২৭

النمل

সূরা আন্‌ নাম্‌ল

An-Naml

মক্কী ৯৪ আয়াত ৭ রুকু পারা ১৯–২০

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৯৪ আয়াত এবং ৭ রুকু আছে।

وَتَفَقَّدَ الطَّیۡرَ فَقَالَ مَا لِیَ لَاۤ اَرَی الۡہُدۡہُدَ ۫ۖ اَمۡ کَانَ مِنَ الۡغَآئِبِیۡنَ ﴿۲۱﴾

২১
এবং সে পক্ষীকুলের পরিদর্শন করিল২১৫৯ এবং বলিল, ‘ব্যাপার কি, আমি যে হুদ্‌হুদ্‌কে দেখিতেছি না, সে কি (জানিয়া বুঝিয়া) অনুপস্থিত আছে?
২১৫৯। ‘তাফাক্বাদা’ (সে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করিল) শব্দের উৎপত্তি “ফাক্বাদা’ হইতে, অর্থাৎ সে ইহা হারাইল, সে তাহার নিকট উপস্থিত হইল না। ‘তাফাক্বাদাতহূ’ অর্থ সে মনোযোগ সহকারে অথবা পুনঃ পুনঃ ইহা চাহিয়াছিল, কেননা ইহা তাহার কাছে অনুপস্থিত ছিল, (মুফরাদাত)। সোলায়মান (আঃ) তাঁহার সৈন্যবাহিনীকে এবং হুদ্‌হুদ্‌কে নিরীক্ষণ করিল। রাজকীয় গুরুত্বপূর্ণ কর্মকর্তা, সম্ভবতঃ প্রধান সেনাপতি হুদ্‌হুদ্‌, গুরুত্বপূর্ণ সময়ে অনুপস্থিত ছিল, এই জন্য তিনি তাহার সম্বন্ধে পুনঃ পুনঃ জিজ্ঞাসাবাদ করিলেন।

لَاُعَذِّبَنَّہٗ عَذَابًا شَدِیۡدًا اَوۡ لَاَاذۡبَحَنَّہٗۤ اَوۡ لَیَاۡتِیَنِّیۡ بِسُلۡطٰنٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۲۲﴾

২২
নিশ্চয় আমি তাহাকে কঠোর শাস্তি২১৬০ দিব অথবা যবহ্ করিব, আর না হয় সে আমাকে (অনুপস্থিতির) উপযুক্ত কারণ দর্শাইবে।’
২১৬০। হুদ্‌হুদ্‌ সম্বন্ধে জনসাধারণ্যে ভিত্তিহীন উপকথা এবং অলীক কাহিনী প্রচলিত আছে যাহা যুক্তি-প্রমাণ এবং বিবেক-বুদ্ধি কোন দিক দিয়াই গ্রহণযোগ্য নহে। হুদ্‌হুদ্‌ হযরত সোলায়মান (আঃ) কর্তৃক নিয়োজিত কোন সংবাদ বাহক পাখী ছিল না। কেননাঃ (ক) একজন ক্ষমতাশালী বাদশাহ এবং আল্লাহ্‌র নবী সোলায়মান (আঃ)-এর একটি তুচ্ছ পাখীর প্রতি এত ক্রুদ্ধ হইয়া উহাকে কঠোর শাস্তি প্রদান করার জন্য এমনকি উহাকে হত্যা করার জন্য প্রস্তুত হইয়া যাওয়াটা তাঁহার উচ্চ মর্যাদার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নহে, (খ) মনে হয় হুদ্‌হুদ্‌ রাষ্ট্রীয় কানুন সম্বন্ধে সুপরিচিত ছিল এবং আল্লাহ্‌তা’লার একত্বের সম্বন্ধে জ্ঞান বিশারদ ছিল (পরবর্তী আয়াত ২৫-২৬) যাহা কোন পাখীর পক্ষে সম্ভব হইতে পারে না; (গ) হুদ্‌হুদ্‌ পাখী অধিক উড্ডয়নশীল ও যাযাবর পাখীসমূহের অন্তর্গত নহে,এইজন্য ইহা সুদীর্ঘ দূরত্বে উড়িতে পারে না। অতএব ‘সাবা দেশ’ পর্যন্ত যাতয়াতের জন্য উহাকে নিয়োজিত করা যাইতে পারিত না (আয়াত-২৩)। এই সমস্ত কারণ হইতে প্রতিভাত হয় যে, হুদ্‌হুদ্‌ আসলে পাখী ছিল না, বরং মানুষ ছিল। সে অত্যন্ত দায়িত্বপূর্ণ রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা অথবা সেনাপতি ছিল, যাহার উপর হযরত সোলায়মান (আঃ) সাবা দেশের রাণীর নিকট গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে দায়িত্ব অর্পণ করিয়াছিলেন। মনে হয় সোলায়মান (আঃ)-এর সময়ে দূত বিনিময় বেশ প্রচলিত ছিল। অধিকন্তু ইহাও প্রমাণিত যে, পাখী পশুর নামানুকরণে মানুষের নাম রাখা হইত। হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর জনগণের মধ্যে হুদ্‌হুদ্‌ একটি খুবই প্রচলিত জনপ্রিয় নাম ছিল। মনে হয় বাইবেলে উল্লিখিত ‘হদদ’ নামের আরবীয় অনুকরণ এই হুদ্‌হুদ্‌ শব্দ। অনেক ইডোমাইট রাজার নাম এইরূপ ছিল। ইসমাঈল (আঃ)-এর এক পুত্রেরও এই নাম ছিল। অনুরূপভাবে এক ইডোমাইট রাজপুত্র, যে ইয়াকুব (আঃ)-এর নির্বিচার হত্যার ভয়ে মিশরে পালাইয়া গিয়াছিল, সেও এই নামে পরিচিতি ছিল (১-রাজবলী-১১ঃ১৪)। হুদ্‌হুদ্‌ নামটি এতই জনপ্রিয় ছিল এবং বাইবেলের পুরাতন নিয়মে এত বেশী ব্যবহৃত হইয়াছে যে, কোন বিশেষণ ব্যতীত ব্যবহারে ইহার অর্থ হয় ‘ইদোমিত পরিবারের এক ব্যক্তি’ (যিউ এন সাইক)। সাবার রানী বিলকিসের পিতার নামও হুদ্‌হুদ্‌ বলিয়া কথিত আছে (মুন্‌তাহালইরাব)।

