৬১

الصف

সূরা আস-সাফ

As-Saff

মাদানী ১৫ আয়াত ২ রুকু পারা ২৮

মাদানী সূরা, বিসমিল্লাহসহ ১৫ আয়াত এবং ২ রুকূ

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
পরম করুণাময় আল্লাহর নামে যিনি স্বতঃপ্রবৃত্ত দাতা (ও) বার বার কৃপাকারী।

سَبَّحَ لِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ۚ وَہُوَ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۲﴾

২
কদেখুন: ১:১আকাশসমূহ এবং পৃথিবীতে যা কিছু আছে সবই আল্লাহর পবিত্রতা-মহিমা ঘোষণা করে। আর তিনি মহাপরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়।খদেখুন: ১৭:৪৫; ২৪:৪২; ৫৭:২; ৬২:২; ৬৪:২

یٰۤاَیُّہَا الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا لِمَ تَقُوۡلُوۡنَ مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ ﴿۳﴾

৩
হে যারা ঈমান এনেছ! তোমরা কেন তা বলো- যা তোমরা (নিজেরা) করো না?৩০৩৪
৩০৩৪। মুসলমান কথায় ও কাজে এক। মুসলমান যা বলে, তা করে। বড়ো বড়ো বুলি আর শূন্য-আস্ফালন কোনো কাজেই আসে না। এরূপ ঈমান যা কাজে রূপান্তরিত হয় না, আর এরূপ প্রতিজ্ঞা যা বাস্তবায়িত হয় না, তা মুনাফিকী বা ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছুই নয়।

کَبُرَ مَقۡتًا عِنۡدَ اللّٰہِ اَنۡ تَقُوۡلُوۡا مَا لَا تَفۡعَلُوۡنَ ﴿۴﴾

৪
তোমাদের এমন কথা বলা- যা তোমরা (নিজেরা) করো না, তা আল্লাহর দৃষ্টিতে বড়োই গর্হিত পাপ।

اِنَّ اللّٰہَ یُحِبُّ الَّذِیۡنَ یُقَاتِلُوۡنَ فِیۡ سَبِیۡلِہٖ صَفًّا کَاَنَّہُمۡ بُنۡیَانٌ مَّرۡصُوۡصٌ ﴿۵﴾

৫
নিশ্চয় আল্লাহ তাদেরকে ভালোবাসেন যারা তাঁর পথে সারিবদ্ধ হয়ে এমনভাবে যুদ্ধ করে, যেন তারা এক সিসাগলিত (সুদৃঢ়) প্রাচীর।৩০৩৫
৩০৩৫। মুসলমানের নিকট এটাই আশা করা হয় যে, তারা শত্রুদের হীন চক্রান্তের মোকাবিলায় তাদের নেতার নেতৃত্বের অধীনে পূর্ণ ঐক্য ও অটল আনুগত্য সহকারে অভিযান চালাবে। যারা শক্তিশালী ও ঐক্যবদ্ধ জাতিরূপে ৩০৩৬ টীকা পরবর্তী পৃষ্ঠায় দ্রষ্টব্য গড়ে উঠতে চায় তাদের একই জীবনাদর্শ, একই জীবনপদ্ধতি, একই নীতিমালা, একই উদ্দেশ্যে এবং একই লক্ষ্যসহ একটি একক কর্মসূচির অনুসারী হতে হবে। তবেই তারা লক্ষ্যে পৌছাতে সমর্থ হবে।

وَاِذۡ قَالَ مُوۡسٰی لِقَوۡمِہٖ یٰقَوۡمِ لِمَ تُؤۡذُوۡنَنِیۡ وَقَدۡ تَّعۡلَمُوۡنَ اَنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ ؕ فَلَمَّا زَاغُوۡۤا اَزَاغَ اللّٰہُ قُلُوۡبَہُمۡ ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الۡفٰسِقِیۡنَ ﴿۶﴾

