৬৫

الطلاق

সূরা আত্‌ তালাক

At-Talaq

মাদানী ১৩ আয়াত ২ রুকু পারা ২৮

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১৩ আয়াত এবং ২ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

یٰۤاَیُّہَا النَّبِیُّ اِذَا طَلَّقۡتُمُ النِّسَآءَ فَطَلِّقُوۡہُنَّ لِعِدَّتِہِنَّ وَاَحۡصُوا الۡعِدَّۃَ ۚ وَاتَّقُوا اللّٰہَ رَبَّکُمۡ ۚ لَا تُخۡرِجُوۡہُنَّ مِنۡۢ بُیُوۡتِہِنَّ وَلَا یَخۡرُجۡنَ اِلَّاۤ اَنۡ یَّاۡتِیۡنَ بِفَاحِشَۃٍ مُّبَیِّنَۃٍ ؕ وَتِلۡکَ حُدُوۡدُ اللّٰہِ ؕ وَمَنۡ یَّتَعَدَّ حُدُوۡدَ اللّٰہِ فَقَدۡ ظَلَمَ نَفۡسَہٗ ؕ لَا تَدۡرِیۡ لَعَلَّ اللّٰہَ یُحۡدِثُ بَعۡدَ ذٰلِکَ اَمۡرًا ﴿۲﴾

২
হে নবী! যখন তোমরা স্ত্রীগণকে তালাক দাও,৩০৬৪ তখন তাহাদিগকে তাহাদের নির্ধারিত ইদ্দত অনুযায়ী তালাক দাও এবং ইদ্দতকাল গণনা কর এবং তোমাদের প্রতিপালক আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন কর। তাহাদিগকে তাহাদের গৃহ হইতে বাহির করিয়া দিও না৩০৬৪-ক এবং তাহারাও যেন বাহির হইয়া না যায়, যদি না তাহারা প্রকাশ্য কোন অশ্লীল কাজ করে। অতএব এইগুলি আল্লাহ্‌র নির্ধারিত সীমা, এবং যে আল্লাহ্‌র সীমাসমূহ লংঘন করে বস্তুতঃ সে নিজের উপরই যুলুম করে। তুমি জান না, হয় তো আল্লাহ্ ইহার পর নতুন অবস্থার সৃষ্টি করিয়া দিবেন।৩০৬৫
৩০৬৪। ইহা কুরআনের আয়াতসমূহের মধ্যে ঐগুলির একটি, যেগুলিতে বাহ্যতঃ নবীকরীম (সাঃ)-কে আহ্বান করা হইলেও, সেই আহ্বান প্রকৃত পক্ষে তাঁহার অনুসারী মো’মেনদের উপরই বর্তায়। হযরত রসূলে পাক (সাঃ)-কে তো বিবি তালাকের অধিকারই দেওয়া হয় নাই (৩৩ঃ৫৩)। অতএব এই আহ্বান ও আদেশ তাঁহার অনুসারীদের উদ্দেশ্যেই দেওয়া হইয়াছে।
৩০৬৪-ক। স্ত্রী-বিচ্ছেদের (তালাকের) ঘোষণা, দুইটি মাসিক ঋতুস্রাবের মধ্যবর্তী সময়ে মুক্ত অবস্থায় উচ্চারণ করিতে হয়। ঐ মধ্যবর্তী সময়ের মাঝে যদি তাহারা পরস্পর যৌন সম্পর্ক স্থাপন করিয়া না থাকে, তবেই তালাক-উচ্চারণ বৈধ হইবে। ইহাতে সুবিধা এই যে, স্ত্রী-পরিত্যাগের সিদ্ধান্ত আকস্মিকভাবে, রাগের মাথায়, কোন সাময়িক উত্তেজনার বশবর্তী অবস্থায় না হইয়া, যেন ধীর-স্থির অবস্থায়, ভাবনাচিন্তার পর যথার্থ সিদ্ধান্তরপে গৃহীত হয়। তদুপরি, বিচ্ছেদ-প্রাপ্তা স্ত্রী নিজ গৃহেই অবস্থান করিবে। এই ব্যবস্থা অবলম্বনের আবশ্যকতা ও উপকারিতা এই যে, অপেক্ষা বা ইদ্দৎ-কালে ইহা সম্ভব যে, উভয়ের মনোমালিন্যের তীব্রতা দূরীভূত হইয়া, পরস্পরের মধ্যে মিলনের মনোভাব সৃষ্টি হইতে পারে।
৩০৬৫। ‘আম্‌র’ শব্দের তাৎপর্য এখানে বিড়ম্বিত স্বামী-স্ত্রীর পুনর্মিলিত হওয়াকে বুঝাইয়াছে।

