّاٰتِہِمۡ ؕ وَکَانَ ذٰلِکَ عِنۡدَ اللّٰہِ فَوۡزًا عَظِیۡمًا ۙ﴿۶﴾

৬
যেন তিনি মো’মেন পুরুষদিগকে এবং মো’মেন নারীদিগকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করেন যাহার তলদেশ দিয়া নহরসমূহ প্রবাহিত থাকিবে, তাহারা উহাতে সর্বদা বসবাস করিতে থাকিবে, এবং যেন তিনি তাহাদের সকল অনিষ্টতা দূরীভূত করিয়া দেন; এবং আল্লাহ্‌র নিকট ইহা হইবে মহা সফলতা।

وَّیُعَذِّبَ الۡمُنٰفِقِیۡنَ وَالۡمُنٰفِقٰتِ وَالۡمُشۡرِکِیۡنَ وَالۡمُشۡرِکٰتِ الظَّآنِّیۡنَ بِاللّٰہِ ظَنَّ السَّوۡءِ ؕ عَلَیۡہِمۡ دَآئِرَۃُ السَّوۡءِ ۚ وَغَضِبَ اللّٰہُ عَلَیۡہِمۡ وَلَعَنَہُمۡ وَاَعَدَّ لَہُمۡ جَہَنَّمَ ؕ وَسَآءَتۡ مَصِیۡرًا ﴿۷﴾

৭
এবং যেন তিনি মোনাফেক পুরুষদিগকে ও মোনাফেক নারীদিগকে এবং মোশরেক পুরুষদিগকে ও মোশরেক নারীদিগকে, যাহারা আল্লাহ্ সম্বন্ধে অনেক মন্দ ধারণা পোষণ করে, আযাব দেন। তাহাদের উপরই অমঙ্গল-চক্র আসিবে; এবং আল্লাহ্ তাহাদের উপর ক্রোধ বর্ষণ করিয়াছেন, এবং তাহাদিগকে অভিসম্পাত করিয়াছেন, এবং তাহাদের জন্য জাহান্নাম প্রস্তুত করিয়া রাখিয়াছেন। এবং প্রত্যাবর্তনস্থল হিসাবে উহা অতীব নিকৃষ্ট।

وَلِلّٰہِ جُنُوۡدُ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ ؕ وَکَانَ اللّٰہُ عَزِیۡزًا حَکِیۡمًا ﴿۸﴾

৮
এবং আকাশসমূহের ও পৃথিবীর সৈন্যদলসমূহ আল্লাহ্‌রই, এবং আল্লাহ্ মহাপরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।

اِنَّاۤ اَرۡسَلۡنٰکَ شَاہِدًا وَّمُبَشِّرًا وَّنَذِیۡرًا ۙ﴿۹﴾

৯
নিশ্চয় আমরা তোমাকে সাক্ষীরূপে, সুসংবাদদাতারূপে এবং সতর্ককারীরূপে পাঠাইয়াছি,

لِّتُؤۡمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَتُعَزِّرُوۡہُ وَتُوَقِّرُوۡہُ ؕ وَتُسَبِّحُوۡہُ بُکۡرَۃً وَّاَصِیۡلًا ﴿۱۰﴾

১০
যেন তোমরা আল্লাহ্ ও তাঁহার রসূলের উপর ঈমান আন এবং তাহাকে সাহায্য কর এবং তাহাকে সম্মান কর; এবং প্রভাতে ও সন্ধ্যায় তাঁহার মহিমা ও পবিত্রতা ঘোষণা কর।