৪৬

الأحقاف

সূরা আল্‌ আহ্‌কাফ

Al-Ahqaf

মক্কী ৩৬ আয়াত ৪ রুকু পারা ২৫–২৬

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৩৬ আয়াত এবং ৪ রুকু আছে।

وَیَوۡمَ یُعۡرَضُ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا عَلَی النَّارِ ؕ اَذۡہَبۡتُمۡ طَیِّبٰتِکُمۡ فِیۡ حَیَاتِکُمُ الدُّنۡیَا وَاسۡتَمۡتَعۡتُمۡ بِہَا ۚ فَالۡیَوۡمَ تُجۡزَوۡنَ عَذَابَ الۡہُوۡنِ بِمَا کُنۡتُمۡ تَسۡتَکۡبِرُوۡنَ فِی الۡاَرۡضِ بِغَیۡرِ الۡحَقِّ وَبِمَا کُنۡتُمۡ تَفۡسُقُوۡنَ ﴿٪۲۱﴾

২১
এবং যেদিন তাহাদিগকে, যাহারা অস্বীকার করিয়াছে আগুনের সম্মুখে পেশ করা হইবে (এবং বলা হইবে) ‘তোমরা তোমাদের পার্থিব-জীবনে নিজেদের সমস্ত উত্তম বস্তু খরচ করিয়া নিঃশেষ করিয়াছ এবং তদ্বারা পূর্ণরূপে সুখ ভোগ করিয়াছ; সুতরাং আজ তোমাদিগকে প্রতিফল দেওয়া হইবে লাঞ্ছনাজনক আযাব; এই কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে২৭২৮ অন্যায়ভাবে অহংকার করিতে এবং এই কারণে যে, তোমরা দুষ্কর্ম করিতে।
সূরা আল্‌ আহ্‌কাফ - রুকু ২
২৭২৮। অবিশ্বাসীগণ বিচার দিনে যখন তাহাদের দুষ্কৃতির ফলাফলের মুখামুখী হইবে, তখন তাহাদিগকে বলা হইবে, ‘তোমাদিগকে আল্লাহ্‌তা’লা যত ভাল ভাল বস্তু দুনিয়াতে দান করিয়াছিলেন, তোমরা সেগুলিকে নিজেদের হীনস্বার্থে চূড়ান্তভাবে নিঃশেষে ব্যবহার করিয়াছিলে; ভালকাজে বা পরোপকারের উদ্দেশ্যে সেইগুলিকে মোটেই ব্যবহার কর নাই। অতএব তোমাদের ঐ অপকর্মের জন্য এখন অপমান ও লাঞ্ছনাময় প্রতিফল তোমাদিগকে গ্রহণ করিতে হইবে। ইহাই তোমাদের উপযুক্ত পাওনা।’

وَاذۡکُرۡ اَخَا عَادٍ ؕ اِذۡ اَنۡذَرَ قَوۡمَہٗ بِالۡاَحۡقَافِ وَقَدۡ خَلَتِ النُّذُرُ مِنۡۢ بَیۡنِ یَدَیۡہِ وَمِنۡ خَلۡفِہٖۤ اَلَّا تَعۡبُدُوۡۤا اِلَّا اللّٰہَ ؕ اِنِّیۡۤ اَخَافُ عَلَیۡکُمۡ عَذَابَ یَوۡمٍ عَظِیۡمٍ ﴿۲۲﴾

২২
এবং ‘আদ’ জাতির ভাইকে (হুদকে) স্মরণ কর, যখন সে তাহার জাতিকে আহ্‌কাফে (বালির টিলাসমূহে) সতর্ক করিয়াছিল এবং তাহার পূর্বেও এবং তাহার পরেও অনেক সতর্ককারী গত হইয়া গিয়াছে, তাহাদের প্রত্যেকেই এই শিক্ষা দিয়াছিল যে, তোমরা আল্লাহ্‌ ব্যতীত কাহারও ইবাদত করিও না। নিশ্চয় আমি তোমাদের উপর এক মহা দিনের আযাবের আশংকা করিতেছি।

قَالُوۡۤا اَجِئۡتَنَا لِتَاۡفِکَنَا عَنۡ اٰلِہَتِنَا ۚ فَاۡتِنَا بِمَا تَعِدُنَاۤ اِنۡ کُنۡتَ مِنَ الصّٰدِقِیۡنَ ﴿۲۳﴾

