سبأ
Saba
ইহা মক্কায় অবতীর্ণ, বিসমিল্লাহ্সহ ইহাতে ৫৫ আয়াত এবং ৬ রুকু আছে।
অবতীর্ণ হওয়ার তারিখ, শিরোনাম এবং প্রসংগ
এই সূরাটি মক্কায় অবতীর্ণ হইয়াছিল। তবে ঠিক কোন সময়ে নাযেল হইয়াছিল, উহার সঠিক তারিখ নিরূপণ করা কঠিন। কোন কোন বিশেষজ্ঞের মতে ইহা মক্কী জীবনের মাঝামাঝি সময়কার সূরা, আবার রডওয়েল এবং নলডিকির মত কোন কোন পণ্ডিত ইহাকে আরো পরে অবর্তীর্ণ হইয়াছিল বলিয়া মনে করেন। পূর্ববর্তী কয়েকটি সূরার মধ্যেই অন্য ধর্মের উপরে ইসলাম ধর্মের চূড়ান্ত বিজয় সম্পর্কিত ভবিষ্যদ্বাণীর কথা অন্তর্ভুক্ত করা হইয়াছিল। তবে এই সূরার অব্যবহিত পূর্বের সূরা ‘আল আহযাবে’ এই বিষয়টি বিস্তৃত পরিসরে আলোচিত হইয়াছে যে, কিভাবে অন্ধকারের সম্মিলিত শক্তি ইসলামকে ধ্বংস করার জঘন্য পরিকল্পনায় সম্পূর্ণরূপে ব্যর্থ হয়, কিভাবে নিতান্ত অসহায় অবস্থার মধ্য দিয়া কঠোর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হইয়া ইসলাম ইহার সম্মান ও প্রতিপত্তি অর্জন করে,এইসব কিছুই উহাতে বলা হইয়াছে। বর্তমান সূরাটিতে বিশেষভাবে মুসলমানদেরকে সতর্ক করা হইয়াছে যাহাতে তাহারা খারাপ আচার-আচরণ হইতে নিজদিগকে বাঁচাইয়া রাখে। কেননা, জাগতিক সম্পদে যখন কোন জাতি প্রাচুর্য অর্জন করে, তখন সাধারণভাবে তাহারা আয়েসী জীবনের দিকে ঝুঁকিয়া পড়ে। যেহেতু কোন জাতির সহিতই সর্বকালের জন্য আল্লাহ্তা’লার কোন বিশেষ সম্পর্ক নাই, তাই মুসলমানরাও যদি তাহাদের জাগতিক উন্নতি ও প্রাচুর্যের সুষমার মধ্যে পাপ পঙ্কিল জীবন যাপনে অভ্যস্ত হইয়া পড়ে, তাহা হইলে তাহাদের পূর্ববতী—সেবিয়ান বা সুলায়মান (আঃ)-এর পরবর্তী বনী ইসরাঈল জাতির যে অবস্থা হইয়াছিল, মুসলমানদেরকেও সেই একই দুর্ভোগ পোহাইতে হইবে।
বিষয়বস্তু
সূরাটি প্রথমেই আল্লাহ্র গুণাবলী প্রকাশক বাণী দ্বারা শুরু হইয়াছে, যেমন, ‘সকল প্রশংসা আল্লাহ্র, আকাশসমূহে ও পৃথিবীতে যাহা কিছু আছে সবই তাহারই।’ ইহার তাৎপর্য ইহাই যে, যেহেতু আল্লাহ্তা’লা মহান ও সর্বাপেক্ষা শক্তিশালী— তাই যাহারা তাহার এই আধিপত্যকে অস্বীকার করিবে তাহারা অবশ্যই ব্যর্থ ও নিরাশ হইয়া যাইবে। অতঃপর, বলা হইয়াছে যে, অস্বীকারকারীরা এই প্রতারণাপূর্ণ ধারণায় বিশ্বাসী যে, ইসলামের বাণীকে অস্বীকারজনিত কোন শাস্তিতেই তাহারা নিপতিত হইবে না। যেমন তাহারা বলিয়া থাকে আমরা কখনই কিয়ামতের সম্মুখীন হইব