النمل
An-Naml
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৯৪ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ ও প্রসংগ
পূর্ববর্তীসূরার শেষের দিকে কাফেরদের পক্ষ হইতে উত্থাপিত কিছু অভিযোগের উল্লেখ পূর্বক বলা হইয়াছিল যে, তাহাদের মতে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) একজন কবি এবং তাঁহার উপরশয়তান অবতীর্ণ হইয়া থাকে। অতঃপর, অত্যন্ত জোরালো যুক্তি উপস্থাপন পূর্বক উক্ত অভিযোগ খণ্ডন করিয়া বলা হইয়াছিল যে, শয়তান তো কেবল মিথ্যাবাদী, পাপী এবং প্রতারকদের উপরই অবতীর্ণ হয়, আর যাহারা সত্যের সাথে মিথ্যার মিশ্রণ ঘটায় তাহাদের উপরে। কিন্তু বাস্তবক্ষেত্রে অল্প কিছু সত্যের সাথে যখন প্রচুর মিথ্যার জগাখিচুড়ি ঘটে, তখন উহার পরিণাম কখনই ভাল হয় না। সূরাটিতে আরো বলা হইয়াছিল যে, কবিরা কোন নির্দিষ্ট অনুশাসন মানিয়া চলে না, তাহাদের জীবনেকোন মহৎ উদ্দেশ্যও থাকে না; তাহারা ভ্রান্ত-বুদ্ধির শিকার হইয়া একেকবার একেক ধরণের মত ও পথের অনুসারী হয় এবং তাহারা যাহা বলে তাহা কখনো করে না। উক্ত বিষয়বস্তুটি আরো বিস্তৃতি প্রদান ও উহার ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখিয়া আলোচ্য সূরাটি এই দৃঢ় ঘোষণা সহকারে শুরু হইয়াছে যে, পবিত্র কুরআন স্বয়ং আল্লাহ্র অবতীর্ণ বাণী। মানুষের আধ্যাত্মিক জীবনের বিভিন্ন বিষয় ও প্রয়োজনকে ইহা বিশদ ও পরিপূর্ণভাবে ব্যাখ্যা করে এবং অকাট্য যুক্তি প্রমাণ দ্বারা ইহার অন্তর্নিহিত নীতি ও আদর্শকে সাব্যস্ত করে। হযরত ইবনে আব্বাস এবং ইবনে যোবায়েরের (রাঃ) মতে এই সূরাটি মক্কায় নাযেল হইয়াছিল। অন্যান্য মুসলমান বিশেষজ্ঞরাও এই মতের সমর্থন করেন।
বিষয়বস্তু
পূর্ববর্তী সূরাটি ‘তা সীন মীম্’ এই হুরূফে মুকাত্তায়াত সহকারে শুরু হইয়াছিল, কিন্তু বর্তমান সূরাটির শুরুতে রহিয়াছে শুধুমাত্র তা সীন, মীম্ হরফটি এখানে অন্তর্ভুক্ত হয় নাই। ইহা হইতে বুঝা যায় যে, বর্তমান সূরাটির বিষয়বস্তু পূর্ববর্তী সূরার বিষয়বস্তুর ধারাবাহিকতাকে বজায় রাখিয়াই অবতীর্ণ হইয়াছে, যদিও কিছুটা ভিন্ন ধরণের উপস্থাপনা ইহাতে বিদ্যমান। সূরাটির প্রথম দিকেই হযরত মূসা (আঃ )-এর একটি কাফের ঘটনার বর্ণনা রহিয়াছে, যাহার মাধ্যমে তিনি ঐশীজ্যোতির বিকাশ অবলোকন করেন। ইহার পর হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর শাসনকালীন কিছু ঘটনার উল্লেখও সূরাটিতে রহিয়াছে, যাঁহাদের রাজত্বকালে ইসরাঈলীদের বিজয়, ক্ষমতা ও জাগতিক যশ-সমৃদ্ধির উচ্চতম শিখরে উপনীত হইয়াছিল। ইহার পর সূরাটিতে ধর্মীয় বিশ্বাসের দুইটি বুনিয়াদী বিষয় (১) আল্লাহ্তা’লার অস্তিত্ব ও (২) মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে মোটামুটি বিস্তৃত আলোচনা করা হইয়াছে। প্রসঙ্গতঃ প্রথম বিষয়টির সমর্থনে সূরাটিতে প্রকৃতি, মানুষের অন্তর্নিহিত সত্তা ও মানুষের সম্মিলিত জীবনধারা হইতে যুক্তিপূর্ণ দৃষ্টান্ত উদ্ধৃত করা হইয়াছে। বস্তুতঃ আল্লাহ্তা’লার অপার ক্ষমা প্রকৃতির পরিচালন নীতির মাধ্যমেই প্রকাশিত হয় - এই সত্যকে উপস্থাপনা করার পর মানুষের ডাকে আল্লাহ্ যে জবাব দেন উহাকে আল্লাহ্তা’লার অস্তিত্বের এক জ্বলন্ত প্রমাণ হিসাবে পেশ করা হইয়াছে। এই প্রসংগে আরেকটি অকাট্য যুক্তি এইভাবে দেওয়া হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা তাঁহার প্রেরিত নবী-রসূল ও নেক বান্দাদের নিকট সর্বদাই নিজেকে প্রকাশ করেন এবং তাহাদেরকে গায়েবের সংবাদাদি প্ৰদান করেন। ইহার