الشورى
Ash-Shura
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৫৪ আয়াত এবং ৫ রুকু আছে।
অবর্তীর্ণ হওয়ার সময় ও প্রসংঙ্গ
এই সূরাটিও মক্কায় পূর্ববর্তী সূরার প্রায় কাছাকাছি সময়ে অবতীর্ণ হইয়াছিল। তবে নলডিকি বলিয়াছেন, এই সূরা পূর্ববর্তী সূরার কিছুকাল পরে অবতীর্ণ হইয়াছিল। মারদাওয়াই এবং ইবনে যুবাইর বলিয়াছেন, ইবনে আব্বাস-এর মতে এই সূরা মক্কায় এমনি সময়ে নাযেল হইয়াছিল যখন ইসলামের বিরোধিতা চরমে পৌঁছিয়াছিল এবং মুসলমানগণ একেবারে কোনঠাসা হইয়া পড়িয়াছিলেন। পূর্ববর্তী সূরার শেষাংশে বলা হইয়াছিল, যে ব্যক্তি ঐশী শিক্ষাকে প্রত্যাখ্যান করে, সে নিজের আত্মারই ক্ষতি সাধন করে এবং নিজেই এই প্রত্যাখ্যানের কুফল ভোগ করিয়া থাকে। বর্তমান সূরাটি এই ঘোষণার সহিত আরম্ভ হইয়াছে যে, কুরআন মহাপরাক্রমশালী, পরম প্রজ্ঞাময়, উচ্চ মর্যাদাশালী এবং অতীব মহান আল্লাহ্র তরফ হইতে নাযেল হইয়াছে। অতএব যদি মুহাম্মদ (সাঃ)-এর জাতি ইহাকে প্রত্যাখ্যান করে তাহা হইলে তাহারা ব্যক্তিগত ও জাতিগত শক্তি-সামর্থ্য, জয়-গৌরব, প্রজ্ঞা ও জ্ঞান-বিজ্ঞান এবং মর্যাদা ও মাহাত্ম্য অর্জন হইতে বঞ্চিত হইয়া নিজেদেরই পরম ক্ষতি সাধন করিবে।
বিষয়-বস্তু
কুরআন নাযেলের বিষয় অবলম্বনে সূরাটি আরম্ভ হইয়াছে এবং বলা হইয়াছে যে, মানুষের পাপাচারের সংখ্যা বহু এবং পাপগুলিও গুরুতর। তবে, আল্লাহ্তা’লার ক্ষমাশীলতার পরিধি এসবের চাইতে অনেক বেশী বরং সীমাহীন। তাঁহার করুণার চাহিদা মোতাবেক, মানব-মণ্ডলীকে পাপ হইতে পরিত্রাণের জন্য, তিনি কুরআন অবতীর্ণ করিলেন, কিন্তু মানুষের প্রকৃতি এমনি বিচিত্র যে, সে আল্লাহ্তা’লার এই রহমত হইতে উপকার লাভ না করিয়া নিজের ধ্যান-ধারণার সৃষ্ট প্রতিমার পূজা করিতে লাগিয়া যায়। আল্লাহ্তা’লা তাঁহার রসূল (সাঃ)-কে সান্ত্বনা দিয়া বলিলেন, ‘হে মুহাম্মদ (সাঃ) তোমার ইহাতে দুঃখিত হইবার কিছু নাই, অবিশ্বাসীদের কুকর্মের জন্য তাহাদিগকেই দায়ী করা হইবে। কেননা তুমি তাহাদের উপর নিযুক্ত অবিভাবক নও তোমার কর্তব্য মানুষের কাছে শুধু ঐশী বার্তা পৌঁছাইয়া দেওয়া। বাকীটা আল্লাহ্তা’লার কাজ। অতঃপর সূরাতে বলা হইয়াছে যে, যখনই ধর্মের মৌলিক নীতিমালা নিয়া বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যে প্রবল মতানৈক্য দেখা দেয়, তখন আল্লাহ্তা’লা এই সব মতানৈক্য দূরীভূত করিয়া মানুষকে সঠিক-সত্য পথে আনিবার জন্য তাঁহার প্রেরিত পুরুষের অভূদয় ঘটাইয়া থাকেন। সকল ধর্মের মৌলিক নীতিমালা এক হওয়ার কারণে, প্রেরিত পুরুষগণ একই ধর্ম অনুসরণ করিয়াছেন। এই মৌলিক নীতিটি হইলঃ একমাত্র সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ্র কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ। এই ধর্মেরই পরিপূর্ণ বিকাশ ও পূর্ণতম প্রকাশ ঘটিয়াছে কুরআনের অবতীর্ণ ঐশী বাণীর মধ্যে। আর এই জন্য এই পরিপূর্ণতাপ্রাপ্ত ইলাহী ধর্মের অনুসরণকে বিশ্বের সর্বমানবের কাছে পৌঁছাইয়া দিবার জন্য মহানবী (সাঃ)-এর প্রতি আল্লাহ্তা’লার নির্দেশ আসিল। তাঁহাকে বলা হইল, অত্যাচার-অনাচার, বাধা-বিঘ্ন এবং বিরূপ প্রতিক্রিয়া কোন কিছুকেই যেন তাঁহার উপর অর্পিত দায়িত্ব পালনের পথে তিনি অন্তরায় মনে না করেন। সূরাতে বলা হইয়াছে যে, কুরআনে অবতীর্ণ আদেশ ও নিষেধাজ্ঞা পালনের নামই সৎকর্ম এবং এইগুলির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের নাম হইল অসৎকর্ম। জাতি এবং ব্যক্তির ভাগ্য নির্ণীত হয় তাহাদের সৎ-অসৎ কর্ম দ্বারা। এই কর্মের সৎ-অসৎ গুণাগুণই ভবিষ্যতের সৌভাগ্য ও দুর্ভাগ্য গঠন করিয়া থাকে। মানুষের জীবনে এমন একদিন আসে, যখন তাহার কার্যাবলীকে নিক্তি দ্বারা ওজন করা হয়। যদি তাহাদের ভাল কার্যাবলীর ওজন মন্দ কার্যাবলীর ওজন হইতে বেশী হয় তাহা হইলে এক আশীষপূর্ণ সুখী জীবন তাহাদের ভাগ্যে জুটিয়া যায়। অপরপক্ষে যাহাদের মন্দ কার্যাবলীর ওজন তাহাদের সৎকর্মের ওজনকে ডিঙ্গাইয়া যায়, তাহা হইলে তাহাদের জীবনে নামিয়া আসে অনুতাপ, দুর্ভোগ ও দীর্ঘশ্বাস। অতঃপর এই সূরাতে বলা হইয়াছে যে, নবী করীম (সাঃ) কঠোর সাধনা ও পরিশ্রম করিয়াছেন এবং অসহনীয় যাতনাও ভোগ করিয়াছেন— নিজের জন্য নয় বরং মানবের মঙ্গলের জন্য। দয়া-মায়া, প্রেম-প্রীতি, ভালবাসা ও হিতৈষণা দ্বারা তাহার কোমল হৃদয় ভরপুর ছিল। তাহার একনিষ্ঠ চিন্তা ও ধ্যান ইহাই ছিল যে, মানুষ আল্লাহ্তা’লার সহিত সত্যিকার প্রেমময় সম্পর্ক স্থাপন করুক। এমন অকপট, সাধু-মানব হিতৈষী কি কখনও আল্লাহ্ সম্বন্ধে মিথ্যা বলিতে পারেন? তথাপি তাঁহার জাতি তাঁহাকে মহাপাপে পাপী বলিতে দ্বিধা বোধ করে না। এই সাধারণ কথাটা তাহারা কেন বুঝিতে পারে না যে, আল্লাহ্ সম্বন্ধে কিছু মিথ্যা বানাওট কথা বলা বা আরোপ করা এমনই মারাত্মক বিষ যাহা ঐ মিথ্যা আরোপকারীকে সমূলে ধ্বংস করিয়া ফেলে। অথচ, ধ্বংস হওয়াতো দূরের কথা, মহানবী (সাঃ)-এর মহতী প্রচেষ্টা সুফল দান করিতেছে এবং তাঁহার উদ্দেশ্য ক্রমাগতভাবে দ্রুতবেগে উন্নতি সাধন করিতেছে। তারপর উপমা স্বরূপ বলা হইতেছে, প্রাকৃতিক জগতে আমরা দেখিতে পাই যে, তৃষ্ণার্ত পৃথিবী যখন পানির প্রয়োজন বোধ করে, তখন আল্লাহ্তা’লা মেঘমালা হইতে রষ্টি প্রেরণ করেন। ঠিক অনুরূপভাবে, আধ্যাত্মিক জগত যখন শুষ্ক হইয়া গেল, তখন আল্লাহ্তা’লা কুরআনের আকারে বারিধারা