না। তাহাদেরকে সতর্ক করিয়া বলা হইয়াছে যে, তাহাদের বর্তমান মান-সম্মান সব লুপ্ত হইবে এবং তাহাদের শক্তিও খর্ব হইবে, যাহা বাস্তব ক্ষেত্রে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর সত্যতার প্রমাণ হিসাবে প্রতিভাত হইবে। অতঃপর সূরাটিতে হযরত দাউদ (আঃ) ও হযরত সুলায়মান (আঃ)-এর রাজত্বকালীন কিছু ঘটনার প্রতি বিস্তৃত আলোকপাত করা হইয়াছে। তাহারা উভয়েই নূতন রাজ্য জয় করিয়া তাহাদের রাজ্য-সীমাকে অনেক দূর পর্যন্ত বাড়াইয়াছিলেন এবং বিদ্রোহী অনেক গোত্রকে বশীভূত করিয়াছিলেন। বস্তুতঃ তাহাদের সময়েই বনী ইসরাঈলীরা তাহাদের শক্তি ও মর্যাদার সর্বোচ্চ স্তরে উন্নীত হইয়াছিল। কিন্তু তাহাদের শক্তি ও প্রতিপত্তির গর্বে তাহারা ক্রমে ক্রমে খারাপ আচার-আচরণের দিকে ঝুঁকিয়া পড়ে এবং পাপ-পঙ্কিল জীবন যাপন করিতে থাকে। বনী ইসরাঈলের প্রসংগ উল্লেখের পর সূরাটিতে সেবিয়ান জাতির উল্লেখ করা হইয়াছে, যাহারা বনী ইসরাঈলীদের মতই কৃষ্টি ও সভ্যতায় যথেষ্ট অগ্রগতি সাধন করিয়াছিল। কিন্তু তাহারাও বনী ইসরাঈলীদের মত পাপাচারে লিপ্ত হইয়া পড়ে এবং আল্লাহর আদেশ-নির্দেশ অমান্য করে, ফলে ঐশী আযাবে নিপতিত হয় এবং প্রবল বন্যার পানিতে ভাসাইয়া তাহাদিগকে ধ্বংস করা হয়। প্রথমতঃ হযরত দাউদ (আঃ) ও সুলায়মান (আঃ)-এর রাজত্বকালীন বনী ইসরাঈলীদের অগ্রগতি এবং তৎপরে সেবিয়ান জাতির জাগতিক উন্নতির প্রসংগ বর্ণনা এবং পরবর্তীতে উভয়ের ধ্বংস প্রাপ্ত হইবার ঘটনাকে পেশ করিয়া সূরাটিতে আসলে মুসলমানদেরকে একটি সতর্কবাণী শুনানো হইয়াছে। তাহা হইল এই যে, মুসলমানদেরকেও জাগতিক উন্নতির বিভিন্ন উপকরণ প্রদান করা হইবে, কিন্তু তাহাদের এই উন্নতির শিখরে পদার্পণ করিয়া তাহারা যদি বনী ইসরাঈল ও সেবিয়ান জাতির মত নিজেদেরকে আরাম-আয়েসের মধ্যে ডুবাইয়া দেয়, তাহা হইলে ঐ জাতিদ্বয়ের মত তাহাদেরকেও ঐশী আযাব ভোগ করিতে হইবে। অতঃপর, সূরাটিতে ইহার মূল বক্তব্য উপস্থাপিত হইয়াছে অর্থাৎ, কিভাবে ইসলামের বাণী দিন দিন প্রসার লাভ করিবে আর মূর্তি-উপাসকরা এবং তাহাদের মিথ্যা দেবতারা কিভাবে দুর্ভাগ্যজনক অবস্থার সম্মুখীন হইবে। অবিশ্বাসীদেরকে প্রতিদ্বন্দ্বিতার আহবান জানাইয়া বলা হইয়াছে যে, তাহারা যেন তাহাদের দেব-দেবীর সাহায্যে ইসলামের ক্রমোন্নতিশীল ধারাকে প্রতিহত করে এবং তাহাদের নিজস্ব মিথ্যা ধ্যান-ধারণার মধ্যে যে ক্রমাবনতি শুরু