দৃষ্টান্ত সর্বকালেই পরিদৃষ্ট হইতে থাকিবে। অতঃপর, সূরাটিতে মৃত্যুর পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করা হইয়াছে। সংক্ষিপ্তভাবে প্রাসংগিক কতিপয় যুক্তির উল্লেখের পর পরকালের সমর্থনে সূরাটিতে অতঃপর একটি অখণ্ডনীয় দৃষ্টান্ত পেশ করা হইয়াছে - আর উহা হইল হযরত মুহম্মদ (সাঃ) কর্তৃক প্রচারিত শিক্ষার ফলে তাঁহার স্বজাতির মধ্যে নৈতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে যে বিরাট পরিবর্তন সাধিত হইয়াছিল, উহার বিস্তারিত বর্ণনা। এই অকাট্য যুক্তির অবতারণা ও বিস্তৃতি প্রসংগে যাহা বলা হইয়াছে তাহা হইল এই যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর আবির্ভাবকালীন সময়ে সমগ্র আরব জাতি তাহাদের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে নিরাশ হইয়া পড়িয়াছিল। তাহারা চরমভাবে পাপ-পংকিলতায় নিজেদেরকে ডুবাইয়া দিয়াছিল, নবী করীম (সাঃ)-এর আহ্বানে তাহারা সাড়া তো দিলই না, বরং এই বিশ্বাস পোষণ করিতেও তাহারা অস্বীকার করিল যে, তাহাদের ইহজীবনের কৃত-কর্মের জন্য পরকালে জবাবদিহি করিতে হইবে। কাজেই নৈতিক ও আধ্যাত্মিক অবস্থার বিবেচনায় তাহারা আসলেই ছিল একটি মৃত জাতি। কিন্তু পরবর্তীতে কুরআনের মাধ্যমে তাহারা এক নূতন জীবন লাভ করিল। ঐশী-বাণীর সুমিষ্ট ধারা আরবের তরুলতাহীন, নীরস ভূখণ্ডে যখন বর্ষিত হইল তখন আরবের সেই বিবর্ণ ভূমিই এক পুষ্পিত নূতন জীবন-স্রোতে স্পন্দিত হইয়া উঠিল। কুরআনের শিক্ষায় নিজেদেরকে শিক্ষিত করিয়া পূর্বেকার সেই আরব জাতি, যাহারা প্রকৃত প্রস্তাবেই ছিল মানবতার কলংক এবং তলানি স্বরূপ , তাহারাই আবার নিজেদেরকে মানবজাতির নেতা ও শিক্ষক হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করিল। এই বিস্ময়কর পরিবর্তনের ঘটনাকে এইকথার অনুকূলে একটি জোরালো প্রমাণ হিসাবে পেশ করিয়া বলা হইয়াছে যে, সেই আল্লাহ্, যিনি আধ্যাত্মিকভাবে মৃত একটি জাতিকে নূতন জীবন দান করিতে পারেন, তিনি অবশ্যই শারীরিকভাবে মৃতদেরকেও পুনর্জীবন প্রদানে সক্ষম। অতঃপর, এই প্রসংগের অবতারণা পূর্বক সূরাটির সমাপ্তি টানা হইয়াছে যে, আল্লাহ্তা’লা তাঁহার বাণীর সর্বশেষ প্রকাশস্থলের কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে মক্কা নগরীকে বাছিয়া লইয়াছেন এবং এই নগরী হইতে এমন এক ঐশী আলো নির্গত হইবে যাহা অচিরেই সারা পৃথিবীকে আলোকিত করিয়া ফেলিবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
طٰسٓ ۟ تِلۡکَ اٰیٰتُ الۡقُرۡاٰنِ وَکِتَابٍ مُّبِیۡنٍ ۙ﴿۲﴾
الَّذِیۡنَ یُقِیۡمُوۡنَ الصَّلٰوۃَ وَیُؤۡتُوۡنَ الزَّکٰوۃَ وَہُمۡ بِالۡاٰخِرَۃِ ہُمۡ یُوۡقِنُوۡنَ ﴿۴﴾
اِنَّ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ زَیَّنَّا لَہُمۡ اَعۡمَالَہُمۡ فَہُمۡ یَعۡمَہُوۡنَ ؕ﴿۵﴾
اُولٰٓئِکَ الَّذِیۡنَ لَہُمۡ سُوۡٓءُ الۡعَذَابِ وَہُمۡ فِی الۡاٰخِرَۃِ ہُمُ الۡاَخۡسَرُوۡنَ ﴿۶﴾
وَاِنَّکَ لَتُلَقَّی الۡقُرۡاٰنَ مِنۡ لَّدُنۡ حَکِیۡمٍ عَلِیۡمٍ ﴿۷﴾
اِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِاَہۡلِہٖۤ اِنِّیۡۤ اٰنَسۡتُ نَارًا ؕ سَاٰتِیۡکُمۡ مِّنۡہَا بِخَبَرٍ اَوۡ اٰتِیۡکُمۡ بِشِہَابٍ قَبَسٍ لَّعَلَّکُمۡ تَصۡطَلُوۡنَ ﴿۸﴾
فَلَمَّا جَآءَہَا نُوۡدِیَ اَنۡۢ بُوۡرِکَ مَنۡ فِی النَّارِ وَمَنۡ حَوۡلَہَا ؕ وَسُبۡحٰنَ اللّٰہِ رَبِّ الۡعٰلَمِیۡنَ ﴿۹﴾
یٰمُوۡسٰۤی اِنَّہٗۤ اَنَا اللّٰہُ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ۙ﴿۱۰﴾