৬
আর (স্মরণ করো!) মূসা যখন তার জাতিকে বলেছিল, ‘হে আমার জাতি! তোমরা কেন আমাকে কষ্ট দাও?৩০৩৬ অথচ তোমরা ভালোভাবেই জানো, নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রসূল।’ এরপরও তারা যখন বক্রতা অবলম্বন করল, তখন আল্লাহ তাদের হৃদয়কে বক্র করে দিলেন। বস্তুত আল্লাহ দুষ্কৃতিপরায়ণ জাতিকে হিদায়াত দেন না।
৩০৩৬। হযরত মূসা (আ.)-কে নিজের অনুসারীদের কাছ থেকে যতটা মানসিক কষ্ট ও বিপত্তি সহ্য করতে হয়েছিল অন্য কোনো নবীকেই হয়ত তেমনটা করতে হয় নি। তাঁর অনুসারীরা স্বচক্ষে ফেরাউনের সলিলসমাধি দেখল, আল্লাহর মহাশক্তি প্রত্যক্ষ করল, অথচ নিরাপদে সাগর পাড়ি দেবার পরেই তারা আল্লাহর মহিমাকে ভুলে গিয়ে পৌত্তলিকতার দিকে আকৃষ্ট হয়ে পড়ল। আর অন্য এক জাতিকে মূর্তিপূজা করতে দেখে মূসা (আ.)-কে বলল, ‘তাদের যেমন অনেক উপাস্য রয়েছে আমাদের জন্যও তেমনই একটি উপাস্য বানিয়ে দাও’ (৭:১৩৯)। মূসা (আ.) যখন তাদেরকে আল্লাহর প্রতিশ্রুত ভূমি কেনান এলাকায় অভিযান চালানোর নির্দেশ দিলেন তখন তারা অবহেলা ও তাচ্ছিল্যের সুরে জবাব দিল, ‘তুমি ও তোমার প্রতিপালক-প্রভু যাও এবং তোমরা উভয়ে যুদ্ধ করো; আমরা তো এখানেই বসে থাকব’ (৫:২৫)। পৌত্তলিক মনোভাবাপন্ন স্বজাতিকে মূসা (আ.) মূর্তিপূজা থেকে পুনরুদ্ধারের জন্য অবিরত চেষ্টা করেছিলেন বটে, কিন্তু ফেরাউনের দাসত্ব থেকে উদ্ধারকৃত স্বজাতির নিকট থেকে কৃতজ্ঞতাপ্রাপ্তির বদলে তিনি অবজ্ঞা, অবাধ্যতা ও ঔদ্ধত্য পেয়েছেন বেশি। তাঁর সৎ চেষ্টার প্রতি সহযোগিতা দানের পরিবর্তে তাঁর অনুসারীরা বরং বাধা দান করেছে বেশি। অথচ ফেরাউনের দাসত্ব থেকে মূসা (আ.) তাদেরকে মুক্ত না করলে বনী ইসরাঈলী জাতির জাতিসত্তাই লোপ পেত। পৌত্তলিকতার অন্ধকার থেকে তওহীদের আলোর দিকে না আনলে সকল পারলৌকিক মঙ্গল থেকেও সে জাতি চিরবঞ্চিত থাকত। এত বড়ো ইহলৌকিক ও পারলৌকিক মঙ্গলকারীর প্রতি তারা বিদ্বেষ পোষণ করেছিল এবং তাঁর বদনাম ও কুখ্যাতি পর্যন্ত তারা ছড়িয়েছিল।

وَاِذۡ قَالَ عِیۡسَی ابۡنُ مَرۡیَمَ یٰبَنِیۡۤ اِسۡرَآءِیۡلَ اِنِّیۡ رَسُوۡلُ اللّٰہِ اِلَیۡکُمۡ مُّصَدِّقًا لِّمَا بَیۡنَ یَدَیَّ مِنَ التَّوۡرٰٮۃِ وَمُبَشِّرًۢا بِرَسُوۡلٍ یَّاۡتِیۡ مِنۡۢ بَعۡدِی اسۡمُہٗۤ اَحۡمَدُ ؕ فَلَمَّا جَآءَہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ قَالُوۡا ہٰذَا سِحۡرٌ مُّبِیۡنٌ ﴿۷﴾

