৬৪

التغابن

সূরা আত্‌ তাগাবুন

At-Taghabun

মাদানী ১৯ আয়াত ২ রুকু পারা ২৮

ইহা মদীনায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ১৯ আয়াত এবং ২ রুকু আছে।

بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾

১
আল্লাহ্‌র নামে, যিনি অযাচিত-অসীম দাতা, পরম দয়াময়।

یُسَبِّحُ لِلّٰہِ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ۚ لَہُ الۡمُلۡکُ وَلَہُ الۡحَمۡدُ ۫ وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿۲﴾

২
আকাশসমূহে যাহা কিছু আছে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে, সকলেই আল্লাহ্‌র তসবীহ্‌ (পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা) করিতেছে৩০৫৫ তাঁহারই জন্য আধিপত্য এবং তাঁহারই জন্য সকল প্রশংসা এবং তিনিই সকল বিষয়ে সর্বশক্তিমান।
৩০৫৫। সৃষ্ট-জীব বা সৃষ্ট-বস্তু নিয়মিতভাবে ও সময়মত নিজ নিজ কাজ সম্পাদন করিয়া, নিজেদের সৃষ্টির উদ্দেশ্য পূর্ণ করিতেছে এবং উহার মাধ্যমে ঘোষণা করিতেছে যে, সৃষ্টিকর্তা সকল ক্রুটি-বিচুতি হইতে সম্পূর্ণরূপে মুক্ত। অপূর্ণতা ও অসম্পূর্ণতা কিংবা অপবিত্রতা তাঁহাকে স্পর্শ করিতে পারে না। তিনিই স্রষ্টা, প্রভু ও সর্ব নিয়ন্তা। প্রকৃতপক্ষে, তসবীহ’র তাৎপর্য ইহাই।

ہُوَ الَّذِیۡ خَلَقَکُمۡ فَمِنۡکُمۡ کَافِرٌ وَّمِنۡکُمۡ مُّؤۡمِنٌ ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ بَصِیۡرٌ ﴿۳﴾

৩
তিনিই তোমাদিগকে সৃষ্টি করিয়াছেন, কিন্তু তোমাদের মধ্যে কেহ কাফের এবং তোমাদের মধ্যে কেহ মো’মেন।৩০৫৬ এবং তোমরা যে কর্মই কর আল্লাহ্‌ উহার সম্যক দ্রষ্টা।
৩০৫৬। আল্লাহ্‌তা’লা মানুষকে মহান স্বাভাবিক-শক্তিসমূহ দ্বারা ভূষিত করিয়াছেন। নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উন্নতির সকল উপাদান ও সুযোগ-সুবিধা মানুষকে দিয়াছেন। কিন্তু মানুষের মাঝে একাংশ আছে, যাহারা ঐসব প্রদত্ত শক্তি, উপাদান ও সুযোগ-সুবিধার সদ্ব্যবহার না করিয়া, আল্লাহ্‌র অনুগ্রহরাজিকে প্রকারান্তরে অস্বীকার করে, অপরাংশ ঐগুলিকে নিজের ও অপরের উপকারের জন্য কাজে লাগায় এবং আল্লাহ্‌র সন্তুষ্টি অর্জন করে। কাফের ও মো’মেন শব্দদ্বয়ের তাৎপর্য ইহাই।

خَلَقَ السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضَ بِالۡحَقِّ وَصَوَّرَکُمۡ فَاَحۡسَنَ صُوَرَکُمۡ ۚ وَاِلَیۡہِ الۡمَصِیۡرُ ﴿۴﴾

৪
তিনি আকাশসমূহ এবং পৃথিবীকে যথার্থরূপে সৃষ্টি করিয়াছেন, এবং তিনি তোমাদিগকে আকৃতি দিয়াছেন, এবং তোমাদের আকৃতিকে পরম সুন্দর করিয়াছেন, এবং তাঁহারই দিকে তোমাদের প্রত্যাবর্তন।৩০৫৭
৩০৫৭। এই বিশ্ব-জগত কতকগুলি নিদ্ধারিত প্রাকৃতিক নিয়ম-কানুনের দ্বারা পরিচালিত ও নিয়ন্ত্রিত। মানুষ শুধু অদৃষ্টের বা দৈবের শিকার নহে। অপর পক্ষে, মানুষকে এমন শক্তিনিচয় ও গুণাবলী দ্বারা বিভূষিত করা হইয়াছে, যাহার সদ্ব্যবহার দ্বারা সে নিজেকে এই পৃথিবীতেই আল্লাহ্‌র প্রতিনিধির মহান মর্যাদায় অভিষিক্ত বলিয়া প্রমাণ করিতে পারে। কাজেই মানুষকে তাঁহার আপন আপন কাজ-কর্মের জন্য আল্লাহ্‌র কাছে হিসাব দিতে হইবে।

