“শয়তান তাহাকে জ্ঞান-বুদ্ধিহারা করিয়া ফেলে” কথাগুলি দ্বারা ইহাই বুঝায় যে, পাগল যেমন নিজের কর্মফলের হিতাহিত জ্ঞান রাখে না, তেমনি অর্থ লগ্নিকারীরা জগতের, সমাজের ও ব্যক্তির নৈতিক ও আর্থিক কতবড় ক্ষতি সাধন করে, সেই দিকে মোটেও তাকায় না এবং পরওয়াও করে না। ‘রিবা’ ঋণদাতার লাভের লালসাকে এতই বাড়াইয়া তুলে যে, তাহার মন-মস্তিষ্ক নেশাগ্রস্ত হইয়া পড়ে এবং ভালোর দিকে তাহার আকর্ষণ একেবারে কমিয়া যায়। ‘রিবা’কে ইসলাম বিশেষভাবে এই কারণে নিষিদ্ধ করিয়াছে, যেহেতু ইহা ধনকে মাত্র গুটিকতক লোকের হাতে কুক্ষিগত করিবার অবাধ সুযোগ করিয়া দেয় এবং ধনের ন্যায়সঙ্গত ও সুষম বন্টনকে প্রতিরোধ করে। অর্থ লগ্নিকারীরা অলসতায় জীবন কাটায়। অন্যকে সাহায্য করার প্রবৃত্তি, তাহাদের পূরাপূরি লোপ পায়, তাহাদের হৃদয়ের সহানুভূতির দরজাগুলি একেবারে বন্ধ হইয়া যায়। অন্যের অভাব-অনটন ও দারিদ্র্য-কষ্ট হইতে তাহারা ফায়দা লুটে। তেমনি ঋণ-গ্রহীতা সাধারণতঃ সহজ-লভ্য টাকা-প্রাপ্তির লোভ সংবরণ করিতে না পারিয়া, ঋণ-গ্রহণের ব্যাপারে বেশ তাড়াহুড়া করে। এমনকি পরিশোধ ক্ষমতা তাহার আছে কি নাই, তাহাও বিবেচনা করার ধৈর্য তাহার থাকে না। এইভাবে, নিজের নৈতিক অধঃপতনের সাথে সাথে, সে ঋণ-দাতারও নৈতিক পতন ঘটায়। ‘রিবা’ যুদ্ধ লাগায় এবং যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করে। ঋণ ছাড়া দীর্ঘস্থায়ী যুদ্ধ কখনও সম্ভব নয়। এই ঋণ ও সুদ যখন পরিশোধ করার সময় হয়, তখন বিজয়ী এবং বিজিত উভয়েই নিজেদেরকে অর্থনৈতিক চরম দুর্দশায় নিপতিত দেখিতে পায়। সহজে ঋণ-প্রাপ্তি যুদ্ধ-স্পৃহাকে বাড়াইয়া তুলে, কেননা নাগরিকগণ হইতে প্রত্যক্ষ কর আদায়ের ঝক্কি-ঝামেলা ইহাতে কমিয়া যায়। তাই, ইসলাম সর্ব প্রকারের সুদকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। বর্তমান যুগে সুদের সাথে ব্যবসায়ের যে অবিচ্ছেদ্য সম্পর্ক গড়িয়া উঠিয়াছে, তাহাতে ‘সুদকে’ জীবন হইতে সম্পূর্ণ বাদ দেওয়া একেবারে অসম্ভব বলিয়া মনে হয়। তবে পদ্ধতির পরিবর্তন, পারিপার্শ্বিকতার বিবর্তন ও ব্যবস্থার নিয়ন্ত্রণ দ্বারা সুদ-মুক্ত ব্যবসা-বাণিজ্য চালানো নিশ্চয় সম্ভব হইতে পারে, যেমনটি হইয়াছিল ইসলামের উন্নতির যুগে।