৭
আর (স্মরণ করো!) মরিয়মের পুত্র ঈসা যখন বলেছিল, ‘হে বনী ইসরাঈল! নিশ্চয় আমি তোমাদের প্রতি প্রেরিত আল্লাহর রসূল। তওরাতের যা আমার সামনে বিদ্যমান তার সত্যায়নকারীরূপে এবং আমার পরে আগমনকারী এমন এক মহান রসূলের সুসংবাদদাতারূপে আমি এসেছি- যার নাম হবে আহমদ৩০৩৭।’ অতঃপর সে যখন সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলিসহ তাদের কাছে এলো তখন তারা বলল, ‘এ তো এক প্রকাশ্য জাদু।’কদেখুন: ২৭:১৪; ৪৩:৩১
৩০৩৭। নবী করীম (সা.)-এর আগমন সম্বন্ধে হযরত ঈসা (আ.) যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন, তা বাইবেলের যোহন ১২:১৩, ১৪:১৬-১৭, ১৫:২৬ ও ১৬:৭-এ লিপিবদ্ধ রয়েছে। ভবিষ্যদ্বাণীতে মহানবী (সা.)-কে ‘প্যারাক্লিট’ বা ‘কমফর্টার’ বা ‘স্পিরিট অব ট্রুথ’ নামে অভিহিত বলে দেখতে পাওয়া যায়। এ নামটি ও আনুষঙ্গিক বিষয়াদি বিশ্লেষণ করলে ভবিষ্যদ্বাণীর মর্ম পরিষ্কার বুঝা যাবে: (ক) ভবিষ্যদ্বাণীতে আছে যে, ঈসা (আ.)-এর ইহলীলা ত্যাগের পর শান্তিদাতা (প্যারাক্লিট বা কমফর্টার) বা সত্যের আত্মা (স্পিরিট অব ট্রুথ) আগমন করবেন। (খ) তিনি (অর্থাৎ আগমনকারী) পৃথিবীর বুকে চিরস্থায়ী হবেন। তিনি এসে বহু বিষয়ে অনেক কথা বলবেন, যা ঈসা (আ.) স্বয়ং তখন বলতে পারেন নি, কেননা মানুষ সেগুলোর গুরুত্ব ও দায়িত্ব বহন করার উপযুক্ত শক্তি তখনো প্রাপ্ত হয় নি। (গ) তিনি মানুষকে সাকল্য সত্যে পরিচালিত করবেন। (ঘ) তিনি নিজ থেকে কিছুই বলবেন না, বরং যা যা তিনি শ্রবণ করবেন তা তা বলবেন। (ঙ) তিনি এসে ঈসা (আ.)-এর মর্যাদা উন্নীত করবেন এবং তাঁর সত্যতার সাক্ষ্য দেবেন। (‘শান্তিদাতা’ সত্যের আত্মা) এর বর্ণনা কুরআনে প্রদত্ত মহানবী (সা.)-এর গুণাবলি, মর্যাদা, আদর্শ ও লক্ষ্য সম্বন্ধীয় বর্ণনার সাথে হুবহু মিলে যায়। ঈসা (আ.)-এর ইহজগৎ ত্যাগের পর মহানবী (সা.)-এর আবির্ভাব ঘটে। তিনি চিরস্থায়ী শরীয়তসহ আগমন করেন। কুরআন বিশ্বমানবের জন্য সর্বশেষ গ্রন্থ যা কিয়ামত পর্যন্ত বলবৎ থাকবে (৫:৪)। তিনি নিজ থেকে কিছু বলেন নি, বরং আল্লাহর কাছ থেকে যা শুনেছেন তা-ই তিনি বলেছেন (৫৩:৪)। তিনি ঈসা (আ.)-এর গুণকীর্তন করেছেন (২:২৫৪; ৩:৫৬)। যোহনের সুসমাচারে বর্ণিত ভবিষ্যদ্বাণীর প্রতিটি কথা, কুরআনের এ আয়াতে প্রদত্ত ঈসা (আ.)-এর ভবিষ্যদ্বাণীসংবলিত কথাগুলোর সাথে মিলে যায়, কেবল ‘প্যারাক্লিট’ নামটির স্থলে ‘আহমদ’ নাম ব্যবহৃত হয়েছে। বাইবেলের ও কুরআনের বর্ণনার মধ্যে সামঞ্জস্য থাকা সত্ত্বেও কেবল নামের বিভিন্নতার ওপর ভিত্তি করে খ্রিষ্টান লেখকরা কুরআনের বর্ণিত এ ভবিষ্যদ্বাণীকে ঈসা (আ.)