৩৯

الزمر

সূরা আয্‌ যুমার

Az-Zumar

মক্কী ৭৬ আয়াত ৮ রুকু পারা ২৩–২৪

ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্‌সহ ইহাতে ৭৬ আয়াত এবং ৮ রুকু আছে।

لٰکِنِ الَّذِیۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّہُمۡ لَہُمۡ غُرَفٌ مِّنۡ فَوۡقِہَا غُرَفٌ مَّبۡنِیَّۃٌ ۙ تَجۡرِیۡ مِنۡ تَحۡتِہَا الۡاَنۡہٰرُ ۬ؕ وَعۡدَ اللّٰہِ ؕ لَا یُخۡلِفُ اللّٰہُ الۡمِیۡعَادَ ﴿۲۱﴾

২১
কিন্তু যাহারা নিজেদের প্রতিপালকের তাক্‌ওয়া অবলম্বন করে তাহাদের জন্য অবধারিত আছে বহু তল বিশিষ্ট বালাখানা, যাহার উপর আরও বালাখানা নির্মিত থাকিবে,২৫৭০ যাহাদের তলদেশ দিয়া নহরসমূহ প্রবাহিত থাকিবে। ইহা আল্লাহ্‌র প্রতিশ্রুতি, আল্লাহ্ প্রতিশ্রুতি ভংগ করেন না।
২৫৭০। বেহেশ্‌তে মো’মেনগণের মধ্যে মর্যাদার তারতম্য হইবে। ইহাতে বুঝা যায়, সেখানে তাহাদের কাজ-কর্ম ও প্রচেষ্টার মাঝেও তারতম্য হইবে। অতএব পরজগৎ অলস ও কর্মহীন হইবে না, বরং বিরামহীন কর্ম ও ক্রমোন্নতির ক্ষেত্র হইবে।

اَلَمۡ تَرَ اَنَّ اللّٰہَ اَنۡزَلَ مِنَ السَّمَآءِ مَآءً فَسَلَکَہٗ یَنَابِیۡعَ فِی الۡاَرۡضِ ثُمَّ یُخۡرِجُ بِہٖ زَرۡعًا مُّخۡتَلِفًا اَلۡوَانُہٗ ثُمَّ یَہِیۡجُ فَتَرٰٮہُ مُصۡفَرًّا ثُمَّ یَجۡعَلُہٗ حُطَامًا ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَذِکۡرٰی لِاُولِی الۡاَلۡبَابِ ﴿٪۲۲﴾

২২
তুমি কি দেখ নাই যে, আল্লাহ্ আকাশ হইতে বারি বর্ষণ করেন, ফলে উহাকে ভূপৃষ্ঠে প্রস্রবণের আকারে প্রবাহিত করেন; অতঃপর তিনি তদ্বারা ফসল উৎপন্ন করেন যাহার বর্ণ ভিন্ন ভিন্ন? অতঃপর উহা যখন পাকিয়া শুকাইয়া যায় তখন তুমি উহাকে হলুদবর্ণ দেখিতে পাও, যাহার পর তিনি উহাকে চূর্ণ বিচূর্ণ খড়কুটায় পরিণত করেন। নিশ্চয় ইহাতে বুদ্ধিমান লোকদের জন্য স্মরণীয় উপদেশ রহিয়াছে।
সূরা আয্‌ যুমার - রুকু ২

اَفَمَنۡ شَرَحَ اللّٰہُ صَدۡرَہٗ لِلۡاِسۡلَامِ فَہُوَ عَلٰی نُوۡرٍ مِّنۡ رَّبِّہٖ ؕ فَوَیۡلٌ لِّلۡقٰسِیَۃِ قُلُوۡبُہُمۡ مِّنۡ ذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ اُولٰٓئِکَ فِیۡ ضَلٰلٍ مُّبِیۡنٍ ﴿۲۳﴾