২৩
তাহারা বলিল, ‘তুমি কি আমাদের নিকট এইজন্য আসিয়াছ যেন তুমি আমাদিগকে আমাদের মা’বূদসমূহ হইতে বিচ্ছিন্ন করিয়া দিতে পার? অতএব যদি তুমি সত্যবাদী হইয়া থাক তাহা হইলে আমাদের নিকট সেই সব বিষয় লইয়া আস যাহার ভয় তুমি আমাদিগকে দেখাইতেছ।’

قَالَ اِنَّمَا الۡعِلۡمُ عِنۡدَ اللّٰہِ ۫ۖ وَاُبَلِّغُکُمۡ مَّاۤ اُرۡسِلۡتُ بِہٖ وَلٰکِنِّیۡۤ اَرٰٮکُمۡ قَوۡمًا تَجۡہَلُوۡنَ ﴿۲۴﴾

২৪
সে বলিল, ‘প্রকৃত জ্ঞান২৭২৯ শুধু আল্লাহ্‌র নিকট আছে এবং আমি তোমাদের নিকট কেবল সেই শিক্ষাই পৌঁছাইয়া দিতেছি যাহা লইয়া আমি প্রেরিত হইয়াছি, কিন্তু আমি যে তোমাদিগকে এক অজ্ঞ জাতিরূপে দেখিতেছি।’
২৭২৯। মানুষ কোন্‌ কোন্‌ অবস্থার মধ্যে, কি কি ছোট-বড়-ভাল-মন্দ কাজ করিল, তাহা একমাত্র আল্লাহ্‌তা’লাই জানেন। অতএব একমাত্র আল্লাহ্‌তা’লাই জ্ঞাত, সে ব্যক্তি কতটা শাস্তিযোগ্য এবং কতটা শাস্তিযোগ্য নয়। একথাটাও আল্লাহ্‌তা’লার উপরই নির্ভর করে, তিনি কখন, কোথায়, কিভাবে ও কোন্‌ ধরণের শাস্তি প্রদান করিবেন।

فَلَمَّا رَاَوۡہُ عَارِضًا مُّسۡتَقۡبِلَ اَوۡدِیَتِہِمۡ ۙ قَالُوۡا ہٰذَا عَارِضٌ مُّمۡطِرُنَا ؕ بَلۡ ہُوَ مَا اسۡتَعۡجَلۡتُمۡ بِہٖ ؕ رِیۡحٌ فِیۡہَا عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿ۙ۲۵﴾

২৫
অতঃপর যখন তাহারা উহাকে (আযাবকে) এক মেঘের আকারে তাহাদের উপত্যকাসমূহের দিকে অগ্রসর হইতে দেখিল, তখন তাহারা বলিল, ‘ইহা এক মেঘ, যাহা আমাদের উপর বৃষ্টি বর্ষণ করিবে (আমরা বলিলাম) ‘না, বরং ইহা সেই আযাব যাহা তোমরা তাড়াতাড়ি চাহিয়াছ– এক বায়ু, যাহার মধ্যে যন্ত্রণাদায়ক আযাব নিহিত আছে;

تُدَمِّرُ کُلَّ شَیۡءٍۭ بِاَمۡرِ رَبِّہَا فَاَصۡبَحُوۡا لَا یُرٰۤی اِلَّا مَسٰکِنُہُمۡ ؕ کَذٰلِکَ نَجۡزِی الۡقَوۡمَ الۡمُجۡرِمِیۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
যাহা ইহার প্রতিপালকের আদেশক্রমে প্রত্যেক বস্তুকে ধ্বংস করিয়া যাইতে থাকিবে।’ ফলে তাহাদের প্রভাত হইল এমন অবস্থায় যে, তাহাদের গৃহগুলি ছাড়া আর কিছু দৃষ্টিগোচর হইল না। এইরূপেই আমরা অপরাধী জাতিকে প্রতিফল দিয়া থাকি।

وَلَقَدۡ مَکَّنّٰہُمۡ فِیۡمَاۤ اِنۡ مَّکَّنّٰکُمۡ فِیۡہِ وَجَعَلۡنَا لَہُمۡ سَمۡعًا وَّاَبۡصَارًا وَّاَفۡـِٕدَۃً ۫ۖ فَمَاۤ اَغۡنٰی عَنۡہُمۡ سَمۡعُہُمۡ وَلَاۤ اَبۡصَارُہُمۡ وَلَاۤ اَفۡـِٕدَتُہُمۡ مِّنۡ شَیۡءٍ اِذۡ کَانُوۡا یَجۡحَدُوۡنَ ۙ بِاٰیٰتِ اللّٰہِ وَحَاقَ بِہِمۡ مَّا کَانُوۡا بِہٖ یَسۡتَہۡزِءُوۡنَ ﴿٪۲۷﴾