یَعۡلَمُ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَالۡاَرۡضِ وَیَعۡلَمُ مَا تُسِرُّوۡنَ وَمَا تُعۡلِنُوۡنَ ؕ وَاللّٰہُ عَلِیۡمٌۢ بِذَاتِ الصُّدُوۡرِ ﴿۵﴾

৫
আকাশসমূহে এবং পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে তিনি সবই পরিজ্ঞাত আছেন এবং তোমরা যাহা কিছু গোপন কর এবং যাহা কিছু প্রকাশ কর৩০৫৮ সবই তিনি জানেন এবং বক্ষেঃ যাহা কিছু নিহিত আছে উহাও তিনি সবিশেষ অবগত আছেন।
৩০৫৮। আল্লাহ্‌তা’লা বিশ্ব-জগতের সৃষ্টিকর্তা ও নিয়ন্ত্রক, তাঁহার কাছে কিছুই গুপ্ত-লুপ্ত থাকিতে পারে না অথবা কোন কিছুই তাঁহার দৃষ্টি বা জ্ঞানের বাইরে থাকিতে পারে না। অতএব মানুষের পক্ষে এইরূপ চিন্তা করা একান্তই অবান্তর যে, সে তাহার কৃত-কর্মের ফলাফল এড়াইয়া যাইতে পারিবে।

اَلَمۡ یَاۡتِکُمۡ نَبَؤُا الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا مِنۡ قَبۡلُ ۫ فَذَاقُوۡا وَبَالَ اَمۡرِہِمۡ وَلَہُمۡ عَذَابٌ اَلِیۡمٌ ﴿۶﴾

৬
যাহারা ইতিপূর্বে অস্বীকার করিয়াছিল তাহাদের খবর তোমাদের নিকট আসে নাই কি? তাহারা তাহাদের কর্মের প্রতিফল আস্বাদন করিয়াছে এবং তাহাদের জন্য (অবধারিত) আছে যন্ত্রণাদায়ক আযাব।

ذٰلِکَ بِاَنَّہٗ کَانَتۡ تَّاۡتِیۡہِمۡ رُسُلُہُمۡ بِالۡبَیِّنٰتِ فَقَالُوۡۤا اَبَشَرٌ یَّہۡدُوۡنَنَا ۫ فَکَفَرُوۡا وَتَوَلَّوۡا وَّاسۡتَغۡنَی اللّٰہُ ؕ وَاللّٰہُ غَنِیٌّ حَمِیۡدٌ ﴿۷﴾

৭
ইহা এই জন্য যে, তাহাদের নিকট তাহাদের রসূলগণ উজ্জ্বল প্রমাণাদিসহ আগমন করিত, কিন্তু তাহারা বলিত, ‘(মরণশীল) মানুষ কি আমাদিগকে হেদায়াত দিবে?’ সুতরাং তাহারা অস্বীকার করিত এবং মুখ ফিরাইয়া লইত, ফলে আল্লাহ্ও (তাহাদিগকে) উপেক্ষা করিলেন; বস্তুতঃ আল্লাহ্‌ স্বয়ং সম্পূর্ণ, প্রশংসাভাজন।

زَعَمَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡۤا اَنۡ لَّنۡ یُّبۡعَثُوۡا ؕ قُلۡ بَلٰی وَرَبِّیۡ لَتُبۡعَثُنَّ ثُمَّ لَتُنَبَّؤُنَّ بِمَا عَمِلۡتُمۡ ؕ وَذٰلِکَ عَلَی اللّٰہِ یَسِیۡرٌ ﴿۸﴾

৮
যাহারা অস্বীকার করিয়াছে তাহারা ধারণা৩০৫৯ করে যে, তাহারা কখনও পুনরুত্থিত হইবে না।৩০৫৯-ক তুমি বল, ‘হাঁ আমার প্রতিপালকের কসম, নিশ্চয় তোমরা পুনরুত্থিত হইবে; অতঃপর নিশ্চয় তোমাদিগকে তোমাদের কৃত-কর্ম সম্বন্ধে অবহিত করা হইবে, এবং ইহা আল্লাহ্‌র পক্ষে অতি সহজ।’
৩০৫৯। ‘যাআমা’ অর্থ সে ভাবিল, সে দাবী করিল, বিশ্বাস করিল, দৃঢ়তার সহিত বলিল (লেইন)।
৩০৫৯-ক। মানুষ কি করিয়া ভাবে যে, তাহার কোন পরজীবন নাই। সে কি করিয়া মনে করে যে, তাহাকে অনর্থক এতগুলি স্বাভাবিক শক্তি, এতসব গুণাবলী ও মহান প্রবণতা দ্বারা বিভূষিত করা হইয়াছে? সে কেমন করিয়া কল্পনা করে যে, তাহার কার্যকলাপের দায়-দায়িত্ব বহন না করিয়াই সে রক্ষা পাইয়া যাইবে? এরূপ কল্পনা করিয়া থাকিলে, সে মহা ভ্রমে নিপতিত হইয়াছে। ইহকালের মৃত্যুর পরে নিশ্চয়ই জীবন রহিয়াছে, যেখানে ‘নিশ্চয় তোমাদিগকে তোমাদের কৃত-কর্ম সম্বন্ধে অবহিত করা হইবে।’