২৩
তবে যাহার বক্ষঃকে আল্লাহ্‌ ইসলামের জন্য উন্মুক্ত করিয়াছেন এবং যে তাহার প্রতিপালকের নিকট হইতে (সমাগত) জ্যোতির২৫৭১ উপর প্রতিষ্ঠিত আছে সে কি (ঐ ব্যক্তির সমান হইতে পারে যে এইরূপ নহে)? সুতরাং তাহাদের জন্য দুর্ভোগ যাহাদের হৃদয় আল্লাহ্‌র স্মরণে কঠোর! উহারাই প্রকাশ্য ভ্রান্তির মধ্যে আছে।
২৫৭১। ইসলামের শিক্ষা এত সুগভীর ও বিস্তৃত যে, ইহা মানুষের হৃদয়কে বিশাল-বিস্তৃত করিয়া জ্ঞান ও প্রজ্ঞার আলোকে ভরপুর করিয়া দেয়, তখন আলোর ঝর্ণাধারা মানুষের মন হইতে উপ্‌চাইয়া পড়ে।

اَللّٰہُ نَزَّلَ اَحۡسَنَ الۡحَدِیۡثِ کِتٰبًا مُّتَشَابِہًا مَّثَانِیَ ٭ۖ تَقۡشَعِرُّ مِنۡہُ جُلُوۡدُ الَّذِیۡنَ یَخۡشَوۡنَ رَبَّہُمۡ ۚ ثُمَّ تَلِیۡنُ جُلُوۡدُہُمۡ وَقُلُوۡبُہُمۡ اِلٰی ذِکۡرِ اللّٰہِ ؕ ذٰلِکَ ہُدَی اللّٰہِ یَہۡدِیۡ بِہٖ مَنۡ یَّشَآءُ ؕ وَمَنۡ یُّضۡلِلِ اللّٰہُ فَمَا لَہٗ مِنۡ ہَادٍ ﴿۲۴﴾

২৪
আল্লাহ্ কিতাবরূপে সর্বোত্তম বাণী নাযেল করিয়াছেন, যাহা পরস্পর সাদৃশ্যপূর্ণ, পুনঃপুনঃ পঠনীয়।২৫৭২ ইহার (পাঠের) কারণে তাহাদের গাত্র রোমাঞ্চিত হইয়া উঠে যাহারা তাহাদের প্রতিপালককে ভয় করে, তৎপর তাহাদের দেহ ও তাহাদের মন আল্লাহ্‌র স্মরণে নরম হইয়া পড়ে। ইহা আল্লাহ্‌র হেদায়াত, ইহার দ্বারা তিনি যাহাকে চাহেন হেদায়াত দেন। এবং যাহাকে আল্লাহ্ বিভ্রান্ত সাব্যস্ত করেন তাহার জন্য কেহই হেদায়াতদাতা নাই।
২৫৭২। জ্ঞান ও প্রকাশের দিক হইতে দেখিলে, আল্লাহ্‌র বাণী সর্বাপেক্ষা পূর্ণতা লাভ করিয়াছে কুরআনে। এই আয়াতে কুরআনকে ‘কিতাবাম্ মুতাশাবিহান’ বলা হইয়াছে। ইহার অর্থ এই যে, এই গ্রন্থের বাণীগুলিকে পরস্পর সামঞ্জস্যশীল ও পরস্পর নির্ভরশীল বহু অর্থে গ্রহণ করা যায়। কুরআনের কোথায়ও স্ব-বিরোধ নাই, বৈপরিত্য নাই। ইহা কুরআনের অনন্য শ্রেষ্ঠত্ব। কুরআনের শ্রেষ্ঠত্ব হইল এই যে, আলঙ্কারিক রূপকভাষা, হিতোপদেশপূর্ণ ঘটনাবলী ও ছোট ছোট কাহিনী ইত্যাদি অত্যন্ত উপযুক্ত স্থলে ব্যবহৃত হইয়াছে। ইহাতে ভাষার সৌন্দর্য, বর্ণনার মাধুর্য বর্ধিত হওয়ার সাথে সাথে, অল্প কথায় বহু ব্যাপক অর্থ প্রকাশ করিয়াছে। এখানে ‘কুরআন’ কে আবার ‘মাসানী’ বলা হইয়াছে। অর্থাৎ মৌলিক বিশ্বাসসমূহ ও অতি প্রয়োজনীয় আকিদাগুলিকে কুরআন বিভিন্নভাবে, বিভিন্ন পন্থায় ও বিভিন্ন রূপ দিয়া বার বার বর্ণনা করিয়াছে, যাহাতে এইগুলির অপরিহার্যতা, প্রয়োজনীয়তা ও উদ্দেশ্য মানুষের মনে দৃঢ়ভাবে প্রোথিত করিয়া দেওয়া যায়। এই ‘মাসানী’ শব্দ দ্বারা ইহাও ব্যক্ত করা হইয়াছে যে, কুরআনের কতকগুলি শিক্ষা অন্যান্য ঐশী কিতাবের শিক্ষার মতই। তবে, কুরআনে অনেক নতুন শিক্ষামালা আছে যাহা অতীত কিতাবে নাই। শেষোক্ত শিক্ষাগুলি সৌন্দর্যে ও শ্রেষ্ঠত্বে এতই বৈশিষ্ট্য-মণ্ডিত যে, অন্যান্য কিতাবের শিক্ষা এইগুলির ধারে কাছেও যাইতে পারে না, তুলনায় আসা তো দূরের কথা।

