الرحمن
Ar-Rahman
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৭৯ আয়াত এবং ৩ রুকু আছে।
নাযেল হওয়ার সময় ও প্রসঙ্গ
সূরা কাফ হইতে সূরা ওয়াকেআ পর্যন্ত যে সাতটি সূরার একটি গ্রুপ নবুওয়াতের পঞ্চম বৎসরে, প্রায় কাছাকাছি সময়ে, অবতীর্ণ হইয়াছিল এবং যেগুলিতে প্রায় একই ধরণের বিষয়-বস্তু স্থান পাইয়াছে, ইহা সেই সপ্ত-সূরার ষষ্ঠটি। ঐ সপ্তকের অন্যান্য ছয়টি সূরার মত, এই সূরাটিতেও ইসলামের মৌলিক নীতিগুলি যেমন, আল্লাহ্তা’লার গুণাবলী ও একত্ব, ওহী-ইলহাম এবং পুনরুত্থান ইত্যাদি বিষয় আলোচিত হইয়াছে। পূর্ববর্তী সূরা আল্ কামারে আরব অধিবাসীদের কাছে পরিচিত জাতিগণের উদাহরণ দিয়া বলা হইয়াছিল যে, ঐ প্রাচীন জাতিগুলি তাহাদের নবীগণকে অস্বীকার করার ফলে এবং ঐশী-বাণীকে প্রত্যাখ্যান করার ফলে, ধ্বংস হইয়া গিয়াছিল এবং সূরাটিতে এই কথাও বলা হইয়াছিল যে, কুরায়শগণ কি ঐ উদাহরণগুলি হইতে শিক্ষা গ্রহণ করিবে না এবং সহজ-বোধ্য ও সহজে অনুসরণীয় কুরআনের সরল ঐশী-বাণীকে গ্রহণ করিবে না? কুরআন কি কারণে অবতীর্ণ হইয়াছে সূরাতে তাহাও বর্ণিত হইয়াছে।
বিষয়-বস্তু
এই সূরা আরম্ভ হইয়াছে আল্লাহ্তা’লার গুনবাচক নাম আর রহমান দ্বারা, যাহার তাৎপর্য এই যে, বিশ্ব-জগতের সবকিছু সৃষ্টি করার পর আল্লাহ্ তাঁহার সৃষ্টির মুকুট ও চূড়ামণিরূপে মানুষকে সৃষ্টি করিলেন। আর এই সব কিছুই করিলেন, স্বীয় সদাশয়তা, অযাচিত দানশীলতা ও মঙ্গলকামিতার কারণে (রহমানীয়াতের কারণে)। মানুষকে সৃষ্টি করার পর, আল্লাহ্তা’লা তাহাদের মধ্যে নিজেকে প্রকাশ করিবার উদ্দেশ্যে, তাহার বাণী-বাহক নবীগণকে পাঠাইতে লাগিলেন। কারণ, মানুষ সৃষ্টির পিছনে যে বিরাট ও পবিত্র উদ্দেশ্য রহিয়াছে, তাহা জানিবার ও বুঝিবার জন্য এবং উহার অনুকূলে নির্ধারিত উচ্চমার্গস্থ গন্তব্যে পৌঁছার জন্য ঐশী-বাণী দ্বারা পথ-প্রাপ্তি ও পরিচালিত হওয়া একান্ত প্রয়োজন। নবুওয়াত ও রেসালত মহানবী (সাঃ)-এর মাধ্যমে পূর্ণ মাত্রায় ও চরম-উৎকর্ষে প্রকাশ লাভ করিল। আল্লাহ্তা’লা তাহাকে কুরআনের মাধ্যমে সর্বকালের সর্বমানবের পথ-নির্দেশনার জন্য সর্বশেষ ও সর্বশেষ্ঠ ঐশী-বিধান প্রদান করিলেন। মানুষকে বহু গুণাবলী দিয়া সৃষ্টি করিয়াই, তাহার প্রতি আল্লাহ্র দান শেষ হইয়া যায় নাই। তিনি সারা বিশ্বকেই সেবায় নিয়োজিত