১১১

اللهب

সূরা আল্‌ লাহাব

Al-Lahab

মক্কী ৬ আয়াত ১ রুকু পারা ৩০

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৬ আয়াত এবং ১ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

تَبَّتۡ یَدَاۤ اَبِیۡ لَہَبٍ وَّتَبَّ ؕ﴿۲﴾

২
আবূ লাহাবের৩৪৫৮ দুইটি হাত ধ্বংস হউক এবং সে নিজেও ধ্বংস হউক!
৩৪৫৮। ‘আবু লাহাব’ (অগ্নিশিখার পিতা) ছিল নবী করীম (সাঃ)-এর চাচা এবং চরম অত্যাচারী শত্রু। তাহার আসল নাম ছিল আব্দুল উয্‌যা। তাহার আকৃতি-প্রকৃতি, মুখাবয়ব ও চুল ছিল রুক্ষ এবং মেযাজ ছিল অতিশয় কর্কশ। সেই কারণে তাহাকে ডাকা হইত ‘আবু লাহাব’ নামে। মহানবী (সাঃ)-এর প্রচারকার্যের শুরুতেই একটি ঘটনা ঘটিয়াছিল। এই সূরা তাহা স্মরণ করাইয়া দেয়। আল্লাহ্‌র নির্দেশে নবী করীম (সাঃ) ঐশী-বাণীকে আত্মীয়-স্বজনদের মধ্যে প্রচারের জন্য, ‘সাফা’ পাহাড়ে দাঁড়াইয়া মক্কার গোত্রগুলিকে ডাকিলেন, যাহাদের মধ্যে ছিল লুবাই, মুররা, কিলাব, কুসাঈ ও অন্যান্য নিকট-আত্মীয়বর্গ। তিনি তাহদিগকে বলিলেন, আল্লাহ্ তাঁহাকে রসূল (প্রেরিত পুরুষ) হিসাবে পাঠাইয়াছেন। এমতাবস্থায় তাহারা যেন তাঁহার কাছে অবতীর্ণ ঐশী-বাণীকে গ্রহণ করে এবং তাহাদের ভ্রান্ত পথ ও কুকর্মসমূহ ছাড়িয়া দেয়। তিনি অত্যন্ত আন্তরিকতা ও সহৃদয়তার সহিত তাঁহার কথাগুলি পেশ করিয়াছিলেন এবং বলিয়াছিলেন যে, এই ঐশী-বাণীকে না মানিলে আল্লাহ্‌র শাস্তি তাহাদের উপরে নিপতিত হইবে। নবী করীম (সাঃ)-এর বক্তব্য শেষ হইতে না হইতেই আবু-লাহাব দাঁড়াইয়া বলিলঃ “তুমি ধ্বংস-প্রাপ্ত হও; এই কথা বলার জন্যই কি তুমি আমাদিগকে ডাকিয়াছ?” (বুখারী)। ‘অগ্নি-শিখার পিতা’ এই ডাক-নামটি আবু লাহাব নামীয় ব্যক্তিটিকেও বুঝাইতে পারে, অথবা ইসলামের অগ্নিশর্মা শত্রুদিগকেও বুঝাইতে পারে; অথবা ইহা হইতেও অধিকতর যুক্তিযুক্তভাবে শেষ-যুগের পশ্চিমা জাতিগুলিকেও বুঝাইতে পারে—যাহার একাংশ আল্লাহ্‌তা’লার অস্তিত্বকেই অস্বীকার করে, আর অপরাংশ আল্লাহ্‌তা’লার একত্বকে অস্বীকার করে। এই উভয়াংশই সমভাবে ইসলাম-বিরোধী। এই হিসাবে, ‘দুইটি হাত’ বলিতে, এই দুইটি শক্তিশালী দলকে বুঝাইয়াছে। এই অর্থে আয়াতটির তাৎপর্য হইতেছেঃ ইসলামের শত্রুগণের (বিশেষ করিয়া এই দুইটি পশ্চিমা শক্তি ও তাহাদের মিত্রবর্গের) ইসলাম-বিরোধী প্রচেষ্টা ও ষড়যন্ত্র সম্পূর্ণ বিফল হইবে এবং তাহাদের ইসলাম-বিধ্বংসী চেষ্টা-তদ্বীরসমূহ তাহাদের জন্যই সর্বনাশ ডাকিয়া আনিবে। ইসলামের ক্রমোন্নতি দেখিয়া তাহারা অন্তর্জ্বালায় ভুগিবে। আর তাহাদের রাশি-রাশি ধন-দৌলত, জ্ঞান-গরিমা ও প্রভাব-প্রতিপত্তি তাহাদেরই চোখের সম্মুখে বিলীন হইবে।

مَاۤ اَغۡنٰی عَنۡہُ مَالُہٗ وَمَا کَسَبَ ؕ﴿۳﴾

৩
তাহার ধন-সম্পদ এবং যাহা সে উপার্জন করিয়াছে৩৪৫৯ উহা তাহার কোন কাজে আসিল না,
৩৪৫৯। ‘তাহার ধন-সম্পদ’ বলিতে, তাহাদের দেশে উৎপাদিত ধন-দৌলত বুঝাইতে পারে এবং ‘যাহা সে উপার্জন করিয়াছে’ বলিতে, অপেক্ষাকৃত দুর্বল জাতিসমূহকে শোষণ-পূর্বক তাহাদের প্রাকৃতিক সম্পদগুলি করায়ত্ব ও সংগৃহীত করাকে বুঝাইয়া থাকিতে পারে।

سَیَصۡلٰی نَارًا ذَاتَ لَہَبٍ ۚ﴿ۖ۴﴾

৪
সে অচিরেই লেলিহান অগ্নিতে দগ্ধ হইবে,৩৪৬০
৩৪৬০। ‘আবু লাহাব’ বলিতে ঐ ব্যক্তিকেও বুঝায়, যে অগ্নিশিখা-উৎপাদক যন্ত্রাদি আবিষ্কার করে, অথবা যে অগ্নিতে পুড়িয়া ধ্বংস হয়। দ্বিতীয় অর্থের দিকে লক্ষ্য রাখিয়া ব্যাখ্যা করিলে, এই আয়াতটির মধ্যে এই ভবিষ্যদ্বাণীর সন্ধান পাওয়া যায় যে, শেষ যামানায় বা কলিকালে, দুইটি বৃহৎ রাজনৈতিক জোট তাহাদের আবিষ্কৃত ও উৎপাদিত আণবিক বোমা ও অন্যান্য সমরাস্ত্র দ্বারা নিজেরাই ধ্বংস হইয়া যাইবে। এই আয়াত ইহাও বলিয়া দিতেছে যে, এই জোটভুক্ত জাতিগণের জন্য সেই দিন বেশী দূরে নহে।

وَّامۡرَاَتُہٗ ؕ حَمَّالَۃَ الۡحَطَبِ ۚ﴿۵﴾

৫
এবং তাহার স্ত্রীও যে বার বার ইন্ধন বহন করিয়া আনে,৩৪৬১
৩৪৬১। এখানে আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামীলকে নির্দেশ করিতেছে বলিয়া মনে হয়। এই স্ত্রীলোকটি মহানবী (সাঃ)-এর চলার পথে কাঁটা ছড়াইয়া রাখিত এবং তাঁহার দুর্নাম ছড়াইয়া বেড়াইত। ‘হাতাব’-এর অন্য অর্থ ‘বিদ্বেষজনিত কুৎসা’ (লেইন)। ঐজাতীয় লোক যাহারা বিদ্বেষমূলকভাবে ইসলাম ও মহানবী (সাঃ)-এর নামে কুৎসা রটনা করে এবং মিথ্যা অপবাদ ছড়ায়, তাহাদের উপরও আয়াতটি প্রযোজ্য।

فِیۡ جِیۡدِہَا حَبۡلٌ مِّنۡ مَّسَدٍ ﴿٪۶﴾

৬
তাহার গলায় খর্জুর -আঁশের রশি পেঁচানো হইবে।৩৪৬২
সূরা আল্‌ লাহাব - রুকু ১
৩৪৬২। যদিও বাহ্যতঃ দেখা যায়, ঐ জাতিগুলি মুক্ত ও মুক্তিবাদী, তথাপি তাহারা নিজেদের স্ব স্ব রাজনৈতিক আদর্শ ও জীবন-পদ্ধতির রজ্জুতে এমনই দৃঢ়ভাবে বাঁধা রহিয়াছে যে, তাহারা ঐগুলি হইতে নিজেকে মুক্ত করিতে সক্ষম হইবে না। অথবা, উম্মে জামীল সম্বন্ধে যেমন কথিত আছে যে, সে যে দড়ির সাহায্যে কাঠ বহিয়া আনিত (কাঠের বোঝা পিঠে ঝুলাইয়া তাহা মাথায়-পেছানো দড়ির সাথে বাঁধিয়া বহন করিত), সেই দড়িই একদিন মাথা হইতে ছুটিয়া গলায় ফাঁস লাগিয়া তাহার মৃত্যু ঘটাইয়াছিল। ঠিক তেমনিভাবে, এই জাতিগুলি নিজেদের ধ্বংসকারী মারণাস্ত্র দ্বারা নিজেরাই ধ্বংসপ্রাপ্ত হইয়া যাইবে।