التكوير
At-Takwir
মক্কী সূরা, বিসমিল্লাহসহ ৩০ আয়াত এবং ১ রুকূ
(হিজরতের পূর্বে অবতীর্ণ)
সূরাটি নবুওয়তের ৬ষ্ঠ বছরে কিংবা সম্ভবত এর কিছু পূর্বে অবতীর্ণ হয়েছে। পূর্ববর্তী সূরাগুলোতে কিয়ামত বা ‘পুনরুত্থানের’ বিষয় এবং হযরত নবী করীম (সা.) নিজ জনগণের মাঝে যে মহাবিপ্লব এনেছিলেন (যাকে কুরআনের ভাষায় ‘পুনরুত্থান’ বলা হয়েছে) তা বর্ণিত হয়েছে। এ ‘পুনরুত্থান’ পৃথিবীতে দুবার সংঘটিত হবার কথা ছিল। প্রথমে মহানবী (সা.)-এর স্বয়ং আগমনের মাধ্যমে, অতঃপর দ্বিতীয়বার তাঁর (সা.) প্রতিনিধি প্রতিশ্রুত মসীহ ও মাহদী (আ.)-এর মাধ্যমে, যার সুস্পষ্ট ইঙ্গিত রয়েছে কুরআনের ৬২:৪ আয়াতে। ইসলামের দুর্দিনে প্রতিশ্রুত মসীহর হাতে ইসলামের পুনরুত্থানের ও পুনর্জাগরণের যে আশ্বাসবাণী রয়েছে এবং যে-সকল বৈপ্লবিক পরিবর্তন সে সময়ে সংঘটিত হবার কথা, এ সূরাতে তারই একটা চিত্র তুলে ধরা হয়েছে। সূরাটি ভবিষ্যতে সংঘটিতব্য পরিবর্তনগুলোর বর্ণনা দানের মাধ্যমে আরম্ভ হয়েছে এবং তখনকার মুসলিম-বিশ্বের নৈতিক অধঃপতন ও তার কারণসমূহের প্রতিও ইঙ্গিত দিয়েছে। শেষ দিকে তাদেরকে আশা ও আনন্দের বাণী শুনিয়ে সূরাটি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, অবশেষে মুসলমানদের অধঃপতনের ঘোর অন্ধকারের অবসান হয়ে যাবে এবং তাদের কৃতকার্যতার প্রভাত পুনরায় উপস্থিত হবে, কেননা ইসলাম বিশ্বমানবের জন্য আল্লাহর সর্বশেষ ধর্ম হবার কারণে সগৌরবে টিকে থাকতেই এসেছে।
** এই সূরায় পবিত্র কুরআন পৃথিবীতে সংঘটিতব্য বৈপ্লবিক ঘটনাবলির সংবাদ আরো একবার প্রদান করেছে, যা কিয়ামতের লক্ষণ বলে বিবেচিত হবে। সূর্যকে সাক্ষীরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে যখন তাকে আচ্ছাদিত করা হবে অর্থাৎ সেই যুগের শত্রুরা মহানবী (সা.)-এর জ্যোতি মানবজাতির কল্যাণে মানুষের কাছে পৌঁছাতে দেবে না আর এক্ষেত্রে তাদের নোংরা অপপ্রচার মাঝখানে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। আর তখন সাহাবীদের (রা.) আদর্শের জ্যোতিকেও শত্রুরা ম্লান করে দেবে। ফলে সূর্যের অনুপস্থিতিতে যেভাবে নক্ষত্ররাজি খানিকটা হলেও আলোর চাহিদা পূরণ করে থাকে, সেভাবে সাহাবীদের জ্যোতি ম্লান হবার ফলে মানুষের কোনো উপকারে আসবে না। এটি সেই যুগ হবে যখন বড়ো বড়ো পাহাড়পর্বত চালনা করা হবে। অর্থাৎ পাহাড়সম বিশাল সব সামুদ্রিক জাহাজ ও উড়োজাহাজ ভ্রমণ ও পরিবহনের কাজে ব্যবহৃত হবে আর এগুলোর বিপরীতে উট অকেজো জিনিসের মতো ফেলে রাখা হবে। এটি সেই যুগ- যখন চিড়িয়াখানা বানানোর বহুল প্রচলন ঘটবে। জানা কথা, মহানবী (সা.)-এর যুগে এর কোনো অস্তিত্বই ছিল না। আর এই যুগের চিড়িয়াখানাগুলোও একথার সাক্ষী, বিরাট ও অতিকায় যে-সব জীবজন্তু জাহাজ ও উড়োজাহাজে করে এতে (অর্থাৎ চিড়িয়াখানায়) আনা-নেওয়া করা হয়- সেই যুগের মানুষ তা কল্পনাও করতে পারত না।