فَمَکَثَ غَیۡرَ بَعِیۡدٍ فَقَالَ اَحَطۡتُّ بِمَا لَمۡ تُحِطۡ بِہٖ وَجِئۡتُکَ مِنۡ سَبَاٍۭ بِنَبَاٍ یَّقِیۡنٍ ﴿۲۳﴾

২৩
অতঃপর সে স্বল্পক্ষণই অবস্থান করিল, (ইতিমধ্যে হুদ্‌হুদ্‌ উপস্থিত হইল) এবং সে বলিল, ‘আমি এমন এক বিষয় অবগত হইয়াছি যাহা আপনি অবগত হন নাই এবং সে বলিল, ‘আমি আপনার নিকট সাবা হইতে এক নিশ্চিত সংবাদ আনিয়াছি,২১৬১
২১৬১। এই আয়াত হইতে প্রতীয়মান হয় যে, রাষ্ট্রীয় কোন গুরুত্বপূর্ণ উদ্দেশ্যে হুদ্‌হুদ্‌কে প্রেরণ করা হইয়াছিল এবং সে হযরত সোলায়মানের জন্য অতি প্রয়োজনীয় এক সংবাদ বহন করিয়া আনিয়াছিল। ‘সাবা’কে বাইবেলে উল্লিখিত ‘শিবা’ রূপে চিহ্নিত করা যাইতে পারে (১-রাজবলী-১০)। সানা শহর হইতে তিন দিনের পথের দূরত্বে ইহা ইয়েমেনের অন্তর্গত একটি শহর ছিল এবং এখানে সাবার রানীর রাষ্ট্রীয় সদর দপ্তর ছিল। অধিকন্তু, কাহ্‌তানি উপজাতির এক বিখ্যাত গোত্রের নামও সাবা।

اِنِّیۡ وَجَدۡتُّ امۡرَاَۃً تَمۡلِکُہُمۡ وَاُوۡتِیَتۡ مِنۡ کُلِّ شَیۡءٍ وَّلَہَا عَرۡشٌ عَظِیۡمٌ ﴿۲۴﴾

২৪
আমি এক রমণীকে তাহাদের উপর রাজত্ব করিতে দেখিয়াছি, এবং তাহাকে সব কিছুই দেওয়া হইয়াছে২১৬২ এবং তাহার একটি বিরাট সিংহাসন আছে;
২১৬২। এই আয়াত প্রমাণ করে যে, সাবার রাণী এক অতি উন্নত জাতিকে শাসন করিতেন, যাহারা সভ্যতার এক উচ্চশিখরে পৌঁছিয়াছিল এবং ইহাও প্রমাণ করে যে, তাঁহার আয়ত্তে ঐ সমস্ত উপকরণ ছিল যাহা তাহাকে এক শক্তিশালী রাণীরূপে প্রতিষ্ঠিত করিয়াছিল।

وَجَدۡتُّہَا وَقَوۡمَہَا یَسۡجُدُوۡنَ لِلشَّمۡسِ مِنۡ دُوۡنِ اللّٰہِ وَزَیَّنَ لَہُمُ الشَّیۡطٰنُ اَعۡمَالَہُمۡ فَصَدَّہُمۡ عَنِ السَّبِیۡلِ فَہُمۡ لَا یَہۡتَدُوۡنَ ﴿ۙ۲۵﴾