২৭
এবং আমরা তাহাদিগকে এমন শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিলাম যেভাবে (হে মক্কাবাসীগণ!) তোমাদিগকে উহাতে প্রতিষ্ঠিত করি নাই; এবং আমরা তাহাদিগকে কর্ণ, চক্ষু এবং হৃদয়২৭৩০ দান করিয়াছিলাম। কিন্তু তাহাদের কর্ণ, চক্ষু এবং হৃদয় কোন কিছুই তাহাদের উপকারে আসিল না; কারণ তাহারা আল্লাহ্‌র আয়াতসমূহকে হঠকারিতা করিয়া অস্বীকার করিত; এবং যে আযাব লইয়া তাহারা ঠাট্টা-বিদ্রূপ করিত উহাই তাহাদিগকে পরিবেষ্টন করিয়া ফেলিল।
সূরা আল্‌ আহ্‌কাফ - রুকু ৩
২৭৩০। “আফ্‌ইদাহ” (হৃদয়সমূহ) ‘ফুয়াদ’ শব্দের বহুবচন। ফুয়াদ ও কল্‌ব সমার্থক ও উভয় শব্দের দ্বারাই হৃদয়, মন ও বুদ্ধি (মস্তিক) বুঝাইয়া থাকে। কুরআন শরীফেও শব্দ দুইটি সমার্থবোধক রূপে ব্যবহৃত হইয়াছে। ২৮ঃ১১ এ উভয় শব্দকে একত্রে ব্যবহার করা হইয়াছে এবং অর্থ দাঁড়াইয়াছে ‘হৃদয়’। ইহাদের কোন্‌ শব্দটি কোথায় হৃদয় বা কোথায় মন অর্থে ব্যবহৃত হইয়াছে, তাহা নির্ধারণ করিতে হইবে প্রসঙ্গ অনুসারে। কোন কোন লেখক ‘ফুয়াদ’ ও ‘কল্‌ব’ শব্দদ্বয়ের মধ্যে অর্থের তারতম্য করিয়া থাকেন। ‘কল্‌ব’ শব্দের অর্থের মধ্যে কিছু বিশেষ ব্যাপকতা আছে যাহা ‘ফুয়াদ’ শব্দে নাই। ‘ফুয়াদ’ শব্দটি ‘কলবের’ (গিশা বা ভিআ) মধ্যস্থল বা ভিতরের দিকটা বুঝায়। ‘তারা ফুয়াদুহু’ মানে তাহার মন, বুদ্ধি, সাহস পলায়ন করিল (লেইন)।

وَلَقَدۡ اَہۡلَکۡنَا مَا حَوۡلَکُمۡ مِّنَ الۡقُرٰی وَصَرَّفۡنَا الۡاٰیٰتِ لَعَلَّہُمۡ یَرۡجِعُوۡنَ ﴿۲۸﴾