হইয়াছে উহাকে ঠেকাইয়া রাখে। অবশ্য তাহাদেরকে জানাইয়া দেওয়া হইয়াছে যে, পৃথিবীতে এমন কোন শক্তি নাই যাহা এই চলমান অবস্থার উদ্দিষ্ট লক্ষ্যকে বাধা দিতে সক্ষম। তাহারা যেন বস্তুনিষ্ঠ পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে ঘটমান অবস্থার প্রকৃত স্বরূপ সম্পর্কে অবহিত হয়, অর্থাৎ তাহাদের পরাজয় এবং ইসলামের বিজয় সম্পর্কে ধারণা লাভ করিতে পারে। তাহাদেরকে প্রকৃতির নিয়ম-কানুনের প্রতি অভিনিবেশ সহকারে লক্ষ্য করিতে বলা হইয়াছে, যাহার সবকিছুই ইসলামের অনুকূলে কাজ করিয়া যাইতেছে। অবিশ্বাসীদের এই প্রশ্ন যে কখন ইসলামের বিজয় সংক্রান্ত ভবিষ্যদ্বাণীর পূর্ণতা সংঘটিত হইবে? ইহার উত্তরে সূরাটিতে একটি সম্ভাব্য তারিখও নির্দিষ্ট করিয়া দেওয়া হইয়াছে। নিদর্শন হিসাবে উক্ত তারিখ শুরু হইবে হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর মদীনায় হিজরত করার এক বৎসর পরে, যখন মক্কার কোরায়শরা নবী করীম (সাঃ)-কে নিজ মাতৃভূমি হইতে বহিষ্কার করার শাস্তি হিসাবে এই ঐশী আযাবের সম্মুখীন হইবে। অতঃপর, সূরাটিতে বলা হইয়াছে যে, যখনই পৃথিবীতে কোন ঐশী সংস্কারকের আবির্ভাব হয়, তখন সমাজের সুবিধাবাদী শ্রেণী তাহাদের কায়েমী-স্বার্থ রক্ষার্থে ঐশী আন্দোলনের বিরোধিতা করিয়া থাকে। তাহারা এই ধারণার বশবর্তী হয় যে, নূতন আন্দোলনের ফলে সমাজের দুর্বল শ্রেণীর উপরে তাহাদের যে আধিপত্য রহিয়াছে উহার ভিত্তি দুর্বল হইয়া যাইবে, কেননা এই সব লোক ঐশী আন্দোলনে অংশ গ্রহণ করিয়া তাহাদের দ্বারা শোষণ ও উৎপীড়নের শিকার হইতে মুক্ত হইয়া যাইবে। তখন আর কিছুতেই তাহাদের উপরে অত্যাচারের স্টীম রোলার চালানো যাইবে না। কাজেই ঐশী আন্দোলন যাহাতে অংকুরেই বিনষ্ট হইয়া যায়, সেইজন্য এইসব লোক চেষ্টার কোন ত্রুটি করে না, এবং যাহারা শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণী, তাহাদেরকে ভয়-ভীতি প্রদর্শন করিয়া তাহাদের দলে থাকিতে বাধ্য করে, যাহাতে তাহাদের সাথে থাকিয়া ঐশী সংস্কারকের বিরোধিতা করা যায়। সূরাটির শেষের দিকে একটি সাধারণ মানদণ্ড বা নির্ণায়ককে তুলিয়া ধরিয়া বলা হইয়াছে যে, ইহার সাহায্যেই ফায়সালা করা যায় যে, হযরত মুহাম্মদ (সাঃ) কোন প্রতারক বা উন্মাদ ব্যক্তি নহেন, বরং তিনি আল্লাহ্র একজন সত্য নবী। কেননা, একজন প্রতারক কখনই তাহার ঈপ্সিত লক্ষ্য অর্জনে সাফল্য লাভ করে না, বরং পরিণামে তাহার আন্দোলন ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। অথচ হযরত মুহাম্মদ (সাঃ)-এর ধর্মীয় আন্দোলন দিন দিনই সাফল্যের দিকে অগ্রসর হইতেছে। অন্যদিকে, একজন উন্মাদ লোকের পক্ষেও ইহা কখনো সম্ভবপর নহে যে, সে একটি জাতির সামগ্রিক জীবনে একটি বাঞ্ছিত পরিবর্তন সাধন করিবে, যেরূপ বিপ্লবাত্মক পরিবর্তন নবী করীম (সাঃ) তাঁহার জাতির জীবনে সম্পন্ন করিয়াছেন।
بِسۡمِ اللّٰہِ الرَّحۡمٰنِ الرَّحِیۡمِ ﴿۱﴾
اَلۡحَمۡدُ لِلّٰہِ الَّذِیۡ لَہٗ مَا فِی السَّمٰوٰتِ وَمَا فِی الۡاَرۡضِ وَلَہُ الۡحَمۡدُ فِی الۡاٰخِرَۃِ ؕ وَہُوَ الۡحَکِیۡمُ الۡخَبِیۡرُ ﴿۲﴾
یَعۡلَمُ مَا یَلِجُ فِی الۡاَرۡضِ وَمَا یَخۡرُجُ مِنۡہَا وَمَا یَنۡزِلُ مِنَ السَّمَآءِ وَمَا یَعۡرُجُ فِیۡہَا ؕ وَہُوَ الرَّحِیۡمُ الۡغَفُوۡرُ ﴿۳﴾
وَقَالَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا لَا تَاۡتِیۡنَا السَّاعَۃُ ؕ قُلۡ بَلٰی وَرَبِّیۡ لَتَاۡتِیَنَّکُمۡ ۙ عٰلِمِ الۡغَیۡبِ ۚ لَا یَعۡزُبُ عَنۡہُ مِثۡقَالُ ذَرَّۃٍ فِی السَّمٰوٰتِ وَلَا فِی الۡاَرۡضِ وَلَاۤ اَصۡغَرُ مِنۡ ذٰلِکَ وَلَاۤ اَکۡبَرُ اِلَّا فِیۡ کِتٰبٍ مُّبِیۡنٍ ٭ۙ﴿۴﴾
لِّیَجۡزِیَ الَّذِیۡنَ اٰمَنُوۡا وَعَمِلُوا الصّٰلِحٰتِ ؕ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ مَّغۡفِرَۃٌ وَّرِزۡقٌ کَرِیۡمٌ ﴿۵﴾
وَالَّذِیۡنَ سَعَوۡ فِیۡۤ اٰیٰتِنَا مُعٰجِزِیۡنَ اُولٰٓئِکَ لَہُمۡ عَذَابٌ مِّنۡ رِّجۡزٍ اَلِیۡمٌ ﴿۶﴾
وَیَرَی الَّذِیۡنَ اُوۡتُوا الۡعِلۡمَ الَّذِیۡۤ اُنۡزِلَ اِلَیۡکَ مِنۡ رَّبِّکَ ہُوَ الۡحَقَّ ۙ وَیَہۡدِیۡۤ اِلٰی صِرَاطِ الۡعَزِیۡزِ الۡحَمِیۡدِ ﴿۷﴾
وَقَالَ الَّذِیۡنَ کَفَرُوۡا ہَلۡ نَدُلُّکُمۡ عَلٰی رَجُلٍ یُّنَبِّئُکُمۡ اِذَا مُزِّقۡتُمۡ کُلَّ مُمَزَّقٍ ۙ اِنَّکُمۡ لَفِیۡ خَلۡقٍ جَدِیۡدٍ ۚ﴿۸﴾
اَفۡتَرٰی عَلَی اللّٰہِ کَذِبًا اَمۡ بِہٖ جِنَّۃٌ ؕ بَلِ الَّذِیۡنَ لَا یُؤۡمِنُوۡنَ بِالۡاٰخِرَۃِ فِی الۡعَذَابِ وَالضَّلٰلِ الۡبَعِیۡدِ ﴿۹﴾
اَفَلَمۡ یَرَوۡا اِلٰی مَا بَیۡنَ اَیۡدِیۡہِمۡ وَمَا خَلۡفَہُمۡ مِّنَ السَّمَآءِ وَالۡاَرۡضِ ؕ اِنۡ نَّشَاۡ نَخۡسِفۡ بِہِمُ الۡاَرۡضَ اَوۡ نُسۡقِطۡ عَلَیۡہِمۡ کِسَفًا مِّنَ السَّمَآءِ ؕ اِنَّ فِیۡ ذٰلِکَ لَاٰیَۃً لِّکُلِّ عَبۡدٍ مُّنِیۡبٍ ﴿٪۱۰﴾