فَاِذَا بَلَغۡنَ اَجَلَہُنَّ فَاَمۡسِکُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ اَوۡ فَارِقُوۡہُنَّ بِمَعۡرُوۡفٍ وَّاَشۡہِدُوۡا ذَوَیۡ عَدۡلٍ مِّنۡکُمۡ وَاَقِیۡمُوا الشَّہَادَۃَ لِلّٰہِ ؕ ذٰلِکُمۡ یُوۡعَظُ بِہٖ مَنۡ کَانَ یُؤۡمِنُ بِاللّٰہِ وَالۡیَوۡمِ الۡاٰخِرِ ۬ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مَخۡرَجًا ۙ﴿۳﴾

৩
অতঃপর যখন তাহারা তাহাদের নির্ধারিত ইদ্দতের শেষ সীমায় উপনীত হয় তখন তোমরা তাহাদিগকে হয় ন্যায়-সংগতভাবে রাখ অথবা তাহাদিগকে ন্যায়-সংগতভাবে বিদায় করিয়া দাও, এবং তোমাদের মধ্য হইতে দুইজন ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে সাক্ষী রাখ, এবং আল্লাহ্‌র জন্য সাক্ষ্য প্রতিষ্ঠা কর। সেই ব্যক্তিকে এই উপদেশ প্রদান করা হইতেছে যে আল্লাহ্‌র উপর এবং পরকালের উপর ঈমান রাখে। এবং যে আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন করে— তিনি তাহার জন্য কোন না কোন উদ্ধারের পথ করিয়া দিবেন।৩০৬৬
৩০৬৬। স্বামীর দারিদ্র্যের কারণে যদি স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বনিবনা না হয়, তাহা হইলে আল্লাহ্‌তা’লাই স্বয়ং তাহাদের রিয্‌কের ব্যবস্থা করিয়া দিবেন। তবে শর্ত এই যে, তাহারা আল্লাহ্‌তা’লাকে ভয় করিয়া চলিবে এবং ধৈর্য ধারণ করতঃ অভাব মোচনের জন্য সততার সহিত রুজি-রোজগারের চেষ্টা চালাইবে।

وَّیَرۡزُقۡہُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَحۡتَسِبُ ؕ وَمَنۡ یَّتَوَکَّلۡ عَلَی اللّٰہِ فَہُوَ حَسۡبُہٗ ؕ اِنَّ اللّٰہَ بَالِغُ اَمۡرِہٖ ؕ قَدۡ جَعَلَ اللّٰہُ لِکُلِّ شَیۡءٍ قَدۡرًا ﴿۴﴾

৪
এবং তিনি তাহাকে এমন দিক হইতে রিয্‌ক দিবেন যাহা সে কল্পনাও করিতে পারে না। এবং যে আল্লাহ্‌র উপর নির্ভর করে, তিনি তাহার জন্য যথেষ্ট। নিশ্চয় আল্লাহ্ নিজ উদ্দেশ্যকে পূর্ণ করিয়া থাকেন। আল্লাহ্‌ প্রত্যেক বিষয়ের পরিমাণ অবশ্যই নির্ধারিত করিয়া রাখিয়াছেন।

وَالّٰٓئِیۡ یَئِسۡنَ مِنَ الۡمَحِیۡضِ مِنۡ نِّسَآئِکُمۡ اِنِ ارۡتَبۡتُمۡ فَعِدَّتُہُنَّ ثَلٰثَۃُ اَشۡہُرٍ ۙ وَّالّٰٓئِیۡ لَمۡ یَحِضۡنَ ؕ وَاُولَاتُ الۡاَحۡمَالِ اَجَلُہُنَّ اَنۡ یَّضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یَجۡعَلۡ لَّہٗ مِنۡ اَمۡرِہٖ یُسۡرًا ﴿۵﴾