-এর প্যারাক্লিট সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণী বলে মেনে নিতে অস্বীকার করেন ও চ্যালেঞ্জ করেন। আসল কথা হলো, ঈসা (আ.) ‘আরামাইক’ ও ‘হিব্রু’ এ দুই ভাষাতেই কথা বলতেন। আরামাইক ছিল তাঁর মাতৃভাষা আর হিব্রু ছিল তাঁর ধর্মীয় ভাষা। বাইবেলের যে পঠন আমরা পাই, তা ‘আরামাইক’ ও ‘হিব্রু’ ভাষায় বাইবেলের গ্রিক অনুবাদ। আরামাইক বা হিব্রু বাইবেলের অস্তিত্ব এখন নাই। তাই গ্রিক ভাষায় অনূদিত বাইবেল থেকে অন্যান্য ভাষায় বাইবেল অনূদিত হয়ে আসছে। স্বভাবতই অনুবাদ ‘আসলের’ পূর্ণ অর্থ প্রকাশ করতে পারে না, কেননা প্রত্যেক ভাষারই সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তাছাড়া প্রত্যেক ভাষাভাষী জাতিরও প্রকাশের সীমাবদ্ধতা থাকে। তাদের সেই সীমাবদ্ধতা তাদের লেখার মধ্যেও প্রকাশ পায়। গ্রিক ভাষায় ‘প্যারিব্রুটাস’ একটি শব্দ আছে, যার অর্থ আরবী ভাষার ‘আহমদ’ শব্দের অনুরূপ। খ্রিষ্টধর্ম বিশারদ জেক ফিনেগান তার “দি আরকিওলজি অব রিলিজিওন” পুস্তকে লিখেছেন, “গ্রিক ভাষায় ‘প্যারাক্লিটাস’ (শান্তিদাতা) আর ‘প্যারিব্রুটাস’ একই ধরনের শব্দ। দ্বিতীয় শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় আহমদ এবং মুহাম্মদ”। প্রাচীন কায়রো শহরের এযরা সিনাগগে ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে “দামাস্কাস ডকুমেন্ট” নামের একটি ধর্ম পুস্তকের দ্বিতীয় পৃষ্ঠায় দেখা যায়, ঈসা (আ.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছেন যে, ‘এমেদ’ নামে একজন পবিত্র আত্মার আগমন হবে: “তিনি (সদাপ্রভু) তাঁর মসীহের দ্বারা তাদের কাছে তাঁর (প্রেরিত) পবিত্র আত্মার পরিচয় ঘটালেন, কেননা তিনিই ‘এমেদ’ (অর্থ সত্যবাদী, আল-আমীন) এবং তাঁর (সদাপ্রভুর) নামানুসারে... ‘এমেদ’ হিব্রু শব্দ, যার অর্থ ‘সত্য’ অথবা ‘সত্যবাদী মহান ব্যক্তি, যিনি নিরন্তর ভালো’ (স্ট্র্যাচানস ফোর্থ গসপেল, পৃ. ১৪১)। ইহুদীরা এ শব্দটিকে ব্যাখ্যা করেছে ‘আল্লাহর মোহর’ বলে। যদিও ঈসা (আ.) স্বয়ং ‘আহমদ’ শব্দটির ব্যবহার করেছিলেন তথাপি ‘আহমদ’ ও ‘এমেদ’ এ শব্দের অর্থ ও উচ্চারণে সামঞ্জস্য থাকার কারণে পরবর্তী হিব্রু ভাষাভাষী লেখকরা ‘আহমদ’ শব্দের স্থলে ‘এমেদ’ শব্দ ব্যবহার করেছেন। অতএব এ আয়াতের ভবিষ্যদ্বাণীতে ব্যবহৃত ‘আহমদ’ শব্দটি মহানবী (সা.)-এর উদ্দেশ্যেই ব্যবহৃত হয়েছে। এ যুক্তিধারার অনুসিদ্ধান্ত হিসাবে আহমদীয়া জামা’তের প্রতিষ্ঠাতা প্রতিশ্রুত মসীহের ওপরেও এ ভবিষ্যদ্বাণী সমভাবে প্রযোজ্য, কেননা তাকেও আল্লাহ তা’লা ওহীর মাধ্যমে ‘আহমদ’ নামে অভিহিত করেছেন (বারাহীনে আহমদীয়া) এবং তাঁর আগমনের মাধ্যমে মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় আগমনের বাস্তবায়ন ঘটেছে। মহানবী (সা.)-এর দ্বিতীয় প্রকাশ বা অভ্যুদয়ের কথা সূরা জুমুআর তৃতীয় আয়াতে সূক্ষ্ম ও স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে। এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ‘বার্নাবাসের সুসমাচারে’ মহানবী (সা.)-এর আগমনের ভবিষ্যদ্বাণী অত্যন্ত পরিষ্কারভাবে বর্ণিত হয়েছে। খ্রিষ্টান গির্জা সাধারণভাবে ‘বার্নাবাসের সুসমাচারকে’ সঠিক ও সন্দেহমুক্ত মনে করে না। তা সত্ত্বেও এ সুসমাচারটিও অন্য চারটি সুসমাচারের মতোই সমপর্যায়ের গুরুত্ব রাখে।