২৫
আমি তাহাকে ও তাহার জাতিকে আল্লাহ্‌র পরিবর্তে সূর্যকে সেজদা করিতে দেখিয়াছি২১৬৩ এবং শয়তান তাহাদের কার্যাবলীকে তাহাদের নিকট সুন্দর করিয়া দেখাইয়াছে এবং তাহাদিগকে সত্য পথ হইতে নিবৃত্ত রাখিয়াছে, ফলে তাহারা হেদায়াত পাইতেছে না-
২১৬৩। সাবার অধিবাসীরা সূর্য এবং নক্ষত্রের পূজা করিত, যাহা ইরাক হইতে ইয়েমেনে আমদানীকৃত ধর্মবিশ্বাসের অনুরূপ ছিল, কারণ ইয়েমেনবাসীরা, পারশ্য উপসাগর ও সমুদ্র পথে ইরাকবাসীদের নিকটতর সংসর্গে ছিল। ২ঃ৬৩; ৫ঃ৭০ এবং ২২ঃ১৮ আয়াতসমূহে উল্লেখিত সাবীয়ানদিগের সহিত সাবাবাসীদিগকে এক মনে করিয়া বিভ্রান্ত হওয়া উচিৎ নহে। সাবীয়ানরা বিভিন্নভাবে বিবৃত হইয়াছে, যেমন (১) ইরাকে বসবাসকারী নক্ষত্র-পূজারী এক জনগোষ্ঠী; (২) যরাথুষ্ট্রীয়, খৃষ্টীয় এবং ইহুদী ধর্ম-মতের মিশ্রণে সৃষ্ট গোঁজামিল দেওয়া মতবাদে বিশ্বাসী এক সম্প্রদায়; (৩) ইরাকের অন্তর্গত মোসুলের অধিবাসী, যাহারা একেশ্বরবাদী ছিল, কিন্তু তাহাদের শরীয়াত বা কোন ধর্মীয় বিধান ছিল না, (৪) অন্য একজাতি যাহারা ইরাকের কাছাকাছি বসবাস করিত এবং নবীগণের উপর ঈমান রাখিত বলিয়া প্রকাশ্যে ঘোষণা করিত।

اَلَّا یَسۡجُدُوۡا لِلّٰہِ الَّذِیۡ یُخۡرِجُ الۡخَبۡءَ فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَیَعۡلَمُ مَا تُخۡفُوۡنَ وَمَا تُعۡلِنُوۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
(এবং তাহারা বদ্ধ পরিকর) যে, তাহারা আল্লাহ্‌কে সেজদা করিবে না, যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবীর মধ্যে প্রত্যেক গুপ্ত বস্তুকে প্রকাশ করেন; বস্তুতঃ তোমরা যাহা কিছু গোপন কর এবং যাহা কিছু প্রকাশ কর সব কিছুই তিনি জানেন;

اَللّٰہُ لَاۤ اِلٰہَ اِلَّا ہُوَ رَبُّ الۡعَرۡشِ الۡعَظِیۡمِ ﴿ٛ۲۷﴾

২৭
আল্লাহ্ তিনি, যিনি ব্যতীত অন্য কোন মা’বূদ নাই, তিনি মহা আরশের অধিপতি।’
সিজদাহ্‌

قَالَ سَنَنۡظُرُ اَصَدَقۡتَ اَمۡ کُنۡتَ مِنَ الۡکٰذِبِیۡنَ ﴿۲۸﴾

২৮
সে বলিল, ‘আমরা অবশ্যই দেখিব, তুমি সত্য বলিতেছ অথবা তুমি মিথ্যাবাদীদের অন্তর্ভুক্ত;২১৬৪
২১৬৪। পাখীরা কখনও সত্য বা মিথ্যা বলে বলিয়া কাহারো জানা নাই। এই আয়াত আরও একটি প্রমাণ দেয় যে, হুদ্‌হুদ্‌ পাখী ছিল না বরং হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা ছিল।

اِذۡہَبۡ بِّکِتٰبِیۡ ہٰذَا فَاَلۡقِہۡ اِلَیۡہِمۡ ثُمَّ تَوَلَّ عَنۡہُمۡ فَانۡظُرۡ مَاذَا یَرۡجِعُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
তুমি আমার এই পত্রটি লইয়া যাও এবং ইহা তাহাদের সম্মুখে পেশ কর, অতঃপর তাহাদের নিকট হইতে সরিয়া পড় এবং দেখ তাহারা কি উত্তর দেয়।’২১৬৫
২১৬৫। যদি ইহা স্বীকার করিয়া লওয়া হয় যে, হযরত দাউদ (আঃ) এবং হযরত সোলায়মান (আঃ) পাখীদিগের ভাষা বুঝিতে পারিতেন, তাহা হইলেও কুরআনে এমন প্রমাণ নাই যে, সাবার রাণীও তাহাদের ভাষা বুঝিতে পারিত। অথচ তাঁহার নিকট হযরত সোলায়মান (আঃ)-এর পত্র বহন করিয়া নেওয়ার জন্য এবং প্রতিনিধিরূপে বাক্যালাপ করিবার জন্য হুদ্‌হুদ্‌কেই দয়িত্ব অর্পণ করা হইয়াছিল।

قَالَتۡ یٰۤاَیُّہَا الۡمَلَؤُا اِنِّیۡۤ اُلۡقِیَ اِلَیَّ کِتٰبٌ کَرِیۡمٌ ﴿۳۰﴾

৩০
সে (রাণী) বলিল, ‘হে প্রধানগণ! আমার সম্মুখে একটি সম্মানিত পত্র পেশ করা হইয়াছে;