এরপর খুব সম্ভব বিভিন্ন নৌযুদ্ধের প্রতি আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হয়েছে। সমুদ্রে যখন ব্যাপকহারে জাহাজ চালনা করা হবে এবং এর ফলে দূরদূরান্তে থাকা মানুষজনের মাঝেও যোগাযোগ স্থাপিত হবে, অর্থাৎ কেবল পশুপাখি ও জীবজন্তুগুলোকেই একত্রিত করা হবে না, বরং মানবজাতিকেও একত্রিত করা হবে। সেই যুগটি আইন-আদালতের যুগ হবে, অর্থাৎ গোটা পৃথিবীতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত হবে। এমনকি নিজ সন্তানের প্রতিও বিন্দুমাত্র অন্যায় বা নিপীড়নমূলক আচরণ করার অনুমতি দেওয়া হবে না। বাহ্যত যদিও সারা পৃথিবীতে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠিত থাকবে, কিন্তু আল্লাহ তা’লার আইন মান্য না করার ফলে জাগতিক আইনকানুন কোনো দেশ থেকেই নৈরাজ্য দূর করতে সমর্থ হবে না। এই যুগটি ব্যাপকহারে বইপুস্তক ও পত্রপত্রিকা প্রকাশনার যুগ হবে। আর মহাকাশ নিয়ে গবেষণাও এমন পর্যায়ে পৌঁছাবে, যেন আকাশের আবরণ তুলে ফেলা হবে। সেই যুগে জাহান্নামকেও প্রজ্বলিত করা হবে, যা যুদ্ধবিগ্রহের আগুনের পাশাপাশি ঐশী ক্রোধের ফলে আপতিত দৈবদুর্যোগের আগুনকেও বুঝায়। এই সবকিছু সত্ত্বেও যারা আল্লাহ তা’লা প্রদত্ত শিক্ষার ওপর প্রতিষ্ঠিত থাকবে তাদের জন্য জান্নাতকে নিকটবর্তী করা হবে। আর প্রত্যেকেই জেনে যাবে, সে নিজের জন্য আগাম কী পাঠিয়েছে!
১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে গোপন অভিযান পরিচালনা করে ফিরে আসা সেসব নৌযানকে সাক্ষী হিসাবে উপস্থাপন করা হয়েছে যেগুলো অভিযান শেষে নির্দিষ্ট বন্দর বা ঘাঁটিতে গিয়ে লুকিয়ে পড়ে। এই বিষয়টির পুনরুল্লেখ করার কারণ হলো, এখানে এর দ্বারা সেসব শয়তানী চিন্তাভাবনাকে বুঝানো হয়েছে যেগুলো মানুষের মনোজগতে আক্রমণ করে আবার উবে যায়। আবার সেই রাতকে সাক্ষীরূপে উপস্থাপন করা হয়েছে যা শেষ প্রহরে গিয়ে পৌঁছাবে আর প্রভাতের উদয়ের লক্ষণ প্রকাশ পাবে। আর অবশেষে এই আঁধার রাত এক পর্যায়ে গিয়ে ইসলামের নতুন প্রভাতে পরিণত হবে। *
* হযরত খলীফাতুল মসীহ রাবে (রাহে.) কর্তৃক উর্দুতে অনূদিত কুরআন করীমে প্রদত্ত সূরার ভূমিকা দ্রষ্টব্য।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
اِذَا الشَّمۡسُ کُوِّرَتۡ ۪ۙ﴿۲﴾
وَاِذَا النُّجُوۡمُ انۡکَدَرَتۡ ۪ۙ﴿۳﴾
وَاِذَا الۡجِبَالُ سُیِّرَتۡ ۪ۙ﴿۴﴾
وَاِذَا الۡعِشَارُ عُطِّلَتۡ ۪ۙ﴿۵﴾
وَاِذَا الۡوُحُوۡشُ حُشِرَتۡ ۪ۙ﴿۶﴾
وَاِذَا الۡبِحَارُ سُجِّرَتۡ ۪ۙ﴿۷﴾
وَاِذَا النُّفُوۡسُ زُوِّجَتۡ ۪ۙ﴿۸﴾
وَاِذَا الۡمَوۡءٗدَۃُ سُئِلَتۡ ۪ۙ﴿۹﴾
بِاَیِّ ذَنۡۢبٍ قُتِلَتۡ ۚ﴿۱۰﴾