২৮
এবং অবশ্যই আমরা তোমাদের চতুষ্পার্শ্ববর্তী২৭৩১ জনপদসমূহকে ধ্বংস করিয়া দিয়াছি, অথচ আমরা নিদর্শনসমূহকে পুনঃপুনঃ বিশদভাবে২৭৩২ বর্ণনা করিয়া দিয়াছিলাম, যাহাতে তাহারা (হঠকারিতা হইতে) ফিরিয়া আসে।
২৭৩১। আদ ও তুব্বা জাতি দক্ষিণ-আরব অঞ্চলগুলিতে বিরাট এলাকার উপর আধিপত্য বিস্তার করিয়াছিল। সামূদ জাতি আরবদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে,আর মৃত সাগরের (ডেড্‌ সী) তীরে ছিল সদোম ও ঘমোরার শহর। এই ঐতিহাসিক পুরাতন প্রসিদ্ধ স্থানগুলির ধ্বংসপ্রাপ্তি অবশ্যই মক্কাবাসীর চক্ষু উন্মীলন করার বিষয় ছিল। ‘তোমাদের চতুষ্পার্শ্ববর্তী’ শব্দগুলি দ্বারা সারা বিশ্বকেও বুঝাইতে পারে।
২৭৩২। কুরআন বার বার ঘুরিয়া ফিরিয়া বিশ্বাসের মৌলিক সমস্যাবলীর আলোচনায় ফিরিয়া আসে এবং নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ধরণের বিষয়াদির প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করে। বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন আঙ্গিকে, বিভিন্ন দিক হইতে বিষয়টি এই জন্য উত্থাপন করা হয়, যাহাতে বিভিন্ন ধরণের রুচি, মন-মানসিকতা ও দৃষ্টিভঙ্গি সম্পন্ন লোক সন্দেহ ও সংশয় মুক্ত হইতে পারে। ভাসা-ভাসা চিন্তাসম্পন্ন লোক ও সংস্কারাচ্ছন্ন মন ইহাকে পুনরুক্তির পর্যায়ে ফেলিলেও, প্রকৃত পক্ষে, মানুষের শত-সহস্র সমস্যার দিকে লক্ষ্য করিলে, বারংবার উপস্থাপনের প্রয়োজনীয়তাকে কেহই অস্বীকার করিতে পারিবে না। বরং ঐটাই একমাত্র সঠিক পন্থা।

فَلَوۡلَا نَصَرَہُمُ الَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ قُرۡبَانًا اٰلِـہَۃً ؕ بَلۡ ضَلُّوۡا عَنۡہُمۡ ۚ وَذٰلِکَ اِفۡکُہُمۡ وَمَا کَانُوۡا یَفۡتَرُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
অতএব তাহারা আল্লাহ্‌র পরিবর্তে (তাঁহার) নৈকট্যলাভের জন্য যাহাদিগকে মা’বূদরূপে গ্রহণ করিয়াছিল উহারা কেন তাহাদের সাহায্য করিল না? বরং তাহারা তাহাদের নিকট হইতে অন্তর্হিত হইয়া গেল। ইহা ছিল তাহাদের মিথ্যা এবং যাহা তাহারা মিথ্যা রচনা করিত (উহার পরিণতি)।

وَاِذۡ صَرَفۡنَاۤ اِلَیۡکَ نَفَرًا مِّنَ الۡجِنِّ یَسۡتَمِعُوۡنَ الۡقُرۡاٰنَ ۚ فَلَمَّا حَضَرُوۡہُ قَالُوۡۤا اَنۡصِتُوۡا ۚ فَلَمَّا قُضِیَ وَلَّوۡا اِلٰی قَوۡمِہِمۡ مُّنۡذِرِیۡنَ ﴿۳۰﴾

৩০
এবং (স্মরণ কর) যখন আমরা তোমার নিকট জিন্ন্‌দের২৭৩৩ এক দলকে ফিরাইয়া আনিয়াছিলাম, যাহারা কুরআন শুনিতে চাহিয়াছিল; অতঃপর যখন তাহারা ইহার (কুরআন আবৃত্তির মজলিসের) সমক্ষে উপস্থিত হইল তখন তাহারা একে অপরকে বলিল, ‘চুপ কর;’ অতঃপর যখন ইহা (কুরআন আবৃত্তি) শেষ হইল তখন তাহারা নিজেদের জাতির নিকট (তাহাদের জন্য) সতর্ককারী হইয়া ফিরিয়া গেল।
২৭৩৩। যে জিন্ন্‌দের দলের কথা এখানে বলা হইয়াছে, তাহারা ছিলেন নাসীবীনের ইহুদীদের একটি দল। কেহ বলেন তাহারা আসিয়াছিলেন ইরাকের মওসাল বা নাইনেভা হইতে। মক্কাবাসীদের বিরোধিতার কথা চিন্তা করিয়া তাহারা মহানবী (সাঃ)-এর সাথে রাত্রিতে সাক্ষাৎ করিলেন; তাহারা গাম্ভীর্যের সহিত কুরআন শ্রবণ করিলেন এবং মহানবী (সাঃ)-এর সহিত অনেক কথা-বার্তা বলিলেন। তাহারা ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করিয়া, ইহার নব-বাণীকে নিজেদের লোকের কাছে পৌঁছাইয়াছিলেন। তাহারাও ইসলামের এই নূতন বাণী শ্রবণ করিয়া তাহা গ্রহণ করিলেন (বায়ান, ৮ খণ্ড; আরো দেখুন ৭২ঃ২)।