৫
এবং তোমাদের স্ত্রীগণ হইতে যাহারা ঋতুস্রাব সম্বন্ধে নিরাশ হইয়া গিয়াছে, যদি (তাহাদের ইদ্দত সম্বন্ধে) তোমরা সন্দেহ কর,৩০৬৭ তাহা হইলে তাহাদের ইদ্দত কাল হইল তিন মাস এবং যাহারা ঋতুবতী হয় নাই তাহাদের জন্যও (এই ইদ্দতই)। এবং গর্ভবতী স্ত্রীলোকের ইদ্দত কাল হইল সন্তান প্রসব হওয়া পর্যন্ত। এবং যে আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন করে, তিনি তাহার জন্য তাহার বিষয়কে সহজ সাধ্য করিয়া দেন।
৩০৬৭। ‘যদি তোমরা সন্দেহ কর’ কথাগুলি এই জন্য বলা হইয়াছে যে, জরায়ুর গোলযোগের কারণেও মাসিক স্রাব বন্ধ হইতে পারে, অন্য কারণেও হইতে পারে।

ذٰلِکَ اَمۡرُ اللّٰہِ اَنۡزَلَہٗۤ اِلَیۡکُمۡ ؕ وَمَنۡ یَّتَّقِ اللّٰہَ یُکَفِّرۡ عَنۡہُ سَیِّاٰتِہٖ وَیُعۡظِمۡ لَہٗۤ اَجۡرًا ﴿۶﴾

৬
ইহাই আল্লাহ্‌র আদেশ যাহা তিনি তোমাদের প্রতি নাযেল করিয়াছেন। এবং যে আল্লাহ্‌র তাক্‌ওয়া অবলম্বন করে৩০৬৮ তিনি তাহার নিকট হইতে তাহার (কৃত-কর্মের) সকল অনিষ্টকে দূরীভূত করিয়া দেন এবং তাহার পুরস্কারকে বর্দ্ধিত করিয়া দেন।
৩০৬৮। পূর্ববর্তী পাঁচটি আয়াতে,মো’মেনগণকে বার বার খোদা-ভীতির নির্দেশ দেওয়া হইয়াছে। ইহাতে বুঝা যায়, বিবাহ-বিচ্ছেদের ক্ষেত্রে, পুরুষেরা সাধারণতঃ তাহাদের পরিত্যক্তা স্ত্রীর প্রতি অন্যায় আচরণ করিতে প্রলুদ্ধ হয় এবং তাহার ন্যায্য প্রাপ্য হইতে তাহাকে বঞ্চিত করার প্রয়াস পায়।

اَسۡکِنُوۡہُنَّ مِنۡ حَیۡثُ سَکَنۡتُمۡ مِّنۡ وُّجۡدِکُمۡ وَلَا تُضَآرُّوۡہُنَّ لِتُضَیِّقُوۡا عَلَیۡہِنَّ ؕ وَاِنۡ کُنَّ اُولَاتِ حَمۡلٍ فَاَنۡفِقُوۡا عَلَیۡہِنَّ حَتّٰی یَضَعۡنَ حَمۡلَہُنَّ ۚ فَاِنۡ اَرۡضَعۡنَ لَکُمۡ فَاٰتُوۡہُنَّ اُجُوۡرَہُنَّ ۚ وَاۡتَمِرُوۡا بَیۡنَکُمۡ بِمَعۡرُوۡفٍ ۚ وَاِنۡ تَعَاسَرۡتُمۡ فَسَتُرۡضِعُ لَہٗۤ اُخۡرٰی ؕ﴿۷﴾

৭
তোমরা তাহাদিগকে (তালাকপ্রাপ্তা স্ত্রীদিগকে) সেইখানে বাস করিতে দিও যেখানে তোমরা নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী বসবাস করিয়া থাক৩০৬৮-ক এবং তোমরা তাহাদিগকে কষ্ট দিও না যাহাতে তোমরা তাহাদের জন্য সংকট সৃষ্টি কর (এবং ঘর ছাড়িতে বাধ্য কর)। এবং যদি তাহারা গর্ভবতী হয় তাহা হইলে তাহাদের জন্য খরচ বহন কর যতক্ষণ পর্যন্ত না তাহারা তাহাদের সন্তান প্রসব করে। অতঃপর যদি তাহারা তোমাদের জন্য (শিশুগণকে) স্তন্য পান করায় তাহা হইলে তাহাদিগকে তাহাদের পারিশ্রমিক দাও, এবং পরস্পরের মধ্যে ন্যায়সংগতভাবে পরামর্শ (করিয়া স্থির) কর; এবং যদি তোমরা পরস্পর অসুবিধার সম্মুখীন হও তাহা হইলে তাহাকে (শিশুকে পিতার পক্ষ হইতে) অন্য স্ত্রীলোক স্তন্য পান করাইবে।
৩০৬৮-ক। ‘ইদ্দৎ-কালে’ পরিত্যক্তা স্ত্রীকে ভরণ-পোষণ ও দেখা-শোনা করার ভার স্বামীর উপরই বর্তায়, তাহাকে সেইভাবেই দেখা শোনা করিতে হইবে, যেভাবে গৃহকত্রী থাকাকালীন সময়ে তাহার দেখাশোনা করা হইয়াছে। স্বামীর গৃহ ত্যাগ করিয়া নিজের নির্বাচিত মুক্ত জীবন-যাপনের পূর্ব পর্যন্ত, স্বামীকে তাহার পরিত্যক্তা স্ত্রীর সর্বপ্রকার দেখা-শোনার ভার বহন করিতে হইবে।