فَاٰمِنُوۡا بِاللّٰہِ وَرَسُوۡلِہٖ وَالنُّوۡرِ الَّذِیۡۤ اَنۡزَلۡنَا ؕ وَاللّٰہُ بِمَا تَعۡمَلُوۡنَ خَبِیۡرٌ ﴿۹﴾

৯
সুতরাং তোমরা ঈমান আন আল্লাহ্‌র উপর এবং তাঁহার রসূলের উপর এবং সেই নূরের৩০৬০ উপর যাহা আমরা নাযেল করিয়াছি এবং আল্লাহ্ তোমাদের কর্ম সম্বন্ধে, যাহা তোমরা কর, সবিশেষ অবগত আছেন।
৩০৬০। ঐশী-বাণীর আলো, প্রজ্ঞা ও বুদ্ধির দীপ্তি, আধ্যাত্মিক জ্যোতিঃ,অন্তর্দৃষ্টির তেজ, ঐশী-জ্ঞান-প্রদীপ এবং দূরদর্শিতা ও সূক্ষ্মদর্শিতার আলোক ইত্যাদি যে সকল বিশেষ গুণে নবী করীম (সাঃ) গুণান্বিত ছিলেন, উহাদের সমাবেশকে নূর (আলো) বলা হইয়াছে।

یَوۡمَ یَجۡمَعُکُمۡ لِیَوۡمِ الۡجَمۡعِ ذٰلِکَ یَوۡمُ التَّغَابُنِ ؕ وَمَنۡ یُّؤۡمِنۡۢ بِاللّٰہِ وَیَعۡمَلۡ صَالِحًا یُّکَفِّرۡ عَنۡہُ سَیِّاٰتِہٖ وَیُدۡخِلۡہُ جَنّٰتٍ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ خٰلِدِیۡنَ فِیۡہَاۤ اَبَدًا ؕ ذٰلِکَ الۡفَوۡزُ الۡعَظِیۡمُ ﴿۱۰﴾

১০
যেদিন তিনি তোমাদিগকে সমাবেশ-দিবসের জন্য সমবেত করিবেন উহা হইবে লাভ-লোকসানের দিন।৩০৬১ এবং যে আল্লাহ্‌র উপর ঈমান আনে এবং সৎকর্ম করে, তিনি তাহার সকল (কৃত-কর্মের) অনিষ্টকে তাহার নিকট হইতে দূরীভূত করিয়া দিবেন এবং তাহাকে এমন জান্নাতসমূহে প্রবিষ্ট করিবেন যাহাদের তলদেশ দিয়া নহরসমূহ প্রবাহিত থাকিবে, তাহারা তথায় সদা বসবাস করিবে। ইহাই হইবে পরম সফলতা।
৩০৬১। ‘ইয়াওমুত্তাগাবুন’-এর বিভিন্ন অর্থ করা হইয়াছে যেমনঃ (১) লাভ-লোকসানের দিন, যেদিন মো’মেনগণ তাহাদের কি লাভ হইয়াছে তাহা ভালভাবে জানিতে পারিবে এবং কাফেরগণের কি ক্ষতি হইয়াছে তাহাও তাহারা জানিতে পারিবে; (২) ক্ষয়ক্ষতির প্রকাশ-দিবস, ঐ দিন অবিশ্বাসীরা হৃদয়ঙ্গম করিতে পারিবে যে, আল্লাহ্ ও মানবের প্রতি কর্তব্য পালনে তাহাদের কী পরিমাণ ত্রুটি রহিয়াছিল এবং ফলে তাহাদের যে ভীষণ ক্ষতি হইয়াছে, তাহাও তাহারা প্রকাশ্যে দেখিতে পাইবে, (৩) ঐদিন মো’মেনগণ কাফেরদের জ্ঞান-বুদ্ধির অভাব ও প্রজ্ঞাহীনতাকে তাহাদের অস্বীকারের কারণ মনে করিবে, যাহার দরুন তাহারা ঈমানের পরিবর্তে কুফরীকে ভালবাসিয়াছিল (মুফরাদাত)।