করিয়াছেন, এই মহাকাশের গ্রহ-তারকারাজি আর পৃথিবীর অশেষ সম্পদ, গভীর সমুদ্ররাশি আর সুউচ্চ পর্বতমালা– এ সবই মানুষের জন্য তৈরী করা হইয়াছে। আর, এই সব কিছুরই উপরে, আল্লাহ্তা’লা মানুষকে যাহা দিয়াছেন তাহা হইল তাহার উচ্চমানের বুদ্ধি-বৃত্তি ও বিচার-শক্তি, যাহাতে সে ভাল-মন্দ, ন্যায়-অন্যায়, সুনীতি-কুনীতি যাচাই করিয়া ঐশী পথ অবলম্বন করতঃ স্বীয় জীবনোদ্দেশ্য চরিতার্থ করিতে পারে। কিন্তু মানুষ এমনি এক ধাতে গঠিত যে, দয়াময়, মঙ্গলকামী, পরমহিতৈষী আল্লাহ্তা’লা তাহার সম্মুখে আধ্যাত্মিক উন্নতি ও উন্নয়নের যে সীমাহীন সুযোগ খুলিয়া রাখিয়াছেন তাহা হইতে উপকার লাভের পরিবর্তে সে নিজের আত্মম্ভরিতা ও ঔদ্ধত্য প্রকাশ করে এবং ঐশী বিধানের প্রতি হেলাভরে বৃদ্ধাঙ্গুলি প্রদর্শন করতঃ নিজের উপর আল্লাহ্তা’লার অসন্তুষ্টির অভিশাপ নামাইয়া আনে। সূরাটিতে ইঙ্গিত দেওয়া হইয়াছে যে, এমন এক যামানা আসিবে (মনে হয়, বর্তমান যামানার প্রতি ইঙ্গিত করা হইয়াছে) যখন আসমানী আইন-কানুনের প্রতি মানুষ অভক্তি ও বিরূপ মনোভাব প্রদর্শন করিবে এবং এই অশ্রদ্ধার ভাব ব্যাপক ও তীব্র আকার ধারণ করিবে এবং উহার ফলে এমন বিধ্বংসী ও প্রলয়ংকরী শাস্তি আল্লাহ্র তরফ হইতে নামিয়া আসিবে যে, মানবেতিহাসে ইহার দৃষ্টান্ত খুঁজিয়া পাওয়া যাইবে না। যদিও দোষী ও অন্যায়কারীগণের শাস্তি ভয়ঙ্কর ও প্রলয়ঙ্করী রূপ ধারণ করিবে, তথাপি ঐ লোভ-লালসা ও ভোগ-বিলাসপূর্ণ পার্থিব সুখ-সর্বস্ব যুগে ধার্মিক ও খোদাভীরুদের জন্য আল্লাহ্র অনুগ্রহরাজিও হইবে সীমাহীন। একদিকে ভয়ঙ্কর শাস্তি আর অপরদিকে ঐশী অনুগ্রহ ও আশীর্বাদ ইহাই প্রমাণ করিবে যে, আল্লাহ্ যেমনি হিসাব গ্রহণে দ্রুত, তেমনি মহিমা ও সম্মানের প্রভুও তিনিই। মনে হয়, এই সূরাতে সেই যুগের কথাই আলোচিত হইয়াছে, যে যুগে পশ্চিমা জাতিগুলির ক্ষমতা ও মর্যাদার দম্ভ সর্বোচ্চ শিখরে পৌঁছিবে।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
عَلَّمَ الۡقُرۡاٰنَ ؕ﴿۳﴾
خَلَقَ الۡاِنۡسَانَ ۙ﴿۴﴾
اَلشَّمۡسُ وَالۡقَمَرُ بِحُسۡبَانٍ ﴿۪۶﴾
وَّالنَّجۡمُ وَالشَّجَرُ یَسۡجُدٰنِ ﴿۷﴾
وَالسَّمَآءَ رَفَعَہَا وَوَضَعَ الۡمِیۡزَانَ ۙ﴿۸﴾
اَلَّا تَطۡغَوۡا فِی الۡمِیۡزَانِ ﴿۹﴾
وَاَقِیۡمُوا الۡوَزۡنَ بِالۡقِسۡطِ وَلَا تُخۡسِرُوا الۡمِیۡزَانَ ﴿۱۰﴾