اَفَمَنۡ یَّتَّقِیۡ بِوَجۡہِہٖ سُوۡٓءَ الۡعَذَابِ یَوۡمَ الۡقِیٰمَۃِ ؕ وَقِیۡلَ لِلظّٰلِمِیۡنَ ذُوۡقُوۡا مَا کُنۡتُمۡ تَکۡسِبُوۡنَ ﴿۲۵﴾

২৫
তবে যে ব্যক্তি কিয়ামত দিবসে নিকৃষ্ট আযাব হইতে বাঁচিবার জন্য নিজ মুখমণ্ডলকে২৫৭৩ ঢাল বানাইবে সে কি (জান্নাতবাসীর সমান হইতে পারিবে)? এবং যালেমদিগকে বলা হইবে, ‘তোমরা যাহা কিছু অর্জন করিতে উহার স্বাদ গ্রহণ কর।’
২৫৭৩। কিয়ামতের দিন অবিশ্বাসীগণ যে ভয়াবহ শাস্তি পাইবে, এই শব্দগুলি সেই ভয়াবহতাই তুলিয়া ধরিয়াছে। ঐ ভীষণ শাস্তিতে তাহারা কাণ্ডজ্ঞানহীন ও দিশাহারা হইয়া পড়িবে। এমনি দিশাহারা হইবে যে, মুখমণ্ডল সর্বাপেক্ষা স্পর্শকাতর ও অনুভূতিশীল হওয়া সত্ত্বেও, এই মুখমণ্ডলকে বাঁচাইবার চেষ্টা না করিয়া তাহারা ইহাকে অগ্নির দিকে আগাইয়া দিবে।

کَذَّبَ الَّذِیۡنَ مِنۡ قَبۡلِہِمۡ فَاَتٰٮہُمُ الۡعَذَابُ مِنۡ حَیۡثُ لَا یَشۡعُرُوۡنَ ﴿۲۶﴾

২৬
তাহাদের পূর্ববর্তীগণও (নবীগণকে) মিথ্যাবাদী বলিয়া অস্বীকার করিয়াছিল যাহার ফলে তাহাদের উপর এমন দিক হইতে আযাব আসিয়াছিল যাহা তাহারা অনুমানও করিতে পারে নাই।

فَاَذَاقَہُمُ اللّٰہُ الۡخِزۡیَ فِی الۡحَیٰوۃِ الدُّنۡیَا ۚ وَلَعَذَابُ الۡاٰخِرَۃِ اَکۡبَرُ ۘ لَوۡ کَانُوۡا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۲۷﴾

২৭
সুতরাং আল্লাহ্ তাহাদিগকে ইহজীবনেও লাঞ্ছনা ভোগ করাইয়াছেন, এবং পরকালের আযাব হইবে গুরুতর, হায়! যদি তাহারা বুঝিত।