وَمَنۡ اَظۡلَمُ مِمَّنِ افۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ الۡکَذِبَ وَہُوَ یُدۡعٰۤی اِلَی الۡاِسۡلَامِ ؕ وَاللّٰہُ لَا یَہۡدِی الۡقَوۡمَ الظّٰلِمِیۡنَ ﴿۸﴾

৮
আর তার চেয়ে বড়ো যালিম আর কে- যে মিথ্যা বানিয়ে আল্লাহর প্রতি আরোপ করে? অথচ তাকে ইসলামের দিকে ডাকা হয়!৩০৩৮ আর আল্লাহ কখনো সীমালঙ্ঘনকারী লোকদের হিদায়াত দান করেন না।কদেখুন: ৬:২২; ১০:১৮; ১১:১৯
৩০৩৮। এ আয়াতটি অবিশ্বাসীদের প্রতি আরোপ করা যায়, কারণ আহ্বানকারী যদি মহানবী (সা.) হন তাহলে অবিশ্বাসীরা হবে ইসলামের দিকে আহূত (২০:১০৯ এবং ৩৩:৪৭)। তাছাড়া কুরআনে অবিশ্বাসীদেরকে আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপকারী বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে (৬:১৩৮, ১৪১)। তবে ভবিষ্যদ্‌বাণীটিকে যদি ‘প্রতিশ্রুত মসীহের’ প্রতি আরোপ করা হয়, সেক্ষেত্রে সাধারণ ও তথাকথিত উলামাবৃন্দ প্রতিশ্রুত মসীহকে ইসলামবিচ্যুত ও ভ্রান্ত মনে করে তাঁকে তাদের মতো মুসলমান হয়ে যাবার জন্য ইসলামে ফিরে আসার আহ্বান জানাবে। এক্ষেত্রে আহৃত ব্যক্তি হবেন ‘প্রতিশ্রুত মসীহ ও ইমাম মাহদী (আ.)’।

یُرِیۡدُوۡنَ لِیُطۡفِـُٔوۡا نُوۡرَ اللّٰہِ بِاَفۡوَاہِہِمۡ وَاللّٰہُ مُتِمُّ نُوۡرِہٖ وَلَوۡ کَرِہَ الۡکٰفِرُوۡنَ ﴿۹﴾