বর্ষণ করিলেন। অতঃপর, ইসলামী রাষ্ট্র-পরিচালনা ও অন্যান্য রাষ্ট্রীয় কাজ-কর্ম ইত্যাদি পরামর্শ সভার মাধ্যমে সম্পাদন করার নীতি অবলম্বনের উপদেশ দিয়া, এই সূরাতেই অপরাধ ও দণ্ডবিধির ভিত্তি ও রূপরেখা কিরূপ হইবে তাহা বলা হইয়াছে। এই রূপরেখা অনুসারে, শাস্তি প্রদানের আসল উদ্দেশ্য হইল অপরাধী ব্যক্তির নৈতিক সংশোধন সাধন। “একগালে চড় দিলে, অন্য গালও পাতিয়া দাও” খৃষ্টানদের এইরূপ ঢালাও শিক্ষা কিংবা “চক্ষুর বদলে চক্ষু, আর দাঁতের বদলে দাঁত” ইহুদীদের এই মতবাদ— এর কোনটিরই ইসলামে স্থান নাই। ইসলামের দৃষ্টিতে অবস্থানুযায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে যাহাতে সংশোধন সাধন হয়। সূরার শেষ পর্যায়ে বলা হইয়াছে, মহানবী (সাঃ) তাঁহার যাবতীয় কর্তব্য সম্পাদন করিয়াছেন। তিনি একজন সতর্ককারী হিসাবে সতর্ককরণের দায়িত্ব পূর্ণভাবে পালন করিয়াছেন। তিনি তাহাদের রক্ষণাবেক্ষণকারী নহেন। তিনিই জীবন এবং তিনিই আলো। তাঁহার পথই একমাত্র পথ যাহা মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সাধনের দিকে মানুষকে পরিচালিত করে। সর্বশেষে, আল্লাহ্র অবতীর্ণ বাণীর তিনটি প্রকার-পদ্ধতি উল্লেখ করিয়া সূরাটি সমাপ্ত হইয়াছে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
حٰمٓ ۚ﴿۲﴾
عٓسٓقٓ ﴿۳﴾
کَذٰلِکَ یُوۡحِیۡۤ اِلَیۡکَ وَاِلَی الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِکَ ۙ اللّٰہُ الۡعَزِیۡزُ الۡحَکِیۡمُ ﴿۴﴾
لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ ؕ وَہُوَ الۡعَلِیُّ الۡعَظِیۡمُ ﴿۵﴾
تَکَادُ السَّمٰوٰتُ یَتَفَطَّرۡنَ مِنۡ فَوۡقِہِنَّ وَالۡمَلٰٓئِکَۃُ یُسَبِّحُوۡنَ بِحَمۡدِ رَبِّہِمۡ وَیَسۡتَغۡفِرُوۡنَ لِمَنۡ فِی الۡاَرۡضِ ؕ اَلَاۤ اِنَّ اللّٰہَ ہُوَ الۡغَفُوۡرُ الرَّحِیۡمُ ﴿۶﴾
وَالَّذِیۡنَ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ اللّٰہُ حَفِیۡظٌ عَلَیۡہِمۡ ۫ۖ وَمَاۤ اَنۡتَ عَلَیۡہِمۡ بِوَکِیۡلٍ ﴿۷﴾
وَکَذٰلِکَ اَوۡحَیۡنَاۤ اِلَیۡکَ قُرۡاٰنًا عَرَبِیًّا لِّتُنۡذِرَ اُمَّ الۡقُرٰی وَمَنۡ حَوۡلَہَا وَتُنۡذِرَ یَوۡمَ الۡجَمۡعِ لَا رَیۡبَ فِیۡہِ ؕ فَرِیۡقٌ فِی الۡجَنَّۃِ وَفَرِیۡقٌ فِی السَّعِیۡرِ ﴿۸﴾
وَلَوۡ شَآءَ اللّٰہُ لَجَعَلَہُمۡ اُمَّۃً وَّاحِدَۃً وَّلٰکِنۡ یُّدۡخِلُ مَنۡ یَّشَآءُ فِیۡ رَحۡمَتِہٖ ؕ وَالظّٰلِمُوۡنَ مَا لَہُمۡ مِّنۡ وَّلِیٍّ وَّلَا نَصِیۡرٍ ﴿۹﴾
اَمِ اتَّخَذُوۡا مِنۡ دُوۡنِہٖۤ اَوۡلِیَآءَ ۚ فَاللّٰہُ ہُوَ الۡوَلِیُّ وَہُوَ یُحۡیِ الۡمَوۡتٰی ۫ وَہُوَ عَلٰی کُلِّ شَیۡءٍ قَدِیۡرٌ ﴿٪۱۰﴾