وَلَقَدۡ ضَرَبۡنَا لِلنَّاسِ فِیۡ ہٰذَا الۡقُرۡاٰنِ مِنۡ کُلِّ مَثَلٍ لَّعَلَّہُمۡ یَتَذَکَّرُوۡنَ ﴿ۚ۲۸﴾

২৮
এবং নিশ্চয় আমরা এই কুরআনে মানবমণ্ডলীর জন্য সর্বপ্রকার দৃষ্টান্ত বর্ণনা করিয়াছি যেন তাহারা উপদেশ গ্রহণ করে।২৫৭৪
২৫৭৪। চব্বিশ আয়াতে ‘কুরআনের’ যথার্থতা সম্বন্ধে যে যুক্তি দেওয়া হইয়াছে, এখানে সেই যুক্তিকে জোরদার করা হইয়াছে, এই বলিয়া যে, কুরআন মানুষের জন্য সর্বোত্তম বার্তা বহন করিয়া আনিয়াছে। মানুষের নৈতিক ও আধ্যাত্মিক উৎকর্ষ সাধনের জন্য যে নীতিমালা ও যে শিক্ষাসমূহ প্রয়োজন, তাহা বিস্তারিতভাবে ও পূর্ণতমরূপে কুরআনে সবিশেষ বর্ণিত হইয়াছে। মানুষের জীবনকে সুন্দর, সাবলীল ও সুমহান করিবার সকল বিষয়াদি ও সকল সামগ্রী কুরআনের পাতায় বিশ্লেষিত হইয়াছে এবং বিশ্বাস ও কর্মক্ষেত্রে ইহা সকলের জন্য পথ-প্রদর্শক।

قُرۡاٰنًا عَرَبِیًّا غَیۡرَ ذِیۡ عِوَجٍ لَّعَلَّہُمۡ یَتَّقُوۡنَ ﴿۲۹﴾

২৯
কুরআনকে আরবী ভাষায় বক্রতামুক্ত করিয়া (আমরা নাযেল করিয়াছি), যেন তাহারা তাক্‌ওয়া অবলম্বন করিতে পারে।

ضَرَبَ اللّٰہُ مَثَلًا رَّجُلًا فِیۡہِ شُرَکَآءُ مُتَشٰکِسُوۡنَ وَرَجُلًا سَلَمًا لِّرَجُلٍ ؕ ہَلۡ یَسۡتَوِیٰنِ مَثَلًا ؕ اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ ۚ بَلۡ اَکۡثَرُہُمۡ لَا یَعۡلَمُوۡنَ ﴿۳۰﴾

৩০
আল্লাহ্ দৃষ্টান্ত বর্ণনা করিতেছেন: এক ব্যক্তির যাহার কয়েকজন এমন মালিক রহিয়াছে যাহারা পরস্পর মত বিরোধ রাখে এবং অপর এক ব্যক্তির যাহার মালিক পুরাপুরি এক জনই। এই দুই জনের অবস্থা কি সমান হইতে পারে?২৫৭৫ সকল প্রশংসা আল্লাহ্‌র জন্য। কিন্তু তাহাদের অধিকাংশই ইহা জানে না।
২৫৭৫। যাহারা বহু ঈশ্বরে বিশ্বাস করে, তাহারা ঐ ব্যক্তির ন্যায় যাহার অনেক প্রভু রহিয়াছে। এই প্রভুরা পরস্পর বিরোধী, ঝগড়াটে ও বদমেযাজী। এক প্রভু বলে ডানে যাও, তো অপর প্রভু বলে বামে যাও। এমতাবস্থায়, ঐ ব্যক্তির অবস্থা যেমন অতীব শোচনীয় হয়, বহু দেব-দেবীর উপাসকদের অবস্থাও তেমনি শোচনীয় হয়। তাহারা কখন ঐ একেশ্বরবাদীর মত হইতে পারে না যে মাত্র একজনের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য সেই একজনেরই সেবা করে।