৯
তারা নিজেদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূরকে৩০৩৯ নিভিয়ে দিতে চায়, কিন্তু কাফিররা অপছন্দ করলেও আল্লাহ সর্বাবস্থায় তাঁর নূরকে পূর্ণতা দানকারী।*কদেখুন: ৯:৩২
৩০৩৯। কুরআনে নবী করীম (সা.)-কে বার বার ‘আল্লাহর নূর বা জ্যোতি’ বলা হয়েছে (৪:১৭৫; ৫:১৭; ৬৪:৯)।
* হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) বলেন, এ আয়াতে সুস্পষ্টভাবে বুঝানো হয়েছে, মসীহ মাওউদ চতুর্দশ শতাব্দীতে জন্মগ্রহণ করবেন, কেননা নূরের পরিপূর্ণতার জন্য চতুর্দশীর রাত নির্ধারিত রয়েছে। (তোহফায়ে গুলড়বিয়া, রূহানী খাযায়েন, ১৭শ খণ্ড, পৃ. ১২৪) [হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত কুরআন করীমে প্রদত্ত টীকা দ্রষ্টব্য]

ہُوَ الَّذِیۡۤ اَرۡسَلَ رَسُوۡلَہٗ بِالۡہُدٰی وَدِیۡنِ الۡحَقِّ لِیُظۡہِرَہٗ عَلَی الدِّیۡنِ کُلِّہٖ وَلَوۡ کَرِہَ الۡمُشۡرِکُوۡنَ ﴿٪۱۰﴾

১০
খদেখুন: ৯:৩৩; ৪৮:২৯তিনিই তাঁর রসূলকে হিদায়াত ও সত্য ধর্মসহ পাঠিয়েছেন, যেন তিনি একে সব ধর্মের ওপর বিজয় দান করতে পারেন;৩০৪০ মুশরিকরা যতই অপছন্দ করুক না কেন।*
সূরা আস-সাফ - রুকু ১
৩০৪০। তফসীরকারদের প্রায় সকলেই এ ঐকমত্য পোষণ করেন যে, এ আয়াতটি ‘প্রতিশ্রুত মসীহ’ সম্পর্কে প্রযোজ্য, কারণ তাঁর সময়েই সকল ধর্ম নিজ নিজ প্রভাব-প্রতিপত্তি বিস্তারের জন্য আন্দোলন শুরু করবে এবং প্রতিশ্রুত মসীহর যুক্তিবলে ইসলামের শ্রেষ্ঠত্ব সারা বিশ্বে প্রতিষ্ঠিত হবে।
* এ আয়াতে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামের বিশ্বনবী হবার বিষয়টি জোরালোভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। অর্থাৎ তিনি (সা.) কোনো একটি ধর্মের অনুসারীদের জন্য আবির্ভূত হন নি, বরং তিনি (সা.) সারা বিশ্বের সব ধর্মের অনুসারীদের জন্য প্রেরিত হয়েছেন এবং সব ধর্মের ওপর জয়যুক্ত হবেন। হযরত মসীহ মাওউদ (আ.) বলেন, এ আয়াতটি কুরআন শরীফের এক মহান ভবিষ্যদ্বাণী। এ ব্যাপারে গবেষক আলেমরা ঐকমত্য পোষণ করেন যে, মসীহ মাওউদের যুগে তাঁর মাধ্যমে এটা পূর্ণ হবে। (তিরইয়াকুল কুলুব, রূহানী খাযায়েন, ১৫শ খণ্ড, পৃ. ২৩২) [হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত কুরআন করীমে প্রদত্ত টীকা দ্রষ্টব্য। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানতে দেখুন: তফসীর ইবনে জরীর, তফসীর জামিউল বায়ান, গায়াতুল মাকসুদ, আস-সীরাতুস সাভিয়্যি, হুজ্জাতুল্লাহুল বালিগা।