لِیُنۡفِقۡ ذُوۡ سَعَۃٍ مِّنۡ سَعَتِہٖ ؕ وَمَنۡ قُدِرَ عَلَیۡہِ رِزۡقُہٗ فَلۡیُنۡفِقۡ مِمَّاۤ اٰتٰٮہُ اللّٰہُ ؕ لَا یُکَلِّفُ اللّٰہُ نَفۡسًا اِلَّا مَاۤ اٰتٰٮہَا ؕ سَیَجۡعَلُ اللّٰہُ بَعۡدَ عُسۡرٍ یُّسۡرًا ﴿٪۸﴾

৮
স্বচ্ছল ব্যক্তি নিজ স্বচ্ছলতা অনুযায়ী (স্তন্য-দায়িণীকে) খরচ দিবে। এবং যাহার উপর তাহার রিয্‌ক সংকীর্ণ করা হইয়াছে সে উহা হইতে খরচ করিবে যাহা আল্লাহ্‌ তাহাকে দিয়াছেন। আল্লাহ্ কাহাকেও তাহার সেই সামর্থ্য ব্যতিরেকে বোঝা অর্পণ করেন না যাহা তিনি তাহাকে দান করিয়াছেন। অচিরেই আল্লাহ্‌ তাহাকে অস্বচ্ছলতার পর স্বচ্ছলতা দান করিবেন।
সূরা আত্‌ তালাক - রুকু ১

وَکَاَیِّنۡ مِّنۡ قَرۡیَۃٍ عَتَتۡ عَنۡ اَمۡرِ رَبِّہَا وَرُسُلِہٖ فَحَاسَبۡنٰہَا حِسَابًا شَدِیۡدًا ۙ وَّعَذَّبۡنٰہَا عَذَابًا نُّکۡرًا ﴿۹﴾

৯
এবং কত জনপদই না তাহাদের প্রতিপালকের৩০৬৯ এবং তাঁহার রসূলগণের আদেশ অমান্য করিয়াছিল, ফলে আমরা তাহাদের হিসাব গ্রহণ করিয়াছিলাম—কঠোর হিসাব এবং তাহাদিগকে আযাব দিয়াছিলাম—নিকৃষ্টতর আযাব।
৩০৬৯। পূর্ববর্তী আয়াতগুলিতে বিবাহ-বিচ্ছেদের বিষয়ে আলোচনার পর, এই আয়াতে আসিয়া আল্লাহ্ নির্দেশ অমান্যকারীগণের কথা উত্থাপন করিয়াছেন। কেননা, যাহারা আল্লাহ্‌র নির্দেশ অমান্য করে, তাহারা আল্লাহ্‌র অনুগ্রহরাজির সাথে নিজেদের বিচ্ছেদ ঘটাইয়া থাকে।

فَذَاقَتۡ وَبَالَ اَمۡرِہَا وَکَانَ عَاقِبَۃُ اَمۡرِہَا خُسۡرًا ﴿۱۰﴾

১০
সুতরাং উহারা উহাদের কৃত-কর্মের সমুচিত৩০৭০ শাস্তি ভোগ করিয়াছিল এবং উহাদের কর্মের পরিণাম ক্ষতিকরই হইয়াছিল।
৩০৭০। ‘ওবাল’ অর্থ ক্ষত, পাপ, পাপের শাস্তি। ‘ওয়াবিল’ অর্থ বিপজ্জনক, মারাত্মক, হিংস্র।